ইতিহাস
জ্ঞান বিজ্ঞানে এগিয়ে থাকা বাগদাদ যেভাবে পিছিয়ে পড়লো
, ১৬ শাওওয়াল শরীফ, ১৪৪৭ হিজরী সন, ০৫ হাদী আশার, ১৩৯৩ শামসী সন , ০৫ এপ্রিল, ২০২৬ খ্রি:, ২২ চৈত্র, ১৪৩২ ফসলী সন, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) ইতিহাস
বাগদাদ হতে প্রায় ৪০০ কিঃমিঃ দূরে দজলা নদীর তীরে অবস্থিত একটি শহর মসুল। ত্রয়োদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ের ঘটনা। মসুল শহরে সে সময়ে ছিলো হাজার হাজার দক্ষ কারিগর। তৎকালীন সময়ে জুতোর ফিতা থেকে শুরু করে বড় বড় সিজ ইঞ্জিনও এখানে তৈরি করা হতো।
এই মসুলের আমীর বদরুদ্দীনের কাছে দুটো চিঠি এসেছে। একটা বাগদাদের শাসক আল মুস্তাসিমের কাছ থেকে, অন্যটা মোঙ্গল শাসক ইলখানের কাছ থেকে। মসুলের আমির চিঠি দুটি পড়লেন। বাগদাদের শাসক তাকে কিছু উন্নত মানের বাদ্যযন্ত্র সেতারা আর বেহালা পাঠাতে অনুরোধ করেছে। আর মোঙ্গল শাসক ইলখান চেয়েছে সিজ ইঞ্জিন। যেটি যুদ্ধক্ষেত্রে বড় বড় পাথর ছুড়তে ব্যবহৃত হয়।
আমীরের আর বুঝতে বাকি রইলো না, কে কি উদ্দেশ্যে চিঠি পাঠিয়েছে। মোঙ্গল শাসক ইলখান বাগদাদ হামলার পরিকল্পনা করেছে। অন্যদিকে, বাগদাদের শাসক আল মুস্তাসিম চায় সংগীতের আসর আরো জমজমাট করতে। তখন মসুলের আমীর আফসোস করে বললেন, হায় ইসলামি জাহান! আপনার নেতৃত্ব আজ কাদের হাতে!
বাগদাদের শাসকের তখন প্রধান কাজ ছিলো নর্তকীদের সঙ্গে গান আর মদে ডুবে থাকা। নাউযুবিল্লাহ! বাগদাদের সমাজ তখন ছিলো বিভক্ত। বিভিন্ন বিষয়ে তারা হাজার মতে বিভক্ত হয়ে যেতো। বিভিন্ন বাতিল ফেরকা তাদের এতই আচ্ছন্ন করে রেখেছিলো যে, ঘাড়ের উপর ৩৮ বছর ধরে নিঃশ্বাস ফেলা মোঙ্গল বিপদকে তারা অনুধাবনই করতে পারেনি।
শাসকের দরবার ছিলো তখন ভাঁড়, কবি আর গল্পকথকদের আড্ডাখানা। দরবারের নামধারী আলেমদের কাজ ছিলো যেকোনো বিষয়ে শাসকের মতকে জায়েয বলে ব্যাখ্যা দাড় করানো, তা যতই মনগড়া হোক না কেনো। এছাড়াও বিশ্ব সম্পর্কে শাসকের তেমন ধারণাও ছিলো না। তার সিদ্ধান্ত নির্ভর করতো শিয়া উজির আলকামির পরামর্শের উপর। যুদ্ধের কোনো অভিজ্ঞতাই ছিলো না শাসকের। এমনটা নয় যে বাগদাদের মুসলমানদের হুঁশিয়ার করার চেষ্টা করা হয়নি। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন স্থান হতে মুজাহিদরা এসে মোঙ্গল বাহিনী সম্পর্কে অবহিত করে যাচ্ছিলো বাগদাদকে। কিন্তু যে সমাজের পচন ধরে, যারা ভাঁড়ামোতে মেতে থাকে, তাদের পতন ঠেকানো সম্ভব নয়।
চেঙ্গিস খানের সন্তান ওগেদাই খানের আমল থেকেই মোঙ্গলরা চাচ্ছিলো বাগদাদের শাসককে তাদের বশ্যতা স্বীকার করাতে। বাগদাদের শাসক ভাবলো, কিছু উপহার পাঠিয়ে বিপদ হতে রক্ষা পাবে। কিন্তু মঙ্কি খান (চেঙ্গিস খানের নাতি) সাফ জানিয়ে দিলো, তোমাকে আবশ্যই আমার বশ্যতা স্বীকার করতে হবে। অন্যথায় তোমাদের ধ্বংস করতে আমি হালাকু খানকে (মঙ্কি খানের ভাই, চেঙ্গিস খানের নাতি) পাঠাচ্ছি।
হালাকু বাগদাদ জয় করতে আসছে শুনে অপদার্থ শাসক আল মুস্তাসিম তার দরবারের উজির ইবনে আল আলকামির মতামত চাইলো। অপদার্থ শিয়া উজির বললো, মোঙ্গলরা বাগদাদে হামলা করলে বিশ্বের প্রতিটি প্রান্ত হতে মুসলিমরা এগিয়ে আসবে বাগদাদ রক্ষা করতে। সুতরাং আপনার ভয়ের কিছু নেই।
কিন্তু বাস্তবতা ছিলো ভিন্ন। পশ্চিমের আইয়ুবী সালতানাত তখন ছিলো তখন নিজেদের আন্ত কোন্দল নিয়েই ব্যস্ত, ইতিমধ্যেই মিশরে তারা ক্ষমতা হারিয়েছে। উত্তর পশ্চিমের সেলজুক সালতানাত ভেঙ্গে যাওয়ার পর আলাতোলিয়ায় (বর্তমান তুরস্ক) টিকে থাকা সেলজুক রুমেরও পতন হয়েছে। আর পূর্বের দিল্লির দরবার থেকে সাহায্য আসার একমাত্র পথ ইরান এবং আফগানিস্তান মোঙ্গল বাহিনীর দখলে। সুতরাং পৃথিবীর অন্য প্রান্তের মুসলিমদের নিকট হতে সাহায্য আসার কোনো সম্ভাবনাই নেই। সব জানা সত্ত্বেও মিথ্যা আশ্বাস দিয়েছিলো উজির ইবনে আল আলকামি! প্রকৃত পক্ষে আলকামির পরিকল্পনা ছিলো স্বেচ্ছায় বাগদাদকে মোঙ্গলদের হাতে তুলে দিয়ে সমঝোতার মাধ্যমে শিয়াদের রক্ষা করা। আর সুন্নিদের নির্মূল করা।
পরবর্তী ইতিহাস সবারই জানা। বাগদাদ আক্রমন করে বসে হালাকু খান। ধ্বংস করা হয় পুরো বাগদাদ। লাখ লাখ মুসলমানকে নির্মমভাবে শহীদ করা হয়। মুসলমানদের রক্তে বাগদাদের রাস্তাঘাট ভেসে যায়। ধ্বংস হয় বাগদাদের বাইতুল হিকমাহ লাইব্রেরী। নাউযুবিল্লাহ!
এভাবেই একসময়ের উন্নত সমৃদ্ধ নগরী বাগদাদ জ্ঞান-বিজ্ঞানের আতুড়ঘর থাকলেও অপদার্থ নগরীতে পরিণত হয়। ইতিহাসের আস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হয়।
-মুহম্মদ শাহ জালাল।
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
দেশে দেশে জাতিসংঘ ওরফে ইহুদীসংঘের কথিত মানবাধিকার অফিসমূহের পবিত্র দ্বীন ইসলাম ও মুসলমান বিরোধী কার্যক্রমের ইতিহাস (১৩তম পর্ব)
১৯ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
আফ্রিকান মুসলমান ইউরোপকে যেভাবে সমৃদ্ধ করেছেন
১৭ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
সন্ত্রাসী সংগঠন ‘আইএস’ এর মাধ্যমে মুসলিম বিশ্ব ভাঙ্গার মানচিত্র বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়ে এখন গাজা যুদ্ধের মাধ্যমে সেই চেষ্টা করছে ক্রুসেডার জোট
১৫ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসী ইহুদী-খ্রিস্টানদের নজরদারী, তথ্যচুরি, ফিৎনা সৃষ্টিকারী, সন্ত্রাস সৃষ্টিকারী এবং বিমান হামলার কাজে ব্যবহৃত সন্ত্রাসী আমেরিকা ভিত্তিক মুসলিম বিদ্বেষী এক তথ্যজালিকা (২)
১৩ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
হিজরী চর্তুদশ শতকের মহান মুজাদ্দিদ, ফুরফুরা শরীফের মুজাদ্দিদে যামান হযরত আবূ বকর ছিদ্দীক্বী ফুরফুরাবী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার সংক্ষিপ্ত সাওয়ানেহ উমরী মুবারক
১১ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
আমেরিকা আবিষ্কারের যে সঠিক তথ্যটি আড়াল করা হয়েছে
০৮ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
মুসা বিন আবী গাসসান: হার না মানা এক অকুতোভয় মুসলিম সিপাহী
০৭ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
বৃটিশরা কুচক্রীদের সহযোগিতায় মাদরাসা শিক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করে চালু করে সেক্যুলার নামক নাস্তিক্যবাদী সিলেবাস। (২য় পর্ব)
০৭ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
দেশে দেশে জাতিসংঘ ওরফে ইহুদীসংঘের কথিত মানবাধিকার অফিসমূহের পবিত্র দ্বীন ইসলাম ও মুসলমান বিরোধী কার্যক্রমের ইতিহাস (১১ম পর্ব)
০৫ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
সাইয়্যিদুনা হযরত ইমাম মালিক রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার সংক্ষিপ্ত জীবনী মুবারক (৫)
০৫ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
বৃটিশরা কুচক্রীদের সহযোগিতায় মাদরাসা শিক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করে চালু করে সেক্যুলার নামক নাস্তিক্যবাদী সিলেবাস। (১ম পর্ব)
০৪ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
সাইয়্যিদুনা হযরত ইমাম মালিক রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার সংক্ষিপ্ত জীবনী মুবারক (৪)
০৪ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার)












