মন্তব্য কলাম
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গোপনীয় বাণিজ্য চুক্তি: জনগণের অজান্তে জিএমও খাদ্য অর্থাৎ বিষ ও রোগ জীবাণু ঢোকানোর ষড়যন্ত্র
, ১৪ মে, ২০২৬ ১২:০০:০০ এএম ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) মন্তব্য কলাম
বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্পাদিত গোপনীয় বাণিজ্য চুক্তির কিছু ধারা প্রকাশ্যে আসার পর উদ্বেগ ও প্রশ্ন ক্রমেই বাড়ছে। বিশেষ করে চুক্তির “কৃষিপ্রযুক্তিপণ্য”অংশে আর্টিকেল ১.৬, অ্যানেক্স ৩-এ বলা হয়েছে- চুক্তি স্বাক্ষরের ২৪ মাসের মধ্যে বাংলাদেশকে এমন নীতিমালা তৈরি করতে হবে, যাতে যুক্তরাষ্ট্রে নিরাপদ হিসেবে স্বীকৃত বায়োটেকনোলজি বা জৈবপ্রযুক্তিপণ্য বাংলাদেশে বিনা পরীক্ষা ও বাড়তি কোনো লেবেলিং ছাড়াই প্রবেশ করতে পারে। অর্থাৎ, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে জিএমও (এবহবঃরপধষষু গড়ফরভরবফ ঙৎমধহরংস) খাদ্যপণ্য পাঠাবে, কিন্তু বাংলাদেশে সেই পণ্যের গায়ে জিএমও হিসেবে কোনো লেবেল লাগানো যাবে না। একজন ভোক্তা জানতেই পারবেন না তিনি কী খাচ্ছেন।
এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন- যে যুক্তরাষ্ট্র নিজ দেশে জিএমও খাদ্যে বাধ্যতামূলক লেবেলিং চালু রেখেছে, তারা কেন বাংলাদেশে লেবেলবিহীন জিএমও খাদ্য প্রবেশের শর্ত চাপিয়ে দিল?
যুক্তরাষ্ট্রে ঘধঃরড়হধষ ইরড়বহমরহববৎবফ ঋড়ড়ফ উরংপষড়ংঁৎব ঝঃধহফধৎফ (ঘইঋউঝ) নামে একটি ফেডারেল আইন রয়েছে। ২০১৬ সালে প্রণীত এবং ২০১৮ সালে টহরঃবফ ঝঃধঃবং উবঢ়ধৎঃসবহঃ ড়ভ অমৎরপঁষঃঁৎব (টঝউঅ) -এর অধীনে চূড়ান্ত হওয়া এই আইনের মাধ্যমে খাদ্যে জেনেটিকালি পরিবর্তিত উপাদান থাকলে তা ইরড়বহমরহববৎবফ (ইঊ) হিসেবে উল্লেখ করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। অর্থাৎ, মার্কিন ভোক্তাকে জানানো হয়- খাদ্যটি জিএমও কি না। এরপর সিদ্ধান্ত নেন ভোক্তাই- তিনি সেটি খাবেন, নাকি বর্জন করবেন।
কিন্তু বাংলাদেশের জনগণের ক্ষেত্রে কেন সেই অধিকার থাকবে না?
একজন বাংলাদেশি ভোক্তার কি জানার অধিকার নেই যে তিনি যে খাবার কিনছেন, সেটি জেনেটিকালি পরিবর্তিত কি না? তথ্য গোপন রেখে খাদ্য বাজারজাত করার অধিকার কোনো রাষ্ট্র বা বহুজাতিক করপোরেশনের থাকতে পারে না।
বিশ^জুড়ে জিএমও খাদ্য ও ফসল নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে। স্বাস্থ্যঝুঁকি, পরিবেশগত প্রভাব এবং জীববৈচিত্র্যের ওপর সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাবের আশঙ্কায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের অনেক দেশ- যেমন ফ্রান্স, জার্মানি ও অস্ট্রিয়া- জিএমও চাষ বা ব্যবহারে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। এছাড়া রাশিয়া, তুরস্ক, পেরু, জিম্বাবুয়ে, আলজেরিয়া এবং ভেনিজুয়েলার মতো দেশও জিএমও ফসল চাষ বা আমদানির ওপর আংশিক কিংবা পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। অর্থাৎ বিশে^র বহু দেশ যেখানে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে, সেখানে বাংলাদেশকে উল্টো কোনো ধরনের লেবেলিং ছাড়াই জিএমও খাদ্য গ্রহণে বাধ্য করা হচ্ছে।
জিএমও খাদ্য নিয়ে উদ্বেগের আরেকটি বড় কারণ সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি। বিভিন্ন গবেষণা ও সমালোচনায় বলা হয়েছে, জিএম ফুডে ব্যবহৃত অতিরিক্ত জিন মানুষের হজমতন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। বিশেষ করে এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধী জিন ব্যবহারের ফলে শরীরের উপকারী ব্যাকটেরিয়া ও রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিভিন্ন গবেষণায় প্রজননক্ষমতা হ্রাস, শিশুর জন্মগত ত্রুটি, কিডনি ও যকৃতের সমস্যা, এমনকি ক্যান্সারের ঝুঁকি বৃদ্ধির কথাও উঠে এসেছে। কিছু গবেষকের দাবি, জিএম খাদ্যে সংযোজিত ভিন্ন জীবের জিন মানবদেহে পুরোপুরি হজম না হয়ে দীর্ঘমেয়াদে জটিল জৈবিক প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে। এত বড় স্বাস্থ্যঝুঁকির আশঙ্কা থাকা সত্ত্বেও জনগণকে না জানিয়ে জিএমও খাদ্য বাজারে ঢুকতে দেয়া কোনোভাবেই দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত হতে পারে না।
এই চুক্তির সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো- এটি শুধু খাদ্য আমদানির বিষয় নয়; এটি বাংলাদেশের নীতিনির্ধারণী স্বাধীনতার ওপরও চাপ সৃষ্টি করছে। একটি বিদেশি রাষ্ট্র তার নিজস্ব বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষার জন্য বাংলাদেশের আইন ও নীতিমালা পরিবর্তনের শর্ত দিয়েছে, আর বাংলাদেশ সেই শর্ত মেনে নিয়েছে। এটি কার্যত নীতিগত গোলামির শামিল।
দেখা যায়, দেশীয় খাদ্যে বা ফসলে ভেজাল বা রাসায়নিক নিয়ে প্রায় আতঙ্ক ছড়ানো হয়। এসব অজুহাতে প্রতি বছর হাজার হাজার টন দেশী খাদ্য বা ফল ধ্বংস করা হয়। কিন্তু আশ্চর্যজনক বিষয় হচ্ছে, বিদেশ থেকে কী খাদ্য আসছে, তার উপাদান কী, জনগণকে কী তথ্য দেওয়া হচ্ছে- এসব নিয়ে সবাই নিরব। যেন বিদেশি পণ্যের ক্ষেত্রে প্রশ্ন তোলা যাবে না। আর সেই নিরবতার মধ্য দিয়ে দেশে প্রবেশ করছে জিএমও’র মত ভয়ঙ্কর স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পন্ন খাদ্য যা বিষ।
মূল কথা, দেশের জনগণের অধিকার, খাদ্য নিরাপত্তা ও নীতিগত স্বাধীনতা ক্ষুণœ করে এমন শর্ত কখনই গ্রহণযোগ্য না। তাই সরকারের উচিত হবে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা যেকোনো গোপনীয় ও অসম বাণিজ্য চুক্তি থেকে সরে আসা বা বাতিল করা। সরকারকে ভুলে গেলে চলবে না, তাদের দায়িত্ব দ্বীন ইসলাম, দেশ ও জনগণের স্বার্থ রক্ষা করা, বিদেশি স্বার্থ রক্ষা করা নয়।
-মুহম্মদ আমিমুল ইসলাম।
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
বাংলাদেশের ভূ-কৌশলগত প্রতিরক্ষা কৌশলের জরুরি রূপরেখা (পর্ব-১)
০১ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
অন্তর্জালে আম্রিকার সাথে বাংলাদেশের গোপন সমঝোতা- নিয়ে তুমুল প্রতিবাদ ও সমালোচনা।
০১ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
প্রয়োজনীয় ৫০ লক্ষাধিক সদস্য সম্পন্ন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে ন্যানোটেকনোলজির কৌশলগত উপযোগিতা (পর্ব-১০)
৩০ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
মুসলমানদের সাথে রাশিয়ার মুনাফেকী নূতনভাবে প্রকাশ পাচ্ছে। মুসলিম বিশ্বের জাগরণ দরকার।
৩০ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
বাংলাদেশের ভূ-কৌশলগত প্রতিরক্ষা কৌশলের জরুরি রূপরেখা (পর্ব-২)
২৯ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
নওমুসলিমদের আইনি সুরক্ষা ও তথাকথিত ‘ডিটেনশন সেল’ উচ্ছেদের দাবি
২৯ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
৫০ লক্ষাধিক সেনাবাহিনীর জন্য বাংলাদেশের বাংকার নেটওয়ার্কের রূপরেখা (পর্ব ৯)
২৮ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
মালয়েশিয়া-বাংলাদেশ সম্পোর্কোন্নয়ন কেন শুধু দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ভিত্তিতে? অনন্য উচ্চতায় উঠা এ সম্পর্ক কেন ইসলামী মূল্যবোধ ও মুসলিম ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে উজ্জীবিত হবে না? (১ম পর্ব)
২৫ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
প্রতিরক্ষা আধুনিকায়ন ও কৌশলগত স্বনির্ভরতা: বাংলাদেশের ৫০ লক্ষ পদাতিক বাহিনীর জন্য ৩য় প্রজন্মের এটিজিএম রোডম্যাপ (পর্ব ৭)
২৫ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
বিশ্বে তৈরী পোশাক রফতানীতে প্রথম বাংলাদেশ কেনো তুলা আমদানীতেও প্রথম? নামে তুলা উন্নয়ন বোর্ড থাকলেও স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত তুলা চাষে কোনো উন্নয়নই নেই অপার সম্ভাবনা থাকলেও দেশে তুলা উৎপাদনে সরকারী কোনো তৎপরতা নেই অথচ ১৬৫০ থেকে ১৭৫০-এই ১০০ বছরে ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোই বাংলা থেকেই ৩ লাখ গজ থেকে ৩ কোটি গজ কাপড় রপ্তানি করেছে। এই বিপুল উৎপাদনে এই বাংলাদেশই কীভাবে তুলার যোগান দিল?
২৫ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
বিশ্বে তৈরী পোশাক রফতানীতে প্রথম বাংলাদেশ কেনো তুলা আমদানীতেও প্রথম? নামে তুলা উন্নয়ন বোর্ড থাকলেও স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত তুলা চাষে কোনো উন্নয়নই নেই অপার সম্ভাবনা থাকলেও দেশে তুলা উৎপাদনে সরকারী কোনো তৎপরতা নেই
২৩ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
দেশের ৪ কোটি মানুষ না খেয়ে থাকে। অথচ বছরে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকার শস্য নষ্ট হয় খাদ্য অপচয় রোধ করতে ‘নিশ্চয়ই অপব্যয়কারীরা শয়তানের ভাই’- পবিত্র কুরআন শরীফ উনার এই নির্দেশ সমাজের সর্বাত্মক প্রতিফলন ব্যতীত কোনো বিকল্প নেই।
২২ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার)












