ঘটনা থেকে শিক্ষা
শেখ চুল্লির দুনিয়াবী সম্পদ গড়ার অলীক কল্পনা এবং হাক্বীক্বত বাস্তবতা
, ০৮ রবীউছ ছানী শরীফ, ১৪৪৮ হিজরী সন, ২২ রবি, ১৩৯৪ শামসী সন , ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রি:, ০৫ আশ্বিন, ১৪৩৩ ফসলী সন, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) পবিত্র দ্বীন শিক্ষা
মানুষের আশা-আকাঙ্খা কতটুকু? মানুষ কতটুকু চায়? মানুষ কতটুকু মহান আল্লাহ পাক উনার কাছে আরজু করে। এ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, অনেক আগেকার ঘটনা। একলোক, জিনিসপত্রের দাম যখন খুব কম ছিল, সে বাজারে গিয়েছে, কিছু মাল-সামানা খরীদ করবে। সে জরুরত মনে করে বাজার থেকে এক কলসী তেল খরীদ করলো আট আনা দিয়ে। খরীদ করে সেই লোক মনে করলো যে, এক কলসী তেল তো হাতে করে আনা কঠিন। একটা মিন্তী বা কুলির দরকার রয়েছে। সে মিন্তী বা কুলি তালাশ করতে লাগল। তালাশ করতে করতে একটা মিন্তী পাওয়া গেল। তাকে সে জিজ্ঞেস করলো যে, তুমি আমার এই তেলের কলসীটা আমার বাড়ীতে পৌঁছিয়ে দিতে পারবে কি? সেই মিন্তী বললো যে, হ্যাঁ-এটাই আমার কাজ, আমি এটাই করে থাকি, এটাই আমার পেশা। যদি আপনি আমাকে দেন, আমি অবশ্যই পৌঁছিয়ে দিব। তখন সে তেলের মালিক বললো, কত দিতে হবে তোমাকে? বেশী না, এক পয়সা দিলেই চলবে, সে রাজী হয়ে গেল। মিন্তীর মাথায় সে তেলের কলসীটা তুলে দিল। রাস্তায় চলতে থাকলো তারা পর্যায়ক্রমে।
বৃষ্টি হওয়ার কারণে রাস্তা ছিল খুব স্যাঁতস্যাঁতে অর্থাৎ কাদাযুক্ত ছিল। খুব পিচ্ছিল ছিল, সহজে একটা লোক পিছলিয়ে যেতে পারে, এমন রাস্তা ছিল। সতর্কতার সাথে তারা চলতে থাকলো। কিন্তু যে লোকটা সরিষার তেলের কলসী মাথায় নিয়েছে। সে ফিকির করতে থাকলো- আজকে সকালে আমি যে পয়সা পেয়েছি, আমার সংসার চলার জন্য এটাই যথেষ্ট আজকের জন্য, আজকে আর পয়সা লাগবেনা। আজকের সংসারের খরচ আমার উঠে গেছে। এখন আমি যে এক পয়সা পাব, এটা দিয়ে আমি কি করবো? সে ফিকির করতে লাগলো। এই পয়সা দিয়ে কি করা যেতে পারে? ফিকির করতে করতে তার মনের মধ্যে উদিত হলো যে, তাহলে এক কাজ করা যেতে পারে, কিছু ডিম কিনা যেতে পারে। ডিম খরীদ করে এটা রাখবো। ডিমের থেকে অনেক বাচ্চা হবে, মুরগী হবে। মুরগী বৃদ্ধি হতে হতে অনেক হয়ে যাবে।
এটা কিন্তু সেই যে কুলি সে রাস্তায় হাটছে খুব সতর্কতার সাথে, স্যাঁতস্যাঁতে কাঁদাযুক্ত রাস্তা, খুব পিচ্ছিল, রাস্তা দিয়ে হাঁটছে এবং সে ফিকির করছে। সেই ডিমগুলি খরীদ করার পরে অনেক বাচ্চা হবে। বাচ্চা থেকে একদিন অনেক মুরগী হবে। বড় বড় মুরগী হবে। এতবেশী হবে, যেটা আমার পক্ষে লালন-পালন করা কষ্ট হবে। দেখাশুনা করা কষ্ট হবে, তখন কি করতে হবে? মুরগীগুলি বিক্রি করে ছাগল কিনতে হবে। তখন আস্তে আস্তে সেই ছাগলগুলি থেকে আরো অনেক ছাগল হবে, বাচ্চা হবে। এত বেশী হয়ে যাবে, যেটা আমার জন্য লালন-পালন করা কষ্ট হবে। তখন সেইগুলি আমি বিক্রি করে গাভী-গরু কিনব। গাভী আস্তে আস্তে অনেক হয়ে যাবে। তখন গাভীগুলিও আমার জন্য লালন-পালন করা কষ্ট হবে। তখন আমি সেটা বিক্রি করে দিব। সমস্ত গরু-ছাগল যা রয়েছে, তা বিক্রি করে দিলে আমার অনেক টাকা হবে।
আর এই শহরের মধ্যে এটাই সবচেয়ে বড় বাজার। এই বাজারের মধ্যে একটা দোকানের দাম হচ্ছে এক লক্ষ টাকা। এক লক্ষ টাকা দিয়ে আমি একটা দোকান কিনব। একটা দোকান কিনলে বেচা-কিনা অনেক হবে। আমি অনেক ধনী হয়ে যাব। এই শহরের মধ্যে যারা বিশিষ্ট ধনী, তাদের মধ্যে আমি একজন হবো। যেহেতু আমি এখনও বিয়ে-শাদী করিনি। তখন এই শহরের যিনি প্রধান রয়েছেন, তার মেয়েকে বিয়ে করার প্রস্তাব দিব। সে তো সহজে রাজী হয়ে যাবে। আমার এত সম্পদ, এত টাকা-পয়সা দেখে, সে রাজী হয়ে যাবে। রাজী হয়ে সে তার মেয়ে আমার কাছে বিয়ে দিবে। বিয়ে করব, কিছুদিন পর আমার একটা সন্তান হবে। সে চলছে আর ফিকির করছে। যখন সন্তান হবে, কথা বলবে, কথা শিখবে। কথা শিখলে সে আমাকে বলবে একদিন খাওয়ার জন্য।
তখন সেই মিন্তী ফিকির করছে। সন্তান যখন আমাকে বলবে খাওয়ার জন্য, তখন আমি অভিমান করব। অভিমান করে বলবো খাব না। রাস্তাতো খুব কাদাযুক্ত ছিল। সে যখন খাব না বলে তার পা সামনের দিকে বাড়িয়ে দিয়েছে, তার মাথায় কলসী ভরা সরিষার তেল, ওজন রয়েছে অনেক। আর এক পা সে তুলে ফেলেছে, এক পা পিছলে সে পড়ে গেছে। এটা যখন সে বললো, তার ছেলে যখন তাকে খাদ্যের জন্য তাকে বলবে, বারবার তাকে বলতে থাকবে খাওয়ার জন্য, অনুরোধ করতে থাকবে, তখন সে অভিমান করে বলবে, আমি খাব না বলে পা দিয়ে সে সামনের দিকে ধাক্কা দিবে। এই বলে সে পা তুলে ফেললো। সে পিছলিয়ে পড়ে গেল। পড়ে যাওয়ার কারণে তার মাথায় যেহেতু তেলের কলসী ছিল, কলসীটা মাটিতে পড়ে গেল। বিকট আওয়াজ হয়ে কলসীটা ভেঙ্গে গেল। তেলগুলি জমিনে পড়ে গেল।
এদিকে যে তেলের মালিক ছিল, সে তো সামনে সামনে হাটছিল। তার দ্রুত যাওয়ার দরকার ছিল বাড়ীতে। বাড়ীতে গিয়ে অন্যান্য কাজ রয়েছে সেটা সে করবে। সে তার ফিকিরে চলছে। আর মিন্তী তার ফিকিরে চলছিল। যখন কলসী পড়ে গেল, বিকট আওয়াজ হলো। মালিক পিছন দিকে তাকিয়ে দেখল কলসী পড়ে গেছে, তেল নষ্ট হয়ে গেছে। সে তো মাথায় হাত দিল, হে কুলি তুমি করলে কি? আমার আট আনার তেল তুমি নষ্ট করে দিলে! তুমি করলে কি এটা। একটু সাবধান হয়ে চললে না? সে মালিক নানান চু-চেরা করতে লাগল। সেই কুলি-মিন্তী সেতো চুপ হয়ে রইলো।
কিছুক্ষণ পরে বললো, হুযূর বেয়াদবী মাফ করবেন। আপনি চু-চেরা, ক্বিল ও ক্বাল করবেন না, আপনি আমার কথা শুনুন। আপনার মাত্র আট আনার তেল নষ্ট হলো। আর কিছুই হয়নি। এটা আবার আট আনা দিলে পাওয়া যাবে। কিন্তু আমার লাখ টাকার দোকান গেল, বাড়ী গেল, গাড়ী গেল, সন্তান গেল, স্ত্রী-পুত্র, সংসার সব আমার বিনাশ হয়ে গেল। আর আপনার মাত্র আট আনার তেল খরচ হলো।
খুব ফিকিরের বিষয়। এই লোকটার নাম দেয়া হয়েছে শেখ চুল্লী। এই শেখ চুল্লী বললো যে, আপনার মাত্র আট আনার তেল ক্ষতি হলো আর আমার কি ক্ষতি হলো? আমার লাখ টাকার দোকান গেল, গাড়ী-বাড়ী গেল, স্ত্রী-সন্তান গেল, সব কিছু গেল। আমি আবার সেই শূন্যের মধ্যে এসে দাঁড়ালাম।
হাক্বীক্বত প্রত্যেকটা লোকই এই ফিকিরই করে থাকে, এটাই তার চিন্তা তার কল্পনা তার আশা-আকাঙ্খা। কারণ একটা লোক আশা ছাড়া বাঁচতে পারে না। তার সামনে অবশ্যই কিছু আশা থাকতে হবে। এখন সেটা শরীয়তসম্মতই হোক আর শরীয়ত উনার খেলাফই হোক, জায়েয হোক আর নাজায়েযই হোক, তার সামনে একটা আশা থাকতেই হবে। যেই আশাকে লক্ষ্য করে সে চলতে থাকবে। এখন যাদের আশা শরীয়তসম্মত, তাদের জন্য রহমত, বরকত, সাকিনা আর যাদের আশাগুলি এই শেখ চুল্লীর মত হবে, তাদের ইহকালও বরবাদ হয়ে যাবে, তাদের পরকালও বরবাদ হয়ে যাবে।
যেমন- শেখ চুল্লীর সব বরবাদ হয়ে গেল। চোখের পলকে সব কিছু ধ্বংস হয়ে গেল। ঠিক তদ্রুপ যারা এভাবে ফিকির করবে, এভাবে চিন্তা করবে, তাদের ইহকাল এবং পরকালও ধ্বংস হয়ে যাবে। এটা খুব ফিকিরের বিষয়, এটাই মহান আল্লাহ পাক তিনি বলে দিয়েছেন যে, “আধিক্যের আগ্রহ মানুষকে মোহগ্রস্ত করে দেয়। কবর জিয়ারত না করা পর্যন্ত তার কোন উদ্ধার নেই।”
এবং মহান আল্লাহ পাক উনার রসূল নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “আদম সন্তান একটা পাওয়ার পর আরেকটা তালাশ করে। একটার পর আরেকটা তালাশ করে, করতেই থাকে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে তার মঞ্জিলে মকসুদে পৌঁছতে পারুক আর না পারুক, তার আশা-আকাঙ্খা কিন্তু শেষ হয় না মৃত্যু পর্যন্ত। যখন তার মৃত্যু হয়ে যায়, তখন তার আশা বন্ধ হয়ে যায়। তার আশা-আকাঙ্খা রদ হয়ে যায়।”
-০-
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
সাইয়্যিদুনা হযরত সুলত্বানুন নাছীর আলাইহিস সালাম উনার পবিত্র ওয়াজ শরীফ
২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
ফিক্বাহ বা ফতওয়ার সকল কিতাবেই গান-বাজনা, বাদ্য-যন্ত্র ইত্যাদিকে হারাম ফতওয়া দেয়া হয়েছে
২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
দেশে দেশে জাতিসংঘ ওরফে ইহুদীসংঘের কথিত মানবাধিকার অফিসমূহের পবিত্র দ্বীন ইসলাম ও মুসলমান বিরোধী কার্যক্রমের ইতিহাস (১৬তম পর্ব)
২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
ফুটবল-ক্রিকেটসহ সর্বপ্রকার খেলাধুলা করা, সমর্থন করা হারাম ও নাজায়িয (১৮)
১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
অসংখ্য হাদীছ শরীফ দ্বারা প্রমাণিত- প্রাণীর ছবি হারাম
১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
সাইয়্যিদুনা হযরত সুলত্বানুন নাছীর আলাইহিস সালাম উনার পবিত্র ওয়াজ শরীফ
১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
মুসলমানদের জন্য সমস্ত খেলাধুলা হারাম
১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
ফিঙ্গারপ্রিন্ট বা আঙ্গুলের ছাপ শরীয়তসম্মত, নিখুঁত, ব্যবহারে সহজ এবং রহমত, বরকত, সাকীনা লাভের কারণ (৬)
১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
ব্যবসা করা হালাল ও সুন্নত আর সুদ হারাম
১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
পবিত্রতা সম্পর্কিত মাসয়ালা-মাসায়িল (৭)
১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
যে নিজে পর্দা করে না ও অধীনস্থদের পর্দা করায় না সে দাইয়ূছ
১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
সাইয়্যিদুনা হযরত সুলত্বানুন নাছীর আলাইহিস সালাম উনার পবিত্র ওয়াজ শরীফ
১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার)












