ইলমে তাছাওউফ
মুর্শিদ কিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক (৭০)
, ২৯ ছফর শরীফ, ১৪৪৮ হিজরী সন, ১৪ ছালিছ, ১৩৯৪ শামসী সন , ১৩ আগস্ট, ২০২৬ খ্রি:, ২৯ শ্রাবণ, ১৪৩৩ ফসলী সন, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) ইলমে তাছাউফ
৩২। কামিল শায়েখ উনার সন্তুষ্টি-অসন্তুষ্টি উভয়ের মধ্যে নিজের খায়ের বরকত জানবে।
হযরত কা’ব রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু আরো বলেন, একদিন আমি মদীনা শরীফের বাজারে ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম। এমন সময় একজন বণিক লোকজনকে জিজ্ঞেস করলো, কা’ব ইবনে মালিক কে? সকলেই আমার দিকে ইঙ্গিত করে জানিয়ে দিলেন যে, আমিই তার কাঙ্খিত ব্যক্তি। সে ব্যক্তি কাছে এসে আমাকে গাস্সানের বাদশাহর পত্র দিলো। তাতে লিখা ছিলো, “আমি জানতে পেরেছি, আপনার সম্মানিত রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি আপনার প্রতি কঠোর ব্যবহার করেছেন। অথচ মহান আল্লাহ পাক তিনি তো আপনাকে কম মর্যাদাবান করেননি! আপনি এত অবহেলার পাত্র নন! আপনি আমাদের দলে যোগদান করলেই স্বীয় মর্যাদার মান স্বচক্ষে দেখতে ও উপলব্ধি করতে পারবেন।”
হযরত কা’ব রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেন, “আমি পত্রটি পড়েই বললাম, এতো দেখছি আর এক মুছীবত। তারপর পত্রটি আমি চুলোয় নিক্ষেপ করে জ্বালিয়ে দিলাম।”
৪০দিন এভাবে অতিবাহিত হওয়ার পর সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার কাসিদ (দূত) এসে জানিয়ে দিলেন যে, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি আমাদেরকে আহলিয়াদের সাথে মেলামেশা বর্জন করার নির্দেশ মুবারক দিয়েছেন।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, আহলিয়াকে কি তালাক দিয়ে দিবো?” কাসিদ বললেন, “তালাক দিবেন না, সঙ্গ বর্জন করে চলবেন।” আমার অপর দু’জন সাথীর প্রতিও একই হুকুম জারী হলো। আমি আমার আহলিয়াকে বললাম, “এ ব্যাপারে মহান আল্লাহ পাক উনার হুকুম না আসা পর্যন্ত তোমার পিত্রালয়ে আপন লোকদের সাথে অবস্থান করো।”
তারপর আরও ১০দিন অতিবাহিত হলো। ৫০দিন পূর্ণ হলো। মহান আল্লাহ পাক তিনি উনাদের উপর সু-সংবাদ দিয়ে আয়াত শরীফ নাযিল করেন-
وَعَلَى الثَّلَاثَةِ الَّذِينَ خُلِّفُوا حَتَّى إِذَا ضَاقَتْ عَلَيْهِمُ الْأَرْضُ بِمَا رَحُبَتْ وَضَاقَتْ عَلَيْهِمْ أَنْفُسُهُمْ وَظَنُّوا أَنْ لَا مَلْجَأَ مِنَ اللَّهِ إِلَّا إِلَيْهِ ثُمَّ تَابَ عَلَيْهِمْ لِيَتُوبُوا
অর্থ: “অপর তিনজনকে (অনুগ্রহ করা হলো) যাদের সম্পর্কে সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখা হয়েছিলো, যখন পৃথিবী বিস্তৃত হওয়া সত্ত্বেও উনাদের জন্য সঙ্কুচিত হয়ে গেলো এবং উনাদের জীবন দুর্বিসহ হয়ে উঠলো; আর উনারা বুঝতে পারলেন যে, মহান আল্লাহ পাক তিনি ব্যতীত আর কোন আশ্রয়স্থল নেই। অতঃপর তিনি উনাদের প্রতি সদয় হলেন, যাতে উনারা ফিরে আসেন।” (পবিত্র সূরা তওবা/১১৮)
হযরত কা’ব রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বলেন, “এমনি অবস্থায় একবার হঠাৎ একটা আওয়াজ শুনতে পেলাম, কে যেন সালা পর্বত থেকে বুলন্দ আওয়াজে ঘোষণা করছেন, হে কা’ব ইবনে মালিক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু, আপনার জন্য সু-সংবাদ।” আমি তৎক্ষনাৎ সিজদায় পড়ে গেলাম। তারপর সেই সু-সংবাদ নিয়ে একের পর একজন আসতে লাগলেন। কে কার আগে সে সংবাদটুকু দিবেন তার জন্যে রীতিমত প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেলো। পাহাড়ের উপর থেকেও অনেকের আওয়াজ ভেসে আসছিলো।
যার আওয়াজ আমি সর্বপ্রথম শুনেছিলাম, সে আসতেই আমি আমার পরিধেয় দুটো বস্ত্রই খুলে উনাকে দিয়ে দিলাম। মহান আল্লাহ পাক উনার কসম! তখন এ দু’টি কাপড় ছাড়া আর কোন কাপড় ছিলো না। আমি অন্যের থেকে কর্জে হাসানার শর্তে কাপড় এনে পরলাম। তারপর ছুটে চললাম নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার দরবার শরীফে। উনাকে সালাম দিলাম। খুশিতে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মহাসম্মানিত নূরুর রহমত মুবারক অর্থাৎ চেহারা মুবারক চাঁদের মত ঝলমল করছিলো। সুবহানাল্লাহ!
নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করলেন “হে কা’ব রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু! সু-সংবাদ গ্রহণ করুন। দুনিয়াতে আসার পর আজকের দিনটিই আপনার জন্যে সবচাইতে শুভ দিন।” সুবহানাল্লাহ! (বুখারী শরীফ, মুসলিম শরীফ, তিরমিযী শরীফ, আসাহহুস সিয়ার ও সীরাতে ইবনে হিশাম)
উল্লেখ্য যে, হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনারা সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার অসন্তুষ্টি তথা সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হওয়ার কারণে দুনিয়ার যমীন সংকীর্ণ বোধ করতেন। জীবন অত্যন্ত দূর্বিসহ হয়ে পড়তো। বিচ্ছেদের বিরহ ব্যাথায় উনারা হতেন দগ্ধিভূত। উনারা নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সন্তুষ্টি-রেযামন্দীর প্রত্যাশায় সর্বদা এন্তেজার থাকতেন। বহিঃশত্রু তথা ইহুদী-নাছারাদের দুনিয়াবী মান-সম্মান, প্রভাব-প্রতিপত্তির প্রলোভনের দিকে ফিরে তাকাননি তথা নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সাথে কোন অবস্থাতেই সম্পর্ক ছিন্ন করার কল্পনাও করতেন না।
অনুরূপভাবে যারা হাকীকী সালিক তাদের অবস্থাও কিন্তু হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনাদের মত হয়ে থাকে। কেননা যে কামিল শায়েখ বা মুর্শিদ কিবলার সন্তুষ্টিই হচ্ছে দুনিয়া আখিরাতের একমাত্র পাথেয় তিনি যদি অসন্তুষ্ট হন, উনার সাথে মুরীদের সম্পর্কের যদি অবনতি ঘটে তবে মুরীদের বেঁচে থাকাটা মূল্যহীন মনে হয়। জীবন-যাপন হয়ে যায় দূর্বিসহ।
কাজেই তখন তারা এ অবস্থা হতে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য তথা কামিল শায়েখ উনার সন্তুষ্টি-রেজামন্দি হাছিলের জন্য সবর্দা উদগ্রীব থাকেন। জান-মাল এমনকি দুনিয়ার সবকিছুর বিনিময়ে হলেও উনার সন্তুষ্টি কামনা করতে থাকেন। আর এ লক্ষ্যে কামিল শায়েখ উনার নিকট অবস্থানকেই একমাত্র আশ্রয়স্থল মনে করে অবস্থান করতে থাকেন। (অসমাপ্ত)
-আল্লামা মুফতী সাইয়্যিদ মুহম্মদ আব্দুল হালীম।
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
মুর্শিদ কিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক (৬৯)
১২ আগস্ট, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
হযরত মুর্শিদ ক্বিবলা আলাইহিস সালাম উনার প্রতি আদব (৬)
১২ আগস্ট, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
মুর্শিদ কিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক (৬৮)
১১ আগস্ট, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
মুর্শিদ কিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক (৬৭)
১০ আগস্ট, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
মুর্শিদ কিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক (৬৬)
০৮ আগস্ট, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
পাঁচ তরীক্বার শাজরা শরীফ (৫)
০৭ আগস্ট, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
মুর্শিদ কিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক (৬৫)
০৭ আগস্ট, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
পাঁচ তরীক্বার শাজরা শরীফ (৪)
০৫ আগস্ট, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
মুর্শিদ কিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক (৬৪)
০৫ আগস্ট, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
হযরত মুর্শিদ ক্বিবলা আলাইহিস সালাম উনার প্রতি আদব (৫)
০৫ আগস্ট, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
পাঁচ তরীক্বার শাজরা শরীফ (৩)
০৪ আগস্ট, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
মুর্শিদ কিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক (৬৩)
০৪ আগস্ট, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার)












