মুসলমানদের পবিত্র কুরবানী আয়োজনে নগর ব্যবস্থাপনা সমন্বয়ের অভাব কোথায়? পশু কুরবানির হাট বসানোর অবৈধ তকমার আড়ালে এক নীরব সংকট!
, ১৭ মে, ২০২৬ ১২:০০:০০ এএম ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) মন্তব্য কলাম
আসন্ন পবিত্র কুরবানির হাট নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে যে আলোচনা শুরু হয়েছে, তা এখন আদালতের দোরগোড়ায় পৌঁছে গেছে। সিটি করপোরেশনের কথিত ইজারা না পাওয়া হাটগুলো একে একে বিলুপ্ত হওয়ার পথে।
‘অবৈধ হাট’ এই একটি শব্দের আড়ালে যে আয়োজনটি লুকিয়ে আছে, সেটি কেবল একটি বাজার নয়; এটি একটি দ্বীনি উৎসবের প্রাণ, মানুষের বিশ্বাসের অংশ, এবং বহু মানুষের জীবিকার একমাত্র ভরসা। অথচ আজ সেই আয়োজনটিকেই ধীরে ধীরে অপরাধের আসনে বসানো হচ্ছে। এর অভিঘাত এসে পড়েছে ঢাকার ঐতিহ্যবাহী মেরাদিয়া হাটেও, যা বহু বছর ধরে একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য মানুষের প্রয়োজন মিটিয়ে আসছে। অথচ আমরা যেন ইচ্ছে করেই ভুলে যাচ্ছি এই হাট বছরজুড়ে থাকে না, এটি মাত্র পাঁচ থেকে সাত দিনের একটি অস্থায়ী বাস্তবতা, যা পবিত্র ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে এবং শেষ হয়ে যায়।
এই হাটগুলো বন্ধ হয়ে গেলে তার প্রভাব কেবল একটি এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। মেরাদিয়া বা আফতাবনগর হাট বন্ধ মানে দক্ষিণ বনশ্রী, রামপুরা, খিলগাঁও, বাসাবো, বাড্ডা এমনকি গুলশান পর্যন্ত বিস্তৃত জনপদের লাখো কোটি মুসলমানের কুরবানির পশু সংগ্রহে সংকট তৈরি হওয়া। এটি কেবল সরবরাহের ঘাটতির প্রশ্ন নয়; এটি সরাসরি মানুষের জীবনযাত্রা ও সাধ্যের সঙ্গে জড়িত।
হাজারো প্রান্তিক খামারি, দিনমজুর, পরিবহন শ্রমিক এবং মৌসুমি ব্যবসায়ী এই কয়েকটি দিনের আয়ের ওপর নির্ভর করে সারা বছরের হিসাব মেলান। এই পথ বন্ধ হয়ে গেলে তারে সামনে বিকল্প কী? তাদের করুণ কণ্ঠ কি কোথাও শোনা হচ্ছে?
সম্মানিত দ্বীন ইসলামের দৃষ্টিতে পবিত্র কুরবানি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত, যা কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং আত্মত্যাগ, সংযম এবং সামাজিক বণ্টনের শিক্ষা দেয়। পবিত্র কুরআন শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে, তাদের গোশত বা রক্ত মহান আল্লাহ পাক উনার কাছে পৌঁছে না, বরং তোমাদের তাক্বওয়াই উনার কাছে পৌঁছে।
এই আয়াত শরীফ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, পবিত্র কুরবানির আসল লক্ষ্য হৃদয়ের ভেতরের ঈমান ও আল্লাহভীতি। কিন্তু সেই পবিত্র ইবাদত বাস্তবায়নের জন্য যে সামাজিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাটি প্রয়োজন, সেটিকে যদি আমরা অকারণে বাধাগ্রস্ত করি, তবে তা কেবল একটি বাজার বন্ধ করা নয়; বরং একটি পবিত্র ইবাদতের পথকেই কঠিন করে তোলা।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক আমরা প্রায়ই উপেক্ষা করি। নগরের বিভিন্ন স্থানে গুটিকতক হিন্দুর জন্য রাস্তা বন্ধ করে মেলা বসে, মিছিল হয়, কনসার্ট হয়, পূজাম-প স্থাপন করা হয় এবং এসব আয়োজনে মারাত্মকভাবে জনদুর্ভোগ তৈরি হয়, পরিবেশ দূষণ ঘটে, শব্দ দূষণ বাড়ে। কিন্তু সেগুলো খুব কম ক্ষেত্রেই প্রশাসনের দায়িত্বশীলদের কাছে অবৈধ তকমা পায় বা একই কঠোরতার মুখোমুখি হয়। তখন প্রশ্নটা আরও তীব্র হয়ে ওঠে, দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের দ্বীনি একটি স্বল্পমেয়াদি আয়োজনের ক্ষেত্রেই কেন এত কঠোরতা? এটি কি নীতির প্রয়োগ, নাকি দৃষ্টিভঙ্গির বৈষম্য?
এই পরিস্থিতিকে ঘিরে আরও একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। হাট বন্ধের গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়তেই কিছু প্রভাবশালী এগ্রোফার্ম বড় অঙ্কের বিজ্ঞাপন দিয়ে বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে শুরু করেছে। যদি খোলা বাজার সংকুচিত হয়ে যায়, তবে স্বাভাবিকভাবেই নিয়ন্ত্রণ চলে যাবে অল্প কয়েকটি শক্তিশালী গোষ্ঠী তথা সিন্ডিকেটের হাতে। তখন প্রতিযোগিতা কমে যাবে, দাম বাড়বে, আর সাধারণ মানুষ বাধ্য হবে বেশি দামে পশু কিনতে। এটি শুধু অর্থনৈতিক চাপই তৈরি করবে না, বরং একটি স্বাভাবিক দ্বীনি চেতনার অনুশীলনকেও অনেকের জন্য কঠিন করে তুলবে। প্রশ্ন হচ্ছে- এটা কি ন্যায্যতা, নাকি এক ধরণের নীরব বৈষম্য?
বাস্তবতা হলো পবিত্র কুরবানির হাট কোনো অনিয়ন্ত্রিত বিশৃঙ্খলা নয় চাইলেই এটিকে সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনা করা সম্ভব। নির্ধারিত খোলা জায়গা, সীমিত সময়ের অনুমতি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদারকি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং স্বেচ্ছাসেবকদের সম্পৃক্ততার মাধ্যমে একটি নিরাপদ ও পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করা যায়। এমনকি আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার ডিজিটাল লেনদেন, অনলাইন ট্র্যাকিং, এলাকাভিত্তিক ভিড় নিয়ন্ত্রণ এসব যুক্ত করলে এই ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর ও জনবান্ধব করা সম্ভব। জনবহুল এলাকায় হাটের সংখ্যা কমিয়ে দেয়ার বদলে পরিকল্পিতভাবে বাড়ানো হলে বরং চাপ কমবে, ভোগান্তিও কমবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো, পাশাপাশি একাধিক হাট বন্ধ করে দেওয়া মানে শুধু একটি বাজার বন্ধ করা নয় এটি মানুষের আয় রোজগারের বিকল্পকে বন্ধ করে দেওয়া। তখন মানুষকে দূরে যেতে হয়, বাড়ে পরিবহন ব্যয়, বাড়ে নিরাপত্তা ঝুঁকি, এবং সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ মানুষ। এতে কেবল পবিত্র কুরবানির পশু কেনা কঠিন হয়ে ওঠে না, বরং মানুষের ভেতরে এক ধরনের হতাশা তৈরি হয় যেখানে তারা মনে করে তাদের দ্বীনি অনুশীলন, তাদের অধিকার, এমনকি তাদের সম্মানও যেন গুরুত্ব পাচ্ছে না।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি খুব সরল, কিন্তু উত্তরটি এড়িয়ে যাওয়া কঠিন! প্রশ্ন দাঁড়ায়, সমস্যা কি পবিত্র কুরবানির হাট, নাকি দ্বীনি বিষয়ে সরকারের উদাসীনতা? একটি অস্থায়ী, প্রয়োজনভিত্তিক এবং মানুষের জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত এই আয়োজনকে অবৈধ তকমা দিয়ে বন্ধ করে দেয়ার চেষ্টা কি সত্যিই সমাধান, নাকি এটি আরও বড় সংকটের পথ তৈরি করছে?
মানুষ কেবল পবিত্র কুরবানি দেয় না, মানুষ বিশ্বাস ধরে রাখে, অধিকার ধরে রাখে, নিজের অস্তিত্বের একটি অংশ ধরে রাখে। সেই জায়গাটিকে যদি সংকুচিত করার অপচেষ্টা করা হয়, তবে প্রশ্নটা কেবল একটি হাটের নয়, প্রশ্নটা সকলের বিবেকের কাছে- সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের দেশে নির্বিঘেœ দ্বীনি অধিকার লালন পালনে আর কত বাধা দেয়ার অপচেষ্টা অব্যাহত থাকবে?
-ফিয়াদ নওশাদ ইয়ামিন।
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
শুধু একটি মৃত্যুর খবর, নাকি একটি সমাজের ভবিষ্যৎ?
১০ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
সস্তা জনপ্রিয়তার বিপরীতে সস্তা জনরোষের পথেই কী হাটতে চায় সরকার? মাত্র ১০/১৫ হাজার কোটি টাকার জন্য ওয়াদা খেলাফ করে বিদ্যুতের দাম আবার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতির আগুনে আরো ঘি ঢালছে সরকার। জনভোগান্তির জুলুম থেকে সরে আসতে হবে সরকারকে।
০৯ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
ঢাকামুখী জনস্রোত বন্ধ এবং ঢাকা শহরের প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বিকেন্দ্রীকরণ ব্যতীত অন্য কোন পদ্ধতিতে কখনোই যানজট নিরসনের স্থায়ী সমাধান হবে না (৮)
০৮ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
১৯৯০ সালে কাঁচা চামড়া রফতানীর নিষিদ্ধ করণের প্রেক্ষাপট বর্তমানে নেই। এ মুহুর্তে কাঁচা চামড়া রফতানীর অনুমোদন বর্তমান সংকটকে অনেকটাই কমাতে পারে।
০৪ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
কুরবানী আসে-যায় মৌসুমী কসাইরা অরক্ষা আর অবহেলাতেই থেকে যায়। তাদের অনেকে আহত হয়, পঙ্গু হয়, আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে যায়- মৌসুমী কসাইদের প্রশিক্ষণ ও পৃষ্টপোষকতার পাশাপাশি ঈদুল আদ্বহায় বিশেষ স্বাস্থসেবা চালু করা দরকার।
০৩ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
‘দ্যা গ্রেট রিসেট’ ও নমরুদী মশার প্রতিশোধের এক চরম ইহুদী-নাসারায়ী নীলনকশা!
২৬ মে, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
বিদ্যুতের বিল বার বার বাড়ানো শোষক জমিদারি কায়দায় চক্র বৃদ্ধি হারে খাজনার চাবুক মারা অথচ বিদ্যুতে শুধু চুরি নয়, সব দিক থেকে সাগর চুরি হচ্ছে। সে চুরির ক্ষত পোষাতে জনগণের উপর খাজনা বৃদ্ধি করে চোরদের উৎসাহ ও প্রনোদনা এবং নিরাপত্তা দেয়া হচ্ছে।
২৫ মে, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
সে যুগেও হুসাইন আহমদকে ইহুদীদের দালাল, হিন্দুদের কংগ্রেসের পা চাটা- গোলাম প্রচারণা করা হলেও থানভী গংরা তা বুঝতে পারলো কৈ? আজকে পশ্চিমবঙ্গে হাজার হাজার মসজিদ ভাঙ্গা ও লাখ লাখ মুসলমানদের বাড়ী-ঘর ধ্বংস, হিন্দুত্ববাদ গ্রহণে বাধ্য করার মত মহা জুলুমের মূলে হোসেন আহমদের সর্ব ভারতীয় জাতীয়বাদ।
২৪ মে, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
আকাশের অতন্দ্র প্রহরী: বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ও আবহাওয়া রাডার অবকাঠামোর মহাপরিকল্পনা কেন জরুরি? (১ম পর্ব)
২৩ মে, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
শুক্রবার (১৯ ডিসেম্বর ২০২৫) ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা মুহাম্মদ জসীম উদ্দিনের সই করা এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
২২ মে, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
কিন্তু গতকাল গুগল, ফেইসবুকে অসংখ্য আইডি থেকে প্রচারিত- ‘তারেক রমমান নারিকেল দ্বীপ (সেন্টমার্টিন দ্বীপ) আমেরিকাকে দিয়ে দিয়েছেন নারিকেল দ্বীপ এখন মার্কিন ঘাটি হবে’- ইত্যকার প্রচারণা দেশবাসীকে হতভম্ব করছে। সর্বপোরি সরকারের দলীয় বা প্রশাসনের তরফ থেকে এটাকে গুজব না বলায়- হতাশা চরম আকার ধারণ করেছে।
২২ মে, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
বর্বর আম্রিকা আর সন্ত্রাসী ইসরাইলের সাথে সু-সম্পর্ক বজায় রাখছে সংযুক্ত আরব আমিরাত কিন্তু মুসলিম দেশ ইয়েমেন থেকে শুরু করে সোমালিয়া-লিবিয়া হতে সুদানে ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ চালিয়ে রাখছে আরব-আমিরাত ভয়াবহ মানবেতর সংকটে সুদান, সহিংসতা-রোগ-দুর্ভিক্ষে দিশাহারা মানুষ সুদানের রক্তপাত বন্ধে মুসলিম বিশ্বকে সক্রিয়ভাবে এগিয়ে আসতে হবে এক্ষুনি
২১ মে, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার)












