উপমহাদেশে ব্রিটিশবিরোধী সুফি, ফকীর-দরবেশ বিদ্রোহের ইতিকথা
, ১২ শাবান শরীফ, ১৪৪৭ হিজরী সন, ০৩ তাসি, ১৩৯৩ শামসী সন , ০১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রি:, ১৮ মাঘ, ১৪৩২ ফসলী সন, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) ইতিহাস
ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশ বেনিয়া শক্তির প্রতিরোধে মুসলিম শাসকশ্রেণীর বাইরে গণমানুষের মধ্য থেকে যারা প্রথম তলোয়ার হাতে তুলে নেন, তারা হলেন সংসারবিমুখ মুসলিম ফকির-দরবেশ। ১৭৬০ সাল থেকে ১৮০২ সাল পর্যন্ত তারা গেরিলা কায়দায় ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সংগ্রাম চালান।
তৎকালীন সময়ে বাংলাসহ পুরো উত্তর ভারতে সম্মানিত দ্বীন ইসলাম প্রচারের জন্য একদল ফকির-দরবেশ নিজেদের নিয়োজিত রেখেছিলেন। বর্তমান ভারতের উত্তর প্রদেশের কানপুরের সুফী সাইয়্যিদ বদিউদ্দীন শাহ মাদার রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার মুরীদ এই ফকির-দরবেশরা দ্বীন প্রচারের জন্য পুরো উত্তর ভারতের বিভিন্ন স্থানেই যাতায়াত করতেন। সবাই সাধাসিধে সাধারণভাবেই জীবনযাপন করতেন। স্থানীয় মুসলিম শাসকরা তাদের ভরনপোষনের জন্য অর্থ হাদিয়া করতেন। নিজেদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য উনারা তলোয়ার, তীর ধনুক, বর্শা, বল্লম, বন্দুক ইত্যাদি হালকা অস্ত্র বহন করতেন।
১৭৫৭ সালে বাংলায় কার্যত ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর জনসাধারণের দুর্গতি সম্পর্কে উনারা সচেতন ছিলেন। জনসাধারণের মাঝে চলাফেরার কারণে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর আধিপত্যে সাধারণ জনগনের নিঃস্ব হয়ে যাওয়া এবং নতুন নতুন বিভিন্ন প্রকারের করের জন্য তাদের ওপর অত্যাচার-নির্যাতন এই ফকির-দরবেশগণ প্রত্যক্ষ করেন।
এসময়েই ব্রিটিশ আধিপত্যে বাংলায় এই সুফি-দরবেশগণের চলাফেরায় বাধা দেওয়া শুরু হয়। এছাড়া উনাদের আখ্যায়িত করে অনুদান দেওয়াকে ইংরেজ ছত্রছায়ায় তৎকালীন বাংলার শাসক বেআইনী ঘোষণা করে। এরইমধ্যে ১৭৫৯ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর হাতে বাংলার বিভিন্ন স্থানে বিনা কারণে প্রায় ১৫০ জন ফকির-দরবেশকে শহীদ করা হয়। যার প্রতিবাদে ফকির-দরবেশগণ প্রতিবাদী হয়ে ওঠেন।
বিহারভিত্তিক মাদারী সুফী তরিকার প্রধান শাহ সুলতান হাসান সুরিয়া বুরহানা রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার খলীফা ফকির মজনু শাহের নেতৃত্বে তারা বাংলায় সংগঠিত হন। প্রথমে মীর কাসিমের সমর্থনে এবং পরবর্তীতে মীর কাসিমের পরাজয়ের পরে একাকী নিজেরাই উনারা ব্রিটিশবিরোধী প্রতিরোধ সংগ্রাম চালিয়ে যান।
বগুড়ার মহাস্থানগড়ের জঙ্গলকে কেন্দ্র করে এই ফকির-দরবেশরা পূর্ণিয়া, বর্ধমান, মেদিনীপুর, বীরভূম, জলপাইগুড়ি, কুচবিহার, দিনাজপুর, রংপুর, মালদহ, রাজশাহী, বগুড়া, নাটোর, পাবনা, নদীয়া, যশোর, খুলনা, বরিশাল, ফরিদপুর, ঢাকা, ময়মনসিংহ, সিলেট ত্রিপুরা, নোয়াখালী, চট্টগ্রামসহ সমগ্র বাংলাতেই ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকদের আধিপত্যের বিরুদ্ধে এক অসম লড়াই শুরু করেন। গেরিলা কায়দায় উনারা বাংলার বিভিন্ন স্থানে কোম্পানী ও তাদের দেশীয় সহযোগীদের কুঠি-আস্তানা ও সেনাঘাঁটি আক্রমণ করে লুটপাট করেন। এছাড়া বাংলার বিভিন্ন স্থানে ইংরেজ সেনাবাহিনীকে আক্রমণ করে পর্যুদস্ত করেন। ফকিরদের সাথে সংঘর্ষে ইংরেজ সেনাপতি মার্টল, টমাস, কিথসহ অনেক উচ্চপদস্থ সেনা কর্মকর্তা পরাজিত ও নিহত হয়।
একইসাথে তাদের ছত্রছায়ায় ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে বাংলার বিভিন্ন স্থানে গণবিদ্রোহ সংগঠিত হয়। এরমধ্যে ত্রিপুরায় শমসের গাজীর বিদ্রোহ (১৭৬৭-৬৮), স্বন্দ্বীপে আবু তোরাবের বিদ্রোহ (১৭৬৯), ময়মনসিংহে করম শাহের কৃষক বিদ্রোহ (১৭৭৫), শের দৌলত খাঁ, রামু খাঁ ও জান বখশ খাঁর নেতৃত্বে পার্বত্য চট্টগ্রামে জুম-চাষীদের বিদ্রোহ (১৭৭৬-৮৯), নূর উদ্দীনের নেতৃত্বে রংপুর-দিনাজপুরে কৃষক বিদ্রোহ (১৭৮৩), ফকির বোলাকী শাহের নেতৃত্বে বরিশালে কৃষক বিদ্রোহ (১৭৯২) ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।
১৭৮৬ সালের ৮ ডিসেম্বর, ময়মনসিংহের কাছে কালেশ্বরে লেফটেন্যান্ট ব্রেনানের সাথে এক সংঘর্ষে মজনু শাহ গুরুতর আহত হন। এ যুদ্ধে অনেক ফকির শহীদ হন এবং মজনু শাহ নিজেও পরবর্তীতে শহীদ হন। মজনু শাহের শাহাদাতের পর মুসা শাহ, চেরাগ আলী শাহ, পরগল শাহ প্রমুখের নেতৃত্বে এই ফকির মুজাহিদরা আরও পনেরো বছর ব্রিটিশদের ব্যতিব্যস্ত রাখেন। পরে ধীরে ধীরে এই আন্দোলন স্তিমিত হয়ে যায়। তবে অনুপ্রেরণা দিয়ে যায় পরবর্তী সকল ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামকে।
সম্পাদনায়: মুহম্মদ শাহজালাল।
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
হাজিব আল মানসুর: যে সেনাপতি পরাজিত হননি কোনো যুদ্ধে
২৩ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
পবিত্র আযানের জন্য ২২ জন মুসলমানের শহীদ হওয়ার ঈমানদীপ্ত ঘটনা
১৯ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
বাহাদুর শাহ জাফর: ব্রিটিশবিরোধী শেষ মোঘল শাসক
১৪ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
পিরি রইস: বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ মানচিত্র অঙ্কনকারী উসমানীয় এডমিরাল
০৩ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
বঙ্গ, বাংলা, বাঙ্গালী শব্দের উৎপত্তি মুসলমানদের মাধ্যম দিয়েই (৬)
০১ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
তাতার বিরোধী যুদ্ধে হযরত আমীর খসরু দেহলভী চিশতী রহমতুল্লাহি আলাইহি
২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
মুসা বিন আবী গাসসান: হার না মানা এক অকুতোভয় মুসলিম সিপাহী
২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
ফিঙ্গারপ্রিন্ট বা আঙ্গুলের ছাপ শরীয়তসম্মত, নিখুঁত, ব্যবহারে সহজ এবং রহমত, বরকত, সাকীনা লাভের কারণ (৭)
২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
আফগানিস্তানেও উগ্রতাবাদী ওহাবী-সালাফীদের অনুপ্রবেশের অপচেষ্টা
১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
বঙ্গ, বাংলা, বাঙ্গালী শব্দের উৎপত্তি মুসলমানদের মাধ্যম দিয়েই (৪)
১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনাদেরকে মুহব্বত করা পবিত্র ঈমানের অন্তর্ভুক্ত
১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
মুসলমানদের বিচার ব্যবস্থা চুরি করেই গড়ে উঠেছে ব্রিটিশ, গ্রীক ও রোমানদের আইন ব্যবস্থা
০৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার)












