ইতিহাস
পান্থনিবাস ও সরাইখানা নির্মাণে মুসলমানদের অনবদ্য অবদান
, ০৪ জুমাদাল ঊখরা শরীফ, ১৪৪৭ হিজরী সন, ২৮ সাদিস, ১৩৯৩ শামসী সন , ২৬ নভেম্বর, ২০২৫ খ্রি:, ১১ অগ্রহায়ণ, ১৪৩২ ফসলী সন, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) ইতিহাস
সম্মানিত ইসলামী সভ্যতা শুরুর দিক থেকে সরাইখানার সাথে জড়িত। মুসলমান সভ্যতার সূচনাকাল থেকেই পান্থনিবাস ও সরাইখানা নির্মাণের যে ইতিহাস তা সত্যিকার অর্থেই ইসলামী নগরায়ন ও সভ্যতার উন্নতির সাক্ষ্য দেয়। পথিক, মুসাফির ও আগন্তুকদের অবস্থা কতটা গুরুত্বের সাথে বিবেচিত হতো তাও বোঝা যায়। মুসাফির যদি যাকাতের সম্পদের হক্বদার হতো তাহলে সালতানাত তাদের খাদ্য, পানীয়, বাসস্থান প্রয়োজনীয় সবকিছুর ব্যবস্থা করতো। ফলে পান্থনিবাস ও সরাইখানা ছিলো জনকল্যাণেরই একটি অংশ, আর জনকল্যাণের ধারণাটি দিয়েছেন সম্মানিত দ্বীন ইসলাম। সম্মানিত ইসলামী সভ্যতা উনার সুদীর্ঘ ইতিহাসকালে সরাইখানার চমৎকার বাস্তবায়ন ঘটিয়েছে।
মুসলমান শহরগুলোর মধ্যে যেসব ব্যবসায়িক পথ ছিলো সেগুলোজুড়ে সরাইখানা ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিলো। এগুলোতে আশ্রয়প্রার্থীদের অধিকাংশই ছিলো ব্যবসায়ী ও শিক্ষার্থী। সরাইখানা কর্তৃপক্ষ দরিদ্র, মিসকিন ও মুসাফিরদের বিনামূল্যে খাদ্য ও পানীয়ের ব্যবস্থা করতো। বিনামূল্যে আপ্যায়ন করতো বলে সরাইখানাগুলোর নাম হয়ে গিয়েছিলো ‘দারুয যিয়াফাত বা আপ্যায়নগৃহ।
সরাইখানা ও পান্থনিবাসগুলো ছিলো পথিক ও মুসাফিরদের প্রকৃত আশ্রয়স্থল। ইসলামী সালতানাত যেমন এগুলো প্রস্তুত করে দিয়েছিলো তেমনই জনকল্যাণকর কাজে ব্রতী মুসলমানগণও এগুলো তৈরি করে দিয়েছিলেন। সরাইখানায় এসে মুসাফির ও পথিকেরা গ্রীষ্মের তাপদাহ ও শীতকালের প্রচন্ড শীত থেকে রক্ষা পেতেন।
এসব পান্থনিবাসে ত্বলিবুল ইলম ও শিক্ষার্থীদের জন্য চমৎকার ব্যবস্থাপনা ছিলো। উনারা গোলমাল ও হইচই থেকে নিরাপদ থেকে পড়াশোনা ও আলোচনা করতে পারতেন। এসব সরাইখানা শিক্ষার্থীদের ইসলামী সালতানাতের বিভিন্ন অঞ্চলে যাওয়ার জন্য প্রকৃত অর্থে বেশ বড় সহায়ক ছিলো।
ইমাম যাহাবী রহমতুল্লাহি আলাইহি এ ব্যাপারে একটি ঘটনা উল্লেখ করেছেন। ইসলামী স্পেন অর্থাৎ আল আন্দালুসের বিখ্যাত আলেম বাকী ইবনে মাখলাদ রহমতুল্লাহি আলাইহি বাগদাদে এলেন হযরত ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার থেকে পবিত্র হাদীছ শরীফ শেখার জন্য। ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহমতুল্লাহি আলাইহি তখন জাবরিয়্যাদের দ্বারা শোষণের শিকার ছিলেন। সদ্যই তিনি খালকুল কুরআনের ঘটনায় জালিম শাসকের দ্বারা বন্দিত্ব থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন। বাকী ইবনে মাখলাদ রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি নিশ্চিত হলেন যে, উনাকে দীর্ঘদিন বাগদাদে কাটাতে হবে। তাই তিনি সরাইখানার একটি কামরা ভাড়া নিয়ে নিলেন। এখান থেকে তিনি প্রতিদিন একজন মিসকিন লোকের বেশে আহমদ ইবনে হাম্বল রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার কাছে যেতেন এবং উনার কাছ থেকে একটি বা দুটি পবিত্র হাদীছ শরীফ শ্রবণ করতেন। তারপর সরাইখানার কামরায় ফিরে আসতেন। এভাবে চলতে থাকলো। অবশেষে ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি প্রকাশ্যে পাঠদান শুরু করলেন।
সম্মানিত ইসলামী সভ্যতায় সরাইখানার কার্যক্রম বিস্তৃতি লাভ করে, এগুলো কেবল ব্যবসায়ী ও শিক্ষার্থীদের আশ্রয়স্থলে সীমাবদ্ধ না থেকে আরও বড় কিছু হয়ে ওঠে। কতিপয় শাসক এসব সরাইখানায় উঠতেন এবং যাত্রাবিরতি দিতেন। আব্বাসীয় শাসক আল মুতাদিদ বিল্লাহ ইস্কানদারুন শহরের কাছে হুসাইন নামক একটি সরাইখানায় ওঠেন। এটা ২৮৭ হিজরীর ঘটনা। এ সময় তিনি উপকূলীয় এলাকা ও সিরিয়ান শহরগুলোর অবস্থা পর্যবেক্ষণে বেরিয়েছিলেন। ইস্কানদারুন শহরটি বর্তমানে তুরস্কের হাতাই প্রদেশের অন্তর্গত।
অনেক শাসক পান্থনিবাস ও সরাইখানাকে কাঠামোবদ্ধ ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত করে ফেলেন। ফলে এগুলো সালতানাতের প্রশাসনের অধীনে চলে যায়। সরাইখানার ব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে মুসাফির, দরিদ্র ও শিক্ষার্থীদের ব্যয়ভার ও অন্যান্য জিনিস দেয়া হতো। আব্বাসীয় শাসক আল মুস্তানসির বিল্লাহ সরাইখানা ও পান্থনিবাস নির্মাণে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। এগুলোতে দরিদ্র মানুষ ও মুসাফিরদের আশ্রয় দেওয়া হতো।
সম্পাদনায়: মুহম্মদ শাহ জালাল।
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
বিধর্মীরা যতটুকু সভ্যতা পেয়েছে তা মুসলিম শাসনামলেই আর বর্বরোচিত প্রথাসমূহ বন্ধ করেছিলেন মুসলিম শাসকরাই
১১ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
সম্মানিত দ্বীন ইসলাম উনার স্বর্ণালী যুগের নিরাপত্তা বিভাগের ইতিহাস (৪)
১১ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
বিখ্যাত মুসলিম পর্যটক ইবনে বতুতার বর্ণনায় বাংলাদেশ
০৬ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
উপমহাদেশে ব্রিটিশবিরোধী সুফি, ফকীর-দরবেশ বিদ্রোহের ইতিকথা
০১ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
বন্দর দখলদার, নব্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী, বিশ্ব সন্ত্রাসী ইহুদী দস্যুদের দোসর ডিপি ওয়ার্ল্ড এর পরিচিতি এবং উদ্দেশ্য (২)
৩১ জানুয়ারি, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
বর্তমানে দেশকে উন্নত করতে হলে দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ উত্তোলনের বিকল্প নেই (২)
২৮ জানুয়ারি, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
সম্মানিত দ্বীন ইসলাম উনার স্বর্ণালী যুগের নিরাপত্তা বিভাগের ইতিহাস (৩)
২৮ জানুয়ারি, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
বর্তমানে দেশকে উন্নত করতে হলে দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ উত্তোলনের বিকল্প নেই (১)
২৭ জানুয়ারি, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
শুধু স্পেন নয় ফিলিপাইনও ছিলো মুসলিম অধ্যুষিত, শাসিত বর্তমানে ফিলিপাইন হতে পারতো খ্রিস্টানের পরিবর্তে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ
২৬ জানুয়ারি, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
মুসলমানদের ক্ষমতা হারানোর কারণ: জ্ঞান চর্চা থেকে দূরে সরে আসা (২)
২২ জানুয়ারি, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
সম্মানিত দ্বীন ইসলাম উনার স্বর্ণালী যুগের নিরাপত্তা বিভাগের ইতিহাস (২)
২১ জানুয়ারি, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
সম্মানিত ইসলামী ইতিহাসের স্বর্ণালী পুলিশ বিভাগের ইতিহাস (১)
১৪ জানুয়ারি, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার)












