স্থাপত্য-নিদর্শন
ভারতের মালদহর ঐতিহাসিক তাঁতীপাড়া মসজিদ
, ১২ ছফর শরীফ, ১৪৪৮ হিজরী সন, ২৮ ছানী, ১৩৯৪ শামসী সন , ২৭ জুলাই, ২০২৬ খ্রি:, ১২ শ্রাবণ, ১৪৩৩ ফসলী সন, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) স্থাপত্য নিদর্শন
ভারতের মালদহ জেলায় রয়েছে হযরত পান্ডুয়া মসজিদ, আদিনা মসজিদের মতো ঐতিহাসিক স্থান। ভারতের স্বাধীনতা লাভের আগে মালদহ ছিলো রাজশাহী জেলার অন্তর্ভুক্ত। র্যাডক্লিফ রোদেদাদেও এক রায়ে এই জেলার চাঁপাইনবাবগঞ্জ, শিবগঞ্জ, ভোলাহাট, নাচোল ও গোমস্তাপুর থানা বাদে বাকি অংশ ১৯৪৭ খৃ: ১৭ আগস্ট ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়। মালদার উত্তরে বিহারের পূর্ণিয়া জেলা এবং উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুর জেলা, পূর্বে বাংলাদেশের চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা। দক্ষিণে মুর্শিদাবাদ জেলা ও রাজশাহী। পশ্চিমে বিহার ও ঝাড়খন্ড রাজ্য।
তাঁতীপাড়া মসজিদ পশ্চিমবঙ্গের মালদা জেলায় মাটির দেয়াল ঘেরা নগরী গৌড়ের দক্ষিণে লট্টন মসজিদ এবং উত্তরে ছোট সাগরদিঘির মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত। শিলালিপি অনুযায়ী মসজিদটি ১৪৮০ খৃ: সুলতান ইউসুফ শাহের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা মিরসাদ খান নির্মাণ করেন।
বিশাল আকৃতির এ মসজিদ বর্তমানে শুধুমাত্র কিছু অংশ টিকে আছে। বাইরের দিকের কোণগুলিতে চারটি বৃহৎ অষ্টভুজাকৃতির বুরুজসহ বহির্ভাগে এর আয়তন উত্তর-দক্ষিণে ২৮.৬৫ মিটার এবং পূর্ব-পশ্চিমে ১৩.৪১ মিটার। মসজিদে প্রবেশ করতে পূর্বদিকের সম্মুখভাগে ৫টি এবং উত্তর ও দক্ষিণ দিকে ২টি করে খিলান নির্মিত প্রবেশপথ ছিলো। অভ্যন্তরস্থ পশ্চিম দেয়াল পূর্ব দেয়ালের প্রবেশপথের মুখোমুখি পাঁচটি অর্ধবৃত্তাকার মিহরাব দেয়াল দ্বারা সজ্জিত। মসজিদটির ২৩.৭৭ মিটার ও ৯.৪৫ মিটার আয়তনের অভ্যন্তরভাগ পাঁচটি কক্ষ এবং চারটি প্রস্তরস্তম্ভের একটি সারিতে দুটি লম্বালম্বি লাইনে বিভক্ত। ফলে মসজিদের ভেতরে তৈরি হয়েছিলো দশটি আলাদা বর্গক্ষেত্র।
প্রতিটি বর্গাকার কক্ষের উপর একটি গম্বুজ নির্মাণ করে ছাদকে আবৃত করা হয়েছে। পিলারের উপর প্রতিষ্ঠিত পরষ্পর ছেদকারী খিলান এবং মিহরাবের উপরের বদ্ধ খিলান গম্বুজগুলিকে ধারণ করে আছে। গম্বুজের উত্তরণ পর্যায় বাংলা পেন্ডেন্টিভ রীতিতে নির্মাণ করা হয়েছে, যার প্রমাণ এখনও মসজিদের ভেতরে উপরের কোণে দেখা যায়।
মসজিদের কেন্দ্রীয় মিহরাবটি একটি আয়তাকার ফ্রেমের মধ্যে স্থাপিত। ব্যাটেলমেন্ট এবং কার্নিস ধীরে ধীরে বাঁকানো। ইমারতের অভ্যন্তরে উত্তর-পশ্চিম কোণে একটি উঁচু গ্যালারি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। পশ্চিম দেয়ালের উপরিভাগে, সর্বউত্তরের মিহরাবের ঠিক উপরে একটি ছোট মিহরাব কারুকার্য খচিত খিলানের অস্তিত্ব দেখা যায়। উত্তর দেয়ালের পশ্চিম প্রান্তের উপরের অংশে একটি খিলানযুক্ত খোলা পথ এখনও বিদ্যমান রয়েছে। এ উপরের খিলানপথ অবশ্যই বাইরের দিকে সিঁড়ির প্লাটফর্ম হতে উঁচু গ্যালারিতে প্রবেশপথ হিসেবে ব্যবহৃত হতো। স্থাপত্যিক কৌশল বাংলার বিভিন্ন মসজিদে, যেমন হযরত পান্ডুয়ার আদিনা মসজিদ, নবাবগঞ্জের দরসবাড়ি মসজিদ ও ছোট সোনা মসজিদে লক্ষ্য করা যায়।
মসজিদটি প্রকৃতপক্ষে অপূর্ব টেরাকোটা নকশা দ্বারা অলংকৃত; যার বেশিরভাগই এখন টিকে নেই। মসজিদের পূর্বদিকের সম্মুখভাগ প্যানেল দ্বারা সজ্জিত। প্যানেলে রয়েছে উঁচু রিলিফে বিভিন্ন নকশা। একইরূপ নকশাকৃত প্যানেল দেখা যায় অষ্টভুজাকৃতির পার্শ্ববুরুজের গায়ে। প্রবেশপথের খিলানের ছাঁদের নিচে (ংড়ভভরঃ) ছোট ছোট গোলাপ নকশা দ্বারা অলংকৃত এবং দরজার উপরিভাগের দিক থেকে ফুলদানির নকশা উপরের দিকে উঠতি আঙ্গুরলতাসহ গোলাপ নকশা দ্বারা অনেক সুদৃশ্যভাবে অলংকরণ করা হয়েছে।
সবগুলি মিহরাবও সুচারুরূপে অলংকৃত এবং আয়তাকার ফ্রেমে আবদ্ধ। এ ফ্রেম বিভিন্ন নকশায় পূর্ণ এবং মোল্ডিং সারি দ্বারা অলংকৃত। খিলানের চূড়ায় বদ্ধ মারলোনের সারি। উচ্চভাগে এখন পর্যন্তও গভীরভাবে খোদিত মেডালিয়ন নকশা রয়েছে। মিহরাব দেয়ালের অভ্যন্তরভাগ ছোট ছোট রুমে ভাগ করা; প্রতিটি রুমের দরজায় খাঁজকাটা খিলান ও ঝুলন্ত নকশা দ্বারা অলংকৃত।
সুষমামন্ডিত অলংকরণ এবং স্থাপত্য বৈশিষ্ট্যের বৈচিত্র্যের কারণে তাঁতীপাড়া মসজিদ গৌড়ের নিদর্শনসমূহের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর স্থাপত্যকর্ম বলে বিবেচিত হয়। সূত্র: বাংলাপিডিয়া, ইসলামিক হেরিটেজ অফ বেঙ্গল।
-মুহম্মদ নাইম।
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
ফ্রান্সের ইতিহাসে মুসলিম অবদানের এক জীবন্ত দলিল
২১ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
তাজ-উল-মসজিদ ভারতের সর্ববৃহৎ মসজিদ
১৮ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
সুনামগঞ্জে কালের সাক্ষী শত বছরের পুরনো ঐতিহ্যবাহী পাগলা বড় মসজিদ
১৫ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
মোঘল শাসক আওরঙ্গজেবের শাসনামল নিয়ে প্রচলিত ভাষ্য বদলে দিতে পারে ৩০০ বছর আগের নথি
১৪ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
উমাইয়া আমলের মুসলিম স্থাপত্য ‘কুসাইর আমরা দুর্গ’
১৩ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
আফ্রিকার দেশ ঘানার ঐতিহাসিক স্থাপত্য ‘লারাবাঙ্গা মসজিদ’
০৬ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
বন্দরের ঐতিহাসিক নিদর্শন হযরত বাবা সালেহ রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার মাজার শরীফ
০১ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
পবিত্র মসজিদে জুমুয়াহ
১৯ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
সম্মানিত ইসলামী সভ্যতার অনবদ্য নিদর্শন নাফত বা পেট্রোলিয়াম
১০ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
ভারতের সাদা রত্ন ঐতিহাসিক মতি মসজিদ
২৪ মে, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
নহরে জুবাইদা: ঐতিহাসিক মিষ্টি পানির খাল
১৬ মে, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
হযরত নূর কুতুবে আলম রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার নামকরণে তৈরী করা হয়েছিলো ভারতের যে মসজিদ: ফিরোজাবাদে যুগের সাক্ষী ঐতিহাসিক নিদর্শন কুতুব শাহি মসজিদ
৩০ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার)












