ইলমে তাছাওউফ
মুর্শিদ কিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক (৬৬)
, ২৪ ছফর শরীফ, ১৪৪৮ হিজরী সন, ০৯ ছালিছ, ১৩৯৪ শামসী সন , ০৮ আগস্ট, ২০২৬ খ্রি:, ২৪ শ্রাবণ, ১৪৩৩ ফসলী সন, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) ইলমে তাছাউফ
কামিল শায়েখ বা মুর্শিদ কিবলা উনার ব্যবহৃত কোন বস্ত্র কিংবা অন্য কোন দ্রব্য পেলে তা তাবারুক বা বরকতময় মনে করে তার যথাযথ তা’যীম-তাকরীম করবে এবং ওজুসহকারে ব্যবহার করে তার হক আদায় করবে।
একবার মুজাদ্দিদে মিল্লাত ওয়াদ দ্বীন, হযরত ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি খুশি হয়ে এক ব্যক্তিকে একটি জিনিস দান করেছিলেন। বস্তুটি তেমন মূল্যবান ছিলো না। তবুও অন্য এক ব্যক্তি উনার নিকট হতে তা অধিক মূল্যে ক্রয় করতে চাইলো। সেই ব্যক্তি বললো, “ভাই! আপনার ঐ জিনিসটি আমাকে দিন। আমি আপনাকে তার দ্বিগুণ মূল্য দিবো।” প্রথম ব্যক্তি বললো, “দ্বিগুণ কেন শতগুণ মূল্য দিলেও আমি তা কাউকে দিতে রাজী নই। আমার নিকট হতে ক্রয় করে আপনি যেমন বরকত লাভের আশা করেন, আমিও তেমনি তা দ্বারা বরকত হাছিল করতে চাই। সুতরাং দ্বিগুণ কেন শতগুণ, হাজার গুণ বেশী মূল্য দিলেও আমি তা হাত ছাড়া করবো না।” সুবহানাল্লাহ!
হযরত ইমাম বায়হাকী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার রেওয়ায়েত হতে হযরত ইমাম রবী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন, হযরত ইমাম শাফিয়ী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি একটি চিঠি দিয়ে আমাকে হযরত ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার নিকট পাঠালেন। চিঠি নিয়ে আমি যখন উনার খিদমতে উপস্থিত হলাম তখন তিনি সবেমাত্র ফজরের নামায শেষ করলেন। যথারীতি সালাম-কালামের পর চিঠিটি আমি উনার হাতে সমর্পণ করলাম। হযরত ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহমতুল্লাহি আলাইহি তা হাতে নিয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, “তাতে কি আছে, আপনি পড়ে দেখেছেন কি?” আমি বললাম, “না, আমি পড়িনি।”
হযরত ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহমতুল্লাহি আলাইহি তখন চিঠিটি খুলে পড়তে শুরু করলেন। পড়তে পড়তে উনার দু’চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগলো। তা দেখে আমি জিজ্ঞেস করলাম, “কি ব্যাপার, তাতে কি লেখা আছে?” হযরত ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহমতুল্লাহি আলাইহি বললেন, “হযরত ইমাম শাফিয়ী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি লিখেছেন- আমি সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন নাবিয়্যীন, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে স্বপ্নে দেখেছি। নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি আমাকে বলেছেন যে, “ইমাম আহমদ রহমতুল্লাহি আলাইহি উনাকে আমার সালাম জানিয়ে বলবেন, অনতিবিলম্বে উনাকে খলকে কুরআনের মহাপরীক্ষায় অবতীর্ণ হতে হবে। এতে যদি তিনি সফলকাম হন তবে পুরস্কারস্বরূপ মহান আল্লাহ পাক তিনি উনার ইলিম এর ছিলছিলাকে কিয়ামত পর্যন্ত জারী রাখবেন।
এ মহা সু-সংবাদ শুনে খুশির আবেগে হযরত ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহমতুল্লাহি আলাইহি নিজ শরীর মুবারক হতে উনার জামা মুবারক খুলে হযরত ইমাম রবী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনাকে দিলেন এবং বললেন, “এটি ইমাম শাফিয়ী রহমতুল্লাহি আলাইহিকে দিবেন আর বলবেন, আমি প্রস্তুত আছি। তিনি যেন আমার জন্য দোয়া করেন।”
জামা নিয়ে হযরত রবী রহমতুল্লাহি আলাইহি মিশর চলে আসলেন। যথা সময়ে তা তিনি হযরত ইমাম শাফিয়ী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার হাতে সমর্পণ করলেন। হযরত ইমাম শাফিয়ী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি ইমাম রবী রহমতুল্লাহি আলাইহিকে লক্ষ্য করে বললেন, “জামাটি ভিজিয়ে তার একটু পানি আমাকে দিন। মহান আল্লাহ পাক তিনি চান তো তাতেই আমার বরকত হবে।” সুবহানাল্লাহ!
৩০। মুর্শিদ কিবলা উনার সামনে উঁচু স্বরে কথা বলবে না। বরং আদব ও শিষ্টতার প্রতি লক্ষ্য রেখে বিনয় ও নম্রতার সাথে কথা বলবে।
এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ করেন-
يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَرْفَعُوا أَصْوَاتَكُمْ فَوْقَ صَوْتِ النَّبِيِّ وَلَا تَجْهَرُوا لَهُ بِالْقَوْلِ كَجَهْرِ بَعْضِكُمْ لِبَعْضٍ أَنْ تَحْبَطَ أَعْمَالُكُمْ وَأَنْتُمْ لَا تَشْعُرُونَ
অর্থ: “হে ঈমানদারগণ! তোমরা নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার কণ্ঠস্বরের উপর তোমাদের কণ্ঠস্বরকে উঁচু করো না। এবং তোমরা একে অপরের সাথে যেরূপ উচুঁ স্বরে কথা বলো, উনার সাথে সেরূপ উচুঁ স্বরে কথা বলো না। এতে তোমাদের আমলসমূহ বিনষ্ট হয়ে যাবে, যা তোমরা উপলব্ধি করতে পারবে না।” (সূরা হুজুরাত শরীফ/২)
উদ্ধৃত আয়াত শরীফ অবতীর্ণ হওয়ার পর হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনাদের অবস্থার পরিবর্তন হলো। আফদ্বালুন নাস বা’দাল আম্বিয়া, হযরত ছিদ্দীকে আকবর আলাইহিস সালাম তিনি আরজ করলেন, “ইয়া রসূলাল্লাহ, ইয়া হাবীবাল্লাহ, ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! মহান আল্লাহ পাক উনার কসম! এখন থেকে মৃত্যু পর্যন্ত আপনার সাথে অতি স্বল্প আওয়াজে কথা বলবো।” (বায়হাকী শরীফ)
খলীফাতুল মুসলিমীন, সাইয়্যিদুনা হযরত ফারুকে আ’যম আলাইহিস সালাম তিনি এই আয়াত শরীফ নাযিল হওয়ার পর হতে এমন আস্তে আস্তে কথা বলতেন যে, প্রায়শই পুনঃরায় জিজ্ঞেস করতে হতো। (বুখারী শরীফ, মুসলিম শরীফ, তিরমিযী শরীফ, আবু দাউদ শরীফ, নাসায়ী ও ইবনে মাজাহ শরীফ)
আর ছহিবে রসূলিল্লাহ, হযরত সাবিত ইবনে কায়েস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার কণ্ঠস্বর স্বভাবতই উচুঁ ছিলো। অত্র আয়াত শরীফ শুনে তিনি ভয়ে সংযত হলেন এবং কণ্ঠস্বর নীচু করলেন। (তাফসীরে দুররে মানছূর)
আর এ সমস্ত ব্যক্তিবর্গের প্রতি খোশ খবরী প্রদান পূর্বক মহান আল্লাহ পাক তিনি বলেন-
إِنَّ الَّذِينَ يَغُضُّونَ أَصْوَاتَهُمْ عِنْدَ رَسُولِ اللَّهِ أُولَئِكَ الَّذِينَ امْتَحَنَ اللَّهُ قُلُوبَهُمْ لِلتَّقْوَى لَهُمْ مَغْفِرَةٌ وَأَجْرٌ عَظِيمٌ
অর্থ: “যারা মহান আল্লাহ পাক উনার রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সামনে নিজেদের কণ্ঠস্বর নীচু করে মহান আল্লাহ পাক তিনি তাদের অন্তরকে তাকওয়া বা পরহেজগারীর জন্য মনোনীত করেন। আর তাদের জন্য রয়েছে ক্ষমা ও মহাপুরস্কার।” (সূরা হুজুরাত/৩) (অসমাপ্ত)
-আল্লামা মুফতী সাইয়্যিদ মুহম্মদ আব্দুল হালীম।
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
পাঁচ তরীক্বার শাজরা শরীফ (৫)
০৭ আগস্ট, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
মুর্শিদ কিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক (৬৫)
০৭ আগস্ট, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
পাঁচ তরীক্বার শাজরা শরীফ (৪)
০৫ আগস্ট, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
মুর্শিদ কিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক (৬৪)
০৫ আগস্ট, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
হযরত মুর্শিদ ক্বিবলা আলাইহিস সালাম উনার প্রতি আদব (৫)
০৫ আগস্ট, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
পাঁচ তরীক্বার শাজরা শরীফ (৩)
০৪ আগস্ট, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
মুর্শিদ কিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক (৬৩)
০৪ আগস্ট, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
পাঁচ তরীক্বার শাজরা শরীফ (২)
০৩ আগস্ট, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
মুর্শিদ কিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক (৬২)
০৩ আগস্ট, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
মুর্শিদ কিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক (৬১)
০২ আগস্ট, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
মুর্শিদ কিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক (৬০)
০১ আগস্ট, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
হযরত মুর্শিদ ক্বিবলা আলাইহিস সালাম উনার প্রতি আদব (৪)
২৯ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার)












