ইলমে তাছাওউফ
মুর্শিদ ক্বিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক প্রসঙ্গে (৪৫)
, ০৭ জুমাদাল ঊখরা শরীফ, ১৪৪৭ হিজরী সন, ৩১ সাদিস, ১৩৯৩ শামসী সন , ২৯ নভেম্বর, ২০২৫ খ্রি:, ১৪ অগ্রহায়ণ, ১৪৩২ ফসলী সন, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) ইলমে তাছাউফ
শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা যখন যা আদেশ করবেন তখন তা পালন করাই মুরীদের জন্য সন্তুষ্টি লাভের কারণ
বর্ণিত আছে যে, একবার এক ব্যক্তি খলীফাতুল মুসলিমীন, সাইয়্যিদুনা হযরত ফারূকে আ’যম আলাইহিস সালাম উনাকে বিভিন্ন সূরার শুরুতে বর্ণিত
الم - حم - ص - يس - الر-
ইত্যাদি হুরূফে মুকাত্তায়াতের অর্থ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন। তার জাওয়াবে তিনি বলেছিলেন-
اَبْهِمُوا مَا اَبْهَمَهُ اللهُ تَعَالٰى
অর্থ: “মহান আল্লাহ পাক তিনি যা গোপন রেখেছেন তা গোপন রাখো। ”
অর্থাৎ গোপনীয় বিষয়গুলো যেভাবে আছে সেগুলো সেভাবে গোপন রাখাই উচিত।
মূলতঃ হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম, হযরত আউলিয়ায়ে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিম, ইমাম-মুজতাহিদ উনারা আমভাবে তা প্রকাশ করেননি। বরং গোপন রেখেছেন। আর যারা গোপন রাখতে সক্ষম উনারাই নিয়ামত প্রাপ্ত হয়ে থাকেন।
এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা হয়, হযরত ইউসুফ ইবনে হুসাইন রয়ী রহমতুল্লাহি আলাইহি। তিনি প্রথম জীবনে স্বপ্নযোগে মহান আল্লাহ পাক উনার জলীলুল কদর রসূল, হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালাম উনার নির্দেশ মুবারকে সে যুগের মহান আল্লাহ পাক উনার ওলী, হযরত যুন নুন মিশরী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার ছোহবত মুবারক লাভের জন্য মিশর অভিমুখে রওয়ানা করলেন। মিশর পৌঁছে উনার দরবার শরীফে গিয়ে উঠলেন। একদিন হযরত যুন নুন মিশরী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি উনাকে জিজ্ঞেস করলেন- “হে ব্যক্তি! তোমার নাম কি? তিনি বললেন, ‘ইউসুফ ইবনে হুসাইন’।
হযরত যুন নুন মিশরী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি উনাকে আর কিছু জিজ্ঞেস করলেন না। প্রায় এক বছর অতিবাহিত হলো। এক বছর পরে তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কোথা হতে এসেছো?’
হযরত ইউসুফ ইবনে হুসাইন রয়ী রহমতুল্লাহি আলাইহি জবাব দিলেন। ‘হুযূর! আমি “রয়” প্রদেশ থেকে এসেছি। আপনার নিকট কিছু আরজ ছিলো। ’
জবাবে হযরত যুন নুন মিশরী রহমতুল্লাহি আলাইহি কিছুই বললেন না। এভাবে আরও এক বছর কেটে গেলো। তারপর একদিন হযরত যুন নুন মিশরী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি উনাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কি চাও?’ জবাবে তিনি বললেন, হুযূর! আমি আপনার দরবার শরীফে “ইসমে আ’যম” শিক্ষা করার উদ্দেশ্য নিয়ে আগমন করেছি।
উনার কথা শুনে হযরত যুন নুন মিশরী রহমতুল্লাহি আলাইহি কোন উত্তর দিলেন না। এভাবে আরও এক বছর কেটে গেলো। একদিন হযরত যুন নুন মিশরী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি একটি মুখবন্ধ কৌটা, হযরত ইউসুফ ইবনে হুসাইন রয়ী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার হাতে দিয়ে বললেন, ‘নীলনদের অপর তীরে অমুক স্থানে এক বুযূর্গ ব্যক্তি আছেন। উনার কাছে কৌটাটি পৌঁছাতে হবে।
হযরত ইউসুফ ইবনে হুসাইন রয়ী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি কৌটাটি নিয়ে যথাস্থানে পৌঁছিয়ে দেয়ার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলেন। কৌটাটির ভিতরে কি যেন খটখট আওয়াজ হচ্ছিলো। কিছু একটা নড়াচড়া করছিলো। বেশ কিছু দূর যাওয়ার পর উনার প্রবল ইচ্ছা জাগলো যে, কৌটাটি খুলে দেখবেন তার মধ্যে কি নড়াচড়া করছে? এক পর্যায়ে তিনি কৌটাটি খুললেন। খোলামাত্র ভিতর থেকে ছোট একটি ইঁদুর লাফ দিয়ে পড়ে জঙ্গলে পালিয়ে গেলো। তিনি আর চেষ্টা করেও ইদুরটি ধরতে পারলেন না। ইদুরতো আর দৌড়ে ধরা যায় না। এখন কি করবেন? বেশ ভাবনায় পড়ে গেলেন।
হযরত ইউসুফ ইবনে হুসাইন রয়ী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি ভাবতে লাগলেন যে, এখন কি তিনি খালি কৌটা নিয়েই সেই ব্যক্তির কাছে যাবেন, না আবার হযরত যুন নুন মিশরী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার কাছে ফিরে যাবেন। অনেক ভেবে-চিন্তে খালি কৌটা নিয়ে শেষ পর্যন্ত সেই বুযূর্গ ব্যক্তির নিকট গিয়ে পৌঁছলেন। বুযূর্গ ব্যক্তি উনাকে দেখে মুচকি হাসলেন। এবং বললেন, হে ব্যক্তি! হযরত যুন নুন মিশরী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি তোমাকে একটি কৌটা দিয়েছিলেন আমার নিকট পৌঁছানোর জন্য, তুমি আমানত রক্ষা করতে পারলে না। তুমি একটা ইঁদুরের খটখটানি বরদাশত করলে পারলে না! তুমি কিভাবে ইসমে আ’যম শিক্ষা লাভ করবে? যেখান থেকে এসেছো সেখানে ফেরত যাও।
হযরত ইউসুফ ইবনে হুসাইন রয়ী রহমতুল্লাহি আলাইহি লজ্জিত হয়ে হযরত যুন নুন মিশরী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার দরবার শরীফে ফেরত আসলেন।
হযরত যুন নুন মিশরী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি সবই জানতেন। তিনি উনাকে বললেন, ‘আমি তোমার ব্যাপারে অনেকবার (এক বর্ণনায়) সাতবার মহান আল্লাহ পাক উনার দরবার শরীফে অনুমতি চেয়েছি, বারে ইলাহী! আমি তাকে কিছু দেই? মহান আল্লাহ পাক তিনি অনুমতি দেননি। বারবার আরজি পেশ করায় মহান আল্লাহ পাক তিনি আমাকে বললেন, তাহলে আপনি পরীক্ষা করুন, পরীক্ষায় যদি সে উত্তীর্ণ হতে পারে তাহলে তাকে কিছু দিবেন। ’
সে জন্য একটি ইঁদুর দ্বারা তোমাকে পরীক্ষা করলাম, কিন্তু তুমিতো উত্তীর্ণ হতে পারলে না। পরীক্ষায় বুঝা গেলো, আমি এতবার বলার পরও মহান আল্লাহ পাক তিনি আমাকে কেন এ ব্যাপারে অনুমতি দেননি। এখন তুমি স্বদেশে ফেরত যাও, ধৈর্যধারণ করে কোশেশ করতে থাকো।
ঘটনা আরো আছে তবে মূল ঘটনা এতটুকুই- পরে আরো পঞ্চাশ বছর রিয়াজত-মাশাক্কাত করার পর তিনি তাকমীলে পৌঁছলেন।
কাজেই আহলে তাছাউফগণের উচিত যথাসম্ভব ইলমে তাছাওউফের হাক্বীক্বতকে গোপন রাখা। গোপন রাখার মধ্যে বহুমূখী কল্যাণ নিহিত। কেননা তা গোপন রাখার মধ্য দিয়ে ঈমানদারগণের ঈমান মজবুত হয়, আমল করতে সহজ হয় তেমনিভাবে মুনাফিকদের কপটতার খোলস উন্মোচিত হয়। তাদের আসল রূপ প্রকাশিত হয়। (অসমাপ্ত)
-আল্লামা মুফতী সাইয়্যিদ মুহম্মদ আব্দুল হালীম।
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা উনার প্রতি ইমামুল মুসলিমীন, হযরত ইমামে আ’যম রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার চূড়ান্ত আদবের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন
২৮ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
হক্কানী রব্বানী আউলিয়ায়ে কিরাম উনাদের শানে সবসময় সার্বিকভাবে হুসনে যন পোষণ করা আবশ্যক
১৯ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
কৃপণতা জঘণ্যতম বদ খাছলত
১০ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
মুর্শিদ ক্বিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক (৫৭) কামিল শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা উনার সাথে সংশ্লিষ্ট সকল বিষয়কে সর্বশ্রেষ্ঠ ও বরকতময় মনে করে যথাযথ তা’যীম-তাকরীম করার গুরুত্ব
০৬ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
শায়েখ বা মুর্শিদ কিবলা উনার সাথে তায়াল্লুক-নিসবত ব্যতীত মহান আল্লাহ পাক ও উনার হাবীব ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাদের সাথে তায়াল্লুক-নিসবত মুবারক রাখার দাবি করা অবান্তর
০৬ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
ইসলামী শরীয়তের আলোকে কুকুর নিধন (১১)
০৫ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
মুর্শিদ ক্বিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক (৫৬) কামিল শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা উনার সাথে সংশ্লিষ্ট সকল বিষয়কে সর্বশ্রেষ্ঠ ও বরকতময় মনে করে যথাযথ তা’যীম-তাকরীম করার গুরুত্ব
০২ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
আদব রক্ষা করার গুরুত্ব
৩০ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
কৃপণতা জঘণ্যতম বদ খাছলত
১৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
ইলমে ফিক্বাহ ও ইলমে তাছাওউফ উনাদের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা
১২ জানুয়ারি, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
মুর্শিদ ক্বিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক (৫৫) কামিল শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা উনার সাথে সংশ্লিষ্ট সকল বিষয়কে সর্বশ্রেষ্ঠ ও বরকতময় মনে করে যথাযথ তা’যীম-তাকরীম করার গুরুত্ব
০৭ জানুয়ারি, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
মুর্শিদ ক্বিবলা ও মুরীদের সম্পর্ক (৫৪) কামিল শায়েখ বা মুর্শিদ ক্বিবলা উনার সাথে সংশ্লিষ্ট সকল বিষয়কে সর্বশ্রেষ্ঠ ও বরকতময় মনে করে যথাযথ তা’যীম-তাকরীম করার গুরুত্ব
০৬ জানুয়ারি, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার)












