বঙ্গ, বাংলা, বাঙ্গালী শব্দের উৎপত্তি মুসলমানদের মাধ্যম দিয়েই (৬)
, ১৯ রবীউছ ছানী শরীফ, ১৪৪৮ হিজরী সন, ০২ খ্বমিছ, ১৩৯৪ শামসী সন , ০১ অক্টোবর, ২০২৬ খ্রি:, ১৬ আশ্বিন, ১৪৩৩ ফসলী সন, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) ইতিহাস
বঙ্গ বা বাংলা, বাঙ্গালী বা বাংগালী শব্দের উৎপত্তি মুসলমানদের মাধ্যম দিয়েই এবং বাঙালি তাহযীব তামাদ্দুন (সংস্কৃতি) মানেই মুসলমানদের তাহযীব তামাদ্দুন (সংস্কৃতি):
সালাহউদ্দীন আহমদ লিখেছেন- ‘তের শতকের প্রথম দিক থেকে চৌদ্দ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত বাংলাদেশ দিল্লী সালতানাতের অধীনে ছিলো। চৌদ্দ শতকের মাঝামাঝি নাগাদ আফগান (পাঠান) সুলতান ফখরুদ্দীন মুবারক শাহ্ বাংলার প্রায় সমস্ত অঞ্চল জয় করে ঐক্যবদ্ধ করেন এবং বাংলাদেশে স্বাধীন সুলতানী যুগের সূচনা করেন। বাংলার স্বাধীন সুলতান “শাহ ই বাঙ্গালা” উপাধি ধারণ করেন। পরবর্তী প্রায় ‘দু’শত বছর বাংলাদেশে স্বাধীন পাঠান সুলতানরা রাজত্ব করে। এই পাঠান সুলতান উনারা অন্যান্য দেশের হলেও এ দেশের মাটি ও মানুষের সাথে নিবিড় সম্পর্ক স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। হুসাইন শাহী আমলে বাংলার ভাবজগতে এক অভূতপূর্ব আলোড়নের সৃষ্টি হয়েছিলো।” (bdnews24. ২৮ মে, ২০১১)
পাঁচ. বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের পুনরুজ্জীবনে মুসলমান:
বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে রয়েছে মুসলমানদের অভূতপূর্ব অবদান। উনারাই বাংলা ভাষার জন্মদাতা ও বাংলা সাহিত্যের স্থপতি। মুসলিম সেনাপতি ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজি কর্তৃক বঙ্গদেশে মুসলিম রাজত্ব কায়েমের ফলে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের নবজন্ম ঘটে। মুসলমান শাসক হুসেন শাহ, গৌড়ের সামসুদ্দিন ইউসুফ শাহ এবং অপরাপর মুসলিম শাসকরা বাংলা ভূখন্ডে বাংলা ভাষাকে সুপ্রতিষ্ঠিত করে আমাদের সাহিত্যে এক নতুন যুগ সৃষ্টি করেছিলেন।
এসব ইতিহাস সামনে রেখে দীনেশ চন্দ্র সেনও মন্তব্য করে, “মুসলমান শাসকগণ বর্তমান বঙ্গ-সাহিত্যের এইরূপ জন্মদাতা বললে অত্যুক্তি হয় না। বঙ্গ-সাহিত্য মুসলমানদেরই সৃষ্ট, বঙ্গ-ভাষা বাঙালি মুসলমানদের মাতৃভাষা।”
হিন্দু শাসনাধীন বাংলায়, বাংলা ভাষাকে মেøচ্ছ ভাষা, নীচ ভাষা, ইতরজনের ভাষা ইত্যাদি বলে উপহাস করা হতো। নাউযুবিল্লাহ!
বাংলা ভাষায় সাহিত্য চর্চা ছিলো নিষিদ্ধ। মুসলমানরাই পরে এ ভাষার পুনরুজ্জীবনে ব্যাপক ভূমিকা রাখেন। সর্বশেষ ১৯৫২ সালে মুসলমান যুবক উনারাই বাংলা ভাষার জন্য শাহাদাত বরণ করেন। যার ফলে আমরা পেয়েছি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। পাক আমলে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রথম দাবি তুলেছিলেন নবাব সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী।
ছয়. শিক্ষায় মুসলিম অবদান:
নবাব সলিমুল্লাহ দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় সর্বাত্মক ভূমিকা রাখেন। বুয়েটসহ অগণিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন। ঢাকায় প্রথম বিদ্যুতায়ন ও পানি সরবরাহরের কৃতিত্বও নবাব সলিমুল্লাহ উনার। এছাড়াও মুসলিম শাসনামলে শিক্ষার ব্যপক বিস্তার ঘটান। বৃটিশরা আসার পূর্বেও এ বাংলায় ৮০ হাজারের অধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিলো। বৃটিশ বর্বরেরা এসে হিন্দুদের সহযোগীতায় বাংলায় শিক্ষা বিস্তারের ব্যাপক বাধার সৃষ্টি করে। এমনকি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ বন্ধ করে দেয়।
সাত. বঙ্গীয় অধিকার আদায়ে মুসলমান:
হাজী শরীয়তুল্লাহ, তিতুমীর রহমতুল্লাহি আলাইহি, শেরে বাংলা, সোহরাওয়ার্দী, মাওলানা ভাষানী, মাওলানা তর্কবাগীশ প্রমুখ মুসলিম ব্যক্তিত্ব উনারা বাঙালির কল্যাণে সর্বাত্মক ভূমিকা রাখেন। যুগে যুগে বাঙালি মুসলমানরা স্বাধীন বাংলা কায়েমের জন্য সংগ্রাম করেছেন। অথচ বাঙালি হিন্দুরা চেয়েছে অখ- হিন্দুস্তান।
আট. স্থাপত্যশিল্পে মুসলমান:
মুসলমানরাই বাংলাদেশে প্রথম স্বতন্ত্ররীতি সম্পন্ন স্থাপত্য নির্মাণ করেন। মসজিদ নির্মিত হলে সরাসরি তা জনকল্যাণে সম্পৃক্ত ছিলো। মুসাফির খানা, লঙ্গরখানা, পথিক ছাউনি, রাস্তা নির্মাণ ইত্যাদিতে মুসলমানদের একচ্ছত্র ভূমিকা ছিলো।
নয়. পোশাক শিল্পে ভূমিকা:
মুসলমানরা সুন্নতী লেবাস পরিধান করতেন। পুরুষদের কোর্তা, সালোয়ার, টুপি, পাগড়ি, রুমাল, মেয়েদের সুন্নতি লেবাস ইত্যাদির প্রচলন ঘটে। মোজা শব্দটি আরবী মোজাস থেকে এসেছে। এছাড়া বাংলায় মুসলমানরাই প্রথম আতর-সুগন্ধি ইত্যাদি ব্যবহার করেন। পরে অনেক হিন্দুরা মুসলিম অনুকরণে পোশাক পরিধান করতো।
দশ. উন্নতমানের খাবার প্রচলন:
মুসলমানরাই এই ভূমিতে মোগলাই, কোর্মা, কাবাব, কালিয়া, কোপ্তা, রেজালা, বিরিয়ানি, পোলাও ইত্যাদি খাবারের প্রচলন করেন। যা ইতোপূর্বে ছিলো না। উনারাই প্রথম তরকারী ও মিষ্টি দ্রব্যে সুগন্ধি ও মশলার ব্যবহার শুরু করেন। এলাচ, দারুচিনি, লবঙ্গ, কিসমিস, পিঁয়াজ, রসুন, আদা প্রভৃতির ব্যবহার মুসলমানদের রন্ধন প্রকৌশলের ফল।
মুসলমানরাই মূলধারার বাঙালি। মুসলমানরাই বাঙালি তাহযীব তামাদ্দুন (সংস্কৃতি) প্রবর্তক। বাঙালি তাহযীব তামাদ্দুন (সংস্কৃতি) মানেই মুসলমানদের তাহযীব তামাদ্দুন (সংস্কৃতি)। (সমাপ্ত)
-ডাঃ আব্দুল আলী।
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
তাতার বিরোধী যুদ্ধে হযরত আমীর খসরু দেহলভী চিশতী রহমতুল্লাহি আলাইহি
২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
মুসা বিন আবী গাসসান: হার না মানা এক অকুতোভয় মুসলিম সিপাহী
২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
ফিঙ্গারপ্রিন্ট বা আঙ্গুলের ছাপ শরীয়তসম্মত, নিখুঁত, ব্যবহারে সহজ এবং রহমত, বরকত, সাকীনা লাভের কারণ (৭)
২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
আফগানিস্তানেও উগ্রতাবাদী ওহাবী-সালাফীদের অনুপ্রবেশের অপচেষ্টা
১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
বঙ্গ, বাংলা, বাঙ্গালী শব্দের উৎপত্তি মুসলমানদের মাধ্যম দিয়েই (৪)
১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনাদেরকে মুহব্বত করা পবিত্র ঈমানের অন্তর্ভুক্ত
১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
মুসলমানদের বিচার ব্যবস্থা চুরি করেই গড়ে উঠেছে ব্রিটিশ, গ্রীক ও রোমানদের আইন ব্যবস্থা
০৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
আজকের নির্যাতিত-নিপীড়িত নিষ্পেষিত মুসলিম জনপদের দখল যেভাবে নিলো কুখ্যাত ইহুদী গোষ্ঠী
০৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
খলীফাতুল মুসলিমীন, আমীরুল মু’মিনীন সাইয়্যিদুনা হযরত কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহূ আলাইহিস সালাম উনার খলীফা মনোনীত হওয়ার সঠিক ইতিহাস
০৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
উসমানীয় সুলতানের কাছে ফিলিস্তিনে ইহুদী রাষ্ট্র গঠনের প্রস্তাব!
০৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
সাইয়্যিদু সাইয়্যিদিল আ’ইয়াদ শরীফ সংক্রান্ত ঐতিহাসিক একটি ঘটনা
০৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
ধূর্ত রোমান শাসককে আব্বাসীয় সালতানাতের দাতভাঙ্গা জবাব
০৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার)












