জীবনী মুবারক
খাদিমু রসূলিল্লাহ সাইয়্যিদুনা হযরত আনাস ইবনে মালিক রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু (৮)
বিলাদত শরীফ: হিজরতপূর্ব ১০ সন বিছাল শরীফ: ৯৩ হিজরী বয়স মুবারক: ১০৩ বছর
, ১০ জুমাদাল ঊলা শরীফ, ১৪৪৮ হিজরী সন, ২৩ খ্বমিছ, ১৩৯৪ শামসী সন , ২২ অক্টোবর, ২০২৬ খ্রি:, ০৬ কার্তিক, ১৪৩৩ ফসলী সন, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) পবিত্র দ্বীন শিক্ষা
ফযীলত ও মর্যাদা:
হযরত ছুমামা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু থেকে বর্ণিত আছে যে, হযরত আনাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি এত দীর্ঘ সময় নামাযে দন্ডায়মান থাকতেন যে, উনার পা মুবারক দু’টি ফেটে রক্ত বের হতো। (সিয়ারু আলামিন নুবালা)
একবার হযরত ইবরাহীম ইবনে রাবীআ’ রহমতুল্লাহি আলাইহি হযরত আনাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার নিকট আসলেন। হযরত আনাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু একখানা কাপড়ের একপাশ পরে অন্য পাশ গায়ে জড়িয়ে নামাযে মশগুল ছিলেন। নামায শেষ হলে হযরত ইবরাহীম রহমতুল্লাহি আলাইহি জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি এভাবে এক কাপড়ে নামায পড়েন? হযরত আনাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বললেন, হ্যাঁ, আমি এভাবে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে নামায পড়তে দেখেছিলাম। (মুসনাদ)
নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পবিত্র জীবনের প্রতিটি আচরণ ও পদক্ষেপ ছিলো হযরত আনাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার জীবন পথের দিশারী। ফরয ছাড়াও ওয়াজিব ও সুন্নত মুবারকসমূহেও নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ছিলেন হযরত আনাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার আদর্শ। তিনি ছোট-বড় সকলকে সালাম করতেন। সবসময় অযু অবস্থায় থাকতেন। তিনি বলতেন, আমাকে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বলেছেন, হে হযরত আনাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু! আপনি যখন ঘর থেকে বের হবেন, তারপর যার সাথে দেখা হবে, সকলকে সালাম করবেন। এতে আপনার নেকী বা মুহব্বত বৃদ্ধি পাবে। আর সম্ভব হলে সবসময় অযু অবস্থায় থাকবেন। কারণ, আপনি জানেন না আপনার মৃত্যু কখন আসবে।
হযরত আনাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি সবসময় হক্ব কথা বলতে কাউকে ছাড়তেন না। একবার উবায়দুল্লাহ ইবনে যিয়াদের (উমাইয়া শাসক) একটি মজলিসে হাউজে কাওছার প্রসঙ্গে আলোচনা হয়। উবায়দুল্লাহ উনার বাস্তবতা সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ করে। এ কথা হযরত আনাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার কানে গেলে তিনি সরাসরি উবায়দুল্লার দরবারে উপস্থিত হয়ে তাকে প্রশ্ন করেন, তোমার এখানে কী হাউজে কাওছার প্রসঙ্গে কিছু আলোচনা হয়েছিলো? উবায়দুল্লাহ বললো, হ্যাঁ; কেন? নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি কী এ সম্পর্কে কিছু বলেছেন? হযরত আনাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি হাউজে কাওছার সম্পর্কে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার পবিত্র হাদীছ শরীফ তাকে শুনিয়ে ফিরে আসেন।
হযরত মুছআব ইবনে উমাইর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি একজন আনছারী ব্যক্তির ষড়যন্ত্রের রিপোর্ট পেলেন। এই অপরাধের জন্য তিনি লোকটিকে পাকড়াও করার চিন্তা করলেন। লোকেরা হযরত আনাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনাকে কথাটি জানালেন। তিনি সোজা হযরত মুছআব রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার নিকট গিয়ে বললেন, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি আনছারদের প্রতি ভাল ব্যবহার করার জন্য আমীরদের ওছীয়ত করেছেন। উনাদের ভাল লোকদের সাথে উত্তম আচরণ এবং খারাপ লোকদের ক্ষমা করতে বলেছেন। এই পবিত্র হাদীছ শরীফ শুনামাত্র হযরত মুছআব ইবনে উমাইর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু খাট থেকে নীচে নেমে এসে মাটিতে কপাল ঠেকিয়ে বললেন, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার আদেশ মুবারকের স্থান আমার চোখের উপর। আমি লোকটিকে ছেড়ে দিচ্ছি।
হযরত আনাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার ছাত্র হযরত ছাবিত বনানী রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন, একদিন আমি বছরার ‘যাবিয়া’ নামক স্থানে হযরত আনাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার সঙ্গে চলছিলাম। এমন সময় আযান শোনা গেলো। সাথে সাথে হযরত আনাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু মন্থর গতিতে চলতে শুরু করলেন এবং এভাবে আমরা মসজিদে প্রবেশ করলাম। তারপর তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কী বলতে পারো, কেন আমি এভাবে হেঁটে মসজিদে আসলাম? তারপর নিজেই বললেন, নামাযের জন্য আমার পদক্ষেপ যাতে বেশী হয়, সেই জন্য। (হায়াতুছ ছাহাবা)
হযরত আনাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু ইলিম হাছিলের চেয়ে অর্জিত ইলিম অনুযায়ী আমলের উপর বেশী জোর দিতেন। তিনি বলতেন, যত ইচ্ছা ইলিম বা জ্ঞান হাছিল করো। তবে মহান আল্লাহ পাক উনার কসম! আমল না করলে সেসব ইলিমের প্রতিদান দেয়া হবে না। তিনি আরো বলতেন, প্রকৃত আলিম উনার কাজ হচ্ছে বুঝা ও সেই অনুযায়ী কাজ করা। আর মূর্খদের কাজ শুধু বর্ণনা করা। (হায়াতুছ ছাহাবা)
হযরত আনাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সুন্নত মুবারকের প্রতি অপরিসীম গুরুত্ব দিতেন। এ সম্পর্কে তিনি নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার হাদীছ শরীফ বর্ণনা করেছেন।
নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন, যে ব্যক্তি আমার সুন্নত মুবারক ছেড়ে দিবে, সে আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়। নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি আরো ইরশাদ মুবারক করেন, যে আমার সুন্নত মুবারক অনুসরণ করবে, সে আমার দলভুক্ত। (হায়াতুছ ছাহাবা)
হযরত আনাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার ব্যবহƒত বেশ কিছু সামগ্রী মুবারক স্মৃতি হিসাবে সংরক্ষণ করেছিলেন, যেমন: মহাসম্মানিত নূরুল ফখর মুবারক অর্থাৎ না’লাইন, সেন্ডেল বা জুতা মুবারক, একটি চাদর মুবারক, একটি পেয়ালা মুবারক, তাঁবুর কয়েকটি খুঁটি ইত্যাদি।
হযরত আনাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলতেন, আমার মাতা হযরত উম্মে সুলাইম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা তিনি ইন্তিকালের সময় আমার জন্য রেখে যান নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার একটি চাদর মুবারক, একটি পিয়ালা মুবারক যাতে তিনি পানি পান করতেন, তাঁবুর কয়েকটি খুঁটি মুবারক এবং একটি শীলা মুবারক যার উপর আমার মাতা হযরত উম্মে সুলাইম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মহাসম্মানিত নূরুত ত্বীব মুবারক অর্থাৎ ঘাম মুবারক মিশিয়ে সুগন্ধি পিষতেন। সুবহানাল্লাহ!
সূত্র: উসুদুল গাবা, ইছাবা, হায়াতুছ ছাহাবা, সিয়ারু আলামিন নুবালা, সীরতে ইবনে হিশাম, মুসনাদ, অন্যান্য সীরাত ও ইতিহাস গ্রন্থ। (সমাপ্ত)
-আল্লামা সাঈদ আহমদ গজনবী।
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
মহাসম্মানিত সুন্নত তরীক্বায় দোয়ার খাযীনাহ (২৪)
২২ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
বেপর্দা হওয়া লা’নত ও হালাকীর কারণ
২২ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
সাইয়্যিদুনা হযরত সুলত্বানুন নাছীর আলাইহিস সালাম উনার পবিত্র ওয়াজ শরীফ
২২ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র হাদীছ শরীফ উনাদের দৃষ্টিতে পবিত্র যিকির উনার গুরুত্ব ও ফযীলত (২)
২১ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
অসংখ্য হাদীছ শরীফ দ্বারা প্রমাণিত- প্রাণীর ছবি হারাম
২১ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
সাইয়্যিদুনা হযরত সুলত্বানুন নাছীর আলাইহিস সালাম উনার পবিত্র ওয়াজ শরীফ
২১ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
মূর্তি নির্মাণ করা এবং নির্মাণে সমর্থন করা ও এর সাথে সশ্লিষ্টতা হারাম ও কুফরী (১৩)
২০ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
পর্দা রক্ষা করা ফরজ, বেপর্দা হওয়া ব্যভিচারের সমতুল্য
২০ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
সাইয়্যিদুনা হযরত সুলত্বানুন নাছীর আলাইহিস সালাম উনার পবিত্র ওয়াজ শরীফ
২০ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
প্রত্যেক মু’মিন মুসলমানকে কাফির-মুশরিকদের অনুসরণ থেকে দূরে থাকতে হবে
২০ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসী ইহুদী-খ্রিস্টানদের নজরদারী, তথ্যচুরি, ফিৎনা সৃষ্টিকারী, সন্ত্রাস সৃষ্টিকারী এবং বিমান হামলার কাজে ব্যবহৃত সন্ত্রাসী আমেরিকা ভিত্তিক মুসলিম বিদ্বেষী এক তথ্যজালিকা (৪)
২০ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
পবিত্র নামাযের মাসয়ালা-মাসায়িল
১৯ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার)












