ইলমে তাছাওউফ
মুর্শিদ কিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক (৭১)
, ০১ রবীউল আউওয়াল শরীফ, ১৪৪৮ হিজরী সন, ১৬ ছালিছ, ১৩৯৪ শামসী সন , ১৫ আগস্ট, ২০২৬ খ্রি:, ৩১ শ্রাবণ, ১৪৩৩ ফসলী সন, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) ইলমে তাছাউফ
৩২। কামিল শায়েখ উনার সন্তুষ্টি-অসন্তুষ্টি উভয়ের মধ্যে নিজের খায়ের বরকত জানবে।
উল্লেখ্য যে, কামিল শায়েখ উনার ছোহবত মুবারক ইখতিয়ার থেকে দূরে সরিয়ে দেয়ার জন্য শয়তানী ওয়াসওয়াসা আসা স্বাভাবিক। কিন্তু সেদিকে ধাবিত হওয়া যাবে না। বরং সর্বদা কামিল শায়েখ উনার সন্তুষ্টি তালাশের কোশেশে লিপ্ত থাকতে হবে।
মহান আল্লাহ পাক ও উনার হাবীব, সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মা’রিফাত-মুহব্বত, সন্তুষ্টি-রেজামন্দি মুবারক হাছিলের বুনিয়াদ বা ভিত্তি হচ্ছে- “স্বীয় মুর্শিদ কিবলা উনার সন্তুষ্টি-রেজামন্দি।” আর ইহা সুবিদিত যে, যার ভিত্তি যত মজবুত ও শক্তিশালী তা তত মজবুত, শক্তিশালী ও দীর্ঘস্থায়ী হয়। সেক্ষেত্রে মহান আল্লাহ পাক উনার মা’রিফাত ও মুহব্বত হাছিলের লক্ষ্যে তার বুনিয়াদকে শক্তিশালী করার জন্য পূর্ববর্তী আউলিয়ায়ে কিরামগণ রীতিমত কঠোর রিয়াজত-মাশাক্কাতে মশগুল হতেন।
অতীতের আউলিয়ায়ে কিরাম, যারা ইমাম-মুজতাহিদের পদ অলংকৃত করেছেন, উনারা এ বুনিয়াদ তথা স্বীয় মুর্শিদ কিবলা উনার সন্তুষ্টি-রেজামন্দি মুবারক হাছিলের জন্যই জান-মাল, নিজেদের সম্মান-মর্যাদা, প্রভাব-প্রতিপত্তিকে নিজ শায়েখ বা মুর্শিদ কিবলা উনার কদম মুবারকে নিবেদিত করেছিলেন। শুধু তাই নয়, বরং রীতিমত মুর্শিদ কিবলার চেহারা মুবারকের ধ্যানও করতেন।
মহান আল্লাহ পাক উনার খালিছ ওলী, হযরত আবু ইসহাক শামী চিশ্তী রহমতুল্লাহি আলাইহি, হযরত আবু বকর শিবলী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনাদের মত জগদ্বিখ্যাত আলিম, যিনি চল্লিশ হাজার হাদীছ শরীফ হিফ্জ করেন, চারশত উস্তাদের নিকট হতে ইলিমের সনদপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। উনারা স্ব স্ব মুরীদকে তাছাউফের তর্জ-তরীকা অনুযায়ী পরীক্ষা করার নিমিত্তে স্বীয় নামে কালেমা শরীফের তালকীন দিলেন। আর মুরীদ মুর্শিদ কিবলা উনার সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে বিনা দ্বিধায় সেই কালেমা শরীফ পাঠে স্বীকৃত হয়। মাহবুবে ইলাহী, হযরত খাজা নিজামুদ্দীন আউলিয়া রহমতুল্লাহি আলাইহি যথারীতি প্রতিদিন ১৫ বার করে স্বীয় মুর্শিদ কিবলা উনার নামে ওযীফা পাঠ করতেন। (তাযকিরাতুল আউলিয়া)
আরো অসংখ্য আউলিয়ায়ে কিরাম গত হয়েছেন যারা স্বীয় মুর্শিদ কিবলা উনার সন্তুষ্টি-রেজামন্দি মুবারক হাছিলের জন্য উনার নামে ওযীফা পাঠ করতেন। এতো কঠোর রিয়াজত-মাশাক্কাতের ফসল যদি কোন সময় হাত ছাড়া হয়ে যায় তথা মুর্শিদ কিবলা অসন্তুষ্ট হন কিংবা এ কাঙ্খিত পথে কোন প্রতিবন্ধকতা আসে তবে সালিক বা মুরীদ কিরূপ অবস্থার সম্মুখীন হয় তা নিম্নলিখিত ঘটনার দ্বারা আরো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
সুলতানুল আউলিয়া, মাহবুবে ইলাহী, হযরত খাজা নিজামুদ্দীন আউলিয়া রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি ইলমে ফিকাহ শিক্ষা সমাপ্ত করে ইলমে তাছাউফ হাছিল করার জন্য হযরত খাজা বাবা ফরীদুদ্দীন মাসউদ গঞ্জে শোকর রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার খিদমতে নিজেকে নিবেদিত করলেন। হযরত খাজা বাবা ফরীদুদ্দীন মাসউদ গঞ্জে শোকর রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনিও তা’লীম-তরবিয়ত দ্বারা উনাকে প্রতিপালন করতে লাগলেন।
একবার হযরত বাবা ফরীদুদ্দীন মাসউদ গঞ্জে শোকর রহমতুল্লাহি আলাইহি “আওয়ারিফুল মায়ারিফ” কিতাবটি পড়তে শুরু করলেন। কয়েক সবক পড়ার পরই তিনি কোনো কোনো জায়গায় ঠেকে যেতে লাগলেন। হযরত বাবা ফরীদুদ্দীন মাসউদ গঞ্জে শোকর রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার হাতে যেই নুসখাটি ছিলো তার লেখা খুব একটা স্পষ্ট ছিলো না। লেখা খুব সূক্ষ¥ ছিলো। আর বয়স বেশী হওয়ার কারণে উনার দৃষ্টি শক্তিও কিছুটা হ্রাস পেয়েছিলো। যার কারণে হযরত বাবা ফরীদুদ্দীন মাসউদ গঞ্জে শোকর রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার পড়তে কষ্ট হচ্ছিলো অথবা পড়তেছিলেন; কিন্তু থেমে থেমে তার তাৎপর্য উপলব্ধির জন্য চিন্তা করতেছিলেন।
এমন সময় মাহবুবে ইলাহী, হযরত খাজা নিজামুদ্দীন আউলিয়া রহমতুল্লাহি আলাইহি বলে উঠলেন, “হে আমার শায়েখ! আমি মুন্তাজাবুদ্দীন মুতাওয়াক্কেল এর নিকট আওয়ারিফুল মায়ারিফের একটি ভালো নুসখা দেখেছি।” সাথে সাথে হযরত বাবা ফরীদুদ্দীন মাসউদ গঞ্জে শোকর রহমতুল্লাহি আলাইহি গম্ভীর স্বরে আওয়াজ করলেন, “অশুদ্ধ কপি সংশোধনের ক্ষমতা দরবেশের নেই?” এ কথাটি এক বার নয় বরং পর পর কয়েকবার বললেন। “আমি প্রথমে বুঝতে পারলাম না যে, ইহা কাকে বললেন।” কিন্তু তিনি যখন কয়েকবার একই উক্তি করলেন তখন আমার সহপাঠী মাওলানা বদরুদ্দীন ইসহাক বললেন, “তোমাকে লক্ষ্য করেই বলছেন।”
একথা শুনে আমার জ্ঞান লোপ পেতে লাগলো। আমি মাথার পাগড়ী খুলে ফেলে হযরত বাবা ফরীদুদ্দীন মাসউদ গঞ্জে শোকর রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার কদম মুবারকে লুটিয়ে পড়লাম। কেননা আমার ধারণা হলো, আমার উক্তি হযরত শায়েখের মর্যাদায় আঘাত হেনেছে। কাজেই আমি ক্ষমা চেয়ে বলতে লাগলাম, “আমি শুধু হযরতকে জানালাম যে, অমুকের কাছে বিশুদ্ধ নুসখা রয়েছে। এতে আমার জ্ঞানের প্রশস্ততা প্রকাশ কিংবা হযরতের জ্ঞানের সংকীর্ণতার প্রতি ইঙ্গিত করা আমার আদৌ উদ্দেশ্য ছিলো না।” কিন্তু আমি বললে কি হবে! আমার প্রকৃত উদ্দেশ্য তা না হলেও আমার উক্তির দ্বারা সেই ভাব ফুটে উঠেছে। কাজেই যতই ক্ষমা প্রার্থনা করলাম আপাতভাবে ক্ষমা পেলাম না। (অসমাপ্ত)
-আল্লামা মুফতী সাইয়্যিদ মুহম্মদ আব্দুল হালীম।
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
মুর্শিদ কিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক (৭০)
১৩ আগস্ট, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
মুর্শিদ কিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক (৬৯)
১২ আগস্ট, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
হযরত মুর্শিদ ক্বিবলা আলাইহিস সালাম উনার প্রতি আদব (৬)
১২ আগস্ট, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
মুর্শিদ কিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক (৬৮)
১১ আগস্ট, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
মুর্শিদ কিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক (৬৭)
১০ আগস্ট, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
মুর্শিদ কিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক (৬৬)
০৮ আগস্ট, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
পাঁচ তরীক্বার শাজরা শরীফ (৫)
০৭ আগস্ট, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
মুর্শিদ কিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক (৬৫)
০৭ আগস্ট, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
পাঁচ তরীক্বার শাজরা শরীফ (৪)
০৫ আগস্ট, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
মুর্শিদ কিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক (৬৪)
০৫ আগস্ট, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
হযরত মুর্শিদ ক্বিবলা আলাইহিস সালাম উনার প্রতি আদব (৫)
০৫ আগস্ট, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
পাঁচ তরীক্বার শাজরা শরীফ (৩)
০৪ আগস্ট, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার)












