বাংলার মুসলিম কৃষকদের উপর হিন্দু জমি দখলদারদের জুলুমের ইতিহাস (পর্ব ১২)
, ২৮ যিলক্বদ শরীফ, ১৪৪৬ হিজরী সন, ২৮ ছানী আ’শার, ১৩৯২ শামসী সন , ২৭ মে, ২০২৫ খ্রি:, ১৪ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩২ ফসলী সন, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) ইতিহাস
১৯১০ সালে ডিএসপি শামসুল আলমকে হত্যা করা হয়। বোমাবাজির ঘটনা তো নিত্য ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছিলো। হিন্দু দেবতাদের নামে এসব হত্যাকান্ড উৎসর্গীকৃত হতো। এছাড়া প্রশিক্ষিত যুবক বাহিনী ব্যাপক দস্যুবৃত্তিতে জড়িয়ে পড়ে। হিন্দু ধর্মের পুনর্জাগরণের উদাত্ত আহবান সম্বলিত সাহিত্য ও প্রচার পুস্তিকাসমূহ বিতরণ করা হতো মহোৎসাহে। ‘স্বদেশী’ আন্দোলনের জন্য শপথ গ্রহণ করানো হতো কালী মন্দির প্রাঙ্গণে।
১৯০৮ সালের ৩০ মে কলকাতার ‘যুগ্মান্তর’ পত্রিকা হিন্দুদের এ সকল কর্মকান্ডকে সমর্থন করে চরম উস্কানিমূলক এক নিবন্ধে উল্লেখ করে: “মা জননী পিপাসার্ত হয়ে নিজ সন্তানদেরকে জিজ্ঞেস করছে, একমাত্র কোন বস্তু তার পিপাসা নিবারণ করতে পারে। মানুষের রক্ত এবং ছিন্ন মস্তক ব্যতীত অন্য কিছুই তাকে শান্ত করতে পারে না”।
মুসলিম বিদ্বেষী প্রচার এতদূর গড়ালো যে, জাতীয়তাবাদী হিন্দুমহল থেকে এমন ঘোষণাও শোনা যেত যে, স্পেন থেকে কয়েক শতাব্দীর পূর্বে যেমন মুসলমানদেরকে নির্মূল করা হয়েছিলো, তেমনি ভারত থেকেও তাদের নির্মূল করা হবে। নাঊযুবিল্লাহ!
এসব সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ব্রিটিশ সরকার কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করলে তাদের আন্দোলন ক্রমশ স্তিমিত হতে থাকে। কিন্তু পুরনো মিত্র হিন্দুদের চটিয়ে কোন বিপদ ডেকে আনার ভয়েই হোক ইংরেজরা রণেভঙ্গ দেয়।
অসমাপ্ত আত্মজীবনী: শীর্ষক বইয়ের শেখ মুজিবুর রহমান হিন্দু জমি দখলদারদের নির্যাতন সম্পর্কে লিখেন, “আজাদ পত্রিকার কাটিংও আমার ব্যাগে থাকতো। সিপাহী বিদ্রোহ এবং ওহাবী আন্দোলনের ইতিহাসও আমার জানা ছিলো। কেমন করে বৃটিরাজ মুসলমানদের কাছ থেকে ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছিলো, কি করে রাতারাতি মুসলমানদের সর্বস্বান্ত করে হিন্দুদের সাহায্য করেছিলো, মুসলমানরা ব্যবসা-বাণিজ্য, জমিদারী, সিপাহীর চাকরি থেকে কিভাবে বিতাড়িত হলো- মুসলমানদের স্থান হিন্দুদের দ্বারা পূরণ করতে শুরু করেছিলো ইংরেজরা কেন? মুসলমানরা কিছুদিন পূর্বেও দেশ শাসন করেছে তাই ইংরেজকে গ্রহণ করতে পারে নাই। সুযোগ পেলেই বিদ্রোহ করতো। ওহাবী আন্দোলন কি করে শুরু করেছিলো হাজার হাজার বাঙালি মুজাহিদরা? বাংলাদেশ থেকে পায়ে হেঁটে সীমান্ত প্রদেশে যেয়ে জিহাদে শরীক হয়েছিলো। ”
তিনি আরো লিখেন, “তিতুমীরের জিহাদ, হাজী শরীয়তুল্লাহর ফারায়জি আন্দোলন সম্বন্ধে আলোচনা করেই আমি পাকিস্থান আন্দোলনের ইতিহাস বলতাম। ভীষণভাবে হিন্দু বেনিয়া ও জমি দখলদারদের আক্রমণ করতাম। এর কারণও যথেষ্ট ছিলো। একসাথে লেখাপড়া করতাম, একসাথে খেলাধুলা করতাম, একসাথে বেড়াতাম, কিন্তু আমি যখন কোন হিন্দু বন্ধুর বাড়িতে বেড়াতে যেতাম, আমাকে অনেক সময় তাদের ঘরের মধ্যে নিতে সাহস করতো না আমার সহপাঠীরা। হিন্দু ধনাঢ্যশীল ও জমি দখলদারদের অত্যাচারেও বাংলার মুসলমানরা অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলো। আর হিন্দুরা ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণ করে ইংরেজকে তোষামোদ করে অনেকটা উন্নতির দিকে অগ্রসর হয়েছিলো । ...........”
একদিকে মুসলিম কৃষকদের নির্যাতন করছে বর্ণ হিন্দু জমি দখলদারেরা আর অপরদিকে একশ্রেণীর বর্ণ হিন্দু ব্রিটিশদের পক্ষে দালালী এবং অত্যাচারি জমি দখলদারের পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছে।
মুসলমানদের উপর যে অত্যাচার ও জুলুম হিন্দু জমি দখলদার ও বেনিয়ারা করেছিলো, তার বিরুদ্ধে যদি মুসলমানরা রুখে দাঁড়াতেন, তাহলে তিক্ততা এত বাড়তো না। ......
আর যখনই কোন মুসলমানরা অপর কোন মুসলমান ভাইদের জন্য ন্যায্য অধিকার দাবি করতো তখনই দেখা যেতো হিন্দুদের মধ্যে অনেক শিক্ষিত, এমনকি গুণী সম্প্রদায়ও চিৎকার করে বাধা দিতো । ”
ঊনবিংশ শতকের প্রথম দিকে হিন্দু জমি দখলদার ও কোম্পানী শাসনের দ্বারা বাংলার মুসলমান নির্যাতিত, নিষ্পেষিত ও জর্জরিত হচ্ছিলো এবং তার প্রতিবাদে বাংলায় ফারায়েজী আন্দোলন ও সাইয়্যিদ তিতুমীরের আন্দোলন প্রচ- আকার ধারণ করে। পরবর্তীকালে হযরত সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বেরেলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার জিহাদী আন্দোলন সারা ভারতে এক আলোড়নের সৃষ্টি করে। অতঃপর ভারতের আযাদী আন্দোলন শুরু হয় ১৮৫৭ সালে। এ সমস্ত আন্দোলন হিন্দুদের ব্যর্থতায় পর্যবসিত হওয়ার ফলে ভারতীয় মুসলমান ইংরেজদের কোপানলে পড়ে কোন অসহনীয় জীবন যাপন করছিলো, তা যথাস্থানে আলোচনা করা হবে। জেল, ফাঁসি, দ্বীপান্তর, স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ বাজেয়াপ্তকরণ এবং ইংরেজ কর্তৃক অন্যান্য নানাবিধ অমানুষিক-পৈশাচিক অত্যাচারে মুসলিম সমাজদেহ যখন জর্জরিত, সে সময়ে বঙ্কিম চট্টোপাধ্যায় লিখনীর নির্মম আঘাত শুরু করে মুসলিম জাতির জর্জরিত দেহের উপর।
এই প্রসঙ্গে মুনতাসীর মামুন তার বই উনিশ শতকে বাংলাদেশের সংবাদ সাময়িকপত্র, (১০ম খন্ড, অনন্যা প্রকাশন, প্রথম প্রকাশ ফেব্রুয়ারি ২০০৬) ৪৬ পৃষ্ঠায় বলেছে, মধ্যশ্রেণী নিয়ন্ত্রিত পত্রিকায় কখনো বলা হয়নি যে, ইংরেজ শাসনের অধীনে থাকতে আগ্রহী নয়। ইংরেজ শাসন প্রশাসন সম্পর্কে মধ্যশ্রেণীর মনোভাব সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে, পূর্ববঙ্গের রক্ষণশীল পত্রিকা হিন্দু রঞ্জিকার এক মন্তব্যতে প্রকাশ হয়েছে- ব্রিটিশ শাসনের অধীনে আমরা অত্যন্ত আনন্দিত। ..........
এই উদ্ধৃতি থেকে আমরা পরিষ্কার বুঝতে পারছি তৎকালীন সংবাদপত্রগুলোও কৃষকদের উপরে অত্যাচার নির্যাতনের খবর প্রকাশ তেমনটা করেনি বরং করেছে অত্যাচারি ইংরেজ ও বর্ণ হিন্দু জমি দখলদারদের পক্ষে সীমাহীন দালালি।
-মুহম্মদ মুশফিকুর রহমান।
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
হাজিব আল মানসুর: যে সেনাপতি পরাজিত হননি কোনো যুদ্ধে
২৩ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
পবিত্র আযানের জন্য ২২ জন মুসলমানের শহীদ হওয়ার ঈমানদীপ্ত ঘটনা
১৯ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
বাহাদুর শাহ জাফর: ব্রিটিশবিরোধী শেষ মোঘল শাসক
১৪ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
পিরি রইস: বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ মানচিত্র অঙ্কনকারী উসমানীয় এডমিরাল
০৩ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
বঙ্গ, বাংলা, বাঙ্গালী শব্দের উৎপত্তি মুসলমানদের মাধ্যম দিয়েই (৬)
০১ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
তাতার বিরোধী যুদ্ধে হযরত আমীর খসরু দেহলভী চিশতী রহমতুল্লাহি আলাইহি
২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
মুসা বিন আবী গাসসান: হার না মানা এক অকুতোভয় মুসলিম সিপাহী
২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
ফিঙ্গারপ্রিন্ট বা আঙ্গুলের ছাপ শরীয়তসম্মত, নিখুঁত, ব্যবহারে সহজ এবং রহমত, বরকত, সাকীনা লাভের কারণ (৭)
২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
আফগানিস্তানেও উগ্রতাবাদী ওহাবী-সালাফীদের অনুপ্রবেশের অপচেষ্টা
১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
বঙ্গ, বাংলা, বাঙ্গালী শব্দের উৎপত্তি মুসলমানদের মাধ্যম দিয়েই (৪)
১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনাদেরকে মুহব্বত করা পবিত্র ঈমানের অন্তর্ভুক্ত
১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
মুসলমানদের বিচার ব্যবস্থা চুরি করেই গড়ে উঠেছে ব্রিটিশ, গ্রীক ও রোমানদের আইন ব্যবস্থা
০৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার)












