পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের দায়িত্ব-কর্তব্য
(রাজারবাগ শরীফ উনার সম্মানিত মুর্শিদ ক্বিবলা সাইয়্যিদুনা হযরত সুলত্বানুন নাছীর আলাইহিস সালাম উনার ওয়াজ শরীফ থেকে সংকলিত)
, ১২ জুমাদাল ঊখরা শরীফ, ১৪৪৭ হিজরী সন, ০৫ সাবি’, ১৩৯৩ শামসী সন , ০৪ ডিসেম্বর, ২০২৫ খ্রি:, ১৯ অগ্রহায়ণ, ১৪৩২ ফসলী সন, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) মহিলাদের পাতা
(ধারাবাহিক)
সে প্রসঙ্গে বলা হয় যে, সেই বনী ইস্রাইল আমলে এক লোক ছিল খুব দ্বীনদার। খুব নেককার পরহেজগার। এক কথায় সে লোকটা ছিল মশহুর দ্বীনদার মহান আল্লাহওয়ালা। কিন্তু সে ঋণগ্রস্ত হয়ে যায়, কোন কারণে। কিন্তু সে ঋণগ্রস্ত হওয়ার কথা ছিলো না। তার মাত্র একটা ছেলে ছিল। আর কোন আল আওলাদ বা ওয়ারিস তার কেউ ছিলো না। কোন কারণে হঠাৎ সে যখন ঋণগ্রস্ত হয়ে যায়; তখন তার বয়সও অনেক হয়ে গিয়েছিল। অর্থাৎ তার মৃত্যুর সময় প্রায় নিকটবর্তী।
সে তখন তার সে সন্তানকে ডেকে বললো, ‘দেখ বাবা আমার তো অনেক সম্পদ রয়েছে সত্যিই, তবে ঋণও অনেক রয়েছে।’ ছেলেটাও ছিল মহান আল্লাহওয়ালা। পিতা বলল, ‘তুমি যেহেতু আমার ছেলে আমি তোমাকে কয়েকটা শপথ করিয়ে যাচ্ছি, তুমি এগুলো স্মরণ রাখবে।
এক নাম্বার হচ্ছে তুমি কখনই ইচ্ছায় হোক, অনিচ্ছায় হোক, সত্য হোক, মিথ্যা হোক কসম কাটবে না অর্থাৎ মহান আল্লাহ পাক উনার নামে কখনই কসম করবে না; ইচ্ছায় হোক অনিচ্ছায় হোক, সত্য-মিথ্যা যেটাই হোক না কেন কসম করবে না।
আর দুই নাম্বার হচ্ছে, যেহেতু তুমি ছাড়া আমার আর কোন আওলাদ নেই। আমার সম্পত্তি অনেক রয়েছে, যে সম্পদ রয়েছে তুমি বসে খেলেও খেতে পারবে, কিন্তু আমার অনেক ঋণও রয়েছে। আমার ঋণ হয়তো পরিশোধ করতে গেলে সম্পদ নাও থাকতে পারে। তবে তুমি কমপক্ষে আমার পক্ষ হয়ে আমার সন্তান হিসেবে আমার ঋণগুলি পরিশোধ করে দিবে। হয়তো তোমার অসুবিধা হবে, মহান আল্লাহ পাক তোমাকে হিফাযত করবেন ও সুখ-শান্তি দান করবেন।’
সেই দ্বীনদার পিতা তার সন্তানকে বললো যে, ‘তুমি আমার ঋণগুলি পরিশোধ করে দিও। যদিও তোমার কষ্ট হবে তথাপিও; আর আমি তোমার জন্য দোয়া করতেছি, মহান আল্লাহ পাক তোমাকে হিফাযত করবেন এবং ইহকাল ও পরকালে সুখ-শান্তি দান করুন।’
তখন সে সন্তান রাজি হলো। এদিকে তার পিতা ইন্তেকাল করলো। সারা এলাকার লোক সেটা জেনে গেল যে, সে লোক ইন্তেকাল করেছে। তার ঋণের জিম্মাদার হয়েছে তার সন্তান। তখন পর্যায়ক্রমে লোক আসতে লাগলো। ঋণ সে দিতে লাগলো। তার যা সম্পত্তি ছিল ধন-দৌলত টাকা পয়সা সব দেয়া হয়ে গেল, জায়গা-জমীন বিক্রি করে শোধ করলো। শেষ পর্যন্ত সে, যে বাড়িতে ছিল সেটাও বিক্রী করে তার ঋণ পরিশোধ করতে হলো। তার সম্পদও শেষ হয়ে গেল, তার ঋণও পরিশোধ হয়ে গেল। এখন থাকার মত তার কোন জায়গা সেখানে ছিলো না এবং কাজ করার মত তার তেমন কোন যোগ্যতাও ছিলো না।
সে এখন মনে মনে চিন্তা করলো তার স্ত্রী এবং তার দুই ছেলে রয়েছে। তাদের নিয়ে সে কি করবে এখন? কারণ কোন কাজ করবে সে? পরিশ্রম করেনি কোন সময়। কোন কাজ সে জানেনা, সে কি করে কাজ করবে! সে তখন তার স্ত্রীর সাথে পরামর্শ করল যে আমরা এখান থেকে দূরে কোথাও চলে যাই, যেখানে আমাদেরকে কেউ চিনবেনা। সেখানে গিয়ে আমরা যেটা ইচ্ছা সেটা করতে পারবো। এখানে কোন কাজ করতে গেলে বা কিছু করতে গেলে মানুষ হয়তো অনেক কিছু মনে করবে, নানান কিছু বলবে। আর বিশেষ করে তার পিতার সম্মানের খাতিরে। আমার পিতাকে মানুষ খারাপ বলবে যে, সন্তানকে সে রাস্তায় বসিয়ে দিয়ে গেছে। আমার পিতাকে খারাপ গালি-গালাজ করবে। অশ্লীল, অশালীন কথা-বার্তা বলবে। সেটা আমার পক্ষে বরদাশ্ত করা সম্ভব হবেনা। কাজেই আমি এখান থেকে চলে যাবো।
স্ত্রীর সাথে পরামর্শ করে সে রওয়ানা হলো, অনেক দূর চলে যাওয়ার জন্য। কিছুদূর যাওয়ার পর একটা নদী পড়লো। বড় এক নদী। তারা নৌকায় চড়লো। নৌকায় চড়ে কিছুদূর যাওয়ার পর মধ্য নদীতে যাওয়ার পর হঠাৎ তুফান উঠলো। ছিল রাত্রিবেলা, তুফানে সমস্ত নৌকা ছিন্নভিন্ন করে দিল, তছনছ করে দিল। তারা কোথায় কে চলে গেল কোন চিহ্ন রইলোনা। প্রত্যেকেই জুদা হয়ে গেল। কারো খবর কারো কাছে পৌঁছলোনা, কোথায় কে অবস্থান করতেছে।
সেই যে লোকটা বা ছেলেটা যে নেক সন্তান, সে নিরিবিলি এক জঙ্গলের কিনারে গিয়ে উঠলো। অর্থাৎ যখন তার হুঁশ ফিরে আসলো, সে দেখলো যে, সে জঙ্গলের পাশে পড়ে রয়েছে। সে উঠলো, উঠে চিন্তা করলো এখন কি করা যেতে পারে? নির্জন, লোকজন নেই, ভয়ও করছে। স্মরণ হলো তার স্ত্রীর কথা, তার ছেলেদের কথা। কিন্তু স্মরণ হলেও তো করার কিছু নেই। কেউই নেই সেখানে, একলা সে নদীর পাড়ে, জঙ্গলের পাশে। সে রওয়ানা হয়েছে যাওয়ার জন্য। কিন্তু কোথায় যাবে? রাস্তা নেই, ঘাট নেই, ঝোপ-ঝাড়, জঙ্গল। হঠাৎ একটা নেদা হলো, হে নেক সন্তান! পিতা-মাতার অনুগত সন্তান, তুমি সামনে অগ্রসর হও। তোমার জন্য মহান আল্লাহ পাক এখানে কিছু ধন ভান্ডার রেখেছেন। তুমি সেটা গ্রহণ কর এবং ব্যবহার কর। মহান আল্লাহ পাক উনার নির্দেশে সে সামনে অগ্রসর হলো। হওয়ার পর সত্যিই একটা ধন ভান্ডার সে পেল। এখন সে এটা কি করবে?
মহান আল্লাহ পাক উনার ইচ্ছা, কিছু লোক কোথা থেকে সেখানে এসে পৌঁছল। পৌঁছার পর সে তাদের সহিত ভাল ব্যবহার করলো এবং সে উক্ত লোকদের মাধ্যমে আর কিছু লোক আনালো। যেহেতু তার টাকা-পয়সা ছিল, তাই সে কিছু কাজ-কাম করালো, ঘর-বাড়ী তৈরী করলো এবং অনেক দান-খয়রাতও সে করলো। আস্তে আস্তে তার সুনাম ছড়িয়ে পড়লো সারা এলাকাতে। নদীর এপাশ-ওপাশ সব পাশেই গিয়ে সে সংবাদ পৌঁছলো। লোকজন আসতে থাকলো তার সাথে সাক্ষাতের জন্য, দানশীলতার জন্য। কাউকে সে ফিরিয়ে দেয় না। কম বেশী দান করে, মেহমানদারী করে, জায়গা বিশেষ লোকদেরকে থাকারও ব্যবস্থা সে করে দেয়। এভাবে তারা চলতে লাগলো। কয়েক বছর অতিবাহিত হয়ে গেল।
হঠাৎ একটা ছেলে আসলো তার এখানে থাকার জন্য। সে তাকে কাজ দিলো। মূলতঃ সেটা ছিল তারই বড় ছেলে। কিন্তু সময়ের ব্যবধানের কারণে সন্তান পিতাকে চিনতে পারেনি, পিতাও সন্তানকে চিনতে পারেনি। তাকে কাজ দিয়ে রেখে দিলো। যেহেতু তার সুনাম ছড়িয়ে পড়েছিল সারা এলাকায়। তার দ্বিতীয় ছেলে যেখানে ছিল, সে জায়গায় এক লোকের অধীনে থাকা অবস্থায়ই সে এই লোকের সংবাদ শুনে যে, সে খুব দানশীল এবং সে মানুষের সঙ্গে সৎ ব্যবহার করে। তা শুনে সেও পর্যায়ক্রমে সেখানে আসলো এবং চাকরি নিল এখানে এসে। বেশ কিছু দিন অতিবাহিত হলো।
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের দায়িত্ব-কর্তব্য
১৯ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
খাছ দোয়া মুবারক পাওয়ার বিশেষ মাধ্যম পবিত্র যাকাত আদায়
১৯ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
পারিবারিক তা’লীম ও তার তারতীব
১৮ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
৩টি বিশেষ নেক কাজ, যা ইন্তেকালের পরও জারি থাকে
১৮ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি সৃষ্টির শুরুতেই মহান আল্লাহ পাক উনার কুদরত মুবারক উনার মধ্যে ছিলেন, আছেন এবং অনন্তকাল থাকবেন
১৬ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
দুনিয়ার চাকচিক্যে মোহগ্রস্ত হয়ে বদ আমল করার কারণে মানুষকে পরকালে পাকড়াও হতে হবে (২)
১৫ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
ক্বলবী যিকির জারী না থাকলে শয়তানের ওয়াসওয়াসা থেকে বেঁচে থাকা সম্ভব নয়
১৫ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে সম্বোধন মুবারক করার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ আদব-শরাফত বজায় রাখতে হবে
১৩ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের দায়িত্ব-কর্তব্য
১২ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
খাছ দোয়া মুবারক পাওয়ার বিশেষ মাধ্যম পবিত্র যাকাত আদায়
১২ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
সম্মানিত রমাদ্বান শরীফ মাস হচ্ছে তাক্বওয়া হাছিলের মাস, নেক দোয়া করার মাস এবং কাফির মুশরিকদের বিরুদ্ধে বেশী বেশী বদ দোয়া করার মাস
১১ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
৩টি বিশেষ নেক কাজ, যা ইন্তেকালের পরও জারি থাকে
১১ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার)












