বাংলার মুসলিম কৃষকদের উপর হিন্দু জমি দখলদারদের জুলুমের ইতিহাস (পর্ব ১৪)
, ০৬ যিলহজ্জ শরীফ, ১৪৪৬ হিজরী সন, ০৪ আউওয়াল, ১৩৯৩ শামসী সন , ০৩ জুন, ২০২৫ খ্রি:, ২১ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩২ ফসলী সন, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) ইতিহাস
পল্লীবাংলার ইতিহাস গ্রন্থের লেখক ডাব্লিউ হান্টার খাজনা আদায়ের কঠোরতার কথা উল্লেখ করে। আর সেই কথাই উঠে এসেছে তার পল্লী বাংলার ইতিহাস বইয়ের (দিব্য প্রকাশ সংস্করণ ফেব্রুয়ারি ২০০২) ২৫ পৃষ্ঠায়।
হান্টার লেখে, ১৭৬৮ সালে আংশিকভাবে ফসল বিনষ্ট হওয়ায় ১৭৬৯ সালের প্রথম দিকে জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যায়। তবে এই অভাব অনটনের ফলে সরকারের আদায়কৃত খাজনার পরিমাণ হ্রাস পায়নি। স্থানীয় অফিসারদের অভিযোগ-আপত্তি সত্ত্বেও সদর দফতরের কর্তৃপক্ষ জানায় যে, কড়াকড়িভাবে খাজনা আদায় করা হয়েছে।
উনিশ শতকে বাংলাদেশের সংবাদ সাময়িক পত্র গ্রন্থের ১০ম খন্ডের ৭২ পৃষ্ঠায় মুনতাসীর মামুন কলকাতার সংবাদপত্র অমৃতবাজার পত্রিকা ১ জুলাই ১৮৬৯ সালের উদ্ধৃতি দিয়ে বর্ণ হিন্দু জমি দখলদারদের অত্যাচার নির্যাতনের কথা উল্লেখ করে আরও লিখে, প্রায় ২-৩ বৎসর অন্তর জমির কর বৃদ্ধি করা হয়। এতো গেলো জমি দখলদারদের অত্যাচার, এছাড়া জমি দখলদারদের কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও অত্যাচার আছে। তারা বছরের মধ্যে চার-পাঁচবার অতিরিক্ত ট্যাক্স নিয়ে থাকে। যদি প্রজারা দিতে অসম্মত হয়, তাহলে বাড়ির মাল-সামানা, স্বর্ণ-চান্দি টাকা-পয়সা রাতের আধারে হামলা করে লুট করে নিয়ে যায়। এমনিভাবে অত্যাচারের মাত্রা বৃদ্ধি পেতে থাকে। এভাবে প্রজারা সর্বস্বান্ত হয়ে পড়ে। অনেকে সহ্য করতে না পেরে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হয়।
আর মহাজন বা মালিক শ্রেণীর লোক যারা অধিকাংশই অর্থলোভী ও কঠিন হৃদয়ের হয়ে থাকে, তা প্রসিদ্ধও বটে। কৃষক মাত্রই প্রতি বছর মহাজনের আশ্রয় নিতে হতো, কারণ কৃষকদের মূলধন নেই। ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় মহাজনদের দারস্থ হতে হতো। আর যে একবার মহাজনের নিকট ঋণে আবদ্ধ হয়েছে, সে আর বংশানুক্রমেও ঋণ শোধ করতে পারতো না। সুদের উপর সুদ, তার উপরে সুদ এভাবে অনন্তকাল পর্যন্ত সুদ চলতে থাকে।
ঋণ শোধ করতে অনেক সময় যদি কৃষকরা ব্যর্থ হয় এবং কোন কারণে ধান দিতে না পারে তবে তার মূল্য স্থির করে যত টাকা হয়, তত টাকার জমি লিখে নিতো ঋণদাতারা।
আরো একটা উপায়ে ঋণদাতারা কৃষকদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করতো। আর তা হলো- সাধারণত কৃষক অথবা খামারীদের নিকট গরুই সর্বাপেক্ষা মূল্যবান বস্তু। ঋণদাতারা যখন লক্ষ্য করে, অন্য উপায়ে কর্জের টাকা আদায় হচ্ছে না, তখন কৃষক ও খামারীদের পালিত গরু নিয়ে বিক্রি করে দিতো। কিন্তু দুর্ভাগা কৃষকদের দিকে তাকিয়ে একবারের জন্য অনুকম্পাও পয়দা হয় না এই সমস্ত উগ্র হিন্দু জমি দখলদার ও আত্মসাৎকারী এবং চড়া সুদে ঋণ দাতাদের। নিম্নবিত্ত ও দিনমজুর কৃষক সম্প্রদায়ের আয়ের প্রতি তারা একবারের জন্য ভ্রুক্ষেপও করে না।
ফলশ্রুতিতে কৃষকদের জমি দখলদার ও ঋণ দাতাদের কৃতদাস বললেও মনে হয় অত্যুক্তি হয় না। এত পরিশ্রম করে তারা যা কিছু উপার্জন করে, তার সমুদয় উপার্জন জমি দখলদার ও ঋণদাতাদের পকেটে যায়।
মূলত, ঋণদাতাদের টাকা শোধ করার একমাত্র উপায় ছিলো কৃষকদের শস্য বিক্রয় করে। যদি কোন বছর প্রাকৃতিক দুর্যোগে বা অন্য কোন কারণে শস্য ফলন না হয়, সে বছর কৃষকদের দূরবস্থার আর শেষ থাকে না। ‘কথিত’ জমিদারদের পেট ভরাতে হবে, অন্যদিকে যাদের থেকে কৃষকরা ঋণ নিয়ে ফসলের কাজে লাগিয়েছে তাদেরকে বিপুল অংকের অর্থ দিয়ে ঠান্ডা করতে হবে, আবার নিজের পরিবারের ভরণ পোষণ চালাতে হবে। অর্থাৎ কৃষকদের নানা খাতে খরচ আয় অপেক্ষা কয়েকগুণ বেশী হয়ে যায়। এরুপ ত্রিমুখী চাপে কৃষকদের অনেকে আত্মহত্যার পথও বেছে নেয়।
উনিশ শতকে বাংলাদেশের সংবাদ সাময়িক পত্র গ্রন্থের দশম খন্ডের ৭৩ ও ৭৫ পৃষ্ঠায় মুনতাসীর মামুন কলকাতার সংবাদপত্র অমৃতবাজার পত্রিকা ২৬ আগস্ট ১৮৬৯ সালের উদ্ধৃতি দিয়ে হিন্দু জমি দখলদারদের অত্যাচার নির্যাতনের ফলে দুর্ভিক্ষে বাংলার তিনভাগের এক ভাগ মানুষ মারা যাওয়ার কথা উল্লেখ করে লিখেছে, ১৭৭০ হতে ১৭৭৬ সালের মধ্যে বাংলায় দুর্ভিক্ষের সৃষ্টি হয়। বর্ণিত আছে যে, দুর্ভিক্ষে বাংলায় তিনভাগের এক ভাগ মানুষ মারা যায়। এই ঘটনাকে ১৭৭৭-এর ‘মন্নান্তরা’ বলে অনেকে।
দুর্ভিক্ষের কারণগুলো হলো, প্রজাদের নিকট থেকে জমি দখলদারদের কয়েকগুণ বেশি খাজনা আদায়। তারা যা গভর্নমেন্টকে দেয়, অনেক স্থানে তারা প্রজাদের নিকট থেকে তার ২০গুণ বেশি খাজনা নিয়ে থাকে। প্রজাদের যত লোকসান হয়, তার সমুদয় বাদ দিলে, ভূমির উৎপন্ন হতে প্রজারা যা পায়, জমি দখলদাররা তার অর্ধেক নিয়ে নেয়।
এছাড়া আরও নির্যাতন করা হতো এই উপমহাদেশ ও বাংলার মুসলিম কৃষকদের উপরে। সে কথাই তুলে ধরেছে বাংলাদেশের বামধারার লেখক গবেষক বদরুদ্দীন উমর তার বইয়ে। বইটির ২২ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে, কৃষক ও প্রজা সাধারণের ওপর নির্যাতন শুধুমাত্র জমিদারি এবং ইজারাদারী প্রভৃতি মধ্যস্বত্বভোগীদের নির্যাতনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলো না। গ্রামাঞ্চলে প্রায় নৈরাজ্যিক অবস্থার মধ্যে সরকারি কর্মচারীরা সাধারণ কৃষক ও বিভিন্ন ধরনের গ্রাম্য শ্রেণীর নাগরিকদের ওপর সমান্তরালে উৎপীড়ন ও শোষণ করতো। (চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত বাংলাদেশের কৃষক, বদরুদ্দীন উমর, মাওলা ব্রাদার্স প্রকাশনী, সপ্তম মুদ্রণ জানুয়ারি ২০১৩)
২১ জুন ২০১৬ মঙ্গলবার দৈনিক যুগান্তর পত্রিকায় বদরুদ্দীন উমর বলে, উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা পর্যন্ত সাম্প্রদায়িকতাকেই ধর্মের সব থেকে পরিচিত ও শক্তিশালী রূপ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। পরবর্তীকালে ব্রিটিশ সরকার ভারতের গভর্নর জেনারেল মাউন্ট ব্যাটেনকে দিয়ে যেভাবে ভারত বিভক্ত করেছিলো, তাতে সাম্প্রদায়িকতা ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্রে দ্বন্দ্ব-সংঘর্ষের মাধ্যমে জিইয়ে রাখার চক্রান্ত ছিলো। সে চক্রান্ত এখন পর্যন্ত কার্যকর আছে। ভারত-পাকিস্তান দ্বন্দ্ব-সংঘর্ষ হলো হিন্দু-মুসলিম সংঘর্ষেরই স্বাধীনতা উত্তর রূপ।
ব্রিটিশ আমলে পূর্ববাংলায় অধিকাংশ জমিদার, জোতদার, মহাজন, ব্যবসায়ী ইত্যাদি উচ্চ শ্রেণীর লোকরা ছিলো ধর্মগতভাবে হিন্দু এবং অধিকাংশ মুসলমান ছিলো প্রজা, ভাগচাষী, খাতক ও দরিদ্র ক্রেতা। ১৯৪৭ সালের পর এ সম্পর্কের পরিবর্তন ঘটে। এ কারণে ব্রিটিশ আমলে এ অঞ্চলে হিন্দু-মুসলমানের সম্প্রদায়গত দ্বন্দ্ব যেভাবে ছিলো তার অবসান ঘটে। (সমাপ্ত)
-মুহম্মদ মুশফিকুর রহমান।
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
মুসলিম নির্যাতনের প্রতিশোধ হিসেবে বাংলার সুলতান যেভাবে নেপাল বিজয় করেছিলেন
০৫ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
আধুনিক কাগজ শিল্পের প্রতিষ্ঠাতা মুসলমানগণই
০৪ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
মাদরাসা প্রতিষ্ঠা নিয়ে ইতিহাসের আলোকে কিছু সংক্ষিপ্ত তথ্য
২৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
তাতারস্তানে সম্মানিত দ্বীন ইসলাম এবং মুসলমানদের স্বর্ণালী ইতিহাস
১৮ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
বিধর্মীরা যতটুকু সভ্যতা পেয়েছে তা মুসলিম শাসনামলেই আর বর্বরোচিত প্রথাসমূহ বন্ধ করেছিলেন মুসলিম শাসকরাই
১১ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
সম্মানিত দ্বীন ইসলাম উনার স্বর্ণালী যুগের নিরাপত্তা বিভাগের ইতিহাস (৪)
১১ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
বিখ্যাত মুসলিম পর্যটক ইবনে বতুতার বর্ণনায় বাংলাদেশ
০৬ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
উপমহাদেশে ব্রিটিশবিরোধী সুফি, ফকীর-দরবেশ বিদ্রোহের ইতিকথা
০১ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
বন্দর দখলদার, নব্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী, বিশ্ব সন্ত্রাসী ইহুদী দস্যুদের দোসর ডিপি ওয়ার্ল্ড এর পরিচিতি এবং উদ্দেশ্য (২)
৩১ জানুয়ারি, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
বর্তমানে দেশকে উন্নত করতে হলে দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ উত্তোলনের বিকল্প নেই (২)
২৮ জানুয়ারি, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
সম্মানিত দ্বীন ইসলাম উনার স্বর্ণালী যুগের নিরাপত্তা বিভাগের ইতিহাস (৩)
২৮ জানুয়ারি, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
বর্তমানে দেশকে উন্নত করতে হলে দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ উত্তোলনের বিকল্প নেই (১)
২৭ জানুয়ারি, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার)












