উপকূল হারিয়ে বস্তিতে ঠাঁই, খুলনায় বাড়ছে বাস্তুচ্যুতদের দীর্ঘশ্বাস
একসময় নদীর পাড়ে নিজেদের ঘর, চাষের জমি ও জীবিকার নিশ্চয়তা থাকলেও ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন আর লবণাক্ততা সেসব গিলে খেয়েছে। বাঁচার শেষ আশায় হাজারো মানুষ ছুটে আসছেন খুলনা শহরে। কিন্তু শহরও তাদের জন্য খুলে দিতে পারেনি নিরাপদ আশ্রয় বা নিশ্চিত ভবিষ্যতের দরজা। ফলে উপকূল হারানোর পর বস্তির অন্ধকার গলিতেই শুরু হয়েছে জলবায়ু বাস্তুচ্যুত মানুষের নতুন জীবনসংগ্রাম।
, ২১ ছফর শরীফ, ১৪৪৮ হিজরী সন, ০৬ ছালিছ, ১৩৯৪ শামসী সন , ০৫ আগস্ট, ২০২৬ খ্রি:, ২১ শ্রাবণ, ১৪৩৩ ফসলী সন, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) তাজা খবর
প্রাকৃতিক দুর্যোগ, নদীভাঙন, লবণাক্ততা ও কর্মসংস্থানের সংকটে খুলনার উপকূলীয় এলাকা থেকে প্রতিনিয়ত মানুষ ছুটছেন শহরের দিকে। টিকে থাকার শেষ আশ্রয় হিসেবে বেছে নিচ্ছেন খুলনা মহানগরের বস্তিগুলো। তবে শহরে এসেও মিলছে না নিরাপদ আবাসন, স্থায়ী কাজ কিংবা সামাজিক সুরক্ষা। ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছেন উপকূল হারানো এসব মানুষ।
কয়রা উপজেলার মহারাজপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা রহিমা বেগম বলেন, ‘আমাদের তিনবার ঘর নদীতে গেছে। শেষবার আর থাকার মতো জায়গা ছিল না। জমিতে লবণ উঠে গেছে, চাষ হয় না। সব সময় আতঙ্কে থাকি, এখন যেখানে আছি, সেখান থেকেও হয়তো চলে যেতে হতে পারে। বাড়িঘর ভেঙে যাওয়ায় আমাদের আশপাশ থেকে বহু মানুষ শহরে চলে গেছে।’
দাকোপ উপজেলার পানখালি ইউনিয়নের বাসিন্দা রফিক মোড়ল বলেন, ‘বছরের অধিকাংশ সময় কৃষিজমি পানির নিচে তলিয়ে থাকে। লবণ পানি প্রবেশ করায় বাকি সময়ও খুব একটা জমিতে ফসল ফলে না। ফলে আমাদের কৃষি কাজ নেই বললেই চলে। ফসল ফলাতে পারছি না। আগের তুলনায় ফসলের উৎপাদন প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। এভাবে চলতে থাকলে আমাদের নিজেদের বাড়িঘর ছেড়ে কাজের খোঁজে শহরেই যেতে হবে।’
উপকূল ছেড়ে আসা জলবায়ু বাস্তুচ্যুত মানুষের বড় একটি অংশ এখন খুলনা শহরের শতাধিক বস্তিতে বসবাস করছে। কেউ দিনমজুর, কেউ রিকশাচালক, কেউ গৃহকর্মী কিংবা ক্ষুদ্র ব্যবসার মাধ্যমে কোনোমতে জীবন চালাচ্ছেন। শহরের স্থায়ী পরিচয়পত্র না থাকায় অনেকেই সরকারি বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, অনিশ্চিত আয় এবং মৌলিক নাগরিক সুবিধার অভাব তাদের জীবনকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।
দাকোপ উপজেলার আমজাদ হোসেন বলেন, ‘উপকূলে থাকলে অন্তত নিজের জমি ছিল। এখন শহরে ভাড়া ঘরে থাকি। কখন কাজ থাকে, কখন থাকে না। ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা চালানোও কঠিন হয়ে গেছে। কিন্তু ফিরে যাওয়ার মতো পরিবেশও আর নেই।’
পাইকগাছা থেকে পাঁচ বছর আগে খুলনায় আসা হাসিনা খাতুন বলেন, ‘ঘূর্ণিঝড়ের পর সবকিছু শেষ হয়ে যায়। প্রথমে আত্মীয়ের বাড়িতে ছিলাম, পরে বস্তিতে উঠি। এখানে পানির সমস্যা, ড্রেনেজ সমস্যা, নিরাপত্তার অভাব-সবকিছু নিয়েই কষ্ট। তারপরও বেঁচে থাকার জন্য এখানেই থাকতে হচ্ছে।’
বাস্তুচ্যুত মানুষদের নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, খুলনা মহানগরের বস্তিগুলোর প্রায় ৭০ শতাংশ বাসিন্দাই দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় এলাকা থেকে আসা জলবায়ু অভিবাসী। গত ১০ বছরে খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটের উপকূল ছেড়ে অন্তত ৩০ হাজার পরিবার এসব বস্তিতে আশ্রয় নিয়েছে।
কারিতাস খুলনার আঞ্চলিক পরিচালক অ্যালবিনো নাথ বলেন, ‘জলবায়ু বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা প্রতিবছর বাড়ছে। তারা শুধু আশ্রয় হারাচ্ছেন না, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তার মতো মৌলিক অধিকার থেকেও পিছিয়ে পড়ছেন। তাই বিষয়টিকে মানবিক সহায়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা ও আইনি সুরক্ষার আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি উপকূলে টেকসই জীবিকার সুযোগ তৈরি করা জরুরি।’
খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) ইনস্টিটিউট অব ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্টের সহকারী অধ্যাপক ড. মো. ইসমাইল হোসেন বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট এই অভিবাসন এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; এটি একটি চলমান বাস্তবতা। তাই শুধু শহরে আশ্রয়ের ব্যবস্থা করলেই হবে না। উপকূল এলাকায় দুর্যোগ সহনশীল অবকাঠামো, বিকল্প কর্মসংস্থান এবং দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হবে। নীতিনির্ধারণে জলবায়ু বাস্তুচ্যুত মানুষকে আলাদা গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু শহরে বস্তির সংখ্যা বাড়তে দেয়া নয়, উপকূলে মানুষের টিকে থাকার পরিবেশ তৈরি করাই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর সমাধান। কর্মসংস্থান, টেকসই পুনর্বাসন, নদীভাঙন ও লবণাক্ততা মোকাবিলা এবং দুর্যোগের ক্ষতি কমাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন না হলে জলবায়ু বাস্তুচ্যুত মানুষের এই স্রোত আগামী দিনগুলোতে আরও বাড়বে।
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
মেঘনায় গোসলে নেমে নিখোঁজ ৩ স্কুলছাত্রের লাশ উদ্ধার
২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
ন্যাম ভবন থেকে জামাত এমপি গাজী নজরুলের কথিত স্ত্রীর মরদেহ উদ্ধার!
২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
বিধবা স্ত্রী বা বিপত্নীক স্বামী আবার বিয়ে না করার শর্তে আজীবন পেনশন পাবেন
২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
ফাতেহা-ই-ইয়াজদহম ছুটির তালিকা সংশোধন
২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
ইলিয়াস মোল্লাসহ ৫০ জনের বিরুদ্ধে মামলা
২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
পেনশনভোগীদের সার্ভার অদৃশ্য মাফিয়ার নিয়ন্ত্রণে
২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
মাদকের টাকার জন্য শিশুকে বিক্রির চেষ্টা -৯৯৯-এ ফোন পেয়ে উদ্ধার
২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
অপ্রাপ্তবয়স্কদের হ্যান্ডসেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নীতিমালা জরুরি
২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
অর্থনৈতিক প্রশাসনে বহাল পুরনো বলয়
২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
বেতন বাড়ল সরকারি চাকরিজীবীদের, বেসরকারি খাতে চ্যালেঞ্জ!
২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
প্রধানমন্ত্রী যুক্তরাষ্ট্র যাচ্ছেন আজ -জাতিসংঘে ভাষণ ২৪ সেপ্টেম্বর
২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্রদের বড় ধরনের নতুন হামলার প্রস্তুতি, কঠোর হুঁশিয়ারি ইরানের
২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার)












