মাদরাসা শিক্ষার উপর ভিত্তি করেই ছড়িয়েছে জ্ঞান-বিজ্ঞানের আলো।
-বৃটিশ শাসনপূর্ব মুসলিম শাসনামলে শুধু বাংলাদেশেই ৮০ হাজার মক্তব যার প্রমাণ
, ২৫ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০:০০ এএম ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) বিশেষ প্রতিবেদন
ইতিহাস সাক্ষী অতীতের সকল মুসলিম বিজ্ঞানী, জ্ঞানী-গুনী সবাই মক্তব-মাদরাসায় পড়াশোনা করেই জ্ঞানের আলো ছড়িয়েছেন। বেনিয়া বৃটিশ শাসনের পুর্বে মুসলিম শাসনামলে মাদরাসা শিক্ষা ব্যবস্থাই ছিলো মূল। যেখানে জ্ঞান-বিজ্ঞানের সকল শাখা সম্পর্কে পড়ানো হত।
মুসলিম শাসনামলের অবদান:
মুসলিম শাসনামলের শুরু থেকেই মুসলমানরা বাদশাহ, সুলতান, নবাব এবং তাদের বড় রাজ কর্মচারীদের প্রদত্ত জায়গীর, আয়মা, আল তগমা, মদ মাশ প্রভৃত্তি লাখেরাজ সম্পত্তি (নিষ্কর সম্পত্তি যা ওয়াকফ করে দেয়া হত) ভোগ করতেন। এসব সম্পত্তির আয় দ্বারা শুধু ভরনপোষনই নয়, অসংখ্য মসজিদ, মাদরাসা, খানকাহ, মুসাফির খানাসহ নানা জনহিতকর প্রতিষ্ঠানও পরিচালিত হত।
মুহম্মদ আবদুল মান্নান রচিত “বাংলা ও বাংগালী: মুক্তি সংগ্রামের মুলধারা” নামক বইয়ের ১৫৩ পৃ. বলা আছে- হযরত ওলী-আউলিয়া রহমতুল্লাহি আলাইহিমগন ও আলেমদের প্রভাবে এবং শিক্ষা ব্যবস্থার কল্যানে বাংগালী মুসলমানগন অত্যন্ত উন্নত আধ্যাত্মিক, নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক জীবনের প্রতিনিধিত্ব করতেন। তেরো শতকের সুলতান রুকনউদ্দীন কায়কাউসের সময় ত্রিবেনীর মাদ্রাসায় উৎকীর্ন একটি শিলালিপি শিক্ষা সম্পর্কে সে যুগের মুসলমানদের চিন্তা-চেতনার প্রতিনিধিত্ব করে “তোমরা জ্ঞানার্জন করো, কেননা জ্ঞানার্জনই প্রকৃত আত্মনিবেদন, এর অনুসন্ধানই মুহব্বত এবং এর চর্চাতেই পরম গৌরব।
কেমন ছিলো শিক্ষা ব্যবস্থা?
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা সম্পর্কে ম্যাক্সমুলার উল্লেখ করেছে যে- “ইংরেজদের ক্ষমতা দখলকালে বাংলায় ৮০ হাজার মক্তবের অস্তিত্ব ছিল। প্রতি ৪০০ লোকের জন্য তখন একটি মাদরাসা ছিল”। (সুত্র: মুহম্মদ আবদুল মান্নান রচিত “আমাদের জাতিসত্তার বিকাশধারা”, পৃ ৬০)
মুহম্মদ আবদুল মান্নান রচিত “বাংলা ও বাংগালী: মুক্তি সংগ্রামের মুলধারা” নামক বইয়ের ১৫৪-১৫৫ পৃ. বলা আছে- মুসলিম শাসনামলে বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষার ব্যাপক প্রচলন হয়। উইলিয়াম এডাম এর ১৮৩৫ খৃ. সে সম্পর্কে কিছু ধারনা পাওয়া যায়। বাংলার শিক্ষার তৎকালীন অবস্থার উপর জরিপ চালিয়ে সে উল্লেখ করে যে “বাংলা ও বিহারে পাঁচ থেকে পনেরো বছর বয়সের প্রতি ৩০০ জনের বেশি অধ্যয়নরত ছাত্র-ছাত্রীর জন্য তখন একটি গ্রাম্য বিদ্যালয় ছিল”। (উইলিয়াম এডামঃ শিক্ষা রিপোর্ট ১৮৩৫-৩৮, কলকাতা পৃ ৬-৭)
“এডাম এর এই রিপোর্ট প্রনয়নকালে বাংলার মুসলমানদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা বিধ্বস্থ ছিল। মুসলিম শাসনামলে শিক্ষা অবস্থা অনেক বেশি উন্নত ছিল। প্রাথমিক মক্তব ও পাঠাশালার সংখ্যাও ছিলো অনেক বেশি। মুসলমানদের সামর্থ্য বেশি ছিলো বলে উনাদের মধ্যে উন্নত শিক্ষা ব্যবস্তা চালু ছিলো”। (ডক্টর এম এ রহিম- বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস, পৃ. ২১৫ )
মুসলিম শাসনামলে শিক্ষা খুবই সুলভ ছিলো। শিক্ষার পদ্ধতিও ছিলো যথেষ্ট উন্নত। মুসলিম শাসনামলের শিক্ষার অবস্থা সম্পর্কে এইচ জে রাওলিনসন লিখেছে- “মুঘল ভারতের উন্নততর শিক্ষা সংস্কৃতি যথেষ্ট পরিমানে তাদের শিক্ষা পদ্ধতিরই ফসল। শিক্ষা দ্বীনি কর্তব্য হিসেবে পরিগনিত হত। ধণী পিতামাতার সন্তানকে ৪ বছর বয়সে কুরআনের একটি আয়াত উৎকীর্ন করা পাথর বসানো শ্লেট দিয়ে একজন শিক্ষকের হাতে তুলে দেয়া হত। আর গরীব পিতা মাতার সন্তানকে মৌলভী উনাদের দ্বারা পরিচালিত মক্তব বা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠানো হত। প্রতিটি মসজিদের সাথেও একটি মক্তব ছিলো”। (এইচ জে রাওলিসন: রহফরধ-ধ ংযড়ৎঃ পঁষঃঁৎধষ যরংঃড়ৎু, পৃ ৩৭২)
বিভিন্ন সুত্র থেকে জানা যায়, মাধ্যমিক পর্যায়ের বিদ্যালয়গুলোতে মুসলিম শাসনামলে পাঠ্য বিষয়রূপে পবিত্র কালামুল্লাহ শরীফ, পবিত্র হাদিছ শরীফ, দ্বীনতত্ত্ব, ফিক্বহ, আইনশাস্ত্র ও অন্যান্য দ্বীন ইসলামী বিষয়ের পাশাপাশি যুক্তিবিদ্যা, অংকশাস্ত্র, চিকিৎসাবিদ্যা, রসায়ন, জ্যোতির্বিদ্যা, কৃষি, জ্যামিতি, গার্হস্থ্য বিদ্যা, সরকারী আইনকানুন, রাষ্ট্র বিজ্ঞান, শাসন কৌশল, ইতিহাস ইত্যাদি পাঠ করানো হত।
ইউরোপিয় পর্যটক বার্নিয়ার ও মানুচি উল্লেখ করে যে চিকিৎসা শাস্ত্র অধ্যায়ন ও রোগ চিকিৎসার ক্ষেত্রে মুসলমানরা ইবনে সিনা ও ইবনে রুশদ এর পদ্ধতি অনুসরন করতেন।
উইলিয়াম এডাম এমনকি উনিশ শতকের প্রথমার্ধেও বাংলার মাদরাসাগুলোতে চিকিৎসা শাস্ত্র অধ্যায়ন চালু থাকতে দেখেছে। সে তার ১৮৩৫ সালের শিক্ষা কমিশন রিপোর্টে উল্লেখ করে যে- “দ্বীন ইসলামী বিষয়াদি ছাড়াও প্রকৃতি বিষয়ক দর্শন এবং সাধারন দর্শন শাস্ত্রের গ্রন্থাদির সাথে জ্যামিতি এবং জ্যোতিষশাস্ত্র মাদরাসাগুলোতে পড়ানো হত”। (উইলিয়াম এডাম: শিক্ষা রিপোর্ট ১৮৩৫-৩৮, কলকাতা পৃ ৬-৭)
হিন্দুদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে মুসলমানদের তৎকালীন মাদরাসাগুলির তুলনা করে উইলিয়াম এডাম লিখেছে- “এ দেশে মুসলমানদের অনুসৃত পাঠ্য পদ্ধতি হিন্দু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির প্রচলিত পাঠ্য বিষয়ের তুলনায় অনেক বেশি ব্যাপক ও উদার ছিলো। এই পাঠ্যক্রম অনুসরন করে শিক্ষিত ব্যক্তিরা বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করত”। (উইলিয়াম এডামঃ সেকেন্ড রিপোর্ট, পৃ ২৬-২৭)
তৎকালে মুসলমানদের শিক্ষা সন্বন্ধে উইলিয়াম এ্যাডাম মন্তব্য করে যে, এ দেশে মুসলিমগন বহু বেসরকারী বিদ্যালয় স্থাপন করেছিলেন এবং উনারা শিক্ষাকে পেশা ও জীবিকা নির্বাহের উপায় বলে গ্রহন করেননি। উনারা একে ন্যায় ও নেকীর কাজ বলে মনে করতেন। সে আমলে প্রথম পর্যায়ের শিক্ষা বাংলা ভাষার এবং উচ্চ শিক্ষা আরবী ও ফারসী ভাষার দেয়া হত। কিন্তু পশ্চিম ও উত্তর ভারতীয় মুসলিমগণ ফারসী ও উর্দুভাষা ব্যবহার করতেন। মুসলমান সমাজের অবস্থাপন্ন ঘরের সন্তানরা মসজিদে পবিত্র কুরআন শরীফ শিক্ষার সাথে এক বা একাধিক বিষয় যেমন বাংলা, গনিত, আরবী, ফারসী ইত্যাদি বিষয়ে জ্ঞানলাভ করতেন। বিত্তশালী লোকেরা নিষ্কর জমি, ওয়াকফ ও লাখেরাজ সম্পত্তি দান করে এ শিক্ষা ব্যবস্থা উৎসাহ দিতেন”। (হাসানূজ্জামান বিপুল, বাংলাদেশ জেলা গেজেটীয়ার বৃহত্তর যশোর)
-ডা. মুহম্মদ হাসান আল মারুফ।
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
ডিপি ওয়ার্ল্ড চুক্তিতে দেশের স্বার্থ যেভাবে বিকিয়ে দেয়া হয়েছে (৪)
২৪ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
ডিপি ওয়ার্ল্ড চুক্তিতে দেশের স্বার্থ যেভাবে বিকিয়ে দেয়া হয়েছে (৩)
২১ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
* আমার অভিভাবক তো আল্লাহ পাক, যিনি কিতাব অবতীর্ণ করেছেন এবং তিনিই সৎকর্ম পরায়ণদের অভিভাবকত্ব করে থাকেন। আল্লাহ পাক ব্যতীত তোমরা যাকে আহবান করো তারা তো তোমাদেরকে সাহায্য করতে পারে না এবং তাদের নিজেদেরকেও না। যদি তাদেরকে সৎপথে আহ্বান করেন তবে তারা শ্রবণ করবে না এবং আপনি দেখতে পাবেন যে, তারা আপনার দিকে তাকিয়ে আছে কিন্তু তারা দেখে না’। (পবিত্র সূরা আ’রাফ শরীফ : ৭/১৯৪-১৯৮)।
১৮ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
জনঅসন্তোষের আগুনে ঘি ঢালার শামিল
০৬ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
ধর্মব্যবসায়ী ও বিধর্মীদেরকে গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো থেকে অপসারণ জরুরী
০৫ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
সমসাময়িক ঘটনা
০৩ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
সম্ভ্রমহরণে শিশুর মৃত্যুর অভিযোগ, কিশোর আটক
০৩ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
অন্যান্য দেশে উড়াল সেতু ভেঙ্গে ফেলা হচ্ছে; আর বাংলাদেশ সরকার ফ্লাইওভার তৈরি করছে
০১ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
পানির জন্য ভারতের মুখাপেক্ষী হওয়ার প্রয়োজন নেই:
২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
যত্রতত্র পূজা মন্ডপ কেন?
২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
মুসলমানদের উপর কাফিরদের নির্যাতনের কারণ উদঘাটন
২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
ফিলিস্তিনপন্থী আন্দোলন দমনে অস্ত্র তৈরি প্রতিষ্ঠানের পরামর্শ নিচ্ছে ইংল্যান্ডের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো
২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার)












