বাংলার মুসলিম কৃষকদের উপর হিন্দু জমি দখলদারদের জুলুমের ইতিহাস (পর্ব ১১)
, ১৫ যিলক্বদ শরীফ, ১৪৪৬ হিজরী সন, ১৫ ছানী আ’শার, ১৩৯২ শামসী সন , ১৪ মে, ২০২৫ খ্রি:, ১ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩২ ফসলী সন, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) ইতিহাস
উগ্র হিন্দু জমি দখলদার সুদ ব্যবসায়ী কৃষ্ণ চন্দ্র ও তার পুত্র মুসলমান কৃষকদের উপরে গুলি বর্ষণ করে নির্বিচারে শহীদ করতো। মুসলমানদের কপালে বন্দুকের নল ঠেকিয়ে তৃপ্তি ও বিদ্রুপাত্মক হাসি হাসতো মুসলিম মালিকানাধীন জমি দখলদার উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা।
রক্ষণশীল পত্রিকা হিন্দু রঞ্জিকা ‘র’ এক মন্তব্য প্রকাশে উঠে এসেছে, ‘ব্রিটিশ শাসনের অধীনে আমরা অত্যন্ত আনন্দিত। ’
হিন্দু জমি দখলদারদের অত্যাচারে বাংলার অনেক মুসলমান নিজেদের ভিটে-মাটি ত্যাগ করতে বাধ্য হয়। ........আর সে সময় হিন্দুরা ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণ করে ইংরেজকে তোষামোদ করে ব্রিটিশদের কিছু হলেও খুশি করতে সমর্থ্য হয়েছিলো।
বাংলা ভাগ হল (হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা ও দেশ বিভাগ ১৯৩২-১৯৪৭) জয়া চ্যাটার্জী তার বইয়ের ৯৯ পৃষ্ঠায় বলেছে, “খাজনা না দেওয়ার খারাপ (বর্ণ হিন্দু সাম্প্রদায়িক জমি দখলদারদের নির্যাতনের কারণে) মানসিক অবস্থা সারা বাংলায় ছড়িয়ে পড়ার পর ১৯০৩ সাল নাগাদ পূর্বাঞ্চলের জেলাগুলোর হিন্দু সম্প্রদায় ঐ আন্দোলন এসবের বিরুদ্ধে উৎকন্ঠা প্রকাশ করতে শুরু করে। খাজনা পরিশোধে বাধ্য করার জন্য অনেক জমি দখলদার আদালতের শরণাপন্ন হয়, অন্যরা বল প্রয়োগের মাধ্যমে খাজনা আদায়ের জন্য অবৈধ পন্থা অবলম্বন করে, অবাধ্য কৃষকদের ভূমি থেকে উচ্ছেদ করার জন্য লাঠিধারী পাইক নিয়োগ করে। একাধিক উচ্ছেদ মামলা দায়ের করে হুগলীর জমিদাররা খাজনার জন্য তাদের প্রজাদের উপর অবৈধ চাপ প্রয়োগ করে বলে জানা যায়।
সালতোরা থানায় অবিলম্বে খাজনা পরিশোধে বাধ্য করতে স্থানীয় জমি দখলদাররা তাদের প্রজাদের ধান কাটা থেকে বিরত রাখার জন্যে বরকন্দাজ নিয়োগ করলে, বাঁকুড়া জেলার জমি দখলদার ও প্রজাদের মধ্যকার সম্পর্কের অবনতি ঘটে। জমি দখলদার হিন্দু এবং প্রজা মুসলমান হলে এ ধরনের ঘটনা সাম্প্রদায়িক ঘটনা বলে দৃঢ়তার সঙ্গে চিহ্নিত করা হতে থাকে।
ধানের কর্জ সম্পর্কিত ব্যাপারে এক হিন্দু জমি দখলদার একজন মুসলমান প্রজাকে আক্রমণ করতে তার মুসলমান বরকন্দাজকে নির্দেশ দিলে গোলযোগ শুরু হয়। একজন মুসলমান প্রজার বিরুদ্ধে খাস জমির অধিকার প্রাপ্তির ভিত্তি পাওয়ার পর এক হিন্দু জমি দখলদার বিরোধপূর্ণ জমিতে নির্মিত মসজিদ ভেঙে ফেলার হুমকি দিলে হাওড়ায় এক ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটে। পশ্চিম বাংলার জেলাগুলোতে জমি দখলদার ও তাদের প্রজাদের মধ্যে অত্যন্ত তিক্ততাপূর্ণ বিরোধ দেখা দেয়। কিন্তু উত্তর ও পূর্ব বাংলার পাট উৎপাদনের বিভিন্ন জেলায় হিন্দু সুদ ব্যবসায়ীরাই আক্রমণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।
......... পাওনা খাজনা সম্পূর্ণ মাফ করার জন্য স্থানীয় কৃষক সমিতি পরিচালিত আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ঐ আক্রমণ চালানো হয়। মুসলমান স্বেচ্ছাসেবকেরা একটা ছাপানো ঘোষণাপত্র প্রচার করে; ঐ ঘোষণা পত্রের বক্তব্য ছিলো, “কৃষকেরা দেশ ও দেশের সম্পদের মালিক না হওয়া পর্যন্ত শান্তি আসবে না। ”
সমগ্র উপমহাদেশের ন্যায় বাংলার পূর্বাঞ্চলের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনসাধারণ ছিলো অনগ্রসর, ঈঙ্গ-হিন্দু শোষণ আর জুলুমে নিঃশেষিত তৃতীয় শ্রেণীর নাগরিক।
উইলিয়াম হান্টার তাই তার বিখ্যাত ‘ইন্ডিয়ান মুসলমানস’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছে, “খুব কম সরকারি অফিস আছে, যেখানে মুসলমানরা পাহারাদার, সংবাদ বাহক, দোয়াত সংরক্ষক নয়তোবা কলম মেরামতকারীর ঊর্ধ্বে কোনপদ আশা করতে পারে..”। অর্থাৎ মুসলমানদের জন্য কোন ধরণের উচ্চ পদ ছিলো না। মুসলমানরা আশাও করতে পারতো না।
হিন্দু জমি দখলদারগণ এ অঞ্চলের প্রজাদের শোষণ করে সে শোষণলব্ধ অর্থ কলকাতায় বসে বিলাসিতায় উড়াতো। প্রজাদের শিক্ষা-দীক্ষা, সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য এবং নানাবিধ মৌলিক অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধার ব্যাপারে তারা ছিলো চরম উদাসীন। এক কথায় বঙ্গবিভাগের আগে ঢাকাকেন্দ্রিক পূর্ববঙ্গ ছিলো কলকাতাকেন্দ্রিক তথাকথিত প্রগতি বঙ্গের “লুণ্ঠনক্ষেত্র”। পূর্বের কাঁচামালে পশ্চিমে গড়ে উঠেছিলো শিল্প-কারখানা, পূর্ব বাংলাকে লুণ্ঠন করে পশ্চিম বাংলায় এনেছিলো রেনেসাঁ, সেখানে গড়ে তোলা হয়েছিলো স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও হাসপাতাল। প্রতিবেশী হিন্দু সম্প্রদায়ের যে চরম সাম্প্রদায়িক ও বীভৎসরূপ তারা প্রত্যক্ষ করে যার ফলে তাদের মধ্যে স্বতন্ত্র জাতিসত্ত্বার চেতনা বদ্ধমূল হতে থাকে এবং মুসলমান কৃষকদের মধ্যে বর্ণ হিন্দু জমি দখলদারদের নির্যাতন অত্যাচার জুলুমের বিরুদ্ধে বিভিন্ন এলাকায় আন্দোলন দানা বাঁধতে থাকে।
বাংলা ভাগ হল (হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা ও দেশ বিভাগ ১৯৩২-১৯৪৭) জয়া চ্যাটার্জী তার বইয়ের ১০০ পৃষ্ঠায় আরও বলেছে, অতীতে মুসলমান কৃষক ও হিন্দু জমি দখলদারদের মধ্যে গোলযোগ অবশ্যই ছিলো। কিন্তু ঐ সব গোলযোগের সঙ্গে বিশেষ সাম্প্রদায়িকতার সম্পর্ক ছিলো না। কিন্তু হিন্দুরা নিশ্চিতভাবে মুসলমান কৃষকদের আক্রমণকে সাম্প্রদায়িক উদ্দেশ্যে প্রণোদিত বলে ব্যাখ্যা করতো। স্থানীয় হিন্দুদের ওপর গোঁড়া মুসলমানদের এ ধরনের আক্রমণের ঘটনাকে, এমনকি তা অর্থনৈতিক কারণে হলেও সাম্প্রদায়িক আক্রমণ বলে চিহ্নিত করা হতো।
১৯৩০ সালে সংঘটিত কিশোরগঞ্জের একটি ঘটনা সম্পর্কে এক পুস্তিকার বিবরণ থেকে এরকম বিষয় জানা যায়।
ঐ সময় মুসলমান কৃষকরা ক্ষমতাশীল হিন্দু জমি দখলদার ও সুদ ব্যবসায়ী বাবু কৃষ্ণকে আক্রমণ করে। একদল মুসলমান কৃষক জমি দখলদারের সুদৃঢ়ভাবে নির্মিত বাড়ির চারপাশ ঘিরে ফেলে এবং তারা জমি দখলদারের কাছে রক্ষিত ঋণের সব দলিলপত্র ফেরত দেওয়ার দাবি জানায়। ওই উগ্র হিন্দু জমি দখলদার তা দিতে অস্বীকার করে। কিন্তু উন্মত্ত জনতা তাকে হুমকি দিলে সে ও তার পুত্র মুসলিম কৃষকদের উপরে গুলি বর্ষণ করে। এর ফলে কিছু লোক (মুসলমান কৃষক) নিহত ও কিছু লোক আহত হয়। বন্দুক চালিয়ে জমি দখলদারের গুলি ফুরিয়ে গেলে তার একজন হিন্দু চাকর উন্মত্ত জনতাকে পুনরায় ফিরে আসার আহ্বান জানায়। সে তাদেরকে আশ্বস্ত করে যে, তার মনিবের হাতে আর গুলি নেই। প্রতিশোধ গ্রহণে আগ্রহী জনতা আবার ফিরে আসে, তারা জমি দখলদার ও তার পরিবারের সদস্যদের হত্যা করে। এবং তার বাড়ি ও মোটর গাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে। এ ঘটনাটি ছিলো অর্থনৈতিক বিষয়ের সাথে সম্পর্কিত সাম্প্রদায়িকতার বিষয়ের সাথে নয়। জমি দখলদারের চোখ ধাঁধানো সম্পদ জনতার ক্রোধকে উত্তেজিত করে ছিলো।
অভৃতপূর্ণ দুঃখ কষ্টের সময় কৃষকদের প্রতি জমি দখলদারদের নৃশংস আক্রমণ মুসলমান প্রজাদেরকে উত্তেজিত করে তোলে।
-মুহম্মদ মুশফিকুর রহমান।
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
হাজিব আল মানসুর: যে সেনাপতি পরাজিত হননি কোনো যুদ্ধে
২৩ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
পবিত্র আযানের জন্য ২২ জন মুসলমানের শহীদ হওয়ার ঈমানদীপ্ত ঘটনা
১৯ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
বাহাদুর শাহ জাফর: ব্রিটিশবিরোধী শেষ মোঘল শাসক
১৪ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
পিরি রইস: বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ মানচিত্র অঙ্কনকারী উসমানীয় এডমিরাল
০৩ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
বঙ্গ, বাংলা, বাঙ্গালী শব্দের উৎপত্তি মুসলমানদের মাধ্যম দিয়েই (৬)
০১ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
তাতার বিরোধী যুদ্ধে হযরত আমীর খসরু দেহলভী চিশতী রহমতুল্লাহি আলাইহি
২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
মুসা বিন আবী গাসসান: হার না মানা এক অকুতোভয় মুসলিম সিপাহী
২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
ফিঙ্গারপ্রিন্ট বা আঙ্গুলের ছাপ শরীয়তসম্মত, নিখুঁত, ব্যবহারে সহজ এবং রহমত, বরকত, সাকীনা লাভের কারণ (৭)
২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
আফগানিস্তানেও উগ্রতাবাদী ওহাবী-সালাফীদের অনুপ্রবেশের অপচেষ্টা
১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
বঙ্গ, বাংলা, বাঙ্গালী শব্দের উৎপত্তি মুসলমানদের মাধ্যম দিয়েই (৪)
১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনাদেরকে মুহব্বত করা পবিত্র ঈমানের অন্তর্ভুক্ত
১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
মুসলমানদের বিচার ব্যবস্থা চুরি করেই গড়ে উঠেছে ব্রিটিশ, গ্রীক ও রোমানদের আইন ব্যবস্থা
০৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার)












