ইউরোপের সর্বশেষ ইসলামী দুর্গ স্পেনে কী দেখেছিলেন ইবনে বতুতা?
, ১৫ ছফর শরীফ, ১৪৪৮ হিজরী সন, ৩১ ছানী, ১৩৯৪ শামসী সন , ৩০ জুলাই, ২০২৬ খ্রি:, ১৫ শ্রাবণ, ১৪৩৩ ফসলী সন, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) স্থাপত্য নিদর্শন
শান্ত ও নিরিবিলি তানজিয়ার শহর থেকে হজের উদ্দেশ্যে বের হয়েছিলেন যুবক ইবনে বতুতা। এরপর চষে বেড়িয়েছেন প্রাচীন বিশ্বের সব মহাদেশ। একে একে ভ্রমণ করেছেন উত্তর আফ্রিকা, মিশর, হিজাজ, আরব উপদ্বীপ, ইরাক, শাম (সিরিয়া), ইরান, ভারত মহাসাগর, ভারত, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, চীন। আনাতোলিয়া, রাশিয়া, পশ্চিম আফ্রিকা ও আন্দালুসও ভ্রমণ করেন তিনি।
সুদীর্ঘ প্রায় ত্রিশ বছর বিশ্ব ভ্রমণের পর নিজ জন্মভূমির জন্য ব্যাকুল হয়ে অবশেষে ৭৫০ হিজরীর শা’বান মাসে (নভেম্বর ১৩৪৯ খ্রিস্টাব্দ) এই পর্যটক তার শৈশবের স্মৃতিবিজড়িত মরক্কোতে ফিরে আসেন।
আন্দালুসের পথে:
ইবনে বতুতা যখন ইউরোপের সর্বশেষ ইসলামিক ঘাঁটি আন্দালুস ভ্রমণ করেন, তখন কাস্টিলিয়ান ক্যাথলিকদের শাসক একাদশ আলফোনসো মারা যায়, যে কয়েক মাস ধরে জিব্রাল্টার অবরোধ করে রেখেছিলো। তৎকালীন সময়ে জিব্রাল্টারের পতন ঘটার অর্থ ছিলো সমগ্র দক্ষিণ আন্দালুসের দ্রুত পতন এবং মরক্কোর উত্তরাঞ্চলের জন্য সরাসরি হুমকি। ফলে তার মৃত্যুতে আন্দালুসবাসী স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে।
ইবনে বতুতা তার বর্ণনায় লিখেছেন, ‘অতঃপর আল্লাহ তাকে এমনভাবে ধরলেন যা সে ভাবতেও পারেনি এবং সে মহামারীতে আক্রান্ত হয়ে মারা গেলো, যাকে সে সবচেয়ে বেশি ভয় পেতো।’
তার মৃত্যুর পর তিনি জিব্রাল্টারে প্রবেশ করেন এবং সেখানে মরক্কোর প্রাচীন সুলতানদের, বিশেষ করে মুওয়াহহিদুন সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা আবদুল মুমিন ইবনে আলীর তৈরি করা প্রাচীন দুর্গ ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দেখতে পান।
জিব্রাল্টার নিরাপত্তা জোরদার:
এর কয়েক দশক পর, আবু আল-হাসান আল-মারিনি এবং তার পুত্র আবু ইনান আল-মুতাওয়াক্কিল আল-মারিনি জিব্রাল্টার শহর, এর দুর্গ ও বাসিন্দাদের নিরাপত্তা আরও জোরদার করার উদ্যোগ নেন। এই পাহাড়কে তখন জাবালুল ফাতহ (বিজয়ের পাহাড়) বলা হতো। কারণ তারা বুঝতে পেরেছিলেন যে, এই পাহাড়ের স্ট্র্যাটেজিক গুরুত্ব অপরিসীম এবং এর পতন হলে মরক্কোর পতন অনিবার্য।
জিব্রাল্টার ত্যাগ করার পর ইবনে বতুতা রন্ডা শহরের দিকে রওনা হন, যা ছিলো মুসলমানদের অন্যতম সুরক্ষিত দুর্গ এবং সবচেয়ে সুন্দর শহর। তখনকার সময়ে এই শহরের প্রধান সেনাপতি ছিলেন শেখ আবু আল-রবি সুলাইমান ইবনে দাউদ আল-আসকারি এবং কাজী ছিলেন ইবনে বতুতার চাচাতো ভাই ফকিহ আবু আল-কাসিম মুহাম্মদ ইবনে ইয়াহইয়া ইবনে বতুতা। শহরের অন্যান্য গণ্যমান্য ব্যক্তি ও সেনাপতিরা তাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান এবং তিনি সেখানে পাঁচ দিন অবস্থান করেন।
মালাগা শহরে...
এরপর তিনি মারবেলা শহরের দিকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, যা বর্তমান স্পেনে এবং সারাবিশ্বে অন্যতম বিখ্যাত পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। সেখান থেকে একদল অশ্বারোহী সেনার সাথে তিনি মালাগা শহরের উদ্দেশ্যে রওনা হতে চেয়েছিলেন, কিন্তু কোনো এক কারণে তিনি তাদের চেয়ে কিছুটা পিছিয়ে পড়েন।
এই পিছিয়ে পড়াই শেষ পর্যন্ত তার জীবন বাঁচায় অথবা বন্দী হওয়া থেকে রক্ষা করে। কারণ তারা যখন সুহাইল নামের একটি শহরে পৌঁছায়-যাকে ইতিহাসবিদ হুসাইন মুনিস মালাগা উপকূলে অবস্থিত স্পেনের ফুয়েনহিরোলা শহর হিসেবে চিহ্নিত করেছেন- তখন কাস্টিলিয়ান শত্রুরা সেখানে ওঁত পেতে থেকে তাদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। হামলায় তাদের একজন নিহত হয়, একজন পালিয়ে যেতে সক্ষম হয় এবং বাকিরা বন্দী হয়। এই ঘটনার পর ইবনে বতুতা নিরাপদে মালাগাতে পৌঁছাতে সক্ষম হন।
মালাগার বর্ণনা দিয়ে তিনি লিখেছেন, ‘এটি আন্দালুসের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র এবং একটি দৃষ্টিনন্দন শহর, যা স্থল ও নৌপথের সব সুবিধা দ্বারা সমৃদ্ধ। এখানে প্রচুর পরিমাণে ফলমূল ও নিয়ামত রয়েছে। আমি এখানকার বাজারে এক দিরহামের বিনিময়ে আট রতল আঙুর বিক্রি হতে দেখেছি। এখানকার ইয়াকুত পাথরের মতো লাল ডালিমের কোনো তুলনা দুনিয়াতে নেই। আর ডুমুর ও কাঠবাদাম এখান এবং এর আশপাশ থেকে পূর্ব ও পশ্চিমের দেশগুলোতে রপ্তানি করা হয়।’
মালাগার মসজিদে...
শহরটি ঘুরে দেখার সময় তিনি সেখানকার প্রধান মসজিদে প্রবেশ করেন। সেখানে তিনি খতীব আবু জাফর বিন আব্দুল্লাহ আল-তানজালি এবং শহরের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের জড়ো হতে দেখেন। তারা কাস্টিলিয়ান শত্রুদের হাতে বন্দী হওয়া মুসলিমদের মুক্ত করার জন্য যাকাত সংগ্রহ করছিলেন, যাদের মধ্যে কিছুকাল আগে বন্দী হওয়া সেই অশ্বারোহী সেনাদলটিও ছিলো। তা দেখে তিনি খতীব ও উপস্থিত সবার উদ্দেশ্যে উচ্চস্বরে বললেন, ‘সমস্ত প্রশংসা সেই রব তায়ালার, যিনি আমাকে সুস্থ ও নিরাপদ রেখেছেন এবং তাদের অন্তর্ভুক্ত করেননি!’
ইবনে বতুতা মালাগা শহরে যা দেখেছিলেন তার বিবরণ দিতে গিয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শনগুলোর পরিচয় তুলে ধরে বলেন, ‘মালাগাতে চমৎকার সোনালী মাটির পাত্র তৈরি করা হয় এবং তা সুদূর দেশগুলোতে পাঠানো হয়। সেখানকার মসজিদের আঙিনা অত্যন্ত বিশাল ও বরকতময় এবং এর ভেতরের অংশটি সৌন্দর্য্যে অতুলনীয়, যেখানে দূর-দূরান্তের কমলার গাছ রয়েছে।’
আন্দালুসের দুর্গ:
মালাগা থেকে তিনি উত্তরের বাল্লাশ অভিমুখে এগিয়ে যান, যা বর্তমানে ভেলেজ-মালাগা নামে পরিচিত। তৎকালীন সময়ে এটি ছিলো বৃহত্তর গ্রানাডার অধীনস্থ অন্যতম শহর। এরপর তিনি রওনা হন আল-হাম্মার উদ্দেশ্যে, যা একটি ছোট শহর হলেও এর মসজিদটি অত্যন্ত চমৎকার কারুকার্যময় ও চমৎকার স্থাপত্যের এবং যার নদীর তীরে একটি উষ্ণ পানির ঝরনা রয়েছে। সে সময়ে এটি গ্রানাডা থেকে এক মাইল দূরত্বে অবস্থিত ছিলো।
গ্রানাডায়...
সেখান থেকে তিনি আন্দালুসে ইসলামের শেষ রাজধানী গ্রানাডায় প্রবেশ করেন। এই শহরের বাইরের পরিবেশ সম্পর্কে তিনি লিখেছেন, ‘দুনিয়ার অন্য কোনো শহরের সাথেই এর তুলনা চলে না। এটি চল্লিশ মাইল দীর্ঘ এক পথ, যা শেনিল নদীসহ আরও অনেক নদী, বাগান, উদ্যান, কানন, প্রাসাদ ও আঙুর বাগান দিয়ে চারদিক থেকে বেষ্টিত। এখানকার অন্যতম এক বিস্ময়কর স্থান হলো আইনুদ দাম (অশ্রু ঝরণা); এটি মূলত এমন এক পাহাড়, যা উদ্যান ও বাগানে ঘেরা এবং যার কোনো দ্বিতীয় নজির কোথাও নেই।’
গ্রানাডায় প্রবেশের পর ইবনে বতুতা সেখানকার তৎকালীন বনু আহমার বংশের সুলতানের কথা উল্লেখ করতে ভুলেননি। তিনি লিখেছেন, ‘আমি যখন গ্রানাডায় প্রবেশ করি, তখন সেখানকার শাসক ছিলেন সুলতান আবু আল-হাজ্জাজ ইউসুফ বিন সুলতান আবি আল-ওয়ালিদ ইসমাইল ইবনে ফারাজ ইবনে ইসমাইল ইবনে ইউসুফ ইবনে নাসর। কিন্তু তার অসুস্থতার কারণে আমি তার সাথে সাক্ষাৎ করতে পারিনি। তবে তার সৎ ও মহীয়সী মাতা আমার জন্য কিছু স্বর্ণমুদ্রা পাঠিয়েছিলেন, যা পরবর্তীতে আমার অনেক উপকারে এসেছিলো।’
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
কালকিনির মসজিদ বাইতুর রাইয়ান, যার সৌন্দর্য মুগ্ধ করে দর্শনার্থীদের
২৯ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
প্রসঙ্গ মূর্তি-ভাস্কর্য দ্বীন ইসলামে নিষিদ্ধ (৫)
২৯ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
ভারতের মালদহর ঐতিহাসিক তাঁতীপাড়া মসজিদ
২৭ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
ফ্রান্সের ইতিহাসে মুসলিম অবদানের এক জীবন্ত দলিল
২১ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
তাজ-উল-মসজিদ ভারতের সর্ববৃহৎ মসজিদ
১৮ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
সুনামগঞ্জে কালের সাক্ষী শত বছরের পুরনো ঐতিহ্যবাহী পাগলা বড় মসজিদ
১৫ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
মোঘল শাসক আওরঙ্গজেবের শাসনামল নিয়ে প্রচলিত ভাষ্য বদলে দিতে পারে ৩০০ বছর আগের নথি
১৪ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
উমাইয়া আমলের মুসলিম স্থাপত্য ‘কুসাইর আমরা দুর্গ’
১৩ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
আফ্রিকার দেশ ঘানার ঐতিহাসিক স্থাপত্য ‘লারাবাঙ্গা মসজিদ’
০৬ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
বন্দরের ঐতিহাসিক নিদর্শন হযরত বাবা সালেহ রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার মাজার শরীফ
০১ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
পবিত্র মসজিদে জুমুয়াহ
১৯ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
সম্মানিত ইসলামী সভ্যতার অনবদ্য নিদর্শন নাফত বা পেট্রোলিয়াম
১০ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার)












