প্রতিরক্ষা স্বনির্ভরতা ও বহুমাত্রিক সার্ভে প্রযুক্তি: তুরস্ক, ইরান এবং পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশের কারিগরি সহযোগিতার রোডম্যাপ (পর্ব-১১)
, ২০ মুহররম শরীফ, ১৪৪৮ হিজরী সন, ০৭ ছানী, ১৩৯৪ শামসী সন , ০৬ জুলাই, ২০২৬ খ্রি:, ২২ আষাঢ়, ১৪৩৩ ফসলী সন, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) মন্তব্য কলাম
৫০ লক্ষাধিক বিশাল সমন্বিত সামরিক বহরের জন্য যে আধুনিক, এআই-চালিত এবং ত্রিমাত্রিক ‘সার্ভে ও নজরদারি’ নেটওয়ার্কের প্রয়োজন, তা রাতারাতি শূন্য থেকে গড়ে তোলা কোনো একক রাষ্ট্রের পক্ষে সম্ভব নয়। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য বিপুল পরিমাণ অত্যাধুনিক প্রযুক্তিগত জ্ঞান, হার্ডওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং এবং সফটওয়্যার আর্কিটেকচার প্রয়োজন। এই বিশাল কারিগরি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশ এশিয়ার তিনটি উদীয়মান ও পরীক্ষিত সামরিক-প্রযুক্তি পরাশক্তি-তুরস্ক, ইরান এবং পাকিস্তান-এর কাছ থেকে কৌশলগত কারিগরি সহযোগিতা গ্রহণ করতে পারে।
এখানে এই তিন দেশের শক্তি এবং বাংলাদেশের সম্ভাব্য কারিগরি সহযোগিতার খুঁটিনাটি ক্ষেত্রসমূহ বিশদভাবে বিশ্লেষণ করা হলো:
১. তুরস্ক থেকে কারিগরি সহযোগিতা: ড্রোন প্রযুক্তি এবং সিস্টেম ইন্টিগ্রেশন:
তুরস্ক বর্তমানে বিশে^র অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ড্রোন ও এভিয়েশন প্রযুক্তি উৎপাদনকারী দেশ। তাদের ‘বায়কার’ এবং ‘তাইয়ো’ বিশ^জুড়ে রণক্ষেত্রের সমীকরণ বদলে দিয়েছে।
কারিগরি ড্রোন প্ল্যাটফর্ম: বাংলাদেশের ৫০ লক্ষ বাহিনীর জন্য যে হাজার হাজার ট্যাকটিক্যাল ও মিডিয়াম-অল্টিচিউড লং-এন্ডুরেন্স ড্রোনের প্রয়োজন, তার জন্য তুরস্কের ইধুৎধশঃধৎ ঞই২, অশরহপর এবং অহশধ ড্রোনের ‘যৌথ উৎপাদন’ প্রযুক্তি প্রয়োজন।
ডাটা ফিউশন ও কমান্ড সফটওয়্যার: তুরস্কের সামরিক সফটওয়্যার কোম্পানি ‘ঐঅঠঊখঝঅঘ’ নেটওয়ার্ক-সেন্ট্রিক ওয়ারফেয়ারে অত্যন্ত উন্নত। তাদের কাছ থেকে মাল্টি-সেন্সর ডাটা ফিউশন (স্যাটেলাইট, রাডার ও ড্রোনের তথ্য একীভূত করার প্রযুক্তি) এবং এআই-ভিত্তিক যুদ্ধক্ষেত্র ব্যবস্থাপনা সফটওয়্যার তৈরির কারিগরি লজিক রূপান্তর করতে হবে।
ইলেক্ট্রো-অপটিক্যাল পে-লোড: ড্রোনের নিচে ব্যবহৃত হাই-রেজোলিউশন থার্মাল ক্যামেরা এবং লেজার গাইডেড সার্ভে সিস্টেমের দেশীয় সংস্করণ তৈরির জন্য তুর্কি প্রযুক্তিগত জ্ঞান অত্যন্ত জরুরি।
২. ইরান থেকে কারিগরি সহযোগিতা: রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিং, অ্যান্টি-জ্যামিং এবং ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার :
আমেরিকান ও পশ্চিমা প্রযুক্তির ওপর কয়েক দশকের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বে ইরান বিশে^র অন্যতম সেরা এবং ব্যয়সাশ্রয়ী ড্রোন, ব্যালিস্টিক মিসাইল এবং ইলেকট্রনিক যুদ্ধকৌশল গড়ে তুলেছে। মার্কিন হাই-টেক ড্রোন (যেমন জছ-১৭০ ঝবহঃরহবষ) আকাশেই হ্যাক করে অক্ষত অবস্থায় মাটিতে নামিয়ে আনার ট্র্যাক রেকর্ড রয়েছে ইরানের।
রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিং ও কম-খরচের ড্রোন: বাংলাদেশের ৫০ লক্ষাধিক বিশাল বাহিনীর জন্য লাখ লাখ ছোট-বড় সার্ভে ড্রোন ও সস্তা সুইচব্লেড বা কামিকাজে ড্রোন প্রয়োজন। ইরানের ঝযধযবফ-ংবৎরবং ড্রোনের উৎপাদন কৌশল অত্যন্ত সস্তা কিন্তু কার্যকারিতায় নিখুঁত। ইরান থেকে এই ‘লো-কস্ট হাই-ভলিউম’ ম্যানুফ্যাকচারিং লাইনের কারিগরি জ্ঞান নেওয়া সম্ভব।
জ্যামিং ও অ্যান্টি-জ্যামিং (ঊড/ঝওএওঘঞ): সার্ভে প্রযুক্তিকে শত্রুদেশের রাডার বা জ্যামার থেকে বাঁচাতে ইরানের সিগন্যাল ইন্টেলিজেন্স এবং ইলেকট্রনিক কাউন্টার-মেজারস প্রযুক্তি লাগবে। জিপিএস বা নেভিগেশন সিগন্যাল জ্যাম হয়ে গেলেও কীভাবে সার্ভে ড্রোন বা রাডার সচল রাখা যায়, সেই গোপন কারিগরি মেকানিজম ইরান থেকে শেখা সম্ভব।
থার্মাল সিগনেচার সাপ্রেশন: বাঙ্কার এবং মোবাইল রাডার স্টেশনগুলোকে শত্রুর ইনফ্রারেড বা থার্মাল স্যাটেলাইট থেকে অদৃশ্য রাখার জন্য তাপ-নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তি তৈরিতে ইরানের কারিগরি সাহায্য অত্যন্ত কার্যকর হবে।
৩. পাকিস্তান থেকে কারিগরি সহযোগিতা: স্যাটেলাইট ডেভলপমেন্ট এবং বর্ডার সার্ভে আর্কিটেকচার:
পাকিস্তানের মহাকাশ ও উচ্চ-প্রযুক্তি গবেষণা সংস্থা ‘সুপারকো’ এবং তাদের সামরিক উৎপাদন খাত দীর্ঘকাল ধরে পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক মিসাইল গাইডেন্স এবং স্যাটেলাইট নজরদারি নিয়ে কাজ করছে।
লো-আর্থ অরবিট সামরিক স্যাটেলাইট: বাংলাদেশের জন্য যে ৪ থেকে ৬টি বিশেষায়িত সামরিক গ্রেডের রাডার ও অপটিক্যাল স্যাটেলাইট প্রয়োজন, তা ডিজাইন ও কক্ষপথে স্থাপনে পাকিস্তানের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো যেতে পারে। পাকিস্তান তাদের ১পিআরএসএস-১’ (রিমোট সেন্সিং স্যাটেলাইট) এবং ‘পাক-টেস-১এ’ সফলভাবে পরিচালনা করছে।
বর্ডার সার্ভে অ্যান্ড আর্লি ওয়ার্নিং নেটওয়ার্ক: ভারতের দীর্ঘ সীমান্তে পাকিস্তানের গোয়েন্দা ও নজরদারি নেটওয়ার্ক অত্যন্ত সুবিন্যস্ত। ভারতের উন্নত সামরিক রাডার ও স্পাই এজেন্সিকে কাউন্টার করার জন্য সীমান্তে কী ধরনের অঊঝঅ রাডার এবং কোস্টাল সার্ভে নোড বসাতে হবে, তার কৌশলগত এবং কারিগরি গ্রাউন্ড-ম্যাপিং ডিজাইন পাকিস্তান থেকে পাওয়া সম্ভব।
ট্যাকটিক্যাল ফাইবার ও ভিএলএফ রেডিও: যুদ্ধের চরম মুহূর্তে বাঙ্কারগুলোর মধ্যে যোগাযোগ সচল রাখতে মাটির গভীর দিয়ে কোয়ান্টাম-এনক্রিপ্টেড ফাইবার অপটিক ক্যাবল বসানো এবং ভেরি লো ফ্রিকোয়েন্সি রেডিও অ্যান্টেনাকেন্দ্রিক সার্ভে নেটওয়ার্ক তৈরিতে পাকিস্তানের ব্যালিস্টিক মিসাইল সাইলোর কারিগরি নকশা মডেল হতে পারে।
ত্রিপক্ষীয় সহযোগিতার মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক রূপরেখা:
এই তিন দেশের কারিগরি সহযোগিতাকে ফলপ্রসূ করতে বাংলাদেশের নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্প খাতকে পুনর্বিন্যাস করতে হবে:
১. প্রযুক্তি হস্তান্তর (টিওটি): কোনো দেশ থেকেই সরাসরি অস্ত্র বা সার্ভে গিয়ার কেনার চেয়ে ‘প্রযুক্তি হস্তান্তর’ বা লাইসেন্সড উৎপাদনের চুক্তি করতে হবে, যাতে বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি বা ক্যাডেট প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিজস্ব মেধা দিয়ে এই হার্ডওয়্যারগুলো তৈরি ও মেরামত করতে পারে।
২. যৌথ সাইবার অ্যান্ড ডিফেন্স ল্যাব: ঢাকা বা গাজীপুরে তুরস্ক, ইরান ও পাকিস্তানের সামরিক সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারদের সাথে যৌথ এআই ল্যাব স্থাপন করা উচিত, যা কেবল বাংলাদেশের ৫০ লক্ষ বাহিনীর ডাটা প্রসেসিংয়ের জন্য ডেডিকেটেড মিলিটারি গ্রেড অ্যালগরিদম তৈরি করবে।
উপসংহার:
ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশ এক মহাসংকটের মুখোমুখি। একদিকে বিশাল সৈন্য বহরকে কমান্ড করার চ্যালেঞ্জ, অন্যদিকে উন্নত প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা। তুরস্কের এভিয়েশন ও ডাটা ফিউশন, ইরানের ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার ও রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিং এবং পাকিস্তানের মহাকাশ ও সীমান্ত সার্ভে অভিজ্ঞতাকে এক সুতোয় বাঁধতে পারলে বাংলাদেশ এক অপরাজেয় প্রতিরক্ষামূলক ‘ডিজিটাল শিল্ড’ বা বর্ম তৈরি করতে পারবে। এই ত্রিপক্ষীয় কারিগরি অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করাই হোক নতুন বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা কূটনীতির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ।
- মুহম্মদ শামসিত তাবরিজ।
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
কৃষি শিল্পায়ন যথাযথভাবে করলে দেশবাসীকে কর মুক্ত এবং মূল্যস্ফীতি মুক্ত বাজেট তথা শায়েস্তাখাঁর আমলের মত সস্তা দ্রব্য মূল্যের বাজেট এমনিতেই উপহার দেয়া যাবে ইনশাআল্লাহ
০৬ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
বঙ্গপোসাগরের শুধু টুনা মাছ বিক্রি করে বছরে ১৫ হাজার কোটি টাকা আয় সম্ভব।
০৫ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
ভারতকে বুঝতে হবে তাদের সে দিন শেষ
০৪ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
প্রয়োজন শরয়ী সর্বোচ্চ শাস্তি
০২ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে প্রায় দশ হাজার কোটি টাকা।
০২ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
বাংলাদেশের ভূ-কৌশলগত প্রতিরক্ষা কৌশলের জরুরি রূপরেখা (পর্ব-১)
০১ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
অন্তর্জালে আম্রিকার সাথে বাংলাদেশের গোপন সমঝোতা- নিয়ে তুমুল প্রতিবাদ ও সমালোচনা।
০১ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
প্রয়োজনীয় ৫০ লক্ষাধিক সদস্য সম্পন্ন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে ন্যানোটেকনোলজির কৌশলগত উপযোগিতা (পর্ব-১০)
৩০ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
মুসলমানদের সাথে রাশিয়ার মুনাফেকী নূতনভাবে প্রকাশ পাচ্ছে। মুসলিম বিশ্বের জাগরণ দরকার।
৩০ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
বাংলাদেশের ভূ-কৌশলগত প্রতিরক্ষা কৌশলের জরুরি রূপরেখা (পর্ব-২)
২৯ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
নওমুসলিমদের আইনি সুরক্ষা ও তথাকথিত ‘ডিটেনশন সেল’ উচ্ছেদের দাবি
২৯ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
৫০ লক্ষাধিক সেনাবাহিনীর জন্য বাংলাদেশের বাংকার নেটওয়ার্কের রূপরেখা (পর্ব ৯)
২৮ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার)












