ইলমে তাছাওউফ
মুর্শিদ কিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক (৬৪)
, ২১ ছফর শরীফ, ১৪৪৮ হিজরী সন, ০৬ ছালিছ, ১৩৯৪ শামসী সন , ০৫ আগস্ট, ২০২৬ খ্রি:, ২১ শ্রাবণ, ১৪৩৩ ফসলী সন, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) ইলমে তাছাউফ
মুর্শিদ কিবলা উনার নিকট থেকে প্রস্থান কালে উনাকে কখনও পিঠ প্রদর্শন করবে না। বরং ফিরে আসার সময় উনার দিকে মুখ রেখে পিছনের দিকে হেঁটে আসবে। অতঃপর দৃষ্টির আড়াল হলে স্বাভাবিকভাবে চলতে পারবে।
সুলতানুল ওয়ায়েজীন, কুতুবুল আলম, খাযিনাতুর রহমাহ, হযরত আবু উছমান হারীরী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন, “শাইখুল উলামা ওয়াল মাশায়িখ, মাহবুবে ইলাহী, হযরত আবু হাফ্স্ রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি একবার রাগ করে আমাকে উনার দরবার শরীফ হতে বের করে দিলেন এবং বললেন, “তুমি দ্বিতীয়বার আমার সামনে আসবে না।” আমি কিছুই বললাম না। তবে মনে মনে খুবই কষ্ট পেলাম। তারপরও ইচ্ছা হলো না যে, আপন শায়েখকে ছেড়ে চলে যাই।
অগত্যা উনার দিকে মুখ করে কাঁদতে কাঁদতে পিছনের দিকে হেঁটে চললাম এবং উনার চোখের আড়াল হলাম। আমার মন খুবই বিচলিত হলো, আমি সম্মানিত শায়েখ উনার গৃহের আড়ালে এক স্থানে লুকিয়ে থাকলাম। পরে পাশের বেড়ায় একটি ছিদ্র করে তার মধ্য দিয়ে সম্মানিত শায়েখ উনার চেহারা মুবারক দেখলাম এবং ভাবলাম আমি চলে যাবো না, আর হুকুম ব্যতীত উনার সামনেও হাজির হবো না। এমতাবস্থায় কিছুকাল কেটে গেলো। মহান আল্লাহ পাক উনার রহমতের দৃষ্টি আমার উপর পতিত হলো। একবার তিনি আমাকে দেখে নিকটে ডাকলেন এবং খুশি হয়ে নিজের কন্যাকে আমার সাথে বিবাহ দিলেন।” (তাযকিরাতুল আওলিয়া)
২৭। স্বীয় মুর্শিদ কিবলা উনার ছোহবত মুবারক বা সংসর্গকে মহান আল্লাহ পাক উনার অন্যতম নিয়ামত মনে করে উনার ছোহবত মুবারক তথা মোলাকাত মুবারককেই নিজের জন্য লাজিম করে নিবে।
সমসাময়িক অন্য কোন আওলিয়ায়ে কিরামকে প্রাধান্য দিয়ে উনার ছোহবত হাছিল করা কিংবা প্রত্যাশী হওয়া অথবা উনার ফয়েজ-তাওয়াজ্জুহর প্রয়োজন অনুভব করা বোকামীর নামান্তর।
জেনে রাখা আবশ্যক যে, মহান আল্লাহ পাক তিনি হচ্ছেন নিয়ামত দানকারী, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি নিয়ামত বন্টনকারী। আর স্বীয় মুর্শিদ কিবলা হচ্ছেন তার উছীলা বা মাধ্যম। অর্থাৎ মুরীদের নছীবে যা থাকবে তা মুর্শিদ কিবলা উনার মাধ্যমেই হাছিল হবে। সেক্ষেত্রে মুরীদের অন্য শায়েখ, ওলী বা মাযার শরীফের দিকে দৃষ্টি দেয়া সময়ের অপচয় এবং নিয়ামত প্রাপ্তির ক্ষেত্রে অন্তরায় ছাড়া আর কিছুই নয়।
প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, ইমামুশ শরীয়ত ওয়াত তরীকত, ইমামুল আইম্মাহ, মুজাদ্দিদে মিল্লাত ওয়াদ দ্বীন, হযরত বাহাউদ্দীন মুহম্মদ নক্শবন্দ বোখারী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন, “একদিন আমি হযরত খাজা সাইয়্যিদ আমীর কুলাল রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার দরবার শরীফে হাজির হওয়ার জন্য রওয়ানা হয়েছিলাম। পথিমধ্যে হযরত খিযির আলাইহিস সালাম রাখালের বেশে সওয়ারী অবস্থায় আমার সামনে হাজির হলেন। উনার মাথায় টুপি এবং হাতে ছড়ি ছিলো। তিনি তুর্কী ভাষায় আমাকে বললেন, “তুমি আমার ঘোড়া দেখেছো?” এ কথা জিজ্ঞেস করে হাতের ছড়ি দ্বারা আমাকে প্রহার করলেন। আমি কিছুই বললাম না। তিনি কয়েকবার আমার পথ আগলে দাঁড়ালেন। কিন্তু আমি আমার পথ চলা বন্ধ না করে বললাম, “আপনাকে আমি চিনি, আপনি হযরত খিযির আলাইহিস সালাম।”
তিনি মারাহেল সরাইখানা পর্যন্ত আমার পিছনে পিছনে এসে বললেন, “কিছু সময় আমার নিকট অপেক্ষা করুন।” আমি উনার প্রতি ভ্রুক্ষেপ করলাম না। অতঃপর হযরত সাইয়্যিদ আমীর কুলাল রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার খিদমতে পৌঁছার পর তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, “পথে হযরত খিযির আলাইহিস সালাম উনার সাথে আপনার মোলাকাত হয়েছিলো কিন্তু আপনি উনার প্রতি ভ্রুক্ষেপ করেননি। কেন?” আমি আরজ করলাম, হুযূর বেয়াদবী ক্ষমা করবেন! আমি আপনার প্রতি মুতাওয়াজ্জুহ (রুজু) ছিলাম। সেজন্যই উনার কথায় কর্ণপাত করিনি।” (হালাতে মাশায়িখে নক্শবন্দিয়া মুজাদ্দেদীয়া)
আরো উল্লেখ্য যে, একবার ইস্পাহানের এক তরুণ যুবক ছদরুল উলামা ওয়াল মাশায়িখ, হযরত আবুল হাছান নূরী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার সাথে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে খালি পায়ে বাগদাদ অভিমুখে রওয়ানা হলেন। হযরত নূরী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার এক মুরীদকে নির্দেশ করলেন, “এক ক্রোশ পথ ঝাড়ু দিয়ে পরিস্কার করে রাখো। কেননা আমার একজন খাঁটি মুরীদ খালি পায়ে আমার সাথে দেখা করতে আসছেন।” অতঃপর ঐ ব্যক্তি দরবারে হাজির হলে লোকজন জিজ্ঞেস করলো, “আপনি কোথা থেকে এলেন?”
তিনি জবাব দিলেন, “ইস্পাহান থেকে।” তখন হযরত নূরী রহমতুল্লাহি আলাইহি তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “আচ্ছা, যদি ইস্পাহানের বাদশাহ তোমার জন্য হাজার দীনার খরচ করে এক বিরাট প্রাসাদ তৈরী করতেন ও হাজার দীনার মূল্যের এক অতি রূপসী বাঁদী খরিদ করে তাসহ অন্যান্য বস্তু তোমাকে দান করতেন এবং বলতেন, তুমি যে উদ্দেশ্যে ইস্পাহান রওয়ানা করছো সে উদ্দেশ্য পরিত্যাগ করে এই দান গ্রহণ করো।” তবে তা ছেড়ে কি আমার সাথে দেখা করার ইচ্ছা বহাল রাখতে?”
আসলে বাস্তবেই এরূপ ঘটনা ঘটেছিলো। ইস্পাহানের বাদশাহ তাকে এরূপ প্রস্তাবই দিয়েছিলো। কিন্তু যুবক তা অবহেলা করে বাগদাদ চলে এসেছেন। অতঃপর সে ঘটনা তিনি হযরত নূরী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার জবানে শুনে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে বললেন, “সে কথা বলে আমাকে অপ্রস্তুত করবেন না।”
তখন হযরত নূরী রহমতুল্লাহি আলাইহি বললেন, “প্রকৃত মুরীদ এরূপই হয়ে থাকে। যদি তাদেরকে কেউ সমগ্র মাখলুক এনে যিকিরের পরিবর্তে উপহার দিতে চায় তবু তারা সে উপহারের দিকে ফিরে তাকায় না।” (তাযকিরাতুল আওলিয়া)
অর্থাৎ পৃথিবীর কোন ধন-দৌলত, টাকা-পয়সা, জ্ঞানী-গুণী, ছূফী-দরবেশ সকলের উপর স্বীয় মুর্শিদ কিবলা উনাকেই প্রাধান্য দিয়ে থাকে। যার ফলশ্রুতিতে ঐ সমস্ত লোক মুর্শিদ কিবলা উনার পরিপূর্ণ সন্তুষ্টি-রেজামন্দি ও আদর-যত্ম এবং মনোযোগ পেয়ে থাকে। পক্ষান্তরে যারা স্বীয় মুর্শিদ কিবলা উনার ছোহবত মুবারকের উপর অন্যকে প্রাধান্য দিয়ে সেদিকে মনোনিবেশ করে তখন সে উক্ত নিয়ামত হতে বঞ্চিত হয় এবং সফলতাও আর নছীব হয় না। (অসমাপ্ত)
-আল্লামা মুফতী সাইয়্যিদ মুহম্মদ আব্দুল হালীম।
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
পাঁচ তরীক্বার শাজরা শরীফ (৪)
০৫ আগস্ট, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
হযরত মুর্শিদ ক্বিবলা আলাইহিস সালাম উনার প্রতি আদব (৫)
০৫ আগস্ট, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
পাঁচ তরীক্বার শাজরা শরীফ (৩)
০৪ আগস্ট, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
মুর্শিদ কিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক (৬৩)
০৪ আগস্ট, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
পাঁচ তরীক্বার শাজরা শরীফ (২)
০৩ আগস্ট, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
মুর্শিদ কিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক (৬২)
০৩ আগস্ট, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
মুর্শিদ কিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক (৬১)
০২ আগস্ট, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
মুর্শিদ কিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক (৬০)
০১ আগস্ট, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
হযরত মুর্শিদ ক্বিবলা আলাইহিস সালাম উনার প্রতি আদব (৪)
২৯ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
হযরত মুর্শিদ ক্বিবলা আলাইহিস সালাম উনার প্রতি আদব (৩)
২২ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
হযরত মুর্শিদ ক্বিবলা আলাইহিস সালাম উনার প্রতি আদব (২)
০৮ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
প্রত্যেক উম্মতকে শরীয়ত এবং তাছাওউফ দেয়া হয়েছে
০৬ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার)












