ইতিহাস
বাহাদুর শাহ জাফর: ব্রিটিশবিরোধী শেষ মোঘল শাসক
, ০২ জুমাদাল ঊলা শরীফ, ১৪৪৮ হিজরী সন, ১৫ খ্বমিছ, ১৩৯৪ শামসী সন , ১৪ অক্টোবর, ২০২৬ খ্রি:, ২৯ আশ্বিন, ১৪৩৩ ফসলী সন, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) ইতিহাস
মোঘল সালতানাতের ১৮তম শাসক হলেন আবুল মুজাফফার সিরাজুদ্দীন মুহম্মদ বাহাদুর শাহ গাজী। উপমহাদেশের ইতিহাসে তিনি সমধিক পরিচিত বাহাদুর শাহ জাফর নামে। তিনি ছিলেন মোঘল সালতানাতের শেষ শাসক, যিনি স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন স্বাধীনতার।
তিনি দিল্লীর লাল কেল্লায় ১৭৭৫ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি যখন শাসক হিসেবে ক্ষমতায় আসেন তখন ভারতবর্ষে ব্রিটিশদের আগ্রাসন চরম মাত্রা ধারণ করেছিলো। ফলে একসময় প্রবল প্রতাপশীল মোঘলদের প্রভাব লাল কেল্লার মধ্যেই আবদ্ধ হয়ে পড়েছিলো। মোঘলরা পেনশনভোগী হয়ে পড়েছিলো ব্রিটিশদের কাছে। ইংরেজরা ধীরে ধীরে তাদের কর্তৃত্ব বৃদ্ধি করেই চলছিলো। মুদ্রা থেকে মোঘল শাসকের নাম বাদ দেওয়া, দিল্লীর নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণভাবে করায়ত্ত করাসহ ধীরে ধীরে মোঘলদের নাম সমূলে উৎখাতে সচেষ্ট হলেও সীমাবদ্ধতার কারণে বাহাদুর শাহ জাফর কিছুই করতে পারছিলেন না। এজন্য চরম ব্যথিত ছিলেন তিনি। এই বেদনা ভুলতে তিনি দিনরাত মহান আল্লাহ পাক উনার ইবাদত-বন্দেগীতে সময় কাটিয়ে দিতেন। ফরিয়াদ করতেন যাতে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে গনজোয়ার সৃষ্টি হয়।
বাহাদুর শাহ জাফর হয়তো শেষ কয়েকজন মোঘল শাসকের মতো ইতিহাসের পাতায় বেতনভোগী শাসক হিসেবেই হারিয়ে যেতেন। কিন্তু ইতিহাসের যুগসন্ধিক্ষণে সিপাহী বিদ্রোহের নেতৃত্ব দিতে এগিয়ে আসায় ইতিহাসে তিনি জায়গা করে নিলেন অনন্য মর্যাদায়। ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্ব দেওয়ার মধ্য দিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে। যদিও এর জন্য তাকে ভোগ করতে হয়েছে সীমাহীন দুর্ভোগ, নির্যাতন; হারাতে হয়েছে সন্তান, সম্পতি, ক্ষমতা সবকিছু।
লালকেল্লার মধ্যে আবদ্ধ শাসক বাহাদুর শাহ জাফর তখন বার্ধক্যে উপনীত। বয়স তখন প্রায় ৮২ বছর। পলাশীর যুদ্ধের পর কেটে গেছে ১০০ বছর। এই শত বছরে শুধুই শক্ত হয়েছে ইংরেজ শাসনের ভিত। ইংরেজদের অপশাসন, লুটপাট আর অত্যাচারে নিপীড়িত-নিষ্পেষিত মানুষের হাহাকার তখন চরমে। এমন সময় মুক্তির স্বপ্নে জেগে উঠলো সিপাহী-জনতা। জ্বলে উঠলো বিদ্রোহের আগুন। বিদ্রোহী সিপাহী-জনতা লাল কেল্লায় এসে তাকে অনুরোধ করলেন, ইংরেজদের জুলুম-অত্যাচারের বিরুদ্ধে এ বিদ্রোহের নেতৃত্ব গ্রহণ করতে। বাহাদুর শাহ বয়সের কারণে প্রথমে দায়িত্ব নিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। কিন্তু, ভারতবর্ষে তখন তার চেয়ে সর্বজনবিদিত কিংবা গ্রহণযোগ্য নেতৃত্ব পাওয়া সম্ভব ছিলো না। সিপাহীদের অনুরোধে অবশেষে রাজি হন তিনি। বিদ্রোহীদের মধ্যে পড়ে যায় উৎসবের আমেজ। তারা বাহাদুর শাহ জাফরের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে শপথ নেন। গভীর রাতে ২১ বার কামানের তোপধ্বনির মাধ্যমে বাহাদুর শাহ জাফরকে ভারতবর্ষের স্বাধীন শাসক হিসেবে ঘোষণা করা হয়। সিপাহীরা একত্র হয়ে সেøাগান দেন- “খালক-ই খুদা, মুলক ই বাদশাহ, হুকুম-ই-সিপাহি।” অর্থাৎ, “দুনিয়া মহান আল্লাহ পাক উনার, রাজ্য বাদশার, হুকুম সিপাহীর।”
বাহাদুর শাহ জাফর সিপাহী বিদ্রোহের নেতৃত্ব নিজের কাঁধে নেওয়ার মাধ্যমেই সিপাহী বিদ্রোহ একটি গণআন্দোলনে রূপ নেয়। যার শুরুটা ছিলো শুধু মাত্র বিচ্ছিন্ন ঘটনা। তিনি সকল স্থানীয় শাসকদের চিঠি দিয়ে এ সংগ্রামে অংশ নেওয়ার আহবান জানান। এ বিদ্রোহে তার ব্যক্তিগত কোনো চাওয়া-পাওয়ার বিষয় ছিলো না। তিনি একটি যুদ্ধ কাউন্সিল গঠন করার অভিলাষ ব্যক্ত করেছিলেন, যারা শাসন ক্ষমতা পরিচালনা করবে। বাহাদুর শাহ জাফর বিদ্রোহের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, এ সংবাদে উজ্জীবিত হয়ে লখনৌ, কানপুর, বারেলি, ঝাঁসি, বাংলা অঞ্চলসহ সারা ভারতবর্ষে ওঠে বিদ্রোহের জোয়ার। এ যুদ্ধে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন বাহাদুর শাহ জাফরের তিন পুত্র- মির্জা মোঘল, মির্জা জওয়ান বখত ও মির্জা আবু বকর।
মোঘল শাসক বাহাদুর শাহ জাফরের নেতৃত্বে সিপাহী বিদ্রোহ ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করলো ভারতবর্ষজুড়ে। বিশেষ করে তার তিন ছেলের এতে সামনে থেকে নেতৃত্ব প্রদান এই সংগ্রামকে আরো বেগবান করে তুললো।
এ বিদ্রোহে বাহাদুর শাহ জাফর সর্বতোভাবে নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছিলেন। সিপাহীদের খরচ মেটাতে তিনি তার সকল সম্পদ বিক্রয় করে দেন। এমনকি শেষ পর্যন্ত আসবাব-তৈজসপত্রও তিনি বিক্রি করে দিয়েছিলেন। সেপ্টেম্বরের প্রথমদিকে উনার পুত্র মির্জা মোঘল সিপাহীদের জন্য কিছু অর্থ চেয়ে লিখেছিলেন, তখন জাফর অসহায় হয়ে বলেছিলেন, “মির্জা মুঘলের কাছে আমার ঘোড়ার সাজ, রূপার হাওদা, কুর্সিগুলো পাঠাও, যাতে মির্জা মোঘল সেগুলো বিক্রয় করে খরচ চালিয়ে নিতে পারে। আমার কাছে এছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।
সিপাহী বিপ্লব ব্যাপক উদ্যমে শুরু হলেও দেশীয় আমির-উমরাদের মুনাফিকী, অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্র, অর্থাভাব, সামরিক দক্ষতার অভাবসহ নানা কারণে খেই হারিয়ে ফেলে সিপাহী-জনতার বিল্পব। পাতিয়ালার শাসক কিংবা শিখদের মতো অনেকেই প্রত্যক্ষভাবে অংশ নেয় ইংরেজদের পক্ষে। ইংরেজদের সমন্বিত আক্রমণের মুখে সেপ্টেম্বরের প্রথম দিকেই দিল্লীর পতন মোটামুটি নিশ্চিতই হয়ে যায়। উনার চারপাশেও ব্রিটিশদের চর কিংবা তাদের পদলেহী অনেকেই বিদ্যমান ছিলো। তারা উনাকে আত্মসমর্পণ করতে প্ররোচিত করতে থাকেন।
১৮৫৭ সালের ২০ সেপ্টেম্বর, দিল্লীর লাহোরী গেট, সিকলাল কেল্লা, জামে মসজিদ ইত্যাদি অবস্থানে ইংরেজদের সাথে বীরবিক্রমে লড়াই করে সিপাহীরা। তবে চর্তুমুখী মুনাফিকীর কারণে সিপাহীদের পতন ঘটে। এসব জায়গায় নৃশংসভাবে, নির্বিচারে হত্যা-লুণ্ঠন চালায় ইংরেজ বাহিনী। বাহাদুর শাহ জাফর পরিবারের সদস্য ও প্রায় হাজারখানেক সিপাহীদের সাথে আশ্রয় গ্রহণ করেন পূর্বপুরুষ বাদশাহ হুমায়ুনের কবরের ইমারতে।
তিনি আত্মসমর্পন করতে চাননি। তবে উনার সহচর এবং সেনাপতির প্রবল অনুরোধে তিনি বৃহৎ স্বার্থে আত্মসমর্পন করেন। ২১ সেপ্টেম্বর কুখ্যাত হডসনের নেতৃত্বে একদল ইংরেজ সৈন্য উনাকে পরিবারের সদস্যসহ গ্রেফতার করে। ইংরেজরা বাহাদুর শাহ জাফরের দুই পুত্র মীর্জা মোঘল ও মীর্জা খিজির সুলতান, তার নাতি মীর্জা আবু বকরসহ অসংখ্য মোঘল বংশধর, জাফরের দরবারের লোকজন এবং বিদ্রোহের পক্ষে থাকা সৈন্যদের নির্মমভাবে নির্বিচারে শহীদ করে। শুধু হত্যা করেই ক্ষান্ত হয়নি তারা, বরং তার দুই পুত্রের ছিন্ন-মস্তক উনার কাছে পাঠিয়ে দিয়ে নিষ্ঠুরতার নজির স্থাপন করে।
বৃটিশ ফৌজি কমিশনের দ্বারা ১৮৫৮ সালের জানুয়ারিতে বাহাদুর শাহ জাফরের বিচারের নামে এক প্রহসন অনুষ্ঠিত হয়। ৯ মার্চ কমিশনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী উনাকে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, হত্যা ইত্যাদির অভিযোগে অভিযুক্ত করে মিয়ানমারে রেঙ্গুনে নির্বাসনে পাঠানোর আদেশ দেওয়া হয়। আর এর মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে সমাপ্ত হয় ভারতবর্ষে মোঘল শাসনের স্বর্ণালী ইতিহাস। ১৮৫৮ সালের অক্টোবরে সপরিবারে নেওয়া হয় রেঙ্গুনের পথে। ১৩ নভেম্বর তাদের নিয়ে আসা হয় এলাহাবাদে। সেখান থেকে জাহাজে করে পাঠিয়ে দেওয়া হয় রেঙ্গুনে। সেখানে একটি পরিত্যক্ত বাড়ির কক্ষে শুরু হয় ভারতের শেষ মোঘল শাসক বাহাদুর শাহ জাফরের নির্বাসন। শেষ জীবনে বাহাদুর শাহ নিজের সকল ব্যথা ভুলে থাকতে অধিকাংশ সময় ইবাদত বন্দেগীতে ব্যস্ত থাকতেন। ১৮৬২ সালের ২৬ অক্টোবর তিনি ইন্তেকাল করেন।
বাহাদুর শাহ জাফরের নীরব প্রস্থানের মাধ্যমে উপমহাদেশের ইতিহাসে যোগ হয় আরেকটি দীর্ঘশ্বাস। যদি বাহাদুর শাহ জাফর সফল হতেন, যদি সিপাহী-জনতার বিদ্রোহ ভেঙে ফেলতে পারতো ইংরেজ শাসনের শেকল, তবে হয়তো ভিন্ন হতো এই উপমহাদেশের ইতিহাস।
-মুহম্মদ শাহ জালাল।
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
পিরি রইস: বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ মানচিত্র অঙ্কনকারী উসমানীয় এডমিরাল
০৩ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
বঙ্গ, বাংলা, বাঙ্গালী শব্দের উৎপত্তি মুসলমানদের মাধ্যম দিয়েই (৬)
০১ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
তাতার বিরোধী যুদ্ধে হযরত আমীর খসরু দেহলভী চিশতী রহমতুল্লাহি আলাইহি
২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
মুসা বিন আবী গাসসান: হার না মানা এক অকুতোভয় মুসলিম সিপাহী
২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
ফিঙ্গারপ্রিন্ট বা আঙ্গুলের ছাপ শরীয়তসম্মত, নিখুঁত, ব্যবহারে সহজ এবং রহমত, বরকত, সাকীনা লাভের কারণ (৭)
২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
আফগানিস্তানেও উগ্রতাবাদী ওহাবী-সালাফীদের অনুপ্রবেশের অপচেষ্টা
১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
বঙ্গ, বাংলা, বাঙ্গালী শব্দের উৎপত্তি মুসলমানদের মাধ্যম দিয়েই (৪)
১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনাদেরকে মুহব্বত করা পবিত্র ঈমানের অন্তর্ভুক্ত
১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
মুসলমানদের বিচার ব্যবস্থা চুরি করেই গড়ে উঠেছে ব্রিটিশ, গ্রীক ও রোমানদের আইন ব্যবস্থা
০৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
আজকের নির্যাতিত-নিপীড়িত নিষ্পেষিত মুসলিম জনপদের দখল যেভাবে নিলো কুখ্যাত ইহুদী গোষ্ঠী
০৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
খলীফাতুল মুসলিমীন, আমীরুল মু’মিনীন সাইয়্যিদুনা হযরত কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহূ আলাইহিস সালাম উনার খলীফা মনোনীত হওয়ার সঠিক ইতিহাস
০৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
উসমানীয় সুলতানের কাছে ফিলিস্তিনে ইহুদী রাষ্ট্র গঠনের প্রস্তাব!
০৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার)












