লালমনিরহাটে রেলওয়ের বদলে যাওয়ার ইতিহাস
, ০৯ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০:০০ এএম ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) পাঁচ মিশালী
রেল আসার আগের লালমনিরহাট:
উনিশ শতকের শেষভাগে লালমনিরহাট ছিলো মূলতঃ কৃষি ও নদীনির্ভর জনপদ। তিস্তা, ধরলা, সতিনদী ও অন্যান্য নদী এ অঞ্চলের জীবন ও অর্থনীতিকে প্রভাবিত করতো। পণ্য পরিবহন ও মানুষের যাতায়াতের প্রধান অবলম্বন ছিলো নৌপথ ও স্থলপথ। কিন্তু ব্রিটিশ শাসনের অর্থনৈতিক প্রয়োজন ছিলো ভিন্ন। বৃহত্তর উত্তরাঞ্চলের কৃষিপণ্য, বিশেষ করে পাট, গম, ভুট্টা ও অন্যান্য কাঁচামাল দ্রুত পরিবহন করতে হয়৷ একই সঙ্গে চা-বাগানসমৃদ্ধ অঞ্চলকে বৃহত্তর বাণিজ্যিক বাজারের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। রেল সেই প্রয়োজনের সবচেয়ে কার্যকর সমাধান। রেললাইন নির্মাণের মধ্য দিয়ে বৃহত্তর উত্তরাঞ্চরের ভূগোল যেন নতুন করে আঁকা হতে থাকে।
১৮৭৯ সালে এ রেলের নতুন অধ্যায়:
উত্তরবঙ্গ স্টেট রেলওয়ে ১৮৭৯ সালে পার্বতীপুর থেকে কাউনিয়া পর্যন্ত মিটারগেজ রেলপথ চালু করা হয়। এরপর কাউনিয়া থেকে ধরলা নদীর দিকে রেলপথ সম্প্রসারিত হয়। পরবর্তী সময়ে এ রেলব্যবস্থা লালমনিরহাটকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগকেন্দ্রে পরিণত করে। এই সময়ের লালমনিরহাটকে আজকের চোখে কল্পনা করলে ভুল হবে। তখন এখানে আধুনিক শহর ছিলো না। ছিলো না আজকের প্রশাসনিক কাঠামো। রেলওয়ে ধীরে ধীরে জনপদের নতুন কেন্দ্র তৈরি করছিলো। ১৮৯৯ সালে লালমনিরহাট রেলওয়ে স্টেশনের নির্মাণকাজ শেষ হয়। পরবর্তী সময়ে রেলকে কেন্দ্র করে এখানকার প্রশাসনিক গুরুত্বও বাড়তে থাকে। জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ১৯০১ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর কুলাঘাট থানা বিলুপ্ত করে বর্তমান লালমনিরহাট সদর এলাকার জন্য লালমনিরহাট সদর থানা প্রতিষ্ঠা করা হয়।
লালমনিরহাট জংশন- চারদিকে ৪ পথ:
১৯ শতকের শেষভাগে লালমনিরহাটের গুরুত্ব দ্রুত বাড়তে থাকে। একদিকে পার্বতীপুর ও উত্তরবঙ্গের অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ৷ অন্যদিকে কোচবিহার ও ডুয়ার্সের দিকে রেলপথ সব মিলিয়ে লালমনিরহাট হয়ে উঠে একটি গুরুত্বপূর্ণ রেলকেন্দ্র। ১৮৯১ সালে গঠিত ইবহমধষ উড়ড়ধৎং জধরষধিু ডুয়ার্স অঞ্চলের রেল যোগাযোগ বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ওই রেলপথের অন্যতম লক্ষ্য ছিলো পশ্চিম ডুয়ার্সকে উন্মুক্ত করা এবং ক্রমবর্ধমান চা-শিল্প ও বনসম্পদের অর্থনৈতিক ব্যবহার সহজ করা। লালমনিরহাট ওই নেটওয়ার্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থলে পরিণত হয়। ১৯০০ সালের ২০ নভেম্বর ডুয়ার্সকে ভোটমারী থেকে লালমনিরহাট জংশনের সঙ্গে রেল সংযোগ স্থাপিত হয়। এর ফলে লালমনিরহাটের সঙ্গে ডুয়ার্স ও উত্তরবঙ্গের বাণিজ্যিক যোগাযোগ আরও সুদৃঢ় হয়। রেললাইন তখন শুধু যাত্রী বহন করতো না। চা, পাট, ধান, কাঠসহ বিভিন্ন পণ্য ওই রেলপথে চলাচল করতো। স্টেশনকে ঘিরে গড়ে উঠতে থাকে বাজার, গুদাম, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, আবাসিক এলাকা ও কর্মসংস্থান।
মোগলহাট- আজ যেখানে নীরবতা:
লালমনিরহাটের রেল-ইতিহাসের অধ্যায়গুলোর একটি মোগলহাট রেলওয়ে স্টেশন ও পুলিশ ইমিগ্রেশন। ধরলা নদীর তীরে অবস্থিত ওই সীমান্ত রেলকেন্দ্র একসময় ছিলো ভারতীয় উপমহাদেশের আন্তঃআঞ্চলিক যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মোগলহাট থেকে গিতালদহ হয়ে কোচবিহার ও গোলকগঞ্জের দিকে রেল যোগাযোগ ছিলো। পরবর্তীকালে ওই নেটওয়ার্ক আসামের সঙ্গে যুক্ত হয়। মোগলহাট স্টেশনটি ১৮৯৬ সালে চালু হয়েছিলো বলে রেল-ইতিহাসের বিভিন্ন সূত্র থেকে উল্লেখ করা হয়েছে। আজ সেই মোগলহাটে দাঁড়ালে অতীতের সেই ব্যস্ততার সঙ্গে বর্তমানের নীরবতার তীব্র বৈপরীত্য চোখে পড়ে।
আসাম মেইল- লালমনিরহাট হয়ে দূর আসামের পথে:
লালমনিরহাটের রেল-গৌরবের স্মৃতিগুলোর একটি হলো আসাম মেইল। দেশভাগের আগে সান্তাহার থেকে লালমনিরহাট হয়ে গুয়াহাটি পর্যন্ত চলাচল করতো ওই গুরুত্বপূর্ণ ট্রেন। লালমনিরহাট তখন ছিলো বৃহত্তর পূর্ববঙ্গ ও আসামের মধ্যে রেল যোগাযোগের অন্যতম প্রধান সেতু। তখন ভারত-পাকিস্তান নামে কোনো আন্তর্জাতিক সীমান্ত ছিলো না। একই রেলপথে মানুষ এক ভূখ- থেকে অন্য ভূখ-ে যেতো। আজ যেসব স্থান আলাদা রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত। এখন শুধুই স্মৃতি। রেল তখন সীমান্তের ভাষা জানতো না।
রেল ও লালমনিরহাটের নগরায়ণ:
রেল আসার আগে কোনো জনপদ যতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিলো। রেল আসার পর তার গুরুত্ব অনেক গুণ বেড়ে যায়৷ লালমনিরহাট তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ। রেলওয়ে শুধু স্টেশন নির্মাণ করেনি। তৈরি হয়েছে কর্মসংস্থান। স্টেশন মাস্টার, চালক, গার্ড, পয়েন্টসম্যান, কারিগর, প্রকৌশলী, কুলি, ব্যবসায়ীসহ অসংখ্য মানুষের জীবন রেলের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। রেলওয়ে কলোনি গড়ে উঠেছে। বাজার সম্প্রসারিত হয়েছে। নতুন ব্যবসায়ী শ্রেণি তৈরি হয়েছে। এভাবেই একটি রেলওয়ে স্টেশন ধীরে ধীরে একটি শহরের সামাজিক কাঠামো পাল্টে দিয়েছে। আজকের লালমনিরহাট শহরের বিকাশ বুঝতে গেলে তাই রেলওয়ের ভূমিকা এড়িয়ে যাওয়ার কোন সুযোগ নেই।
দেশভাগ- একই রেলপথের মাঝখানে একটি সীমান্ত:
১৯৪৭ সালে ভারত ভাগ হলো। মানচিত্রে একটি রেখা টানা হলো। কিন্তু সেই রেখা কেবল কাগজে আঁকা ছিলো না। তা মানুষের জীবনের উপরেও আঁকা হলো। লালমনিরহাট থেকে কোচবিহার, গিতালদহ, গোলকগঞ্জ, আসাম যে, রেলপথে অবাধ যোগাযোগ ছিলো। সেখানে হঠাৎ রাষ্ট্রীয় সীমান্ত এসে দাঁড়ালো। একই রেললাইন ২ দেশের হয়ে গেলো। দেশভাগের আগে লালমনিরহাট ছিলো সংযোগের কেন্দ্রঃ- দেশভাগের পরে সেটিই হয়ে উঠলো সীমান্তের প্রান্ত।
রেলপথ হারালো, কিন্তু স্মৃতি হারালো না এখন ইতিহাস ও ঐতিহ্য বহন করছে।
দেশভাগের পরও বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে রেল যোগাযোগ পুনঃস্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিলো। কিন্তু পুরোনো নেটওয়ার্ক আর আগের অবস্থায় ফিরে আসেনি। মোগলহাটের পরিত্যক্ত রেলপথ, ধরলার পুরোনো সেতুর ধ্বংসাবশেষ কিংবা লালমনিরহাটের পুরোনো রেলওয়ে স্থাপনা আজ সেই হারিয়ে যাওয়া যুগের সাক্ষ্য বহন করছে। তবু লালমনিরহাটের রেল পুরোপুরি অতীত হয়ে যায়নি। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ রেলওয়ের উত্তরাঞ্চলীয় নেটওয়ার্কে লালমনিরহাট গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ধরে রাখছে। ২০০৪ সালে ঢাকা ও লালমনিরহাট সরাসরি মিটারগেজ ট্রেন যোগাযোগ চালু করা হয়। বর্তমানে লালমনিরহাট জংশন থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সঙ্গে রেল যোগাযোগ রয়েছে। কিন্তু একসময় যে আন্তর্জাতিক ও আন্তঃআঞ্চলিক রেল নেটওয়ার্কের কেন্দ্র ছিলো ওই শহর, তার তুলনায় বর্তমান সংযোগ অনেক সীমিত।
লালমনিরহাটের ভৌগোলিক অবস্থান এখনও গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল, অন্যদিকে ভারতের কোচবিহার ও আসাম, কাছেই ভুটান। ফলে আঞ্চলিক বাণিজ্য ও যোগাযোগের নতুন যুগে পুরোনো রেল-ঐতিহ্য নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিতে পারে। বিশেষ করে মোগলহাট ও গিতালদহের মতো ঐতিহাসিক রেল সংযোগ পুনরুজ্জীবিত হলে তা শুধু দুটি রেলস্টেশনকে যুক্ত করবে না৷ যুক্ত করবে একসময়ের বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া একটি ঐতিহাসিক যোগাযোগ-ভূগোলকে।
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
চলনবিলে বিলুপ্তির পথে গ্রামবাংলার ঐতিহ্য নল বড়শি
০৮ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
বাংলা কিউআর কীভাবে ব্যবহার করবেন?
০৮ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
মহাসাগরে তাপ শোষণে নতুন রেকর্ড, এক বছরে মানুষের ব্যবহৃত শক্তির ৪০ গুণ
০৬ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
চোখের পাপড়ির কাজ কি?
০৫ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
কোন খাবার গ্যাসের সমস্যা বাড়ায়, কোনটা কমায়?
০৫ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
মানচিত্রে দেশ নেই, আছে সেনা-সংসদ-মুদ্রা!
০৩ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
শিয়ালের গোশত, তক্ষক ও জোঁকের তেল, রোগ সারানোর সত্যতা কতটা?
০১ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
ডিসলেক্সিয়া সম্পর্কে জানেন, কেন হয়?
২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
চাঁদের বুকে গড়ে উঠবে বসতি: কত দিন চলবে পানির ভা-ার?
২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
মেয়াদোত্তীর্ণ খাবার কী ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে?
২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
ঋণ ও বন্ড বাজারে ধস : চরম সংকটের মুখে বিশ্ব অর্থনীতি
২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
যে দেশগুলোতে রাতেও ঝলমল করে সূরে্যর আলো
২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার)












