গোল্ডেন রাইস বহুজাতিক কোম্পানির এগ্রিবিজনেসের নতুন হাতিয়ার
, ০৬ ছফর শরীফ, ১৪৪৮ হিজরী সন, ২২ ছানী, ১৩৯৪ শামসী সন , ২১ জুলাই, ২০২৬ খ্রি:, ০৬ শ্রাবণ, ১৪৩৩ ফসলী সন, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) বিশেষ প্রতিবেদন
বাংলাদেশে বহুজাতিক এগ্রো কর্পোরেশনের বীজ রাজনীতির নতুন সংযোজন জেনেটিক্যালী মডিফাইড (জিএম) ধান গোল্ডেন রাইস। গোল্ডেন রাইস প্রকল্পের সাথে জড়িত মূলত আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইন্সটিটিউ (ওজজও), বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইন্সটিটিউট, ব্রি (ইজজও) এবং মার্কিন সংস্থা বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন। ভুট্টা অথবা ড্যাফোডিল ফুল থেকে নেয়া ‘ফাইটোন সিনথেজ’ জিন এবং মাটির এক ধরণের ব্যাকটেরিয়া থেকে নেয়া ‘ক্যারোটিন ডিস্যাচুরেজ’ জিন ধানের জিনোমে প্রবেশ করিয়ে এই গোল্ডেন রাইস প্রস্তুত করা হয়। এই দুইটি জিন ধানের এন্ডোস্পার্মে বিটা ক্যারোটিন (ভিটামিন এ এর পূর্বের অবস্থা) তৈরিতে কাজ করে। বাংলাদেশে গোল্ডেন রাইস প্রবর্তনের জন্য বহুজাতিক কোম্পানি সিনজেনটা এবং বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইন্সটিটিউট এর মাঝে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর ভিত্তিতেই ব্রি বাংলাদেশের ব্রি-২৯ জাতের ধান সিনজেনটা কোম্পানিকে দিয়েছে জেনেটিক্যালি মডিফাই করার জন্য। সিনজেনটা ব্রি-২৯ জাতে উক্ত দুটি জিন ট্রান্সফার করে গোল্ডেন রাইস নামে বাজারজাত করার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
এই রাইস দিয়ে নাকি সাম্রাজ্যবাদী কোম্পানী বাংলাদেশ, ফিলিপাইনের রাতকানা রোগ সারাতে চায়! কোম্পানির ভাষ্যমতে এই রাইসে বিটা ক্যারোটিন উৎপাদনকারি জিন ট্রান্সফার করা হয়েছে, ফলে এই রাইস খেলেই অপুষ্টির শিকার গরিব মানুষ ‘ভিটামিন এ’র অভাব দূর করে রাতকানা থেকে রক্ষা পাবেন। কিন্তু কোম্পানির এই ভাষ্য এখনো বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমানিত হয়নি । ধান কেটে নেবার পর কতটা সময় এই পুষ্টি ধানে থাকে এবং রান্নার পরে কতখানি অবশিষ্ট থাকে তা নিয়ে অনেক সন্দেহ রয়েছে। রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যের কারনেই বিটা ক্যারোটিন সহজেই জারিত হয়। এই যৌগে অনেকগুলো কনজুগেটেড ডাবল বন্ডের কারনে তা আলো কিংবা অক্সিজেনের উপস্থিতিতে ভেঙ্গে যেতে পারে। ধান মাড়াইয়ের পর শুকিয়ে স্টোরেজ কন্ডিশনে রাখা হলে তা জারিত হয়ে যেতে পারে, ফলে ধানে ভিটামিন এ এর পরিমাণ অনেক লোয়ার লেভেলে চলে যাবে, অর্থাৎ তা রাতকানা রোগ সারাতে ব্যর্থ হবে। আবার বিটা ক্যারোটিন হাইড্রোফোবিক বলে শরীরে তার অভিশোষণের (অনংড়ৎঢ়ঃরড়হ) জন্য ডায়েটে পর্যাপ্ত পরিমাণ ফ্যাট দরকার, ফ্যাট ছাড়া এর অভিশোষণ হবে না মানে রক্তে পৌঁছাতে পারবে না।
২০০০ সালের ২৯ জুন মার্কিন কংগ্রেসে অনুষ্ঠিত এক গণশুনানিতে সিনজেনটা এবং এক ওয়ার্কশপে মনসান্তো কোম্পানি বলেছে তারা গোল্ডেন রাইসের ডেভেলপমেন্টের জন্য রয়ালিটি ফ্রি লাইসেন্স দিবে। এসব এগ্রো জায়ান্টরা কিন্তু গোল্ডেন রাইসের উপর তাদের মূল প্যাটেন্ট/ মেধাস্বত্ব দাবি পরিত্যাগ করে নাই বরং তারা শুধুমাত্র গোল্ডেন রাইসের আরও উন্নত জাত উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে পাবলিক সেক্টরের বিজ্ঞানিদের রয়ালিটি ফ্রি লাইসেন্স দিতে সম্মতি জ্ঞাপন করেছে। গোল্ডেন রাইস মূলত উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বহুজাতিক কোম্পানির এগ্রিবিজনেসের নতুন হাতিয়ার হিসেবেই কাজ করবে। এই রাইস মূলত মানবতাবাদের আড়ালে বহুজাতিক এগ্রো কর্পোরেশনের পাবলিক ইমেজ বৃদ্ধির বিজ্ঞাপনী কৌশল যা বীজ রাজনীতিকে বৈধতা দেয়ার অপচেষ্টা ছাড়া আর কিছুই নয়।
গোল্ডেন রাইস প্রবর্তনের জন্য বহুজাতিক কর্পোরেশনের আগ্রহের কারণ হচ্ছে বাংলাদেশের মত দেশগুলোতে রাতকানা দূর করার মত অবৈজ্ঞানিক প্রকল্পের মাধ্যমে কৃষিতে জিএম প্রযুক্তির একটা ভাল ইমেজ সৃষ্টি করা এবং এর উপর ভিত্তি করে এসব দেশের কৃষিতে অন্যান্য জিএম শস্য বীজের বাজারজাতকরণকে তরান্বিত করা। জিএম বিটি কটন, জিএম ভুট্টা এসব শস্যের বীজ মালিকানা কোম্পানির হওয়ায় চড়া দামে কৃষকদের বীজ কিনে নিতে হয় এবং এসব খাদ্যের জন্য কোম্পানির উপর নির্ভরশীলতা তৈরি হওয়ায় দেশে দেশে সিভিল সোসাইটি এবং কৃষকদের মাঝে এই বীজ আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে।
বহুজাতিক কোম্পানি এখন চাচ্ছে জিএম গোল্ডেন রাইসের রয়ালিটি ফ্রি লাইসেন্স দিয়ে মানবতাবাদের আড়ালে উন্নয়নশীল/ অনুন্নত দেশের কৃষক ও সুশীল সমাজের মাঝে জিএম বীজের প্রতি আস্থা সৃষ্টি করতে। ফলে কোম্পানির এই কৌশলী মানবতাবাদী প্রকল্পকে মহতী মনে করার কোন কারণ দেখি না।
বীজ নিরাপত্তা, খাদ্য নিরাপত্তা, বীজের মালিকানা এসব প্রশ্ন বাদ দিয়ে জিএম প্রযুক্তির নির্বিচার প্রয়োগ আমাদের কৃষিতে বহুজাতিক কোম্পানির মনোপলি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করবে। এই গোল্ডেন রাইস বাজারজাত করা হলে বাংলাদেশ তার নিজস্ব ধান ব্রি-২৯ এর মালিকানা হারাবে। এমনিতেই বহুজাতিক কোম্পানির প্যাটেন্ট আগ্রাসনে বাংলাদেশ প্রচুর ধানের জাতের মালিকানা হারিয়েছে। এখন আবার দেশের জনপ্রিয় ধান ব্রি-২৯ জাতের প্যাটেন্ট কোম্পানির করায়ত্তে চলে গেলে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা এবং খাদ্য সার্বভৌমত্ব আরও বেশি হুমকির মুখে পড়বে।
-মুহম্মদ হাসান আল মারূফ।
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
৫০ লক্ষাধিক সেনাসদস্যের প্রস্তাবিত স্ট্র্যাটেজিক রিজার্ভ এবং ক্লোজ কোয়ার্টার কমব্যাট প্রশিক্ষণ (পর্ব১৫)
২০ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
পবিত্র হাদীছ শরীফে ইরশাদ হয়েছে, “যার সাথে মহব্বত, পরকালে তার হাশর-নশর তার সাথেই হবে।” (সহীহ বুখারী, হাদীছ নং- ৬১৬৯)
১৮ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
চিকিৎসা সক্ষমতা এবং কৌশলগত অংশীদারিত্বের সমীকরণ (পর্ব ১৪)
১৬ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
৫০ লক্ষাধিক বাহিনীর পার্সোনাল ট্যাকটিক্যাল ও সারভাইভাল লজিস্টিকসের কৌশলগত হিসাব (পর্ব ১৩ : ২য় অংশ)
১৫ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
৫০ লক্ষাধিক বাহিনীর পার্সোনাল ট্যাকটিক্যাল ও সারভাইভাল লজিস্টিকসের কৌশলগত হিসাব (পর্ব ১৩ : ১ম অংশ)
১৪ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
মুসলিম যোদ্ধাদের মস্তক ছিন্ন করে বাক্স বন্দী করে “যুদ্ধের ট্রফি” হিসেবে নিয়ে যেতো প্যারিসে (২)
০৮ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
দেশবাসীকে কর মুক্ত এবং মূল্যস্ফীতি মুক্ত বাজেট তথা শায়েস্তাখাঁর আমলের মত সস্তা দ্রব্য মূল্যের বাজেট এমনিতেই উপহার দেয়া যাবে ইনশাআল্লাহ
০৫ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
ব্রেন টিউমারের ঝুঁকি বেশি কাদের?
০৫ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
প্রয়োজন শরয়ী সর্বোচ্চ শাস্তি
০৪ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
শাহিদুন্ নবী ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম
২৮ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
হযরত উম্মাহাতুল মু’মিনীন আলাইহিন্নাস সালাম উনারা বেমেছাল মর্যাদার অধিকারী (২০৩)
২৮ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
ভারতীয় পানি আগ্রাসন, ফারাক্কা ও তিস্তা ব্যারেজ : বাংলাদেশের মরণ ফাঁদ (২)
২৪ আগস্ট, ২০২৪ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার)












