মন্তব্য কলাম
কোনো ধরনের জনমত বা বিশেষজ্ঞের মতামত গ্রহণ ছাড়াই অন্তর্বর্তী সরকার জ্বালানি-বিদ্যুৎ খাতের খসড়া মহাপরিকল্পনা প্রনয়ন ও বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে। ২০৫০ সালে বিদ্যুতের প্রাক্কলন করা হয়েছে ৬০ হাজার মেগাওয়াট। অথচ অভিজ্ঞমহল তথ্য-উপাত্ত দিয়ে দেখিয়েছিলেন এর অর্ধেক, অর্থাৎ ৩০ হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ দরকার হবে না। পর্যবেক্ষকমহল প্রশ্ন রেখে বলেন, কেন এ রকম একটি মহাপরিকল্পনার মিশন-ভিশনে যথাযথভাবে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রতিফলন নেই?
, ২৯ রজবুল হারাম শরীফ, ১৪৪৭ হিজরী সন, ২১ ছামিন, ১৩৯৩ শামসী সন , ১৯ জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রি:, ০৫ মাঘ, ১৪৩২ ফসলী সন, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) মন্তব্য কলাম
অন্তর্বর্তী সরকারের ২৫ বছর মেয়াদী জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মহাপরিকল্পনার (ইপিএসএমপি ২০২৫) বিরুদ্ধে তীব্র আপত্তি জানিয়েছে নাগরিক সমাজের বিভিন্ন সংগঠন।
অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব ছিল নিয়মিত রাষ্ট্র পরিচালনা নিশ্চিত করা। কিন্তু সেই সীমা অতিক্রম করে একটি দীর্ঘমেয়াদি, বহুমাত্রিক ও উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ জ্বালানি পরিকল্পনা প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
২০৫০ সাল পর্যন্ত এলএনজি, কয়লা ও তেলের ওপর প্রায় ৫০ শতাংশ নির্ভরতা বজায় রাখার কথা বলা হয়েছে। এতে ওই সময় পর্যন্ত প্রায় ১৯২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের জ্বালানি আমদানির চাপ তৈরি হবে, যা অর্থনীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য বড় ঝুঁকি।
বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী সরকারকে চাপের মুখে রাখছে। কিছু ক্ষেত্রে সরকার তাদের কাছে নতি স্বীকার করছে।
বিশেষ করে জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আসন্ন বাণিজ্যিক চুক্তিগুলোতে জ্বালানি খাতে বড় ধরনের ছাড় দেয়ার বা বিশেষ প্রতিশ্রুতি দেয়ার প্রবনতা দেখা যাচ্ছে। যা সংবিধানের চরম খেলাফ ও জনগণের সাথে কঠিন প্রতারনা এবং দেশকে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মত বিদেশীদের হাতে তুলে দেয়া
জাতীয় নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত ইপিএসএমপি প্রণয়ন কার্যক্রম স্থগিত চায় সচেতন দেশবাসী। ইনশাআল্লাহ জনগণের তত্ত্বাবধানেই একটি নতুন, স্বচ্ছ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত মহাপরিকল্পনা চূড়ান্ত করেছে বিদ্যুৎ, জ¦ালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়। ২০২৬ থেকে ২০৫০ পর্যন্ত তিন ধাপে এ পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হবে। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে দুই খাতে আগামী ২৫ বছরে ১৯২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার খরচ হতে পারে।
গত বুধবার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় এক সভায় প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে এ মহাপরিকল্পনা করেছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়।
সভায় আগের তিনটি মহাপরিকল্পনার নীতিগত পার্থক্যগুলো চিহ্নিত করে তা সংক্ষেপে পর্যালোচনা হয়। নতুন মহাপরিকল্পনা তিন ধাপে (প্রথম ধাপ ২০২৬-৩০, দ্বিতীয় ধাপ ২০৩০-৪০ ও তৃতীয় ধাপ ২০৪০-৫০ সাল) বাস্তবায়নের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। এর মধ্যে ২০২৬ থেকে ২০৩০-এর মধ্যে র্ফাস্ট ট্র্যাক প্রায়োরিটি প্রজেক্টস পরিকল্পনায় অফশোর অনুসন্ধান, গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধি, এলএনজি সরবরাহ নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, রিফাইনারি সক্ষমতা সম্প্রসারণ, কৌশলগত জ্বালানি মজুদ সক্ষমতা সম্প্রসারণের কাজ হবে। দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত প্রকল্পে অফশোর গ্যাস উন্নয়ন, বৃহৎ পরিসরে রিফাইনিং ও পেট্রোকেমিক্যাল শিল্প সম্প্রসারণ, হাইড্রোজেন ও অ্যামোনিয়া অবকাঠামো উন্নয়ন, ভূ-তাপীয় (জিওথার্মাল) শক্তি উন্নয়ন এবং জোয়ার-ভাটা ও সমুদ্র তরঙ্গভিত্তিক শক্তি উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৬-৫০ মেয়াদে জ্বালানি খাতে ৭০-৮৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং বিদ্যুৎ খাতে ১০৭.২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে।
প্রসঙ্গত, দৈনিক আল ইহসানের অনুসন্ধানে জানা গেছে, কোনো ধরনের জনমত বা বিশেষজ্ঞের মতামত গ্রহণ ছাড়াই অন্তর্বর্তী সরকার জ্বালানি-বিদ্যুৎ খাতের খসড়া মহাপরিকল্পনা প্রনয়ন ও বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে। মহাপরিকল্পনায় বিদ্যুতের চাহিদা অত্যধিক দেখানো হয়েছে। নেপাল ও ভুটান থেকে সাশ্রয়ীমূল্যে বিদ্যুৎ আনার সুযোগ পুরোপুরি উপেক্ষা করা হয়েছে। এমন অভিযোগ তুলেছে পর্যবেক্ষকমহল। বিশেষ কোনো দেশের স্বার্থে তড়িঘড়ি করে অন্তর্বর্তী সরকার জ্বালানি-বিদ্যুৎ খাতের খসড়া মহাপরিকল্পনা প্রস্তুত করেছে কি না সেই প্রশ্নও তুলেছে পর্যবেক্ষকমহল।
আরো জানা গেছে, খসড়া মহাপরিকল্পনায় ২০৫০ সালে বিদ্যুতের প্রাক্কলন করা হয়েছে ৬০ হাজার মেগাওয়াট। অথচ অভিজ্ঞমহল তথ্য-উপাত্ত দিয়ে দেখিয়েছিলেন এর অর্ধেক, অর্থাৎ ৩০ হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ দরকার হবে না। খসড়া মহাপরিকল্পনায় এলএনজি অবকাঠামোকে বিপুল বিনিয়োগের জন্য সামনে নিয়ে আসা হয়েছে। বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত জ্বালানির মধ্যে ৪৫ শতাংশ আসে প্রাকৃতিক গ্যাস ও এলএনজি থেকে, যা ২০৫০ সালের মধ্যে ২৯ শতাংশে নেমে আসবে।
তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বর্তমানে ১৭ শতাংশ, যা ২০৫০ সালের মধ্যে মাত্র ১ শতাংশে নামানো হবে। সরকার একটি ২৪ হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা করছে। পাশাপাশি ২০৫০ সালের মধ্যে সৌর বা সোলার বিদ্যুতের উৎপাদন লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৩২ গিগাওয়াট।
তবে মহাপরিকল্পনায় দেখা যায়, ২০৪০ সালের আগে সৌরবিদ্যুৎ নিয়ে বড় কোনো প্রকল্প বা উদ্যোগ নেই। নতুন মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য ২০৫০ সালের মধ্যে জ্বালানি খাতে প্রায় ৭০ থেকে ৮৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে।
বিদ্যুৎ খাতে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ ধরা হয়েছে ১০৭ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার। এদিকে নেপাল ও ভুটান থেকে সাশ্রয়ী মূল্যে বিদ্যুৎ আনার সুযোগ পুরোপুরি উপেক্ষা করা হয়েছে। সঞ্চালন ও বিতরণব্যবস্থার আধুনিকায়নও খসড়া পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত হয়নি।
আরো জানা গেছে, আগের মহাপরিকল্পনায় এলএনজি অবকাঠামো নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার। এখন খসড়া মহাপরিকল্পনায় ধরা হয়েছে ২৭ বিলিয়ন ডলার। এ ধরনের প্ল্যান বা পলিসি শুধু অর্থনৈতিক ডকুমেন্ট নয়। এটা এক ধরনের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ডকুমেন্ট। কারণ, অনেক জায়গায় সরকারকে সমঝোতা করতে হয়, ছাড় দিতে হয়। কিন্তু বৃহত্তর যে লক্ষ্য, সে জায়গা থেকে সরকার সাধারণত পিছপা হন না। কিন্তু এই ডকুমেন্ট (খসড়া মহাপরিকল্পনা) দেখে সিপিডি মনে করছে, এটার পেছনে প্রেশার গ্রুপগুলোর প্রেশার রয়েছে। এখানে অন্তর্বর্তী সরকার কোনো কোনো জায়গায় ছাড় দিয়েছে বা নতজানু হয়েছে।
অভিজ্ঞমহল বলেন, একটি উন্মুক্ত পরিবেশে, যেখানে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া গবেষণামূলক হওয়ার কথা, যেখানে দীর্ঘমেয়াদি দেশের লক্ষ্যের সঙ্গে তা সাযুজ্যপূর্ণ হওয়ার কথা, যেখানে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার সম্পৃক্ত হওয়ার কথা। কিন্তু কোনো ধরনের আলাপ-আলোচনা ছাড়া, কোনো ধরনের বিশেষজ্ঞ পরামর্শ ছাড়া মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে এ ধরনের একটি কাজ (খসড়া মহাপরিকল্পনা প্রস্তুত) গোপনে শেষ করার বিষয়টি আগের সরকারের আচরণকে মনে করিয়ে দেয়। অভিজ্ঞমহল বলেন, ‘এই মুহূর্তে বিভিন্ন ধরনের যে সংকট চলছে, সেই সংকট সমাধানের বিষয়গুলোও যে বিবেচনায় নেওয়ার কথা এই খসড়া প্রণয়নে তার খুবই ম্রিয়মাণ উপস্থিতি বা বলতে গেলে সেগুলো আসলে এক অর্থে অনুপস্থিত।
অভিজ্ঞমহল বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের মহাপরিকল্পনার যে খসড়া, তা ত্রুটিপূর্ণ। যা অংশগ্রহণমূলক নয় এবং একটি বিশেষ গোষ্ঠীর স্বার্থ এখানে রক্ষা করা হচ্ছে। পর্যবেক্ষকমহল প্রশ্ন রাখেন, কেন তাড়াহুড়া করে এই মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের উদ্যোগ, কেন এই তোড়জোড়?
কোনো দেশের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরের পূর্বশর্তের অংশ হিসেবে কি এ রকম কিছু করা হচ্ছে?’
পর্যবেক্ষকমহল প্রশ্ন রেখে বলেন, কেন এ রকম একটি মহাপরিকল্পনার মিশন-ভিশনে যথাযথভাবে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রতিফলন নেই?
কেন এখানে রিসোর্স অপটিমাইজেশনের নাম করে অভ্যন্তরীণ কয়লাকে ব্যবহার করার জন্য গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে?
কেন সোলারের নাম ব্যবহার করে সোলারের বাইরে অন্যান্য যে জ্বালানি আছে, যেগুলো কার্বন নির্গমন করে, সেগুলো সোলারের ভেতরে যুক্ত করা হয়েছে?
দৈনিক আল ইহসানের অনুসন্ধানে জানা গেছে, যে শিগগির দুটি বড় চুক্তি করতে যাচ্ছে সরকার। ৬ ফেব্রুয়ারি জাপানের সঙ্গে ইকোনমিক পার্টনারশিপ অ্যাগ্রিমেন্ট চুক্তি হতে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একই ধরনের চুক্তি স্বাক্ষর হওয়ার কথা।
উভয় দেশ থেকে জ্বালানি বিষয়ে একটা বড় ধরনের অঙ্গীকার চাওয়া হয়েছে বলে ইঙ্গিত আছে। সুতরাং এই ডকুমেন্ট (খসড়া মহাপরিকল্পনা) তৈরির ক্ষেত্রে এসব দেশের বা চুক্তিগুলোর একটি প্রভাব থাকা অমূলক নয়।
অন্তর্বর্তী সরকারের ২৫ বছর মেয়াদী জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মহাপরিকল্পনার (ইপিএসএমপি ২০২৫) বিরুদ্ধে তীব্র আপত্তি জানিয়েছে নাগরিক সমাজের বিভিন্ন সংগঠন।
গতকাল রোববার রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে খসড়া জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মহাপরিকল্পনা (২০২৬-২০৫০) অবিলম্বে স্থগিত ও সম্পূর্ণ বাতিলের দাবি জানানো হয়।
বক্তারা বলেন, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও স্বচ্ছতা উপেক্ষা করে এবং জনগণের অংশগ্রহণ ছাড়াই দীর্ঘমেয়াদি ও উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এই পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে, যা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করবে।
বাংলাদেশের প্রতিবেশ ও উন্নয়ন কর্মজোটের (বিডব্লিউজিইডি) উদ্যোগে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সহ-আয়োজক ছিল উপকূলীয় জীবনযাত্রা ও পরিবেশ কর্মজোট (ক্লিন), আমরাই আগামী, বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা), সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড পার্টিসিপেটরি রিসার্চ (সিইপিআর), ইথিক্যাল ট্রেডিং ইনিশিয়েটিভ বাংলাদেশ (ইটিআই বাংলাদেশ), জেট-নেট বিডি, লয়ার্স ফর এনার্জি, এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (লিড), মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন (এমজেএফ), রি-গ্লোবাল, সৌহার্দ ইয়ুথ ফাউন্ডেশন, সেইফটি অ্যান্ড রাইটস (এসআরএস), ওয়াটারকিপার্স এবং শ্রমিক-নেতৃত্বাধীন ক্লাইমেট অ্যাকশন নেটওয়ার্ক (ওয়ার্কার ক্যান)।
অভিজ্ঞমহল বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব ছিল নিয়মিত রাষ্ট্র পরিচালনা নিশ্চিত করা। কিন্তু সেই সীমা অতিক্রম করে একটি দীর্ঘমেয়াদি, বহুমাত্রিক ও উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ জ্বালানি পরিকল্পনা প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
উচ্চ আদালতের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও কোনো অর্থবহ অংশগ্রহণমূলক পরামর্শ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি বলেও অভিযোগ করেন তার।
অতীতে দ্রুত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন ব্যবহার করে যেভাবে বিতর্কিত প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল, ইপিএসএমপি ২০২৫ সেই একই পথে ভবিষ্যতেও জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর প্রকল্পকে বৈধতা দেওয়ার কাঠামো তৈরি করছে।
পর্যবেক্ষকমহলের মতে, দেশের বিদ্যুতের প্রকৃত চাহিদা ৪০ হাজার মেগাওয়াটের বেশি হওয়ার কথা নয়, অথচ পরিকল্পনায় তা অযৌক্তিকভাবে বাড়িয়ে দেখানো হয়েছে। এতে ভবিষ্যতে অপ্রয়োজনীয় উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি হবে এবং জনগণকে ক্যাপাসিটি চার্জসহ বাড়তি আর্থিক বোঝা বহন করতে হবে।
অভিজ্ঞমহল আরো মন্তব্য করেন, মহাপরিকল্পনায় ‘এনার্জি ট্রানজিশন’-এর কথা বলা হলেও বাস্তবে প্রকৃত নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ মাত্র ১৭ শতাংশ, যেখানে কাগজে দেখানো হয়েছে ৪৪ শতাংশ।
পরিকল্পনায় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা ১৫ দশমিক ৮ গিগাওয়াট থেকে বাড়িয়ে ২৫ দশমিক ২ গিগাওয়াট করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
পাশাপাশি ২০৫০ সাল পর্যন্ত এলএনজি, কয়লা ও তেলের ওপর প্রায় ৫০ শতাংশ নির্ভরতা বজায় রাখার কথা বলা হয়েছে। এতে ওই সময় পর্যন্ত প্রায় ১৯২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের জ্বালানি আমদানির চাপ তৈরি হবে, যা অর্থনীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য বড় ঝুঁকি।
নির্বাচনের ঠিক আগ মুহূর্তে নাগরিক সমাজকে উপেক্ষা করে আবারও আইইপিএমপি ২০২৩-এর মতো একটি বিতর্কিত মহাপরিকল্পনা আনার উদ্যোগ হতাশাজনক। ইথিক্যাল ট্রেডিং ইনিশিয়েটিভ বাংলাদেশের পরিচালক (প্রোগ্রাম এভিডেন্স অ্যান্ড লার্নিং) বলেন, এটি এগিয়ে গেলে রপ্তানি খাত গুরুতর ঝুঁকির মুখে পড়বে।
অভিজ্ঞমহল বলেন, ‘যেকোনো সরকারি নীতি বা পরিকল্পনা শুধু একটি অর্থনৈতিক বিষয় নয়, বরং এটি একটি রাজনৈতিক ও সামাজিক চুক্তি। বর্তমানে দেখা যাচ্ছে, বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী সরকারকে চাপের মুখে রাখছে। কিছু ক্ষেত্রে সরকার তাদের কাছে নতি স্বীকার করছে। বিশেষ করে জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আসন্ন বাণিজ্যিক চুক্তিগুলোতে জ্বালানি খাতে বড় ধরনের ছাড় দেয়ার বা বিশেষ প্রতিশ্রুতি দেয়ার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে।’
দশককাল ধরে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত নিয়ে কাজ করছে সিপিডি। বর্তমান প্রেক্ষাপটে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের মহাপরিকল্পনার খসড়া দাঁড়িয়ে গেছে, অথচ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো জানে না। এটা তাদের জন্য একধরনের বিব্রতকর পরিস্থিতি।
তারা জানায়, ‘তাড়াহুড়া করে কোনো ধরনের আলাপ-আলোচনা ছাড়া, কোনো বিশেষজ্ঞ পরামর্শ ছাড়া মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে এ ধরনের একটা কাজ গোপনে শেষ করা আগের সরকারের মতোই আচরণ।’
অভিজ্ঞমহল বলেন, ‘তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের অবকাঠামো একবার তৈরি হয়ে গেলে তা পরবর্তী ৫০-৬০ বছর ধরে ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা তৈরি করে, যা দেশকে একটি দুষ্ট চক্রে ফেলে দেয়। এর ফলে অভ্যন্তরীণ উৎসের বদলে বারবার গ্যাস আমদানির প্রয়োজন হয়। ২০১৭ সালের দিকে বিশেষ গোষ্ঠীর চাপে দেশের অভ্যন্তরে গ্যাস অনুসন্ধানের কাজ প্রায় বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল, যা জাতীয় স্বার্থের চরম পরিপন্থী ছিল।’
অভিজ্ঞমহল বলেন, ‘বিদ্যুৎ খাতে উৎপাদন সক্ষমতার জন্য ব্যয় দিন দিন বাড়ছে, যা সাধারণ মানুষের কাছে বিক্রয়মূল্যের চেয়েও অনেক বেশি। ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানির ক্ষেত্রে ভূরাজনৈতিক বিষয়গুলো জড়িয়ে আছে। এমনকি নেপাল থেকে বিদ্যুৎ আনতে হলেও প্রতিবেশী দেশের ওপর নির্ভর করতে হয়। দেশের ভেতরে গ্যাস উৎপাদন ক্রমান্বয়ে কমছে। একই সঙ্গে গভীর সমুদ্রে গ্যাস পেতে প্রায় ১০-১২ বছর লাগবে, যা জাতীয় অর্থনীতির জন্য দুশ্চিন্তার বিষয়।’
অভিজ্ঞমহল বলেন, ‘খসড়া পরিকল্পনায় প্রায় ৬০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার প্রয়োজন দেখানো হয়েছে। এ বিপুল বিদ্যুৎ আসলে কে ব্যবহার করবে? সিপিডির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০৪০ সাল পর্যন্ত দেশের চাহিদা পূরণে এর অর্ধেক সক্ষমতাই যথেষ্ট হতে পারে।’ অতিরিক্ত সক্ষমতা ধরে পরিকল্পনা করলে বিদ্যুৎ খাতে উদ্বৃত্ত উৎপাদন আরো বাড়বে এবং আর্থিক চাপ গভীর হবে বলেও সতর্ক করেন তিনি।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির পরামর্শ দিয়ে অভিজ্ঞমহল বলেন, ‘বর্তমানে বাড়ির ছাদে সৌর প্যানেল স্থাপন ও শিল্প-কারখানায় সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার বৃদ্ধির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। দেশের স্বার্থে অর্থনৈতিক বিষয়গুলোকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রেখে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন।’
অভিজ্ঞমহল বলেন, ‘জাতীয় গ্রিড উন্নয়নে পরিকল্পনাটি অত্যন্ত দুর্বল। স্মার্ট গ্রিড বাস্তবায়ন ২০৪০ সাল পর্যন্ত পিছিয়ে দেয়া হয়েছে। অথচ বর্তমান গ্রিড ২০ শতাংশের বেশি পরিবর্তনশীল নবায়নযোগ্য জ্বালানি গ্রহণে সক্ষম নয়। খসড়ায় কয়লা ও এলএনজি-নির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদনে নতুন করে ঝোঁক দেখা যাচ্ছে। এতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ৬ দশমিক ৮ থেকে বাড়িয়ে ১২ দশমিক ৯ গিগাওয়াট করার প্রস্তাব রয়েছে। নতুন এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এগুলো অত্যন্ত ব্যয়বহুল বিনিয়োগ, যা দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তাকে দুর্বল করব।’
জ্বালানি মহাপরিকল্পনার প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে নতুন কোনো কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র অনুমোদন না দিতে সুপারিশ করেছে অভিজ্ঞমহল। তারা বলেন, বিদ্যমান কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র ধাপে ধাপে বন্ধের সময়সূচি নির্ধারণ করা উচিত। নতুন এলএনজি প্রকল্প বাতিল ও দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি।
অভিজ্ঞমহল জাতীয় নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত ইপিএসএমপি প্রণয়ন কার্যক্রম স্থগিত রাখা উচিত। ইনশাআল্লাহ জনগণের তত্ত্বাবধানেই একটি নতুন, স্বচ্ছ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন।
-আল্লামা মুহম্মদ ওয়ালীউর রহমান আরিফ।
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গোপনীয় বাণিজ্য চুক্তি: জনগণের অজান্তে জিএমও খাদ্য অর্থাৎ বিষ ও রোগ জীবাণু ঢোকানোর ষড়যন্ত্র
১৪ মে, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
“সর্বশক্তিমান আল্লাহ পাক উনার প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস” ব্যক্ত করার সরকারকে অবিলম্বে কুরআন শরীফে হারাম ঘোষিত শুকরের গোশত আমদানীর বাণিজ্য চুক্তি বাতিল করতে হবে ইনশাআল্লাহ।
১৩ মে, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
দেশি আম বাজারে আসার আগেই শুরু হয়েছে কথিত কেমিক্যাল অপপ্রচার : দেশীয় ফলের বিরুদ্ধে বিদেশী দালাল চক্রের এই অপপ্রচার রুখতে হবে।
১২ মে, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
‘ইউনিসেফ’ এর ভয়ংকর তৎপরতা। বাংলাদেশের শিশু ও শিক্ষার্থীদের পশ্চিমা দাস বানানোর প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে ইউনিসেফ। (১)
১২ মে, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
উচ্চ আদালতে ‘ডেড ল’ বা অকার্যকর ঘোষিত ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধি ১৯০০’ পুণঃবহালের অপচেষ্ঠা চলছে। উচ্চ আদালত, সেনাবাহিনী এবং সরকারের উচিত দেশবিরোধী এই চক্রান্ত ষড়যন্ত্র রুখে দেওয়া। (৩)
১১ মে, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
৭১ এ তারা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিলো ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরোধীতার নামে। তবে তারা ২০২৬- এ আমেরিকার আধিপত্যবাদী বাণিজ্য চুক্তির বিরোধিতায় নামছে না কেন?
১১ মে, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
মৃত আইন- “পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধি-১৯০০”: অখ-তার পথে এক ঔপনিবেশিক কাঁটা
১০ মে, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
সাইয়্যিদুনা হযরত সুলত্বানুন নাছীর আলাইহিস সালাম উনার বরকতে- দেশের বুকে স্থলে, নদীতে, পাহাড়ে, কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে, বঙ্গোপসাগরে রয়েছে বিপুল পরিমাণ মহামূল্যবান ইউরেনিয়াম। বাংলাদেশের ইউরেনিয়াম অনেক বেশী গুণগত মান সম্পন্ন ভারতসহ দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্রের কারণেই তা উত্তোলন হচ্ছে না। হিন্দুস্থান টাইমস ও কুখ্যাত প্রথম আলো তথা ভারত আমেরিকার কুচক্রীরা একযোগে ষড়যন্ত্র করছে। জনগণকে জনসচেতন হতে হবে ইনশাআল্লাহ। (৩য় পর্ব)
০৯ মে, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
প্রধানমন্ত্রীকে সাবধান থাকতে হবে- তার মন্ত্রী বা উপদেষ্টাদের দ্বারা যেনো দেশের ভাবমর্যাদা নষ্ট না হয়! বি.এন.পি ক্ষমতায় আসলেই দেশ, সন্ত্রাসবাদের ঝুকিতে পড়ে এই ধরণের প্রচারণার জন্য তথ্য উপদেষ্টার, ‘দেশে সন্ত্রাসবাদ আছে’- এই মিথ্যা উক্তিই কী যথেষ্ট নয়?
০৯ মে, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
আত্মঘাতী ঋণের কঠিন শর্তের বেড়াজালে আটকে যাচ্ছে সরকার। দেশবাসী কেনো নির্বিকার?
০৮ মে, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
পূর্ব তিমুর কেনো মুসলমানদের হারানো ভূমি? পূর্ব তিমুরের ঘটনা কী শিক্ষা দেয়। উপজাতিরা কেনো খ্রীস্টান হয়? উপজাতিরা কেনো মুসলমান হয় না? কেনো কঠিন হয়রানির মুখোমুখি হয়। স্বাধীন জুমল্যান্ড তথা খ্রীস্টান রাজ্য বানানোর বিপরীতে ৯৮ ভাগ জনগোষ্ঠী মুসলমানকে গর্জে উঠতে হবে ইনশাআল্লাহ।
০৭ মে, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
ইউনুসের দেশদ্রোহীতার বয়ান : এক সাংবাদিকের জবানবন্দি (৩)
০৬ মে, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার)












