পার্বত্য চট্টগ্রামে জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় জোরালো পদক্ষেপ গ্রহণ করা সরকারের জন্য ফরজ
, ০২ রবীউছ ছানী শরীফ, ১৪৪৮ হিজরী সন, ১৬ রবি, ১৩৯৪ শামসী সন , ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রি:, ৩০ ভাদ্র, ১৪৩৩ ফসলী সন, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) বিশেষ প্রতিবেদন
পার্বত্য চট্টগ্রাম, বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ ও খোদায়ী দানে অপরূপ সৌন্দর্যের পার্বত্যভূমি। এই খোদায়ী নিয়ামত আজ জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের জন্য এক গুরুতর সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রাকৃতিক শোভার আড়ালে গড়ে উঠেছে সন্ত্রাসী কার্যক্রম, অস্ত্র মজুত এবং পৃথক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অপচেষ্টা। এই অঞ্চলের ভৌগোলিক অবস্থান-ভারতের মিজোরাম, ত্রিপুরা ও মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী-এবং দুর্গম পাহাড়-জঙ্গল এটিকে উপজাতি সন্ত্রাসী ও বিচ্ছিন্নতাবাদী নৃগোষ্ঠীদের দেশবিরোধী কার্যক্রমের জন্য অভয়ারণ্য করে তুলেছে। সম্প্রতি বিদেশী ষড়যন্ত্রমূলক সংগঠনের মদদে ইউপিডিএফ, কুকিচীন, আরাকান আর্মি, জেএসএস সহ বিভিন্ন উপজাতি সন্ত্রাসী সংগঠনের সেখানে যেসব তৎপরতা দৃশ্যমান হচ্ছে, তা কেবল স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাই নয়, বরং বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও অখ-তার ওপর সরাসরি হুমকি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, ভারতের সীমান্ত দিয়ে অত্যাধুনিক অস্ত্র, স্নাইপার রাইফেল ও নাইট ভিশন যন্ত্র প্রবেশ করছে এবং পাহাড়ের গভীরে আরাকান আর্মি, কুকিচীন, জেএসএস ও ইউপিডিএফের প্রশিক্ষণ ক্যাম্প স্থাপিত হয়েছে। এমনকি আন্তর্জাতিক সীমান্ত এলাকায় অস্ত্রধারী সদস্যদের টহল দেওয়ার ভিডিওচিত্র জনমনে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয় যে, ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করতে এবং বাংলাদেশকে একটি স্থায়ী চাপের মধ্যে রাখতে কোনো কোনো বহিরাগত মহল এসব বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীকে মদদ জোগাচ্ছে। এসব কার্যক্রম বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও স্থিতিশীলতার জন্য সরাসরি হুমকি স্বরূপ।
ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আমলে পাহাড়ি অঞ্চলে জনমিতিক ভারসাম্য আনয়ন ও জাতীয় নিরাপত্তা জোরদারে স্থানীয়ভাবে জনবসতি স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সেসময় অনেক ভূমিহীন বাঙ্গালিকে পাহাড়ে জমি বরাদ্দ ও রেশন দিয়ে পুনর্বাসিত করা হয়েছিলো। পরবর্তীতে এরশাদ সরকারের আমলে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিতে সেনাক্যাম্প ও সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি করা হয়। কিন্তু ১৯৯৭ সালের পার্বত্য শান্তিচুক্তির পর পাহাড়ি অঞ্চলে বিশেষ শাসনব্যবস্থা ও কাঠামোগত প্রশাসনিক শিথিলতা তৈরি হওয়ায় দীর্ঘমেয়াদে কাক্সিক্ষত স্থায়িত্ব আসেনি। বরং পৃথক আইনি কাঠামো ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে মূল ভূখ-ের সঙ্গে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে।
নৃতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকেও কিছু বিভ্রান্তিমূলক বক্তব্য প্রচার করা হচ্ছে। ঐতিহাসিক সূত্রমতে, মুসলমানরাই বাংলাসহ সারা পৃথিবীর আদিবাসী। সাইয়্যিদুনা হযরত নূহ আলাইহিস সালাম উনার প্রপৌত্র সাইয়্যিদুনা হযরত বং আলাইহিস সালাম উনার নামানুসারে এই অঞ্চলের নাম হয়েছে বাংলা এবং অধিবাসীদের নাম হয়েছে বাঙ্গালি। আদিবাসী বাঙালি মুসলমান জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি এই অঞ্চলে বিভিন্ন সময়ে পার্শ্ববর্তী এলাকা থেকে আগত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীসমূহ আশ্রিতরুপে বসবাস শুরু করে। কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে এদের ‘আদিবাসী’ স্বীকৃতি দেওয়ার যে দাবি তোলা হচ্ছে, তার মূল উদ্দেশ্য হলো আন্তর্জাতিক আইন ও ফোরামকে ব্যবহার করে পূর্ব তিমুর বা দক্ষিণ সুদানের মতো পার্বত্য চট্টগ্রামকে বাংলাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করার চক্রান্ত করা। এই ধরনের দেশবিরোধী অপপ্রচারে লিপ্তদের আইনের আওতায় আনা ও বিচার করা রাষ্ট্রীয় সুরক্ষার স্বার্থেই আবশ্যক।
একইভাবে, আমাদের দ্বীনী ও সামাজিক মূল্যবোধও মাতৃভূমির নিরাপত্তা রক্ষার নির্দেশ দেয়। ইসলামে শান্তি, ন্যায়বিচার ও অখ-তা রক্ষার প্রতি জোর দেওয়া হয়েছে এবং দেশে বিশৃঙ্খলা ও অসন্তোষ সৃষ্টিকারীদের কঠোর শাস্তির কথা বলা হয়েছে। মহান আল্লাহ পাক পবিত্র সূরা আল-বাকারা শরীফে এবং পবিত্র সূরা আল-মায়িদা শরীফে ফাসাদ বা অরাজকতা সৃষ্টির বিরুদ্ধে কঠোর নির্দেশ মুবারক দিয়েছেন। আর নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি নির্দেশ মুবারক দিয়েছেন মাতৃভূমি ও জনগণের নিরাপত্তার জন্য সীমান্ত পাহারা দেওয়া এবং উপদ্রবকারীদের কঠোরভাবে দমন করার।
বর্তমান সংকটময় পরিস্থিতিতে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় রাষ্ট্রকে এখনই সুনির্দিষ্ট ও সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে:
১। জোরদার সামরিক উপস্থিতি ও সক্ষমতা বৃদ্ধি: পার্বত্য চট্টগ্রামজুড়ে সেনাবাহিনীর অবস্থান শক্তিশালী করতে হবে এবং সেনাক্যাম্পের সংখ্যা ও সেনা মোতায়েন বাড়াতে হবে। সেনাক্যাম্পের সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি বিশেষ অভিযান পরিচালনা এবং সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ব্যবস্থা চালু করতে হবে এবং বিওপি জোরদার করতে হবে । সশস্ত্র বাহিনীর সার্বিক বাজেট, জনবল ও সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করা জরুরি।
২। সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠী নিষিদ্ধকরণ: কুকিচীন, আরাকান আর্মি, জেএসএস ও ইউপিডিএফসহ যেসব গোষ্ঠী সশস্ত্র অরাজকতার সাথে জড়িত, তাদের আনুষ্ঠানিকভাবে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করে সব ধরনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করতে হবে। সন্ত্রাসীদের প্রশিক্ষণ ক্যাম্প রয়েছে এমন এলাকায় সেনাবাহিনীর বিশেষ অভিযান পরিচালনা করতে হবে।
৩। আইনি ও প্রশাসনিক সংস্কার: সিএইচটি কমিশন আইনসহ সংশ্লিষ্ট আইন পর্যালোচনা করে জাতীয় স্বার্থে সংশোধন বা বাতিল করতে হবে। দেশের মূল ভূখ- ও পার্বত্য অঞ্চলের জন্য পৃথক আইন নয়, বরং ‘এক দেশ, এক নীতি’ নিশ্চিত করতে হবে।
৪। রাজা প্রথা ও ভূমিনীতি পরিবর্তন: পার্বত্য অঞ্চলের প্রচলিত ‘রাজা প্রথা’ এবং জমি ক্রয়ে রাজার অনুমোদনের নিয়ম বাতিল করতে হবে। প্রশাসনিক সকল কার্যক্রম কেন্দ্রীয় আইনের অধীনে পরিচালনা করা উচিত।
৫। জনমিতিক ভারসাম্য, নতুন বাঙ্গালি বসতি স্থাপন ও পুনর্বাসন: পাহাড়ের নিরাপত্তা জোরদার করতে এবং রাষ্ট্রীয় সার্বিক সংযোগ বাড়াতে ভূমিহীন ও প্রান্তিক নাগরিকদের পার্বত্য অঞ্চলে ভূমি বরাদ্দ দিয়ে স্থায়ীভাবে পুনর্বাসিত করার কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার। জনবসতি ও প্রশাসনিক ভারসাম্য রক্ষার্থে পাহাড়ে আরও বাঙালি বসতি স্থাপন ও ভূমিহীনদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ নিতে হবে। ভূমিহীন মুসলমানদের পাহাড়ে ভূমি বরাদ্দ ও মাসিক রেশন বরাদ্দ দিয়ে পাহাড় আবাদ করতে হবে।
৬। রাষ্ট্রদ্রোহিতার বিচার ও বিচ্ছিন্নতাবাদী ষড়যন্ত্র মোকাবিলা: বাঙ্গালি মুসলমানদের এই অঞ্চলের আদিবাসী বলে ঘোষণা করতে হবে। ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীকে ‘আদিবাসী’ দাবি করে দেশকে বিভক্ত করার ষড়যন্ত্রে লিপ্তদের রাষ্ট্রদ্রোহী হিসেবে চিহ্নিত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনতে হবে, শাস্তির আওতায় আনতে হবে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের আত্মপরিচয় ও মানচিত্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কোনো ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা বা বাহ্যিক চক্রান্তকে ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই। একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের অখ-তা রক্ষায় সকল নাগরিক, বিচারব্যবস্থা ও সামরিক বাহিনীকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে এখনই সময়োপযোগী ও বলিষ্ঠ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
-মুহম্মদ শামসিত তাবরিজ।
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
প্রকান্ড কিছু দেখলেই অবনত হওয়া নত হওয়া একটি বদ খাছলত
১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
সমন্বিত অক্ষ ও বাংলাদেশের অবস্থান
১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
শক্ত মানসিকতার দৃঢ়চিত্ত শাসন: বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষা
১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
বেতন বৃদ্ধি নয়, বরং জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো জরুরি (২)
১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
বেতন বৃদ্ধি নয়, বরং জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো জরুরি (১)
১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
উপজাতিগুলোকে যেভাবে উস্কানি দিচ্ছে এনজিওগুলো
০৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
আপনি কি শুকরের চর্বিযুক্ত সাবান দিয়ে গোসল করে ইবাদত বন্দেগী করছেন?
০৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
ইসলামী মূল্যবোধহীন সরকার ব্যবস্থায় ‘ভেজাল খাদ্য’
০৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও স্বার্থের চরম বিসর্জন-ভারতের উচ্চভোল্টেজ করিডর কার স্বার্থে?
০৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
অমান্য করলেই কাটা পড়বে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানি
০১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
ইতিহাসের দীর্ঘশ্বাস ও এক বিস্মৃত অধ্যায়ের ট্র্যাজেডি
০১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
৫০ লক্ষাধিক বাহিনীর আন্তঃযোগাযোগে ত্রিদেশীয় স্ট্রাটেজিক রূপরেখা (পর্ব-১৯)
৩০ আগস্ট, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার)












