যে পাঁচ সমুদ্রপথের ওপর নির্ভরশীল বিশ্বের বাণিজ্য
, ১০ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০:০০ এএম ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) পাঁচ মিশালী
সম্প্রতি ইরান যুদ্ধ একটি বড় সমস্যাকে সবার সামনে এনেছে। সেটা হলো, বিশ্ব বাণিজ্য অল্প কিছু সরু সমুদ্রপথের ওপর নির্ভরশীল, যেগুলোকে প্রায়ই ‘সরু পথ’ বলা হয়ে থাকে।
নিম্নে বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথগুলো সম্পর্কে এবং সেগুলো বাধাগ্রস্ত হলে সম্ভাব্য কি ধরনের ঝুঁকি হতে পারে সে বিবরণ তুলে ধরা হলো-
(১) হরমুজ প্রণালি:
বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত জ্বালানি পথ হলো হরমুজ প্রণালি। এটি পারস্য উপসাগরকে ওমান সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। সমুদ্রপথে পরিবাহিত অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৩৯ শতাংশ এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের ১৯ শতাংশ এই পথ দিয়েই যায়। বাণিজ্যের অন্যান্য সরু পথগুলোর তুলনায় এই হরমুজ প্রণালির বৈশিষ্ট্য হলো, পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি রপ্তানির জন্য বাস্তবিকভাবেই এই পথটির কোনো বিকল্প নেই।
১৯৮০ সাল থেকেই ইরান মাঝে মাঝেই হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়ে আসছে। তবে গত ৪০ দিনে সেখানে জাহাজ চলাচলে যে বাধার সৃষ্টি হয়েছে, সেটা গত কয়েক দশকের মধ্যে উত্তেজনা যেভাবে বেড়েছে তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর।
এই পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল দিয়ে বছরে ২৬ মিলিয়ন বা দুই কোটি ৬০ লাখের বেশি কন্টেইনার যাতায়াত করে এবং বিশ্বের সার রপ্তানির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এই হরমুজ প্রণালি দিয়েই পরিবহন করা হয়।
(২) সুয়েজ খাল:
লোহিত সাগরকে ভূমধ্যসাগরের সাথে সংযুক্ত করেছে সুয়েজ খাল। যেটি এশিয়া এবং ইউরোপের ভ্রমণের সময় অন্তত ১০ দিন কমিয়ে দিয়েছে। বিশ্বের মোট সামুদ্রিক বাণিজ্যের ১০ শতাংশই এই নৌপথ দিয়ে হয়।
এর মধ্যে রয়েছে মোট কন্টেইনার পরিবহনের ২২ শতাংশ, যানবাহন চলাচলের ২০ শতাংশ এবং ক্রুড বা অপরিশোধিত তেলের ১০ শতাংশ। যেহেতু এই সুয়েজ খাল মিশরের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে সেহেতু এটি সহজে বা সরাসরি কোনো হুমকির সম্মুখীন হয় না।
তবে এই নৌপথটি যে দুর্ঘটনার ঝুঁকি থেকে মুক্ত নয় তা ২০২১ সালে একটি বড় জাহাজ আটকে যাওয়ার ঘটনায় প্রমাণিত হয়। ওই জাহাজটি আটকে যাওয়ায় ছয় দিন সরু এই সুয়েজ খালটি বন্ধ ছিলো। এর ফলে প্রায় ১০ বিলিয়ন বা এক হাজার কোটি ডলারের বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এই কৌশলগত খালটির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত বাবে আল মানদাব প্রণালি। গাজায় হামাসের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী ইসরায়েলের যুদ্ধের প্রতিবাদে ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ইয়েমেনের হুথিরা বাণিজ্যিক জাহাজগুলোতে যে হামলা চালিয়েছিলো তার ফলে অনেক জাহাজ পথ পরিবর্তন করে আফ্রিকা হয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিলো।
এই কারণে সুয়েজ খালে জাহাজ চলাচলের সংখ্যা যেটি ২০২৩ সালে ২৬ হাজারের বেশি ছিলো তা কমে পরের বছরে ১৩ হাজারে নেমে দাঁড়িয়েছে।
(৩) পানামা খাল:
বৈশ্বিক সামুদ্রিক বাণিজ্যের প্রায় দুই দশমিক পাঁচ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে প্রশান্ত এবং আটলান্টিক সাগরকে সংযুক্তকারী পানামা খাল। এই দুই দশমিক পাঁচ শতাংশ তুলনামূলকভাবে কম হলেও কন্টেইনারজাত পণ্য, গাড়ি এবং শস্যের মতো উচ্চমূল্যের কার্গো এবং কৌশলগত পণ্য এই খাল বা সমুদ্রপথ দিয়ে বেশি পরিবহন করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের মোট কন্টেইনার কার্গোবাহী পণ্যের প্রায় ৪০ শতাংশ এই খাল দিয়ে পরিবহন করা হয়, যার বার্ষিক মূল্য ২৭০ বিলিয়ন ডলার। এই খালের দুর্বলতা মূলত পানিবায়ু পরিস্থিতি এবং রাজনৈতিক ইস্যু উভয় বিষয়ের সঙ্গেই সংযুক্ত।
২০২৩ এবং ২০২৪ সালে তীব্র খরা শুরু হলে খালের মিঠা পানিগুলোতে পানির স্তর উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়, ফলে জাহাজের সংখ্যা এবং আকার সীমিত করতে বাধ্য হয় মিশরীয় কর্তৃপক্ষ। এই খালের কিছু বন্দর হংকংভিত্তিক হাচিসন কোম্পানি পরিচালনা করে, যা আমেরিকার উদ্বেগের কারণ।
(৪) মালাক্কা প্রণালি:
মালাক্কা প্রণালি বিশ্বের ব্যস্ততম সমুদ্রপথ। বিশ্বের সামুদ্রিক বাণিজ্যের ২৪ শতাংশ এই সমুদ্রপথ দিয়ে হয়। এর মধ্যে রয়েছে সমুদ্রপথে পরিবাহিত ক্রুড বা অপরিশোধিত তেলের ১০ শতাংশ এবং অটোমোবাইল বাণিজ্যের ২৬ শতাংশ।
সিঙ্গাপুরের পাশ দিয়ে গেছে এই মালাক্কা প্রণালি। যেটি বিশ্বের দ্বিতীয় ব্যস্ততম কন্টেইনার পোর্ট বা বন্দর। চীন, জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়ার জ্বালানির জন্য একটি প্রধান গেটওয়ে বা প্রবেশপথ এই মালাক্কা প্রণালি।
চীনের তেল আমদানির প্রায় ৮০ শতাংশই এই পথ দিয়ে আসে। এই নির্ভরশীলতাকে মালাক্কা ডিলেমা বা দ্বিধা বা উভয়সঙ্কট হিসেবে উল্লেখ করে বেইজিং।
পাইরেসি এখনো একটি কন্সট্যান্ট কনসার্ন বা অবিরাম উদ্বেগ হিসেবে রয়েছে। ২০২৫ সালে এই মালাক্কা প্রণালিতে ১৩০টিরও বেশি নৌদস্যুতার ঘটনা ঘটেছে।
এই অঞ্চলে সামুদ্রিক আধিপত্য বিস্তার নিয়ে চীন-যুক্তরাষ্ট্র বা ভারতের মধ্যে যে কোন ধরনের উত্তেজনা বাড়লে এই প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।
এছাড়া সুনামি এবং আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের ঝুঁকিতেও রয়েছে এই মালাক্কা প্রণালি।
(৫) টার্কিশ প্রণালি:
কৃষ্ণ সাগর এবং ভূমধ্যসাগরের মধ্যে একমাত্র সমুদ্রপথ হলো তুরস্কের বসফোরাস এবং দার্দেনেলিস প্রণালি। বিশ্বের সমুদ্র পরিবাহিত বাণিজ্যের তিন শতাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়।
এই প্রণালির মাধ্যমে ইউক্রেন, রাশিয়া এবং রোমানিয়া থেকে বিশ্বের মোট গম রপ্তানির প্রায় ২০ শতাংশ পরিবহন করা হয়। এই প্রণালির সবচেয়ে সরু অংশ ৭০০ মিটার চওড়া, এই রুট তুরস্কের ইস্তাম্বুল শহরের মাঝখান দিয়ে বয়ে গেছে।
এ কারণে এখানে জাহাজ চালানো কঠিন হয়ে পড়ে এবং ছোটখাটো সংঘর্ষের ঘটনা এখানে সাধারণ বিষয়। মন্ট্রেক্স কনভেনশন অনুযায়ী, এই প্রণালিগুলোতে প্রবেশাধিকার সামরিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করে তুরস্ক।
২০২২ সালে ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধ শুরুর পর আঙ্কারা এই ক্ষমতা ব্যবহার করে যুদ্ধজাহাজ চলাচল সীমিত করেছে তবে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের পথ খোলা রেখেছে। শক্তিশালী ভূমিকম্পের ঝুঁকিও এই অঞ্চলে একটি বড় উদ্বেগের বিষয়।
উল্লেখ্য, হরমুজ প্রণালিতে চলমান সংকট বৈশ্বিক বাণিজ্যের চরম এই ঝুঁকি প্রকাশ করেছে যে, বিশ্ববাণিজ্য মাত্র অল্প কয়েকটি সরু নৌপথের ওপর নির্ভরশীল।
তবে উক্ত পাঁচ সমুদ্রপথই যে বাণিজ্যের একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট বিষয়টি এমন নয়। পুরো বিশ্বে এমন অন্তত ২৪টি কৌশলগত সামুদ্রিক পয়েন্ট বা সমুদ্রপথ রয়েছে। এর মধ্যে তাইওয়ান, ডোভার এবং বেরিং প্রণালির মতো কিছু গুরুত্বপূর্ণ নৌপথও অন্তর্ভুক্ত।
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
গাজীপুরে চীনা চাষির খেতে ১ ফুট লম্বা মরিচ!
০৯ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
যেহেতু ট্রাইব্যুনালের নিকট প্রতীয়মান হয় যে, নিম্ন বর্ণিত মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তিগণ গ্রেফতার এড়ানোর জন্য পলাতক রয়েছেন। সেহেতু উক্ত অভিযুক্ত ব্যক্তিগণকে এ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের তারিখ হতে ১৫ (পনের) দিনের মধ্যে অত্র ট্রাইব্যুনালে হাজির হওয়ার জন্য নির্দেশ দেয়া গেল। অন্যথায় তাদের অনুপস্থিতিতে মামলার বিচার কার্য সম্পন্ন করা হবে।
০৮ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
চাঁদের পথে অর্ধেক পথ পাড়ি, মহাকাশ থেকে পৃথিবীর ছবি
০৭ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
গরমে ডিহাইড্রেশন দূর করতে আখের রসই যথেষ্ট
০৫ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
সমুচা আবিষ্কার করেছেন মুসলমানগণ
০৪ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
দিনে একটি পেয়ারা খেলেই যথেষ্ট
০৪ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
মানুষ কত ধরনের গন্ধ অনুভব করতে পারে?
০৩ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
ঘোড়ায় টানা ট্রেন ও তার ১২৩ বছরের ইতিহাস
০৩ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
কেন রক্তের গ্রুপ জেনে রাখা জরুরি?
০২ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
‘হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলবে, কিন্তু ড্রাম্পের জন্য বন্ধ থাকবে’
০২ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
৭ টনের উল্কা বিস্ফোরণ, দিনের আলোতে দেখা গেলো আগুনের গোলা
০১ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
রহস্যময় ধূমকেতুর উল্টো ঘোরা: মহাকাশে নতুন চমক
০১ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার)












