মন্তব্য কলাম
তুরস্ক বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ প্রতিরক্ষা পণ্য উৎপাদনকারী দেশ। তুরস্কের সামরিক বাহিনী বেশ আধুনিক, ফলে দেশটি থেকে প্রশিক্ষণ পাওয়া এবং সমরাস্ত্র কেনা---দু'দিক থেকেই লাভবান হতে পারে বাংলাদেশ। দেশটির সঙ্গে অর্থনৈতিক লেনদেনের ক্ষেত্রগুলো অনুসন্ধান করে তার সদ্ব্যবহার করতে পারলে বাংলাদেশ লাভবান হবে। বিশেষ করে বাংলাদেশের রেল ব্যবস্থার উন্নয়ন ও আধুনিকায়নে তুরস্কের প্রযুক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা বাংলাদেশের রেল ব্যবস্থার উন্নতি ঘটতে পারে।
মুসলিম দেশগুলোর সংগঠন ওআইসির নেতৃত্ব এবং ন্যাটোর অংশীদার হিসেবেও সক্ষমতা বাড়ছে তুরস্কের মুসলিম দেশ হিসেবে বাংলাদেশের সমর্থন আশা করে তুরস্ক।
, ০৩ রজবুল হারাম শরীফ, ১৪৪৭ হিজরী সন, ২৫ সাবি’, ১৩৯৩ শামসী সন , ২৪ ডিসেম্বর, ২০২৫ খ্রি:, ০৯ পৌষ অগ্রহায়ণ, ১৪৩২ ফসলী সন, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) মন্তব্য কলাম
পাশাপাশি দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির দেশ হবার কারণে বাংলাদেশের একটা খ্যাতি আছে, সেই সঙ্গে আঞ্চলিক নানা ইস্যুতে বাংলাদেশ একটি অবস্থান নিতে পেরেছে,
যেটি বাংলাদেশের প্রতি তুরস্কের আগ্রহের অন্যতম কারণ।
মুসলিম ভ্রাতৃত্ব বন্ধন দূঢ়করণে উভয় দেশকেই সচেতন ও আগ্রহী হতে হবে ইনশাআল্লাহ।
বাংলাদেশ ও তুরস্কের কূটনৈতিক সম্পর্কের উষ্ণতা নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর।
‘আগে দুই দেশের সম্পর্ক ছিল স্বাভাবিক, বলা যায় ঝামেলামুক্ত হলেও বিশেষ ঘনিষ্ঠ নয়। কিন্তু গত এক বছরে দুই দেশের পারস্পরিক যোগাযোগ ও সফর বিনিময়ে সম্পর্কের গভীরতা স্পষ্টভাবে বেড়েছে।
তুরস্ক এখন বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় সরাসরি ভূমিকা রাখতে আগ্রহী বলেই আঙ্কারার আচরণে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। সরকার পরিবর্তনের দিনই তুরস্কের ফার্স্ট লেডি এমিনে এরদোয়ান শুভেচ্ছা বার্তা পাঠান। এরপরের সপ্তাহেই প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান নিজে ফোন করে অভিনন্দন জানান। অক্টোবরে তুরস্ক থেকে একটি রিফর্ম টিম বাংলাদেশ সফর করে বিভিন্ন খাত পর্যালোচনা করে উন্নয়ন সহযোগিতার প্রস্তাব দেয়, যার পাল্টা হিসেবে বাংলাদেশেরও একটি প্রতিনিধি দল আঙ্কারা সফর করে।
বাংলাদেশ ও তুরস্কের মধ্যে বিদ্যমান ছোট ছোট সমঝোতা স্মারকগুলো (এমওইউ) এক ছাতার নিচে আনতে একটি ‘ডিফেন্স ফ্রেমওয়ার্ক ফর কোঅপারেশন’ স্বাক্ষরের প্রস্তুতি প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে বলে নিশ্চিত করেছে কূটনৈতিক সূত্র।
কূটনৈতিক সূত্র আরও জানায়, বাংলাদেশ সমরাস্ত্র কারখানার (বিওএফ) সক্ষমতা বাড়াতে তুরস্কের সহায়তায় যৌথ উৎপাদন প্রক্রিয়ায় যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে শুধু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ প্রয়োজন নয়, ভবিষ্যতে অস্ত্র বা সামরিক সরঞ্জাম রপ্তানিরও সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশের একজন কূটনীতিক বলেন, ‘বাংলাদেশে এখনো নীতিগতভাবে অস্ত্র বা সামরিক সরঞ্জাম রপ্তানির অনুমতি নেই। তবে এ বিষয়ে রিভিশনের চিন্তা আছে। যদি বাংলাদেশ নিজে অস্ত্র রপ্তানি করে বা এখানে উৎপাদিত অস্ত্র তুরস্ক কিনে বাইরে বিক্রি করে, সেটি আমাদের অর্থনীতির জন্য বড় শক্তি হবে।’
উল্লেখ্য, তুরস্ক বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ প্রতিরক্ষা পণ্য উৎপাদনকারী দেশ। দেশটি ন্যাটো সদস্য হওয়ায় তাদের মান ও প্রযুক্তি আন্তর্জাতিকভাবে উচ্চমানসম্পন্ন।
প্রসঙ্গত আমরা মনে করি, চীনের তুলনায় তুরস্কের সরঞ্জাম কিছুটা ব্যয়বহুল হলেও মান, নির্ভরযোগ্যতা ও আফটার-সেল সার্ভিসে তুরস্কের সহায়তা তুলনাহীন।
বাংলাদেশ-তুরস্ক সম্পর্কের শিকড় মধ্যযুগে গ্রোথিত- যখন বঙ্গীয় ব্যবসায়ী ও প-িতরা সামুদ্রিক পথে অটোমান সাম্রাজ্যের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেন। আধুনিক সম্পর্কের ভিত্তি স্থাপিত হয় ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময়। ১৯৭২ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি তুরস্ক বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়া প্রথম মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর একটি। তুরস্ক তখন মানবিক সহায়তাও পাঠায়।
দুই দেশের মধ্যে সাংস্কৃতিক ঘনিষ্ঠতা, ইসলামী ঐতিহ্য ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোতে (যেমন ওআইসি) পারস্পরিক সমর্থন সম্পর্ককে টিকিয়ে রেখেছে। সাম্প্রতিক দশকগুলোতে উচ্চপর্যায়ের সফর এই সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করেছে। তুরস্কের সাবেক প্রেসিডেন্ট আবদুল্লাহ গুল ২০১০ সালে এবং প্রেসিডেন্ট রেচেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান ২০১৭ ও ২০২১ সালে বাংলাদেশ সফর করেন। এসব সফরে রোহিঙ্গা সংকটসহ মানবিক ইস্যুতে ঐক্য ও সংহতির বার্তা উঠে আসে।
২০২৫ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশ তুরস্কে ৪৭ মিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করে, যা আগের বছরের তুলনায় ২.৬৭% বেশি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-আগস্ট দুই মাসে রপ্তানি হয়েছে ৭৪ মিলিয়ন ডলার।
বাংলাদেশ ও তুরস্কের মানুষে-মানুষে সম্পর্ক প্রাণবন্ত ও আন্তরিক। প্রতিবছর তুরস্কে ১০ হাজারেরও বেশি বাংলাদেশি শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছে। এদের অনেকে ইউনুস এমরে ইনস্টিটিউট ও তুরস্কের সহযোগিতা সংস্থা টিআইকেএ-র বৃত্তিতে পড়াশোনা করছে।
মানবিক সহায়তার ক্ষেত্রেও তুরস্কের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ২০২০ সালের ঘূর্ণিঝড় আমফান ও পরবর্তী বন্যায় তুরস্ক জরুরি সহায়তা পাঠায়। রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য তুরস্কের অব্যাহত সমর্থন বাংলাদেশের কাছে প্রশংসিত। ২০২৫ সালে টিআইকেএ বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে স্কুল ও হাসপাতাল নির্মাণে অর্থায়ন করেছে।
বিশেষজ্ঞ ও খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, তুরস্ক এখন বিশ্বদরবারে নিজেকে পরাশক্তি হিসেবে উপস্থাপন করতে চায়। এজন্য রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা গ্রহণসহ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নানা বিরোধ নিষ্পত্তিমূলক কার্যক্রমে জড়িয়েছে তুরস্ক। সর্বশেষ সিরিয়ায় বাশার আল আসাদ সরকারের পতনের পরও বিষয়টিতে নিজের কৃতিত্ব দাবি করেছে আঙ্কারা। দেশটি এখন বৈশ্বিক ভূরাজনীতিতে নিজের অবস্থানকে আরো গুরুত্ববহ প্রমাণ করতে দক্ষিণ এশিয়ায়ও নিজের প্রভাববলয় আরো জোরদার করতে চাইছে। এরই অংশ হিসেবে বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরো গভীর করতে তৎপরতা বাড়িয়েছে তুরস্ক। আবার ১৮ কোটি মানুষের দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে এখন তুর্কি পণ্যের অত্যন্ত সম্ভাবনাময় বাজার হিসেবেও দেখছে দেশটি।
বিষয়টিকে বাংলাদেশের জন্য বড় সুযোগ হিসেবে দেখছেন আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির বিশ্লেষক ও পর্যবেক্ষকরা। তাদের ভাষ্যমতে, দেশটির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদারের মাধ্যমে এ সুযোগকে কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশের পক্ষেও বাণিজ্যিক ও কৌশলগত সুবিধার নিত্যনতুন ক্ষেত্র তৈরি হবে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা বলেন, ‘দুই দেশের বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এর যতটা উন্মোচন করার কথা, তা হয়নি। আমার কাছে মনে হয় তুরস্কের প্রতিরক্ষা থেকে শুরু করে অনেক কিছুর ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ককে শক্তিশালী করার সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি কৌশলগত বিষয়গুলোও আরো নিবিড় হওয়ার সুযোগ রয়েছে। দুই দেশের মধ্যে এক ধরনের সমঝোতার ক্ষেত্র আছে। ঐতিহাসিকভাবেই তা রয়েছে। সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হলো দেশটি এরই মধ্যে আমাদের প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সংগ্রহের গুরুত্বপূর্ণ ও বিকল্প উৎস হয়ে উঠেছে। এটিকে আরো বেশি উন্নয়নের সুযোগ রয়েছে।’
বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতায় চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, এমনকি ভারতের মতো বৃহৎ অর্থনীতিগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা বাড়বে। ভূরাজনৈতিকসহ বিভিন্ন কারণে তাদের সঙ্গে বাণিজ্যের সম্ভাবনা যেমন আছে, আবার ঝুঁকিও আছে। এসব বিবেচনায় আমাদের দ্বিতীয় বিকল্প হিসেবে কয়েকটি দেশ গুরুত্বপূর্ণ। এর মধ্যে তুরস্ক অন্যতম। এ ধরনের বিকল্প উদীয়মান শক্তিশালী অর্থনীতির দেশগুলোর সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিসহ দীর্ঘমেয়াদি নানা সমঝোতা তৈরি করে অর্থনৈতিক সম্পর্কের পাশাপাশি নিরাপত্তা বা কৌশলগত সম্পর্ককে শক্তিশালী করা সম্ভব। এতে বাংলাদেশের দরকষাকষির সক্ষমতা বাড়বে। প্রচলিত বা শক্তিশালী দেশগুলোর ওপর আমাদের নির্ভরতা কমাতে পারব। একই সঙ্গে ভারতসহ অন্য অংশীদারদের সঙ্গে আমাদের বাণিজ্য কিছুটা হলেও কমানোর পাশাপাশি নতুন দরকষাকষির ক্ষেত্র তৈরি করা সম্ভব। বিশেষ করে আমাদের প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের বাজারে বৈচিত্র্য আনাটা খুবই জরুরি। তুরস্ক সরকার বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককে আরো সম্প্রসারণ করতে চায়। জাতীয় স্বার্থে আমাদেরও এ সুযোগ কাজে লাগানো প্রয়োজন।’
দক্ষিণ এশিয়ায় এতদিন তুরস্কের উল্লেখযোগ্য মাত্রায় ঘনিষ্ঠতা ছিল শুধু পাকিস্তানের সঙ্গে। আর বিগত সরকারের আমলে আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালকে ঘিরে বাংলাদেশের সঙ্গে দেশটির সম্পর্কে অস্বস্তি তৈরি হয়েছিল। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর এ সম্পর্কোন্নয়নের ক্ষেত্র আরো সম্প্রসারণ হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের মধ্যে বেসরকারি পর্যায়েও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সম্পর্ক উন্নয়নের বড় ধরনের প্রয়াস দেখা গেছে। বর্তমানে প্রায় ২০টি বৃহৎ তুর্কি কোম্পানি বাংলাদেশে পোশাক ও বস্ত্র, অ্যাকসেসরিজ, কেমিক্যাল, প্রকৌশল, নির্মাণ ও জ্বালানি খাতে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। আর ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে ঢাকার তুরস্ক দূতাবাসে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে বাংলাদেশের ১১টি ও তুরস্কের ছয়টি কোম্পানির সমন্বয়ে একটি বিজনেস ফোরাম গঠন হয়। মোহাম্মদী গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রুবানা হককে চেয়ারম্যান করে করা বাংলাদেশ তুরস্ক বিজনেস ফোরাম (বিটিবিএফ) শীর্ষক এ ফোরামের সদস্য হিসেবে আছেন দুই দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী ও পেশাজীবীরা।
তাদের অন্যতম ও বিএসআরএম গ্রুপের চেয়ারম্যান বলেন, ‘গত ১৫ বছরে স্টিল ও সিমেন্ট খাত ছাড়া বেসরকারি খাতের উন্নয়নে তেমন কিছু কাজ হয়নি। বহির্বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে এতদিন আমরা ভারতের ওপর অনেক নির্ভরশীল ছিলাম। তুরস্ক দেশ হিসেবে শিল্পায়নে অনেক এগিয়ে। দেশটির সঙ্গে ব্যবসা সম্প্রসারণের অনেক ক্ষেত্র রয়েছে। নতুন নির্বাচিত সরকার এলে দেশটির সঙ্গে সম্পর্ক আরো নিবিড় হবে। তুরস্ক শক্তিশালী দেশ। দেশটির কৌশলগতভাবে সম্পর্ক আরো নিবিড় হলে বাংলাদেশের জন্যই ভালো হবে।’
এ ফোরামের তুর্কি সদস্য ইউনাইটেড আইগ্যাজ এলপিজি লিমিটেডের সিইও হারুন বলেন, ‘তুরস্ক ও বাংলাদেশের মধ্যে অনেক সাদৃশ্য রয়েছে, যার মধ্যে সাংস্কৃতিক বন্ধন, ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং একে অন্যের ঐতিহ্যের প্রতি পারস্পরিক সম্মান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এ সাদৃশ্যগুলো দুই দেশের মধ্যে গভীর ও অর্থবহ সম্পর্ক গড়ার একটি দৃঢ় ভিত্তি তৈরি করছে। তুরস্ক বাংলাদেশের বিষয়ে গভীর জ্ঞান ও বোঝাপড়া রাখে এবং এমন একটি দেশের সঙ্গে দৃঢ় সম্পর্ক বজায় রাখা বিভিন্ন খাতে উন্নত সহযোগিতার দ্বার উন্মুক্ত করে। বাংলাদেশের উদ্যমী এবং যুবসমৃদ্ধ জনসংখ্যার কারণে, আমরা উচ্চমানের পণ্য উৎপাদন এবং শিল্প খাতে আমাদের অবস্থান প্রসারের বিপুল সম্ভাবনা রাখি। তুরস্কের সঙ্গে অংশীদারত্ব আমাদের উদ্ভাবনী উৎপাদন সক্ষমতা, বাংলাদেশীদের জন্য চাকরি ও প্রশিক্ষণের সুযোগ এবং মানবসম্পদ উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করতে পারে। এমন সহযোগিতা বাংলাদেশকে তুর্কি বিনিয়োগের জন্য একটি সম্ভাবনাময় গন্তব্যে রূপান্তর করতে পারে, যা অর্থনৈতিক কর্মকা-কে আরো বৃদ্ধি করবে।’
তুর্কি ব্যবসায়ীদের জন্য এশিয়ার বাজারে কৌশলগত প্রবেশদ্বার হিসেবে বাংলাদেশকে চিহ্নিত করেছেন বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান তিনি টেক্সটাইল, নির্মাণসামগ্রী, ওষুধ ও প্রতিরক্ষাশিল্পে বিনিয়োগের সম্ভাবনার ওপর গুরুত্ব দেন এবং বাংলাদেশে একটি বিশেষ তুর্কি অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের প্রস্তাব দিয়েছেন।
তিনি বাংলাদেশে একটি বিশেষ তুর্কি অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের প্রস্তাব দিয়েছেন, যা বিনিয়োগ ও উৎপাদন কার্যক্রমকে কেন্দ্রীভূত করতে সাহায্য করবে। এর সঙ্গে তুর্কি দক্ষতা যেমন লজিস্টিক, বিমান চলাচল ও সমুদ্রবন্দর ব্যবস্থাপনায়ও ব্যবহার করা সম্ভব।
ঢাকায় তুরস্কের রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশে ব্যবসা-বিনিয়োগ, প্রতিরক্ষাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তুরস্কের সহযোগিতা বৃদ্ধির নানা প্রয়াসে যুক্ত রয়েছেন।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে প্রতিরক্ষা সহযোগিতাকে অন্যতম প্রধান উপাদান।
তুরস্কের রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশের নৌবাহিনীর সরঞ্জাম সরবরাহের দরপত্রে অংশ নিয়েছি। ফ্রিগেট ও কোস্টগার্ডের পেট্রল নৌযান সরবরাহ করতে আমরা তৈরি আছি। এ দেশের প্রকৌশলীদের যুক্ত করে কারিগরি সহায়তার মাধ্যমে খুলনা শিপইয়ার্ড ও চট্টগ্রাম ড্রাই ডকের দুটি দরপত্রে অংশ নিয়েছি। বিমানবাহিনীর সঙ্গে সহযোগিতায় যুক্ত হওয়ার জন্য আলোচনা হচ্ছে।
আরেকটা বিষয় বলতে চাই যে আমাদের সমরাস্ত্রের ৮০ শতাংশই নিজেরা উৎপাদন করি। বাকি ২০ শতাংশ ন্যাটোভুক্ত দেশগুলো থেকে সংগ্রহ করি। আমাদের উৎপাদিত সমরাস্ত্র মান ন্যাটোর সদস্যদেশগুলোর উৎপাদিত অস্ত্রের সমপর্যায়ের। দামও তুলনামূলকভাবে কম। অস্ত্র বিক্রিতে আমরা কোনো রাজনৈতিক শর্ত দিই না।’
তুরস্কের সামরিক বাহিনী বেশ আধুনিক, ফলে দেশটি থেকে প্রশিক্ষণ পাওয়া এবং সমরাস্ত্র কেনা---দু'দিক থেকেই লাভবান হতে পারে বাংলাদেশ।
এছাড়া মুসলিম বিশ্বে তুরস্কের অবস্থান শক্ত করাও একটি বড় লক্ষ্য তুরস্কের কাছে। মুসলিম দেশ হিসেবে বাংলাদেশের সমর্থন আশা করে তুরস্ক।
আর মুসলিম দেশগুলোর সংগঠন ওআইসির নেতৃত্ব এবং ন্যাটোর অংশীদার হিসেবেও সক্ষমতা বাড়ছে তুরস্কের, ফলে একটি প্রভাব বলয় তৈরি করবার প্রচেষ্টা রয়েছে দেশটির।
এখন বিশ্লেষকেরা মনে করেন, এর সঙ্গে দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির দেশ হবার কারণে বাংলাদেশের একটা খ্যাতি আছে, সেই সঙ্গে আঞ্চলিক নানা ইস্যুতে বাংলাদেশ একটি অবস্থান নিতে পেরেছে, যেটি বাংলাদেশের প্রতি তুরস্কের আগ্রহের অন্যতম কারণ।
প্রসঙ্গত আমরা মনে করি, তুরস্কের সঙ্গে বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা দরকার। বাংলাদেশ একটি উদীয়মান দেশ এবং তুরস্ক একটি মধ্যম মানের শক্তি। তুরস্কের প্রতিরক্ষা উৎপাদন ব্যবস্থা ন্যাটোর মানসম্পন্ন এবং এ ক্ষেত্রে সহযোগিতার সুযোগ আছে বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত। তা ছাড়া আমরা যৌথ মিলিটারি সরঞ্জাম উৎপাদন করতে পারি বা তাদের প্রযুক্তি ব্যবহার করে এখানে উৎপাদন করতে পারি। তুরস্কের ড্রোন প্রযুক্তি অত্যন্ত ভালো এবং উদ্যোগ নেয়া হলে পাঁচ বছরের মধ্যে এখানে উন্নত মানের ড্রোন উৎপাদন সম্ভব। কারণ এখানকার যুব প্রকৌশলীর সংখ্যা অনেক বেশি। বিশ্লেষকরা বলছেন, দুই দেশের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা ও সহযোগিতা বৃদ্ধি পাবার পেছনে প্রধান কারণ উভয় দেশের জাতীয় স্বার্থ।
এ ছাড়া ভূরাজনৈতিক অবস্থানের কারণে দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে বাংলাদেশের প্রতি গুরুত্বের বিষয়টিও বড় অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তিগুলোর আগ্রহ তৈরি করেছে, যা বাংলাদেশ-তুরস্কের অভ্যন্তরীণ সম্পর্ক আরও উজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যাবে বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত।
এশিয়া ও ইউরোপের সংযোগস্থলে অবস্থিত তুরস্ক ‘রুগ্নদেশের’ অপবাদ ঘুচিয়ে অনেক আগেই উন্নয়নশীল দেশের শীর্ষ তালিকায় উন্নীত হয়েছে। তাই এ দেশটির সঙ্গে অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লেনদেনের ক্ষেত্রগুলো অনুসন্ধান করে তার সদ্ব্যবহার করতে পারলে বাংলাদেশ লাভবান হতে পারে।
বিশেষ করে বাংলাদেশের রেল ব্যবস্থার উন্নয়ন ও আধুনিকায়নে তুরস্কের প্রযুক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা বাংলাদেশের রেল ব্যবস্থার উন্নতি ঘটতে পারে। নদী ড্রেজিং ও নির্মাণ শিল্পেও তুরস্ক ইউরোপীয় মানের জ্ঞান ও প্রযুক্তি দিয়ে বাংলাদেশকে সহায়তা করতে পারে। উভয় দেশেই উভয়ের জন্য বড় ধরনের বাজার সৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। এগুলোর উদ্ভাবন ও ব্যবহারে দু দেশকেই সচেতন ও আগ্রহী হতে হবে। বিশেষ করে বিদ্যুৎ উন্নয়ন, পরিবহন, তথ্যপ্রযুক্তি, যোগাযোগ এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নে তুরস্ক বাংলাদেশকে অর্থবহ সহায়তা দিতে পারে। এছাড়া জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন, ওআইসিকে শক্তিশালীকরণসহ মুসলিম দেশ হিসেবে একে অপরকে সহযোগিতা দু দেশকেই সমৃদ্ধ করতে পারে ইনশাআল্লাহ।
-আল্লামা মুহম্মদ ওয়ালীউর রহমান আরিফ।
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে না পারার প্রধান কারণ ‘মাফিয়া তান্ত্রিক’ সিন্ডিকেট ব্যবস্থা।
১৫ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
ভারত বাংলাদেশ চুক্তিকে তারা গোলামীর চুক্তি বলে কঠিন আওয়াজ তুলেছিলো! আজ আমেরিকার প্রকাশ্য গোলামী বাণিজ্য চুক্তির বিরুদ্ধে তারা নীরব কেনো? দেশ বিরোধী বাণিজ্য চুক্তির বিরুদ্ধে বৈষম্য বিরোধীরাও নিস্ক্রিয় থেকে কঠিন বৈষম্য করছে।
১৪ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
৫০ লক্ষাধিক বাহিনীর জন্য ড্রোন, কাউন্টার ড্রোন এবং ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ারের কৌশলগত রোডম্যাপ (পর্ব-১২ : ২য় অংশ)
১৩ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
আম রফতানীর বাধা দূর এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতায় গুরুত্ব দিন
১৩ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
৫০ লক্ষাধিক বাহিনীর জন্য ড্রোন, কাউন্টার-ড্রোন এবং ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ারের কৌশলগত রোডম্যাপ (পর্ব-১২ : ১ম অংশ)
১২ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
বর্তমানে সন্ত্রাসী দখলদার ইহুদীদের দ্বারা ফিলিস্তীনীদের উপরে চরম যুদ্ধাপরাধ করার পরও আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্টের প্রকাশ্য ইহুদী ধর্ম গ্রহণ করার পরও কী এদেশের মুসলমানরা আর্জেন্টিনা উন্মাদনায় উন্মত্ত থাকবে? গ্যালারীতে আর্জেন্টিনার সমর্থকরা, মুসলমান বলে মিশরীয় সমর্থকদের উপর মদ ছিটিয়ে ঘৃণা প্রকাশ করেছে।
১২ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
নারিকেল দ্বীপ ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক অস্তিত্বের সংকট
১১ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
রেলে যাত্রীসেবার সাথে সাথে পণ্য পরিবহণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা দিতে হবে।
১১ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
সচেতনতা বনাম আইনি ও সাংবিধানিক বাস্তবতা
১০ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
প্রথম কালো এবং তার সহযোগী তথাকথিত পরিবেশবাদী এবং ‘দালাল- এ ভারতীয় আধিপত্যবাদীরা’- পদ্মা ব্যারাজের বিরোধীতায় নেমেছে।
১০ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
কৌশলগত অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও ভূমি ব্যবস্থাপনা: সচেতনতা বনাম আইনি ও সাংবিধানিক বাস্তবতা
১০ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
যা কিছু ‘কালো’ তার সাথে ‘প্রথম কালো’ প্রথম কালো এবং তার সহযোগী তথাকথিত পরিবেশবাদী এবং ‘দালাল- এ ভারতীয় আধিপত্যবাদীরা’- পদ্মা ব্যারাজের বিরোধীতায় নেমেছে।
১০ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার)












