ইন্দোনেশিয়ার গ্রিন ইসলাম বিপ্লব: প্রেক্ষাপট বাংলাদেশ
, ১৫ জুমাদাল ঊখরা শরীফ, ১৪৪৭ হিজরী সন, ০৮ সাবি’, ১৩৯৩ শামসী সন , ০৭ ডিসেম্বর, ২০২৫ খ্রি:, ২২ অগ্রহায়ণ, ১৪৩২ ফসলী সন, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) পাঁচ মিশালী
ইসলাম স্বভাবগতভাবেই পরিবেশবান্ধব, পরিবেশ রক্ষার প্রতি যতœশীল। তাই তো ইসলামের
দৃষ্টিতে পানি অপচয় করা, অহেতুক গাছ নষ্ট করা, বিনা কারণে পশুপাখির প্রতি নির্দয় আচরণ করা গর্হিত
কাজ। এমনকি যুদ্ধেও ফসল ধ্বংস করতে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এই সত্যকে সামনে নিয়ে পরিবেশ
রক্ষার আন্দোলনে নেমেছে ইন্দোনেশিয়া।
যার নাম তারা ঠিক করেছে ‘গ্রিন
ইসলাম’।
ইন্দোনেশিয়ায় গ্রিন ইসলামের
উত্থান:
ইন্দোনেশিয়া বহু বছর ধরে পরিবেশ
সংকটে জর্জরিত, বন উজাড়, পাম তেলের প্লানটেশন, পিটল্যান্ড আগুন, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ, নদীদূষণ-সব মিলিয়ে দেশটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার পরিবেশ
ঝুঁকির প্রধান ভুক্তভোগী। সরকারি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী গত ২০ বছরে ইন্দোনেশিয়া প্রায়
৯.৭ মিলিয়ন হেক্টর বন হারিয়েছে। অন্যদিকে ‘কার্বন মেজারমেন্ট ইনিশিয়েটিভ’-এর গবেষণায়
দেখা যায়, বিশ্বের মোট কার্বন নির্গমনের
প্রায় ৪ শতাংশ আসে এই অঞ্চল থেকে, মূলত বন পোড়ানো ও পিটল্যান্ড
ধ্বংসের কারণে।
এত বিশাল সংকটকালীন মুহূর্তে
ইন্দোনেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো বেশ কিছু অভিনব উদ্যোগ নিয়ে সমাজে হাজির হয়েছে। পরিবেশবাদ, ধর্মীয় নৈতিকতা ও সামাজিক দায়িত্ব- এই তিন স্তরকে
একত্র করে তারা একটি নতুন ধারার জন্ম দিয়েছে,
যাকে
বলা হচ্ছে ‘গ্রিন ইসলাম’ বা সবুজ ইসলাম। যার প্রভাব শুধু দেশটির ভেতরে নয়, সমগ্র মুসলিম সমাজে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
গ্রিন ইসলামের মৌলিক উদ্যোগগুলো
হলো-
১. পরিবেশবিষয়ক ফতওয়া:
প্রথমত, জাতীয় উলামা কাউন্সিল (গটও) পরিবেশবিষয়ক একাধিক ফতওয়া জারি করেছে।
যেগুলোয় বন উজাড়কে জুলুম হিসেবে
ঘোষণা করেছে; নদী, হ্রদ বা সমুদ্র দূষণকে নিষিদ্ধ আচরণ হিসেবে চিহ্নিত
করেছে; অবৈধ খনি, বন্যপ্রাণী হত্যাকা-, পাম তেলের বাগানের অযৌক্তিক সম্প্রসারণকে ফ্যাসাদ
ও অন্যায় হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।
ফতওয়াগুলোর আইনি প্রভাব না
থাকলেও নৈতিক প্রভাব এত গভীর যে বিভিন্ন জরিপে দেখা যায়, ইন্দোনেশিয়ার মানুষের আচরণ পরিবর্তনে সবচেয়ে প্রভাবশীল
ভূমিকা রাখছে ইসলামী নেতৃত্ব।
২০১৯ সালে পিউ রিসার্চ সেন্টারের
একটি জরিপে দেখা যায়, ইন্দোনেশিয়ার ৮১ শতাংশ
নাগরিক মনে করে পানিবায়ু সংকট মোকাবেলায় ইসলামী নির্দেশনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই
বছর ঈওজঈখঊ ওহফড়হবংরধ জরিপে দেখা যায়,
ইসলামী
ভাষায় পরিবেশবিষয়ক দাওয়াহ শুনলে মানুষের ৬৭ শতাংশ দ্রুত আচরণ পরিবর্তনের দিকে যায়, যেখানে শুধুমাত্র বৈজ্ঞানিক ভাষায় বললে সেই হার
৩৪ শতাংশে নেমে আসে। মানে পরিবেশ সংকট সচেতনতায় দ্বীনি নৈতিকতার প্রভাব বিজ্ঞানের তুলনায়
দ্বিগুণ।
২. ইকো-মসজিদ কর্মসূচি:
দ্বিতীয়ত, এই নৈতিক শক্তির কম্পাস ধরে শুরু হয়েছে বিশাল ব্যাপ্তির
ইকো-মসজিদ আন্দোলন। রাজধানী জাকার্তার ঐতিহাসিক ইস্তিকলাল মসজিদ এরই মধ্যে ২৫০ কিলোওয়াট
ক্ষমতার সোলার প্যানেল, পানি পুনর্ব্যবহার
ব্যবস্থা, শক্তিসাশ্রয়ী আলোকসজ্জা ও প্রাকৃতিক
বায়ুপ্রবাহের মাধ্যমে একটি আধুনিক পরিবেশবান্ধব মসজিদে রূপান্তরিত হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য
ধীরে ধীরে দেশের ৮ লাখ মসজিদকে ইকো-মসজিদরূপে গড়ে তোলা। যেখানে মসজিদের ইমাম প্রত্যেক
জুমুয়ায় পানি সাশ্রয়, বৃক্ষরোপণ, প্লাস্টিক দূষণ, নদী রক্ষা-এসব বিষয়ে দাওয়াহ দিচ্ছেন; মুসল্লিদের নিজেদের ঘরেও পরিবেশবান্ধব আচরণে উদ্বুদ্ধ
করছেন।
৩. ইকো পেসানত্রেন:
তৃতীয়ত, আরো বিস্তৃত পরিবর্তন হচ্ছে ইসলামী আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে।
‘ইকো পেসানত্রেন’ নামে মাদরাসাভিত্তিক পরিবেশ-শিক্ষা আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের শেখানো
হচ্ছে সবুজায়ন, টেকসই কৃষি, কমপোস্টিং, পানি সংরক্ষণ,
বর্জ্য
ব্যবস্থাপনা ও পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপাদানের ব্যবহার। অনেক পেসানত্রেনে শিক্ষার্থীরা
নিজেরাই ছোট কৃষি খামার পরিচালনা করছে;
এটা শুধু
শিক্ষা নয়, বরং পরিবেশবান্ধব জীবনযাপনের
হাতে-কলমে অনুশীলনও।
৪. গ্রিন দাওয়াহ মুভমেন্ট:
চতুর্থত এবং সবচেয়ে আকর্ষণীয়
অংশ হলো দাওয়াহর নতুন ভাষা ও ব্যাপ্তি। নারী-পুরুষ উভয় ধর্মীয় ইনফ্লুয়েন্সারকে যুক্ত
করে ‘গ্রিন দাওয়াহ মুভমেন্ট’ চালু হয়েছে। যাতে বিজ্ঞান ও ধর্মীয় নৈতিকতার সমন্বয়ে জনসাধারণকে
পরিবেশ রক্ষায় উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। ফরিদ সানং নামের একজন আলেমের নেতৃত্বে একটি বিখ্যাত
হাদীছ শরীফ এরই মধ্যে আন্দোলনের শক্তি হয়ে উঠেছে- “যদি কিয়ামত আসে এবং তোমার হাতে একটি
চারা থাকে, তবু তা রোপণ করো।”
আর ব্যক্তি উদ্যোগে তা ছড়িয়ে
পড়ছে প্রত্যন্ত অঞ্চলেও।
এই আন্দোলনের সামাজিক প্রভাব
বা কার্যকারিতা কেমন, সে সম্পর্কে সে দেশের
জরিপগুলো থেকেই পরিষ্কার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। ২০২২ সালে Indonesia Climate
Attitude Survey -এ দেখা যায়, ইকো-মসজিদ বা গ্রিন ফতওয়া কার্যক্রম থাকা এলাকাগুলোতে প্লাস্টিক
ব্যবহারের মাত্রা ২২ শতাংশ কমে গেছে। পানি সাশ্রয়ের প্রবণতা বেড়েছে ৩০ শতাংশ, আর বৃক্ষরোপণে স্থানীয় অংশগ্রহণ বেড়েছে ৪২ শতাংশ।
এই অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য
গভীরভাবে শিক্ষণীয়। সামগ্রিক বাস্তবতায় বাংলাদেশে পরিবেশ সংকট ভয়াবহ। এই সংকট থেকে
উত্তরণে আমাদের দেশের প্রায় লাখ লাখ মসজিদ,
হাজার
হাজার মাদরাসা ও লক্ষাধিক আলেম যদি এগিয়ে আসেন, তাহলে আমাদের দেশের চিত্রও পাল্টে যাবে ইনশাআল্লাহ।
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
ঘরোয়া মসলায় লুকিয়ে থাকা চিকিৎসাগুণ সম্পর্কে জানেন?
১৯ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
আমে কীটনাশক রয়েছে কিনা? পরীক্ষা করুন পাঁচ পদ্ধতিতে
১৮ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
মহাবিশ্ব দ্রুত গতিতে সম্প্রসারিত হচ্ছে: নতুন গবেষণা
১৮ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
কাচারি ঘরের ইতিকথা
১৭ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
কদম মুবারকে কদম রসূল
১৭ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
ব্রেইন-কম্পিউটার ইন্টারফেস
১৬ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
ইন্দোনেশিয়ায় আন্তর্জাতিক উদ্ভাবন প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশি দুই শিক্ষার্থীর সাফল্য
১৬ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
জামের বীজের গোপন গুণ, যা অনেকেরই অজানা
১৫ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
এই চার পানীয় শরীর থেকে ক্ষতিকর পদার্থ বের করে দেয়
১৫ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
ভুট্টায় প্রোটিন বাড়ানোর নতুন জিন আবিষ্কার
১৪ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
সাহারা মরুভূমির উল্কাপিন্ডে মিললো হারিয়ে যাওয়া গ্রহের প্রমাণ
১৪ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
ছায়াপথের কেন্দ্রে বিরল দৃশ্য, নতুন রহস্যের সূত্র পাওয়ার দাবি বিজ্ঞানীদের
১৩ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার)












