বাংলার মুসলিম কৃষকদের উপর হিন্দু জমি দখলদারদের জুলুমের ইতিহাস (পর্ব ০৮)
, ০৫ যিলক্বদ শরীফ, ১৪৪৬ হিজরী সন, ০৫ ছানী আ’শার, ১৩৯২ শামসী সন , ০৪ মে, ২০২৫ খ্রি:, ২১ বৈশাখ, ১৪৩২ ফসলী সন, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) ইতিহাস
কৃষক সম্প্রদায় ধান ও অন্যান্য শস্যাদি উৎপন্নের সাথে সাথে নীলচাষও করতে বাধ্য হতো। এই নীলচাষের প্রচলন এদেশে বহু আগে থেকেই ছিলো। সপ্তদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি ভারত থেকে নীল রং সর্বপ্রথম ইউরোপে রপ্তানি হয়। ব্রিটিশরা তাদের আমেরিকান ও পশ্চিম ভারতীয় উপনিবেশগুলিতে নীলচাষের ব্যবস্থা করে। এগুলি তাদের হাতছাড়া হয়ে যাবার পর বাংলা প্রধান নীল সরবরাহকারী দেশে পরিণত হয়।
১৮০৫ সালে বাংলায় নীলচাষের পরিমাণ ছিলো ৬৪,৮০৩ মণ এবং ১৮৪৩ সালে তার পরিমাণ হয়ে পড়ে দ্বিগুণ। বাংলা, বিহার এবং বিশেষ করে ঢাকা, ফরিদপুর, রাজশাহী, পাবনা, নদিয়া, মুর্শিদাবাদ প্রভৃতি মুসলিম অধ্যুষিত জেলাগুলিতে অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে ব্রিটিশের তত্ত্বাবধানে ব্যাপক আকারে নীলচাষ করা হয়। কিন্তু বিদেশী শাসকগণ নীলের এমন নিম্নমূল্য বেঁধে দেয় যে, চাষীদের বিঘাপ্রতি সাত টাকা করে লোকসান হয় যা ছিলো বিঘাপ্রতি খাজনার সাতগুণ। তথাপি চাষীদেরকে নীলচাষে বাধ্য করা হতো।
বাংলার নীলচাষীদের উপরে শাসকদের অমানুষিক অত্যাচার উৎপীড়নের মর্মন্তুদ ও লোমহর্ষক ঘটনা ইতিহাসে লিপিবদ্ধ আছে। ক্ষমতা মদমত্ত শাসক ও তাদের দালালদের মানবতাবোধ সম্পূর্ণ লোপ পেয়েছিলো। নতুবা তাদের নিষ্পেষণের দরুন কৃষক সমাজের আবাল-বৃদ্ধ-বনিতার মর্মন্তুদ হাহাকারে বাংলার আকাশ বাতাস বিদীর্ণ হতো না।
দরিদ্র ও দুঃস্থ কৃষকগণ বেঁচে থাকার জন্যে নীলচাষের মাধ্যমে কিছু অর্থ উপার্জনের আশা করতো। তাদের দারিদ্রতা ও অসহায়তার সুযোগে ইংরেজ নীলকরগণ কৃষকদের স্বার্থের পরিপন্থী বিভিন্ন চুক্তিতে আবদ্ধ হতে তাদেরকে বাধ্য করতো। অনেক সময় অনিচ্ছুক কৃষকদের বাড়ি-ঘরে আগুন লাগিয়ে দিতো। এতেও সম্মত করতে না পারলে জাল চুক্তিনামার বলে তাদের জমি-জমা জবরদখল করে নীলকরগণ তাদের কর্মচারীদের দ্বারা সেসব জমিতে নীলচাষ করাতো। কখনো কখনো অত্যাচারী জমি দখলদার তার প্রজাকে শাস্তি দেবার জন্যে তার কাছ থেকে জমি কেড়ে নিয়ে নীলকরদেরকে দিয়ে দিতো।
একবার অ্যাশলী ইডেন নীল কমিশনের সামনে ১৮৬০ সালে সাক্ষ্যদানকালে বলে যে, বিভিন্ন ফৌজদারী রেকর্ড থেকে জানা যায় যে, ৪৯টি ঘটনা এমন ঘটেছে, যেখানে নীলকরগণ দাঙ্গা, হত্যা, অগ্নিসংযোগ, ডাকাতি, লুটতরাজ এবং বলপূর্বক অপহরণ প্রভৃতি গুরুতর অপরাধে জড়িত থাকে। তার বহু বৎসর পূর্বে জনৈক ম্যাজিস্ট্রেট একজন খৃষ্টান মিশনারীর সামনে মন্তব্য করে যে, মানুষের রক্তে রঞ্জিত হওয়া ব্যতীত একবাক্স নীলও ইংল্যান্ডে প্রেরিত হয় না। (১৮৬১ সালের নীল কমিশন রিপোর্ট এবং ক্যালকাটা খৃষ্টান অবজার্ভার, নভেম্বর, ১৮৫৫ সাল)
নীল চাষীদের দুঃখ-দুর্দশার কোন প্রতিকারের উপায় ছিলো না। চৌকিদার-দফাদারের সামনে চাষীদের উপর নিষ্ঠুরভাবে নির্যাতন করা হলেও চৌকিদারদের ঘৃণাক্ষরেও সে কথা প্রকাশ করার সাধ্য ছিলো না। একবার নিষ্ঠুর নীলকরগণ একটি গ্রামে অগ্নিসংযোগ করলে তা নির্বাপিত করার জন্যে এক ব্যক্তি চিৎকার করে লোকজন জড়ো করে। তার জন্যে তাকে নিষ্ঠুরভাবে প্রহার করে আহত অবস্থায় একটি অন্ধকার কামরায় ৪ মাস আটকে রাখা হয়। ওদিকে আবার নীলকরগণ পুলিশকে মোটা অংকের ঘুষ দিয়ে বশ করে রাখতো। (নীল কমিশন রিপোর্ট ১৮৬১)
হতভাগ্য অসহায় কৃষকগণ ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট থেকে কোন প্রকারের প্রতিকার ও ন্যায় বিচারের আশা করতে পারতো না। উক্ত নীল কমিশন রিপোর্টে বলা হয়েছে যে, সাদা চামড়ার ম্যাজিস্ট্রেটগণ আপন দেশবাসীদের পক্ষই অবলম্বন করতো। ফৌজদারী আইন-কানুন এমনভাবে তৈরী করা হয়েছিলো যে, ইংরেজ প্রজাকে শাস্তি দেয়া ছিলো অসম্ভব ব্যাপার। একজন দরিদ্র প্রজা সূদুর প্রত্যন্ত এলাকার তার স্ত্রী-পুত্র-পরিজনকে ফেলে কোলকাতায় গিয়ে মামলা দায়ের করার সাহস রাখতো না। কারণ তার অনুপস্থিতিতে তার স্ত্রী-পুত্র-পরিজনের জান-মাল, ইজ্জত-আবরু নীলকরদের দ্বারা বিনষ্ট হতো। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলগুলিতে অধিক পরিমাণে নীল চাষ করা হতো। ফলে নিম্নশ্রেণীর মুসলমানরা নীলকরদের চরম নির্যাতন-নিপীড়নের সার্বক্ষণিক শিকারে পরিণত ছিলো।
এছাড়া প্রজাদের ধান লুট করা, গরু-ছাগল হরণ করা, পানিমগ্ন করে চোবানো ও প্রহার করা বর্ণ হিন্দু জমি দখলদারদের প্রায় অভ্যাসে পরিণত হয়।
বাংলার সামাজিক ইতিহাসের ধারা (১৮০০-১৯০০) বইয়ের (বুক ক্লাব প্রথম প্রকাশ বইমেলা ২০০০) লেখক বিনয় ঘোষ ২৫-২৬ পৃষ্ঠা তত্ত্ববোধিনী পত্রিকার উদ্ধৃতি দিয়ে লিখে, তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা লিখেছে যে, ভিন্ন ভিন্ন ভূ-স্বামী (হিন্দু জমি দখলদার) কত রকমের ছলে বলে কৌশল প্রয়োগ করে যে প্রজাদের উপরে অত্যাচার করে তা গণনা করা যায় না। তাদের অধীন সমস্ত প্রজার যা কিছু সম্পত্তি বা ভোগ্য পণ্য আছে বস্তুত সবই তারা নিজেদের মনে করে। প্রজাদের ফলমূল গাছ পর্যন্ত ভূ-স্বামীর (বর্ণ হিন্দু জমি দখলদার) সর্বগ্রাসী লোভের কাছে রক্ষা পায়নি।
যেমন- কোনো দরিদ্র প্রজা ফলের গাছ রোপণ করে, অনেক যতœ ও পরিশ্রম করার পর বহুদিন পরে ফল বাগানে সফলতার মুখ দেখে, কৃষকের কষ্টের ফল বাগানে ভালো ফলন আসায় ভূ-স্বামীর (বর্ণ হিন্দু জমি দখলদার) লোলুপ দৃষ্টি পড়ে। জমি দখলদারের গোচরীভূত হলে নিয়ম করে দেওয়া হয়, গাছের ফল কথিত জমি দখলদার আগে ভোগ করবে, তারপর প্রজা ভোগ করবে, ...... প্রজাদের স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তি দূরে থাকুক, তাদের দেহে ও দৈহিক পরিশ্রমও জমি দখলদাররা নিজেদের কেনা বস্তু বলে মনে করে।
দৃষ্টান্ত হিসেবে (কুখ্যাত) কৃষ্ণনগরের জমি দখলদারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এই জমি দখলদারের হুকুম হলো, বিনামূল্যে ও বিনা বেতনে খামারীদেরকে তার নিকট দুধ দিতে হবে, জমি দখলদারকে জেলেরা বিনামূল্যে মাছ দিবে, নাপিতরা বিনামূল্যে ক্ষৌরকর্ম করবে, যানবাহকরা তাকে বিনামূল্যে বহন করে নিয়ে যাবে, চর্মকাররা পাদুকাদি দেবে, ইত্যাদি সকলেই স্ব স্ব অবস্থান থেকে জমি দখলদারের সেবা করবে। নাঊযুবিল্লাহ!
জমি দখলদার যখন নিজের গ্রামে থাকে, তখন তাকে নিজ বাসার ব্যয় সম্পাদন করতে হয় না। তার সমস্ত খরচ মুসলমানদের বহন করতে হয়। তার বাড়িতে কোনো ক্রিয়া (মেহমান) উপস্থিত হলে চতুর্দিক হতে নানাপ্রকার সামগ্রীপত্র আসতে থাকে। অবস্থা এমন যে, ক্রীতদাসকেও এরূপ দাসত্ব করতে হয় না। তার জমিদারি এলাকায় যারা ব্যবসা বাণিজ্য করে, তাদেরও জমি দখলদারের ইচ্ছাধীন মূল্য পণ্য দ্রব্য দিতে হবে, তার নাম সরকারি মূল্য। যে জিনিসের দাম বাজারে দুই টাকা, জমি দখলদারের কাছে হয়তো তা চার আনায় বেঁচতে হবে। জমি দখলদারের শোষণের লোভ যেন সীমাহীন।
-মুহম্মদ মুশফিকুর রহমান।
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
মুসলিম নির্যাতনের প্রতিশোধ হিসেবে বাংলার সুলতান যেভাবে নেপাল বিজয় করেছিলেন
০৫ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
আধুনিক কাগজ শিল্পের প্রতিষ্ঠাতা মুসলমানগণই
০৪ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
মাদরাসা প্রতিষ্ঠা নিয়ে ইতিহাসের আলোকে কিছু সংক্ষিপ্ত তথ্য
২৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
তাতারস্তানে সম্মানিত দ্বীন ইসলাম এবং মুসলমানদের স্বর্ণালী ইতিহাস
১৮ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
বিধর্মীরা যতটুকু সভ্যতা পেয়েছে তা মুসলিম শাসনামলেই আর বর্বরোচিত প্রথাসমূহ বন্ধ করেছিলেন মুসলিম শাসকরাই
১১ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
সম্মানিত দ্বীন ইসলাম উনার স্বর্ণালী যুগের নিরাপত্তা বিভাগের ইতিহাস (৪)
১১ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
বিখ্যাত মুসলিম পর্যটক ইবনে বতুতার বর্ণনায় বাংলাদেশ
০৬ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
উপমহাদেশে ব্রিটিশবিরোধী সুফি, ফকীর-দরবেশ বিদ্রোহের ইতিকথা
০১ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
বন্দর দখলদার, নব্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী, বিশ্ব সন্ত্রাসী ইহুদী দস্যুদের দোসর ডিপি ওয়ার্ল্ড এর পরিচিতি এবং উদ্দেশ্য (২)
৩১ জানুয়ারি, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
বর্তমানে দেশকে উন্নত করতে হলে দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ উত্তোলনের বিকল্প নেই (২)
২৮ জানুয়ারি, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
সম্মানিত দ্বীন ইসলাম উনার স্বর্ণালী যুগের নিরাপত্তা বিভাগের ইতিহাস (৩)
২৮ জানুয়ারি, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
বর্তমানে দেশকে উন্নত করতে হলে দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ উত্তোলনের বিকল্প নেই (১)
২৭ জানুয়ারি, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার)












