ঢাকা আলিয়া মাদরাসার গ্রন্থাগার, বকশিবাজারে লুকিয়ে থাকা এক রত্ন ভান্ডার!
, ১৭ আগস্ট, ২০২৫ ১২:০০:০০ এএম ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) পাঁচ মিশালী
কিছু দিন আগে ঢাকার মাদরাসা-ই-আলিয়ার গ্রন্থাগারে দুজন বিদেশি এসেছিলো। তারা আগেই এই গ্রন্থাগারের খোঁজ পেয়েছিলো, এবার এসেছে বইয়ের সন্ধানে। তাদের একজন থমাস, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস পড়ান। অন্যজন তার বন্ধু, ফারসি প-িত শাহিন। গ্রন্থাগারের সবকিছু ঘুরে দেখে তাদের মন্তব্য- “এ এক অমূল্য রত্নভান্ডার!”
তাদের সঙ্গে ছিলো দুই জন বঙ্গসন্তান- জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক তারিক ওমর আলী এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. শহিদুল হাসান।
এই গবেষকদের আগ্রহের জায়গায় ছিলো দারুণ মিল। তারা সবাই পুরোনো পুঁথি ও পান্ডুলিপির সমঝদার। বাংলা অঞ্চলের পা-ুলিপি নিয়ে কাজ করার আগ্রহ থেকেই তাদের মাদরাসা-ই-আলিয়ার গ্রন্থাগারে যাওয়া।
আরবি-ফারসি পা-ুলিপি নিয়ে আগেও বহু কাজ করেছেন ড. শহিদুল হাসান। সুলতানি আমলের মুদ্রা এবং মধ্যযুগীয় বাংলার ধর্মীয় ও সামাজিক ইতিহাস তার গবেষণার প্রধান বিষয়। তার মতে- “আলিয়া মাদরাসার এই গ্রন্থাগার বঙ্গীয় মুসলমানদের ১৯ শতকের জ্ঞান-জগৎ বোঝার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংগ্রহ। ”
গ্রন্থাগারটির আনুমানিক বয়স ২৪৫ বছর। এর মধ্যে ১৬৭ বছর ছিলো কলকাতায়, আর ঢাকায় এসেছে ৭৮ বছর আগে। এই দীর্ঘ ইতিহাসের সাক্ষ্য হয়ে আজও টিকে আছে গ্রন্থাগারটি, ঢাকার বকশিবাজারে।
শুরুটা কোম্পানি আমলে:
১৭৮০ সাল। বাংলার গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংসের কাছে একদল মুসলমান দাবি করেন- ইসলামি ও আধুনিক শিক্ষার জন্য কলকাতায় একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করা হোক। হেস্টিংসের অনুমোদনক্রমে ওই বছরই শুরু হয় মাদরাসা-ই-আলিয়ার কার্যক্রম। ঢাকার আলিয়া মাদরাসা সেই ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠানেরই অংশ।
১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময় কলকাতা আলিয়া মাদরাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থী, আসবাবপত্র এবং গ্রন্থাগারের প্রায় সব বই ঢাকায় নিয়ে আসা হয়। প্রথমে জাহাজে করে চট্টগ্রাম, সেখান থেকে ঢাকায়। শুরুতে লক্ষ¥ীবাজারে বর্তমান কবি নজরুল কলেজের ভবনে চালু হয় পাঠদান। ১৯৬০ সালে মাদরাসা স্থায়ীভাবে উঠে আসে বকশিবাজারে। এখানেই স্থান পায় ঐতিহাসিক গ্রন্থাগারের দুর্লভ সব কিতাব।
আজও মাদরাসার কক্ষগুলোতে চোখে পড়ে সেইসব প্রাচীন আসবাব। গ্রন্থাগারের আলমারি আর শ্রেণিকক্ষের অনেক চেয়ার-টেবিল আজও বহন করছে ব্রিটিশ আমলের স্মৃতি। এসব আলমারির প্রতিটিই ঠাসা দুর্লভ ও প্রাচীন সব গ্রন্থে।
তাকে তাকে সাজানো ‘ধন-রত্ন’:
মাদরাসা ভবনের দ্বিতীয় তলায় গ্রন্থাগার। ঢুকতেই পুরোনো বইয়ের ঘ্রাণ বাতাসের সাথে ভেসে আসে। বিশালাকার চারটি কক্ষ-প্রতিটিই বইয়ে ঠাসা। গ্রন্থাগারিকের কক্ষ পেরিয়ে সারি সারি আলমারির পাশ দিয়ে গেলে বইয়ের সমুদ্রে হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করবে যে কারো।
আরবি, ফারসি, ইংরেজি ও বাংলা ভাষায় রচিত অসংখ্য দূর্লভ গ্রন্থের সংগ্রহশালা এই গ্রন্থাগার। এখানকার অনেক কিতাব মাদরাসার চেয়েও প্রাচীন। ধর্ম, দর্শন, সাহিত্য, বিজ্ঞান ও জ্যোতির্বিজ্ঞান-সব বিষয়েই রয়েছে দুর্লভ বই। ইংরেজি ও ফরাসি সাহিত্যের ধ্রুপদী গ্রন্থও বাদ যায়নি। মোট বইয়ের সংখ্যা প্রায় ২৫ হাজার।
বিশ্বখ্যাত সব গ্রন্থের সম্মিলন:
এই লাইব্রেরির বিশেষত্ব হলো- এখানকার বেশিরভাগ বইই এসেছে কলকাতা থেকে, ব্রিটিশ আমলের ইসলামি জ্ঞান-বিজ্ঞানের ধারা বহন করে। এটি একটি সমৃদ্ধ আর্কাইভ। যারা চেনেন, তারা বোঝেন, কত মূল্যবান বই এখানে আছে।
গ্রন্থাগারটিতে ফারসি মহাকাব্য শাহনামা-র একটি অতি পুরোনো সংস্করণ রয়েছে। বইটি সচিত্র। রয়েছে মোঘল রাজ দরবারের ছাপচিত্র নিয়ে একটি বড় এলবাম, যাতে স্থান পেয়েছে মোঘল আমলের বিভিন্ন ঘটনার চিত্রাবলি।
গ্রন্থাগারে আছে, কোন এক লেখকের হস্তে লিখিত গোটা একখানি বুখারী শরীফ, রয়েছে ফিকাহ শাস্ত্রের বিশ্বকোষ।
গ্রন্থাগারে রয়েছে আইন-ই-আকবরির একটি পুরোনো সংস্করণ। আছে যুক্তিবিদ্যা ও গণিত শাস্ত্রের ঐতিহাসিক গ্রন্থ-কিতাব আল-জাবর ওয়াল-মুকাবালা, কিতাব আল-ফখরি, কিতাব আল-মাহাজান, কিতাব আল-হিসাব।
আইন শাস্ত্রের মধ্যে রয়েছে কিতাব আল-মাবসুত, আল সারখাসি রুহুর মাওয়াহিব, আল মুয়াত্তা, কিতাব আল-আনসাব।
এছাড়া আছে ইবনে সিনার কানুন ফিত তিব, কিতাব আল-শিফা; এবং প্রাচীন চিকিৎসাবিষয়ক অসংখ্য গ্রন্থ।
কলকাতার পাশাপাশি চীন থেকেও বেশ কিছু গ্রন্থ এসেছে এখানে। কোনো কোনোটি প্রায় ৪০০ বছরের পুরোনো। সব মিলিয়ে এত সমৃদ্ধ লাইব্রেরি মনে হয় না অন্য কোথাও আছে।
প্রাপ্ত তথ্যের সারসংক্ষেপ:
মাদরাসার শিক্ষার্থীদের থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়- “প্রথম দিকে ঢাকা আলিয়া মাদরাসায় আইন, জ্যোতির্বিদ্যা, যুক্তিবিজ্ঞান, দর্শন, পাটিগণিত, জ্যামিতি, ছন্দবিজ্ঞান, ব্যাকরণ ও ধর্মতত্ত্ব পড়ানো হতো- যা আধুনিক শিক্ষার অন্যতম ভিত্তি। এসব বিষয়ে অধ্যয়নের ক্ষেত্রে এই গ্রন্থাগারের বইগুলো অমূল্য সম্পদ। ”
ছাত্রদের জন্য নিয়মিত পাঠের সুযোগ রয়েছে। রয়েছে আলাদা পাঠকক্ষ, রাখা হয় সংবাদপত্র ও সাময়িকীও। তবে মাদরাসার বাইরের কেউ ব্যবহার করতে চাইলে দরকার বিশেষ অনুমতির।
বাইরের কোনো গবেষক বা আগ্রহী পাঠক গ্রন্থাগার ব্যবহার করতে চাইলে অধ্যক্ষের কাছ থেকে অনুমতি নিতে হয়। সব নথিপত্র দেখে তিনি ঠিক মনে করলে অনুমতি দেন।
আসেন সমঝদার গবেষকরা:
মাদরাসা-ই-আলিয়ার গ্রন্থাগার সম্পর্কে এখনও খুব বেশি মানুষের জানা নেই। তবে যারা জানেন, তাদের মধ্যে নিয়মিত দেশ-বিদেশ থেকে গবেষক ও অনুসন্ধিৎসু পাঠকরা আসেন এই গ্রন্থাগারে।
উদাহরণস্বরূপ, ফারসি বই পড়তে ইরান দূতাবাস থেকেও অনেকে এসেছিলেন। আগে আরও বেশি গবেষক আসতেন। ২০২০ সালের পর কিছুটা কমেছে।
দরকার রক্ষণাবেক্ষণ:
বছরের পর বছর ধুলো-ময়লা ও প্রাকৃতিক উপাদানের আঘাতে অনেক প্রাচীন বই ও পা-ুলিপি আজ নষ্ট হওয়ার পথে। সেগুলো সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তার কথা বললেন মাদরাসার অধ্যক্ষ মোহাম্মদ ওবাইদুল হক।
তিনি চান, পা-ুলিপিগুলোর আধুনিক সংস্করণ তৈরি করে একটি ই-লাইব্রেরি গড়ে তুলতে। তবে এক্ষেত্রে সরকারের পাশাপাশি সচেতন মানুষদের সহযোগিতাও জরুরি বলে মনে করেন।
এখানকার শিক্ষার্থীরাও মনে করেন, গ্রন্থাগারটি আধুনিকায়ন করে সকলের জন্য জ্ঞানচর্চার সুযোগ করে দেওয়া উচিত। তবেই দুই শতকের এই গ্রন্থাগারের আসল উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন হবে।

এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
ভারী খাবারের পর পেট ফাঁপা: কিভাবে এড়াবেন?
২৬ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
নতুন জুতা পরে পায়ে ফোসকা পড়লে যা করবেন
২৬ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
বাসযোগ্য অঞ্চলে পৃথিবীসদৃশ ৪৫ গ্রহ শনাক্ত
২৫ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
বিজ্ঞানীদের ধারণা বদলে দিলো ক্ষুদ্র এক মাছ
২৫ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
ঈদে সুস্থ থাকতে মিষ্টি ও ভারী খাবার, ডায়াবেটিস রোগীরা সতর্ক থাকবেন যেভাবে
১৯ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
ঈদে ভিড় বাড়ে টাকার হাটে
১৯ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
ইফতারের পর ক্লান্ত লাগার কারণ
১৮ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
জার্মানিতে সাহরি ও ইফতার
১৮ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
এবারও বাড়েনি ‘বিশেষ ট্রেন’, ভোগান্তির আশঙ্কা
১৬ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
খারগ দ্বীপকে ইরানের লাইফলাইন বলা হয় কেন?
১৫ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
ইফতারে কোন মুসলিম দেশে কী খাওয়া হয়? (২)
১৫ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
ইফতারে কোন মুসলিম দেশে কী খাওয়া হয়? (১)
১৪ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার)












