হীলাহ্ বিবাহ এবং তার শরয়ী ফায়সালা (৩)
, ০৪ মুহররম শরীফ, ১৪৪৮ হিজরী সন, ২১ আউওয়াল, ১৩৯৪ শামসী সন , ২০ জুন, ২০২৬ খ্রি:, ০৬ আষাঢ়, ১৪৩৩ ফসলী সন, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) মহিলাদের পাতা
হীলাহ্ বিবাহের প্রকারভেদ:
সমাজে দুই ধরনের হীলাহ্ বিবাহের প্রচলন রয়েছে-
১.শর্তযুক্ত হীলাহ্। যা শরীয়ত বহির্ভূত,হারাম-নাজায়েয ও লা’নতের কারণ।
২. শর্তবিহীন হীলাহ্। যা জায়েয, শরীয়ত সম্মত ও ফযীলতের কারণ।
১. শর্তযুক্ত হীলাহ্। যা শরীয়ত বহির্ভূত, হারাম- নাজায়েয ও লা’নতের কারণ। তালাক প্রাপ্তা আহলিয়াকে (স্ত্রী) হালাল করার লক্ষে শরীয়ত বহির্ভূত, মনগড়া পদ্ধতি অবলম্বন করা। অর্থাৎ কারো নিকট এই শর্তে বিবাহ দেয়া যে, তুমি তার সাথে নির্জনবাস করবেনা। বরং বিবাহের এক ঘন্টা বা দুই ঘন্টা পর তালাক দিবে। এরূপ বিবাহ দৃশ্যত বিবাহ, কিন্তু হাক্বীক্বতে (প্রকৃতপক্ষে) তা বিবাহ নয়। কেননা نكاح (বিবাহের) হাক্বীক্বী বা প্রকৃত অর্থ, নির্জনবাস। আর মাজাজী বা রূপক অর্থ, আকদ বা বন্ধন। এখানে হাক্বীক্বী বা প্রকৃত বিবাহ হয়নি। কাজেই, তা গোনাহের কাজে সহায়তার শামিল। যা লক্ষ কোটি গোনাহের পথকে উম্মুক্ত করে। সেটা লা’নতের কারণ।
মহান আল্লাহপাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন,
وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَىٰۖ وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَان ۚ وَاتَّقُوا اللَّهَ ۖ إِنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ
অর্থ: আর তোমরা নেক কাজ ও খোদাভীতিতে পরস্পর সাহায্য-সহযোগীতা করো। আর গোনাহের কাজে ও শত্রুতার মধ্যে সাহায্য-সহযোগীতা করো না। মহান আল্লাহ পাক উনাকে ভয় করো। নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ পাক তিনি কঠিন শাস্তি দাতা। (পবিত্র সূরা মায়িদাহ শরীফ-০২)
উল্লেখ্য যে, শর্ত দিয়ে বিবাহ করলে শর্ত বাতিল হয়, কিন্তু বিবাহ বহাল থাকে। আর ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে শর্ত দিলে, ক্রয়-বিক্রয় বাতিল হয়, শর্ত বহাল থাকে। কাজেই, নিরিবিলি অবস্থান না করার শর্তে বিবাহ করার পরেও যদি নিরিবিলি অবস্থান করে তবুও হীলাহ্ শুদ্ধ হবে। দ্বিতীয় আহাল বা স্বামী তালাক দিলে, ইদ্দত পালন করার পর প্রথম আহাল বা স্বামী পুনরায় বিবাহ করতে পারবে। কিন্তু নিরিবিলি অবস্থান না করলে প্রথম আহাল বা স্বামীর জন্য উক্ত নারী হালাল হবেনা। সাইয়্যিদাতুনা হযরত উম্মুল মু’মিনীন আছ ছালিছাহ ছিদ্দীক্বাহ আলাইহাস সালাম, তিনি বর্ণনা করেন-
سئل رسول الله صلى الله عليه وسلم عن رجل طلق امرأته (يعني ثلاثا) فتزوجت زوجا غيره فدخل بها، ثم طلقهاقبل أن يواقعها أتحل لزوجها الأول؟ قالت: قال النبي صلى الله عليه وسلم لاتحل للأول حتى تذوق عسيلة الآخر ويذوق عسيلتها.
অর্থ: একদা নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি এমন এক ব্যক্তি সর্ম্পকে জিজ্ঞাসিত হলেন, যে ব্যক্তি তার আহলিয়া বা স্ত্রীকে তিন তালাক দিয়েছে। অতঃপর সে নারী অন্য লোকের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছে। সে তার দ্বিতীয় আহাল বা স্বামীর ঘরেও গিয়েছে, কিন্তু তার সাথে নির্জনবাস হয়নি। পরে দ্বিতীয় আহাল বা স্বামী তাকে তালাক দিয়েছে। সে নারী কি তার প্রথম আহাল বা স্বামীর জন্য হালাল হবে? নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, সে নারী তার প্রথম আহালের জন্য ততক্ষণ পর্যন্ত হালাল হবেনা, যতক্ষণ না সে অপরের নির্জনবাসের স্বাদ গ্রহণ করে এবং তার মাধ্যমে অন্য কেহ নির্জনবাসের স্বাদ গ্রহণ করে। অর্থাৎ নির্জনবাস না হলে হীলাহ্ শুদ্ধ হবেনা। (বুখারী শরীফ-২৪৯৬, মুসলিম শরীফ- ১৪৩৩, তিরমিজী শরীফ- ১১১৮, নাসায়ী শরীফ- ৩৪০৭, আবু দাঊদ শরীফ- ২৩০৯, ইবনে মাজাহ শরীফ- ১৯৩২, মুসনাদে আহমাদ শরীফ-৬/২২৬, মুয়াত্তা ইমাম মালিক শরীফ-১১২৭, দারিমী শরীফ-২২৬৭)
পবিত্র হাদীছ শরীফে আরো বর্ণিত আছে-
عَنْ حضرت ام المومنين عَائِشَةَ عليها السلام قالت أَنَّ امْرَأَةَ حضرت رِفَاعَةَ الْقُرَظِيِّ رضي الله عنه جَاءَتْ إِلَى رَسُولِ اللهِ صلى الله عليه وسلم فَقَالَتْ إِنِّي كُنْتُ عِنْدَ حضرت رِفَاعَةَ فَطَلَّقَنِي رضي الله عنه فَبَتَّ طَلَاقِي فَتَزَوَّجْتُ حضرت عَبْدَ الرَّحْمَنِ بْنَ الزَّبِيرِ رضي الله عنه وَإِنَّ مَا مَعَهُ مِثْلُ هُدْبَةِ الثَّوْبِ فَتَبَسَّمَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم فَقَالَ أَتُرِيدِينَ أَنْ تَرْجِعِي إِلَى حضرت رِفَاعَةَ رضي الله عنه لَا حَتَّى تَذُوقِي عُسَيْلَتَهُ وَيَذُوقَ عُسَيْلَتَكِ ـ
অর্থ: সাইয়্যিদাতুনা হযরত উম্মুল মু’মিনীন আছ ছালিছাহ ছিদ্দীক্বাহ আলাইহাস সালাম তিনি বর্ণনা করেন, সাইয়্যিদুনা হযরত রিফায়াহ আল-কুরাযী রদ্বিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু উনার আহলিয়া (স্ত্রী) একদা নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার খিদমত মুবারকে হাজির হলেন। তারপর বললেন, ইয়া রসূলাল্লাহ! ইয়া হাবীবাল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম!! আমি সাইয়্যিদুনা হযরত রিফায়াহ রদ্বিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু উনার বিবাহাধীন ছিলাম। তিনি আমাকে তিন তালাক দিলেন। পরে আমি সাইয়্যিদুনা হযরত আবদুর রহমান ইবনে যুবাইর রদ্বিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু উনার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হই। কিন্তু উনার সাথে কাপড়ের পোটলার ন্যায় বস্তু ছাড়া কিছুই নাই। নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি নূরূত তাবাসসুম মুবারক তথা মুচকি হেসে ইরশাদ মুবারক করলেন, আপনি কি সাইয়্যিদুনা হযরত রিফায়াহ্ রদ্বিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু উনার নিকট আবার ফিরে যেতে চান? তা হবে না, যতক্ষণ না আপনি উনার মধু পান করেন এবং তিনি আপনার মধু পান করেন।
পবিত্র হাদীছ শরীফে আরো বর্ণিত আছে-
عَنْ حضرت ابْنِ عُمَرَ رضي الله عنه عَنْ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم فِي الرَّجُلِ تَكُونُ لَهُ الْمَرْأَةُ فَيُطَلِّقُهَا فَيَتَزَوَّجُهَا رَجُلٌ فَيُطَلِّقُهَا قَبْلَ أَنْ يَدْخُلَ بِهَا أَتَرْجِعُ إِلَى الْأَوَّلِ قَالَ لَا حَتَّى يَذُوقَ الْعُسَيْلَةَ ـ
অর্থ: সাইয়্যিদুনা হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রদ্বিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু তিনি বর্ণনা করেন, এক ব্যক্তি তার আহলিয়া বা স্ত্রীকে তালাক দেয়ার পর অপর এক ব্যক্তি তাকে বিবাহ করে। সে তার সাথে নির্জনবাসের পূর্বে পুনরায় তাকে তালাক দেয়। উক্ত স্ত্রীলোকটি কি প্রথম আহাল বা স্বামীর সাথে পুনরায় বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারবে? নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, না। যতক্ষণ না সে তার মধু পান করে (তার সাথে নিরিবিলি অবস্থান না করা পর্যন্ত জায়েয হবেনা) (নাসায়ী শরীফ- ৩৪১৪, বায়হাকী শরীফ- ৭/৪৫৯, মুসতাদরাকে হাকীম শরীফ- ৩/২২৬)
-আল্লামা মুফতী সাইয়্যিদ মুহম্মদ আব্দুল হালীম।
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু আনহুম উনাদের সম্পর্কে কটূক্তি করা কাট্টা কুফরী
২০ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে সম্বোধন মুবারক করার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ আদব-শরাফত বজায় রাখতে হবে
২০ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
তওবা
১৯ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের দায়িত্ব-কর্তব্য
১৮ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
তিন ধরনের লোক বেহেশ্তে প্রবেশ করবে না
১৮ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
সাইয়্যিদু সাইয়্যিদিল আ’ইয়াদ শরীফ মেহমানদারী করার মাধ্যমে উদযাপনে শাফায়াত মুবারক লাভ
১৮ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
কারবালার ঘটনার জন্য মালউন ইয়াযিদ লানতুল্লাহি আলাইহি দায়ী এবং সে কাট্টা কাফির (১)
১৭ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
৩টি বিশেষ নেক কাজ, যা ইন্তেকালের পরও জারি থাকে
১৭ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
যে ৪ শ্রেণীর লোকদের জন্য ক্বিয়ামতের দিন সুপারিশ ওয়াজিব হবে
১৭ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
মহিলাদের সুন্নতী লিবাস, অলংকার ও সাজ-সজ্জা (২০)
১৬ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
হাশরের ময়দানে যে ৫টি প্রশ্নের উত্তর প্রত্যেককেই দিতে হবে
১৬ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
মহাসম্মানিত মহাপবিত্র হযরত আহলু বাইত শরীফ আলাইহিমুস সালাম উনারা বেমেছাল ফযীলত মুবারকের অধিকারী
১৬ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার)












