আমেরিকার সাথে জিসোমিয়া ও আকসা’র মত প্রতিরক্ষা চুক্তি :
বাংলাদেশের কৌশলগত নিরপেক্ষতার সামনে নতুন ভূরাজনৈতিক ফিৎনা
, ০৫ জুন, ২০২৬ ১২:০০:০০ এএম ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) আপনাদের মতামত
(GSOMIA - General Security of Military Information Agreement) এবং আকসা (ACSA - Acquisition and Cross-Servicing Agreement) চুক্তি দুটি নিয়ে যে আলোচনা চলছে, তা দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে একটি বড় ফিৎনা ইঙ্গিত দেয়। ওয়াশিংটন একে সামরিক প্রযুক্তি আধুনিকায়নের সাধারণ আইনি প্রক্রিয়া হিসেবে দেখালেও, দেশীয় সমালোচক ও আঞ্চলিক কৌশলবিদরা এর পেছনে কিছু দীর্ঘমেয়াদী ষড়যন্ত্র দেখতে পাচ্ছে।
বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে আমেরিকা-বাংলাদেশ বাণিজ্যিক চূক্তি (ART Agreement on Reciprocal Trade)-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য চুক্তির সাথে এই সামরিক চুক্তিগুলোর সংযোগ দেশের ওপর চাপ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
ঝুঁকিসমূহ: এক নজরে জিসোমিয়া বনাম আকসা :
চুক্তি মূল কাজ প্রধান ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি
জিসোমিয়া (সামরিক তথ্যের সাধারণ নিরাপত্তা চুক্তি) শ্রেণীবদ্ধ (classified) সামরিক গোয়েন্দা তথ্য সুরক্ষিতভাবে আদান-প্রদানের আইনি কাঠামো। গোয়েন্দা সার্বভৌমত্ব খর্ব হওয়া: জাতীয় গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক সরাসরি মার্কিন আঞ্চলিক ট্র্যাকিং উদ্দেশ্যের সাথে যুক্ত হবে।
আকসা (অধিগ্রহণ এবং ক্রস-সার্ভিসিং চুক্তি) বন্দর ও বিমানঘাঁটিতে জ্বালানি নেওয়া, রক্ষণাবেক্ষণ এবং রসদ সরবরাহ ব্যবস্থা (লজিস্টিক) সহায়তার পারস্পরিক সুযোগ। "লিলি প্যাড" (Lily Pad) প্রভাব: বেসামরিক বা সামরিক হাবগুলো বিদেশি শক্তির পরোক্ষ সামরিক ঘাঁটিতে পরিণত হবে।
১. কৌশলগত নিরপেক্ষতার নীতিতে আঘাত :
কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি "সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরিতা নয়"-এই মূলনীতির ওপর ভিত্তি করে চলছিলো। এই নিরপেক্ষতার কারণেই বাংলাদেশ একই সাথে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত ও রাশিয়ার সাথে ভারসাম্যপূর্ণ ও ফলপ্রসূ সম্পর্ক বজায় রাখতে পেরেছে।
সমালোচকদের মতে, জিসোমিয়া এবং আকসা -তে স্বাক্ষর করার অর্থ হলো এই কৌশলগত নিরপেক্ষতা থেকে দূরে সরে যাওয়া। মার্কিন ব্যবস্থার সাথে সামরিক কাঠামোকে যুক্ত করলে বাংলাদেশ কার্যত ওয়াশিংটনের ইন্ডো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি (আইপিএস)-এর অংশ হয়ে পড়বে, যা এই শান্ত সামুদ্রিক অঞ্চলটিকে সন্ত্রাসীদের প্রতিযোগিতার একটি সক্রিয় ক্ষেত্রে পরিণত করবে।
২. চীনের সাথে ভূরাজনৈতিক দূরত্ব সৃষ্টির হবে :
যুক্তরাষ্ট্রের সাথে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক গভীর হলে বাংলাদেশ আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার কেন্দ্রে চলে আসবে।
চীনের প্রতিক্রিয়া: বাংলাদেশের সামরিক সরঞ্জামের প্রায় ৭০% আসে চীন থেকে। এছাড়া, জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল মালাক্কা প্রণালী এড়াতে বেইজিং মায়ানমার ও বঙ্গোপসাগর হয়ে স্থলপথের করিডোরের ওপর নির্ভর করে। ঠিক তার পাশেই মার্কিন সামরিক লজিস্টিক কাঠামোর উপস্থিতি বেইজিংয়ের কাছে এক ধরনের 'ঘেরাও করার কৌশল' হিসেবে সাব্যস্ত হবে।
৩. "লিলি প্যাড" প্রভাব এবং সার্বভৌমত্বের ঝুঁকি :
কাগজে-কলমে ‘আকসা’ দুর্যোগ মোকাবেলা বা যৌথ মহড়ার মতো রসদ সরবরাহ ব্যবস্থা (লজিস্টিক) সহায়তার কথা বললেও, এর বাস্তব পরিধি অনেক বড়।
এই চুক্তির অধীনে চট্টগ্রামের মতো গুরুত্বপূর্ণ বন্দর, মাতারবাড়ি বা ঢাকা ও কক্সবাজারের বিমানঘাঁটিগুলো মার্কিন সামরিক বাহিনী জ্বালানি সংগ্রহ ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ব্যবহার করতে পারবে। কৌশলবিদরা সতর্ক করছেন যে, এটি এক ধরনের "সফট বেস" বা পর্যায়ক্রমিক প্রবেশাধিকারের পথ তৈরি হবে। ভবিষ্যতে কোনো আঞ্চলিক সংঘাত (যেমন তাইওয়ান প্রণালী বা পশ্চিম মায়ানমারে) দেখা দিলে, বাংলাদেশের অবকাঠামো অনিচ্ছাকৃতভাবেই বিদেশি সামরিক অভিযানে ব্যবহৃত হবে, যা দেশের সার্বভৌম রক্ষা করা সম্ভব হবে না।
৪. গোয়েন্দা সার্বভৌমত্বের আপস করা :
মার্কিন আইন অনুযায়ী, কথিত উন্নত প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম (যেমন আধুনিক ফাইটার জেট বা এনক্রিপ্টেড যোগাযোগ প্রযুক্তি) বিক্রি করার আগে জিসোমিয়া (এঝঙগওঅ) স্বাক্ষর করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু এই তথ্য সমন্বয়ের (ডেটা সিনক্রোনাইজেশন) নামে একটি গভীর নির্ভরশীলতা তৈরি করে।
একবার গোয়েন্দা অবকাঠামো একে অপরের সাথে যুক্ত হয়ে গেলে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হবেনা। বিশ্লেষকরা পশ্চিম এশিয়ার কিছু দেশের উদাহরণ দিয়ে দেখান যে, এই ধরণের চুক্তির পর স্থানীয় নজরদারি এবং আকাশসীমা ট্র্যাকিংয়ের ডেটা পরোক্ষভাবে এমন সব তৃতীয় পক্ষের সামরিক অভিযানে ব্যবহৃত হয়েছে, যা সেই দেশের নিজস্ব স্বার্থের সাথে খাপ খায় না।
৫. "লেনদেনমূলক বাস্তববাদ" এবং বাণিজ্যের চাপ :
দেশের অভ্যন্তরে একটি বড় উদ্বেগের জায়গা হলো এই চুক্তিগুলো নিয়ে জনসাধারণের সামনে বা সংসদে কোনো উন্মুক্ত আলোচনা না হওয়া। অর্থনৈতিক দুর্বলতার সাথে প্রতিরক্ষা শর্তের সংযোগ দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে আরও জটিল করে তুলছে:
উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের সংকটের এই সময়ে, এই চুক্তিগুলো করার কোন প্রয়োজন নেই। কারণ, বর্তমানে প্রতিরক্ষা খাত থেকে অর্থনৈতিক খাতকে গুরুত্ব দিতে হবে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রফতানিতে ১৯% শুল্ক মওকুফ এবং বাণিজ্য চূক্তি -এর অধীনে শুল্কমুক্ত সুবিধার মতো বাণিজ্যিক বিষয়গুলোকে এই দীর্ঘমেয়াদী সামরিক চুক্তির সাথে জুড়ে দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র একটি বড় লিভারেজ বা চাপ প্রয়োগের সুযোগ পাচ্ছে। আঞ্চলিক নীতি বিশ্লেষকদের মতে, অর্থনৈতিক দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে কৌশলগত সুবিধা আদায়ের এই চেষ্টা দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের দরকষাকষির স্বায়ত্তশাসনকে দুর্বল করবে।
সব শেষে বলতে হয়, জিসোমিয়া ও আকসার মতো প্রতিরক্ষা চুক্তিগুলো কেবল সামরিক সহযোগিতার প্রযুক্তিগত কাঠামো নয়; এগুলো বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ ভূরাজনৈতিক অবস্থান, কৌশলগত স্বাধীনতা এবং আঞ্চলিক ভারসাম্যের সাথেও গভীরভাবে জড়িত। অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা, চীন-মার্কিন দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়া এবং কৌশলগত নিরপেক্ষতার ক্ষয়ের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তাই এ ধরনের দীর্ঘমেয়াদী চুক্তির ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব এবং আঞ্চলিক ভারসাম্যকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে এবং এ সকল চুক্তি থেকে সরকারকে বিরত থাকতে হবে।
-মুহম্মদ ইনজামামুল রাব্বি।
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
সার্বভৌমত্বের বিনিময়ে কী পাচ্ছি আমরা? - আকসা ও জিসোমিয়া চুক্তি প্রত্যাখ্যান করুন
১৩ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
চট্টগ্রাম বন্দর বিদেশীদের ইজারা দিলে বাংলাদেশ যে সমস্ত গুরুতর হুমকিতে পড়বে
১১ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
উত্তরাঞ্চলে এক ভয়ংকর চক্রান্ত ও আলেম সমাজের নীরবতা
১০ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
পুরোনো স্মার্টফোন বিক্রির আগে যে কাজ না করলে বিপদ
১০ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
পেগাসাসের জাল বিস্তার বাংলাদেশেও। সবাই সাবধান।
০৯ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
৫০ লক্ষের বাহিনী ও ভবিষ্যতের সাইবার যুদ্ধক্ষেত্রের মহাপ্রস্তুতি (পর্ব-৩)
০৮ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
বিজিবির দায়িত্ব সচেতনতা ও আন্তর্জাতিক আইনের বিজয়
০৭ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
সাতক্ষীরায় মসজিদ ভাঙার ধৃষ্টতা এবং আইনের শাসনের জরুরি প্রয়োজনীয়তা
০৭ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
বঙ্গোপসাগরে সাম্রাজ্যবাদী নব্য-ক্রুসেডারদের সামরিক আগ্রাসনের এক পৈশাচিক ফাঁদ
০৬ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
সাইয়্যিদুনা হযরত সুলত্বানুন নাছির আলাইহিস সালাম উনার নির্দেশনা মুবারক পালনেই সফলতা। ঢাকামুখী জনস্রোত বন্ধ এবং ঢাকা শহরের প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বিকেন্দ্রীকরণ ব্যতীত অন্য কোন পদ্ধতিতে কখনোই যানজট নিরসনের স্থায়ী সমাধান হবে না (৭)
০৬ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
জনসাধারণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বেওয়ারিশ কুকুর নিধন করতে হবে
০৫ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
৫১ কোটির জনসংখ্যার জন্য ৫০ লক্ষ সেনাবাহিনী প্রয়োজন সাইবর্গ পদাতিক: এক্সোস্কেলিটন প্রযুক্তিতে মুসলিম বিশে^র যুগলবন্দি (পর্ব-২)
০৪ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার)












