বাংলার মুসলিম কৃষকদের উপর হিন্দু জমি দখলদারদের জুলুমের ইতিহাস (পর্ব ০৫)
, ২৪ শাওওয়াল শরীফ, ১৪৪৬ হিজরী সন, ২৪ হাদি আশির, ১৩৯২ শামসী সন , ২৩ এপ্রিল, ২০২৫ খ্রি:, ১০ বৈশাখ, ১৪৩২ ফসলী সন, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) ইতিহাস
এরপর উগ্র যবন হিন্দু দখলদাররা মুসলমানদের উপর অত্যাচার নির্যাতনের মাত্রা আরো বাড়িয়ে দিলো। উগ্র হিন্দু দখলদাররা মুসলিম কৃষকদের ঘর-বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দিতো। এছাড়া নতুন জমি দখলদারগণ দস্যু-তষ্করদেরকে প্রতিপালন করতো ধন-সম্পদ অর্জনের উদ্দেশ্যে।
হতভাগ্য মুসলিম কৃষকগণ ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট থেকে কোন প্রকারের প্রতিকার ও ন্যায় বিচারের আশা করতে পারতো না। সরকারের কাছে যে রাজস্ব যেতো, তার চার থেকে দশগুণ পর্যন্ত প্রজাদের থেকে জোর-জবরদস্তিমূলক আদায় করা হতো। ২৩ প্রকার ‘অন্যায় ও অবৈধ’ আবওয়াব রায়তদের নিকট থেকে খাজনা আদায় করা হতো।
বুকানন বলেছে, “ব্রিটিশদের ছত্রছায়ায় রায়তদেরকে বাড়ী থেকে ধরে এনে কয়েকদিন পর্যন্ত আবদ্ধ রেখে মারপিট করে খাজনা আদায় করা তো এক সাধারণ ব্যাপার ছিলো। উপরন্তু গরীব ও পড়া-শোনা না জানা প্রজাদের নিকট থেকে জাল রসিদ দিয়ে খাজনা আদায় করে আত্মসাৎ করা হতো”।
তাদের ভাষ্য ছিলো এরকম- “অনাবৃষ্টি হইয়া সমুদয় শস্য শুষ্ক হউক, পানি প্লাবন হইয়া দেশ উচ্ছিন্ন যাউক, রাজস্ব দানে অক্ষম হইয়া প্রজারা পলায়ন করুক, তথাপি নির্দিষ্ট দিবসে সূর্যাস্তের প্রাক্কালে তাঁহাকে সমস্ত রাজস্ব নিঃশেষ পরিশোধ করিতে হইবে।”
অর্থাৎ, যদি বৃষ্টির অভাবে সমুদয় শস্য শুকিয়ে খরা হয়ে যায় অথবা বানের পানি এসে কৃষি ক্ষেত তলিয়ে যায়, অর্থাৎ যদি এসব প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে কৃষকরা খাজনা দিতে অক্ষম হয় তারপরও দৈনিক দিন শেষ হওয়ার পূর্বেই সমস্ত রাজস্ব আদায় করতে হবে। এই ছিলো তাদের আচরণ। নাঊযুবিল্লাহ!
মুসলমানদের শিক্ষার কাজে ব্যবহৃত জমি-সম্পত্তির উপরও ব্রিটিশ আর উগ্র হিন্দু যবনদের শকুনি দৃষ্টি পতিত হয়েছিলো। এর ফলশ্রুতিতেই ওয়ারেন হেস্টিংস ১৭৯৩ সালে ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’ চালু করে। এই চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের অধীনে ছূফী-দরবেশ, আলিম-উলামা উনাদের নিকট থেকে এসব লাখেরাজ জমি কেড়ে নিয়ে তা ব্রিটিশদের অনুগত উগ্র হিন্দুদেরকে দেয়া হয়।
তৎকালীন ভারত সরকারেরই একজন ব্রিটিশ সদস্য চার্লস ব্রিটিশদের এই ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’ সম্পর্কে ১৮২০ সালে মন্তব্য করেছিলো যে, “এ নীতি হচ্ছে অন্যায় অবিচারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত; কোনো দেশেই এরকম নীতির নজীর নেই। যেখানে সমস্ত জমি-জমা যাদের প্রাপ্য তাদেরকে না দিয়ে অন্য এক গোষ্ঠীর (হিন্দুদের) হাতে তুলে দেয়া হলো। যারা নানা দুর্নীতি ও উৎকোচের আশ্রয় নিয়ে দেশের ধনসম্পত্তি চুষে খেতে চায়।” (সূত্র: কোলকাতা কেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবী, পৃষ্ঠা ৭৯)
উল্লেখ্য, ১৭৭২ খ্রিস্টাব্দে ওয়ারেন হেস্টিংস সর্বপ্রথম হিসাব করে বের করে যে, “বাংলাদেশের প্রায় চার ভাগের এক ভাগ একেবারে নিষ্কর অর্থাৎ লাখেরাজ হয়ে রয়েছে। এরপর থেকেই ইংরেজ শাসকগোষ্ঠী, লুটেরার দল নানা বাহানায় এইসব জমি খাজনাযুক্ত করার জন্য (অর্থাৎ তাদের তোষামোদকারী হিন্দুদেরকে দিয়ে লাভবান হওয়ার জন্য) এক ‘অঘোষিত যুদ্ধ’ অব্যাহত রাখে।” (সূত্র: কোলকাতা কেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবী, এমআর আখতার মুকুল, প্রকাশকাল ১৯৮৭, ৭৭-৭৮ পৃষ্ঠা)
চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত বাংলাদেশের কৃষক বইয়ের লেখক, বামধারার গবেষক, বদরুদ্দীন উমর তার বইয়ের ভূমিকায় বলেছে, বাংলাদেশের কৃষকদের মধ্যে সম্প্রদায় হিসেবে মুসলমানরাই ছিলো অনেক সংখ্যাগরিষ্ঠ। তাদের ওপরও জমি দখলদারদের নির্যাতন ও নিপীড়ন ছিলো নিদারুণ। তার কারণ বাংলাদেশের জমিদার জোতদারদের মধ্যেও বর্ণ হিন্দুদের (ব্রিটিশদের আরদালি, গোলাম) ছিলো ব্যাপক প্রাধান্য। এই বর্ণ হিন্দুরাই ছিলো কংগ্রেসের নেতৃত্বে। (চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত বাংলাদেশের কৃষক, বদরুদ্দীন উমর, মাওলা ব্রাদার্স প্রকাশনী, সপ্তম মুদ্রণ জানুয়ারি ২০১৩)
বর্ণ হিন্দু জমি দখলদার ও জোতদারদের দ্বারা কৃষকদের উপর নির্যাতনের মাধ্যমে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করার সম্পর্কে একই বইয়ের ১৪ পৃষ্ঠায় গবেষক বদরুদ্দীন উমর বলেছে, এই নতুন রাজস্ব ব্যবস্থার ফলে বাংলাদেশে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রাপ্য ভূমি রাজস্ব নির্ধারিত হয় দুই কোটি ৬৮ লাখ টাকা অর্থাৎ ৩৪ লাখ পাউন্ড।
এই প্রসঙ্গে ক্যামব্রীজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক জয়া চ্যাটার্জীর কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সে বলেছে, অধীন প্রজা (কোর্ফা) ছিলো সবচেয়ে বেশি গরীব; জমি দখলদারদের চেয়ে তাদের ওপর বেশি অত্যাচার করতো রায়তি স্বত্বের অধিকারীরা। কারণ তাদের কাছ থেকেই তারা জমি গ্রহণ করতো। রায়তি স্বত্বের অধিকারীরা জমি দখলদারকে যে খাজনা দিতো তার চেয়ে বেশি তারা আদায় করতো অধীন (মুসলিম) প্রজাদের কাছ থেকে। (হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা ও দেশ বিভাগ ১৯৩২-১৯৪৭) জয়া চ্যাটার্জী, এল অ্যালমা পাবলিকেশনস, প্রথম সংস্করণ ১৯৯৯)
কোম্পানীর হিন্দু কর্মচারীগণ গ্রাম বাংলার ধ্বংস সাধনে কেন সর্বনাশা ভূমিকা পালন করেছিলো এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে জনৈক এক ব্রিটিশ মন্তব্য করে, ব্রিটিশ ও তাদের আইন-কানুন যে একটি মাত্র শ্রেণীকে ধ্বংসের মুখ থেকে রক্ষা করেছিলো তা হলো, তাদের অধীনে নিযুক্ত এতদ্দেশীয় (হিন্দু) পদলেহনকারী, গোমস্তা-দালাল প্রতিনিধিগণ। এসব লোক পঙ্গপালের মতো যেভাবে দ্রুতগতিতে গ্রাম বাংলাকে গ্রাস করতে থাকে তাতে করে তারা এই উপমহাদেশের অস্তিত্বের মূলেই আঘাত করছিলো। (Muinuddin Ahmad Khan, Muslim Struggle for Freedom in Bengal, pp. 8) ব্রিটিশ-বেনিয়াদের পলিসি ছিলো, যাদের সাহায্যে তারা এ দেশের স্বাধীনতা হরণ করে এখানে রাজনৈতিক প্রভুত্ব লাভ করেছে, তাদেরকে সমাজের সর্বস্তরে প্রতিষ্ঠিত করে মুসলমানদেরকে একেবারে উৎখাত করা, যাতে করে ভবিষ্যতে তারা আর কখনো স্বাধীনতা ফিরে পাবার কোন শক্তি অর্জন করতে না পারে।
হ্যাস্টিংসের ভূমি ইজারাদান নীতি ও কর্ণওয়ালিসের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে হিন্দু যবনগুলো মুসলমান জমিদারদের স্থান দখল করে। নগদ সর্বোচ্চ মূল্যদাতার নিকটে ভূমি ইজারাদানের নীতি কার্যকর হওয়ার কারণে প্রাচীন সম্ভ্রান্ত মুসলিম জমিদারগণ হঠাৎ সর্বোচ্চ মূল্য নগদ পরিশোধ করতে অপারগ হয়। পক্ষান্তরে হিন্দু বেনিয়া শ্রেণী, সুদখোর, ব্যাংকার ও হিন্দু ধনিক-বণিক শ্রেণী এ মোক্ষম সুযোগ গ্রহণ করে। প্রাচীন জমিদারীর অধিকাংশ চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে এসব ধনিক-বণিকদের কাছে অচিরেই হস্তান্তরিত হয়। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য ছিলো, মুসলমান জমিদারদের অধীনে নিযুক্ত হিন্দু নায়েব-ম্যানেজার প্রভৃতির স্বীকৃতি দান।
উপরের কথার সূত্র ধরে বলতে হয় যে, ব্রিটিশ-বেনিয়ারা ও তাদের পদলেহনকারী মুসলমানদের জমি দখলদার হিন্দুরা প্রাকৃতিক দূর্যোগের কারণে ফসল কম হলে বা না হলেও খাজনা মওকুফ করতো না।
সেই কথাই উঠে এসেছে, ডাব্লিউ হান্টারের লেখা পল্লী বাংলার ইতিহাস বইয়ের (দিব্য প্রকাশ সংস্করণ ফেব্রুয়ারি ২০০২) ২৪ পৃষ্ঠায়।
ডাব্লিউ হান্টার লেখে, ১৭৬৮ সালে আংশিকভাবে ফসল বিনষ্ট হওয়ায় ১৭৬৯ সালের প্রথম দিকে জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যায়। তবে এই অভাব অনটনের ফলে সরকারের আদায়কৃত খাজনার পরিমাণ কোনরূপ হ্রাস পায়নি। স্থানীয় অফিসারদের অভিযোগ আপত্তি সত্ত্বেও সদর দফতরের কর্তৃপক্ষ জানায় যে, কড়াকড়িভাবে খাজনা আদায় করা হয়েছে।
-মুহম্মদ মুশফিকুর রহমান।
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
মুসলিম নির্যাতনের প্রতিশোধ হিসেবে বাংলার সুলতান যেভাবে নেপাল বিজয় করেছিলেন
০৫ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
আধুনিক কাগজ শিল্পের প্রতিষ্ঠাতা মুসলমানগণই
০৪ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
মাদরাসা প্রতিষ্ঠা নিয়ে ইতিহাসের আলোকে কিছু সংক্ষিপ্ত তথ্য
২৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
তাতারস্তানে সম্মানিত দ্বীন ইসলাম এবং মুসলমানদের স্বর্ণালী ইতিহাস
১৮ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
বিধর্মীরা যতটুকু সভ্যতা পেয়েছে তা মুসলিম শাসনামলেই আর বর্বরোচিত প্রথাসমূহ বন্ধ করেছিলেন মুসলিম শাসকরাই
১১ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
সম্মানিত দ্বীন ইসলাম উনার স্বর্ণালী যুগের নিরাপত্তা বিভাগের ইতিহাস (৪)
১১ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
বিখ্যাত মুসলিম পর্যটক ইবনে বতুতার বর্ণনায় বাংলাদেশ
০৬ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
উপমহাদেশে ব্রিটিশবিরোধী সুফি, ফকীর-দরবেশ বিদ্রোহের ইতিকথা
০১ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
বন্দর দখলদার, নব্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী, বিশ্ব সন্ত্রাসী ইহুদী দস্যুদের দোসর ডিপি ওয়ার্ল্ড এর পরিচিতি এবং উদ্দেশ্য (২)
৩১ জানুয়ারি, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
বর্তমানে দেশকে উন্নত করতে হলে দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ উত্তোলনের বিকল্প নেই (২)
২৮ জানুয়ারি, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
সম্মানিত দ্বীন ইসলাম উনার স্বর্ণালী যুগের নিরাপত্তা বিভাগের ইতিহাস (৩)
২৮ জানুয়ারি, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
বর্তমানে দেশকে উন্নত করতে হলে দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ উত্তোলনের বিকল্প নেই (১)
২৭ জানুয়ারি, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার)












