চায়ের দোকানের শ্রমিক থেকে রিকশা চালক, কাউসার এখন নোবিপ্রবির ইইই’র শিক্ষার্থী
, ২৯ রবীউল আউওয়াল শরীফ, ১৪৪৮ হিজরী সন, ১৪ রবি, ১৩৯৪ শামসী সন , ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রি:, ২৮ ভাদ্র, ১৪৩৩ ফসলী সন, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) তাজা খবর
স্বপ্ন ছিল পড়াশোনা করে নিজের জীবনটা বদলে ফেলার। কিন্তু সেই স্বপ্নের পথ কখনোই মসৃণ ছিল না। কখনো সংসারের খরচ জোগাতে চায়ের দোকানে কাজ করতে হয়েছে, কখনো কাঠমিস্ত্রির দোকানে শ্রমিকের কাজ করতে হয়েছে। কখনো হাতে উঠেছে কোদাল, কখনো ধান কাটার কাস্তে। আবার কখনো জীবিকার তাগিদে হাতে নিতে হয়েছে রিকশার হ্যান্ডেল।
ময়মনসিংহের ছেলে কাউসারের জীবনের গল্পটা এমনই। ছোটবেলা থেকেই অভাবের সঙ্গে লড়াই করে বড় হয়েছেন তিনি। যে বয়সে অন্যদের দিন কাটত খেলাধুলা আর বই-খাতা নিয়ে, সেই বয়সেই পরিবারের পাশে দাঁড়াতে কাজে নামতে হয়েছে তাকে। তবে জীবনের কঠিন বাস্তবতা তার পড়াশোনার স্বপ্নটাকে থামাতে পারেনি।
দিনের এক অংশ কেটেছে শ্রমে, অন্য অংশ পড়াশোনায়। কখনো কাজ শেষে ক্লান্ত শরীরে বই নিয়ে বসেছেন, আবার কখনো বই-খাতা সরিয়ে পরিবারের প্রয়োজন মেটাতে কাজে নেমেছেন। এভাবেই একের পর এক বাধা পেরিয়ে এখন তিনি নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল (ইইই) বিভাগের শিক্ষার্থী।
পরিবারের আর্থিক সংকট তাকে খুব অল্প বয়সেই বুঝিয়ে দিয়েছিল, জীবনে অনেক কিছুই সহজে পাওয়া যাবে না। পরিবারের প্রয়োজন মেটাতে প্রথমে চায়ের দোকানে কাজ করেছেন। পরে একটু বেশি আয়ের আশায় কাজ নেন কাঠমিস্ত্রির দোকানে।
এরপর কখনো রাজমিস্ত্রির সহকারী হিসেবে কাজ করেছেন, কখনো মাটি কেটেছেন। ধান কাটার মৌসুমে অন্য শ্রমিকদের সঙ্গে মাঠে নেমেছেন। কখনো বর্গাচাষও করেছেন। পড়াশোনার পাশাপাশি টিউশনি করে নিজের খরচ চালানোর চেষ্টাও করেছেন।
কাজের ধরন নিয়ে কাউসারের কোনো বাছবিচার ছিল না। কারণ, তার কাছে কাজ মানে ছিল প্রয়োজন। পরিবারের প্রয়োজন, নিজের পড়াশোনার প্রয়োজন এবং ভবিষ্যৎ গড়ার প্রয়োজন।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিবারের দায়িত্বও বাড়তে থাকে। নিজের পড়াশোনার খরচের পাশাপাশি পরিবারের জন্যও অর্থের প্রয়োজন হচ্ছিল। একপর্যায়ে জীবিকার জন্য হাতে তুলে নেন রিকশার হ্যান্ডেল।
উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার পর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতি শুরু করেন কাউসার। সামনে ছিল ভর্তি কোচিংয়ের খরচ, নিজের থাকা-খাওয়ার ব্যয় এবং পরিবারের আর্থিক চাপ। ময়মনসিংহ থেকে ঢাকায় এসে তাই একসঙ্গে দুটি দায়িত্ব কাঁধে নেন তিনি—ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি আর উপার্জন।
ঢাকায় এসে রিকশা চালিয়েছেন কাউসার। দিনের একটি অংশ কেটেছে রিকশার প্যাডেলে পা রেখে, আর অন্য সময়টা ভর্তি কোচিং ও পড়াশোনায়। রিকশা চালিয়ে যে টাকা আয় করতেন, তা দিয়ে নিজের কোচিং ও প্রয়োজনীয় খরচ মেটানোর পাশাপাশি বাড়িতেও টাকা পাঠাতেন। নিজের স্বপ্নের জন্য শহরে এলেও পরিবারের প্রয়োজনের কথা ভুলে যাননি তিনি।
কখনো রিকশা চালিয়ে ক্লান্ত শরীরে কোচিংয়ে গেছেন, কখনো আবার পড়াশোনার ফাঁকে রিকশা নিয়ে বের হয়েছেন। একদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার স্বপ্ন, অন্যদিকে পরিবারের জন্য কিছু করার তাগিদ—দুটির মধ্যে সমন্বয় করেই এগোতে হয়েছে তাকে।
কাউসার বলেন, ‘ময়মনসিংহ থেকে ঢাকায় এসে রিকশা চালিয়েছি। একই সঙ্গে ভর্তি কোচিং করেছি। রিকশা চালিয়ে যে টাকা পেতাম, তা দিয়ে নিজের কোচিংয়ের খরচ চালিয়েছি, আবার বাড়িতেও টাকা দিয়েছি। তখন কষ্ট হতো, কিন্তু মনে হতো পড়াশোনাটা চালিয়ে যেতে হলে আমাকে এভাবেই করতে হবে।’
ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির সময়টাও তাই অন্যদের মতো ছিল না কাউসারের। অনেকের কাছে কোচিং মানে শুধু ক্লাস আর পড়াশোনা; তার কাছে সেটার সঙ্গে যুক্ত ছিল উপার্জনের চিন্তাও। দিনের পর দিন রিকশা চালিয়ে আয় করেছেন, সেই আয় থেকে নিজের প্রয়োজন মিটিয়েছেন, পরিবারের জন্যও টাকা পাঠিয়েছেন। তারপরও পড়াশোনার প্রতি মনোযোগ হারাননি।
কাউসার বলেন, ‘জীবনে অনেক কাজ করেছি। চায়ের দোকানে কাজ করেছি, কাঠমিস্ত্রির দোকানে কাজ করেছি, মাটি কেটেছি, ধান কেটেছি, রাজমিস্ত্রির কাজ করেছি, টিউশনি করেছি, রিকশা চালিয়েছি। কোনো কাজকেই ছোট মনে হয়নি। কারণ, আমার সামনে তখন একটা লক্ষ্য ছিল—পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া এবং পরিবারের পাশে দাঁড়ানো।’
তিনি বলেন, ‘অনেক সময় কাজ করার পর পড়তে বসলে শরীর খুব ক্লান্ত থাকত। আবার কখনো পড়াশোনার জন্য কাজের সময় কমাতে হয়েছে। তখন সংসারের চিন্তা থাকত। তারপরও মনে হতো, আমাকে পড়াশোনাটা শেষ করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে হবে। সেই স্বপ্নটাই আমাকে বারবার কাজ করার শক্তি দিয়েছে।’
অবশেষে সেই দীর্ঘ লড়াইয়ের ফল আসে। মেধা ও পরিশ্রমের জোরে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পান কাউসার। ভর্তি হন ইইই বিভাগে। জীবনের কঠিন পথ পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে বসার সুযোগ তার কাছে ছিল বড় এক অর্জন।
কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পরও জীবনের কঠিন অধ্যায় শেষ হয়নি। নোবিপ্রবিতে ভর্তি হওয়ার কিছুদিন পরই কাউসার হারান তার জন্মদাত্রী মাকে। যে মা সন্তানের সাফল্যের দিনে সবচেয়ে বেশি আনন্দিত হওয়ার কথা, সেই মা তার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ই চলে যান। মাকে হারানোর শূন্যতা নিয়ে এখনো এগিয়ে যেতে হচ্ছে তাকে।
কাউসার বলেন, ‘মাকে হারানোর কষ্টটা সবচেয়ে বেশি। আমি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম, তখন মনে হয়েছিল মা খুব খুশি হয়েছিলেন। কিন্তু তাকে বেশিদিন সেই আনন্দটা দিতে পারিনি। এখন কোনো ভালো কিছু হলে মাকে বলতে ইচ্ছে করে, কিন্তু মা তো আর নেই।’
কাউসারের বাবা বেঁচে থাকলেও বর্তমানে কর্মক্ষম নন। ফলে পরিবারের দায়িত্বের একটি বড় অংশ এখনো তার কাঁধে। নিজের পড়াশোনা, ক্যারিয়ার এবং পরিবারের ভবিষ্যৎ- সবকিছু নিয়েই ভাবতে হয় তাকে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি তাই এখনো তাকে নানা হিসাব করে চলতে হয়। নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্নের সঙ্গে পরিবারের ভবিষ্যৎ বদলে দেয়ার স্বপ্নটাও জড়িয়ে গেছে।
কাউসার বলেন, ‘আমি চাই পড়াশোনা শেষ করে ভালো একটা অবস্থানে যেতে। নিজের পরিবারের দায়িত্ব নিতে। আমার মা যে স্বপ্ন দেখতেন, সেগুলো পূরণ করতে। আমি জানি, পথটা এখনো কঠিন। কিন্তু এতদূর যখন আসতে পেরেছি, সামনে আরও এগিয়ে যেতে চাই।’
কাউসারের জীবনের গল্পে তাই কাজের তালিকার চেয়ে বড় হয়ে ওঠে তার হার না মানার গল্পে। আজ নোবিপ্রবির ইইই বিভাগের শ্রেণিকক্ষে বসে কাউসার ভবিষ্যতের দিকে তাকান। সামনে তার আরও পড়াশোনা, ক্যারিয়ার গড়ার লড়াই। একই সঙ্গে আছে পরিবারের দায়িত্ব। আর আছে মাকে হারানোর শূন্যতা, যা হয়তো সাফল্যের প্রতিটি ধাপেই তাকে মনে করিয়ে দেবে—এই পথটা তিনি একা পাড়ি দেননি; তার মায়ের স্বপ্নও এর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল।
কাউসারের গল্প তাই শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার গল্প নয়। এটি অভাবের মধ্যেও স্বপ্ন ধরে রাখার গল্প। এটি শ্রমকে ছোট না করে, প্রতিকূলতাকে ভয় না পেয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার গল্প। জীবন তাকে অনেকবার থামিয়ে দিতে চেয়েছে। কখনো অভাব দিয়ে, কখনো দায়িত্ব দিয়ে, কখনো প্রিয় মানুষ হারানোর কষ্ট দিয়ে। কিন্তু প্রতিবারই কাউসার নতুন করে পথ খুঁজেছেন।
আজ তার হাতে রিকশার হ্যান্ডেল নেই, আছে বিশ্ববিদ্যালয়ের বই। তবে সেই পথের ঘাম আর কষ্ট এখনো তার সঙ্গে আছে। সেই অভিজ্ঞতাই হয়তো তাকে মনে করিয়ে দেয়—স্বপ্ন পূরণের পথ যত কঠিনই হোক, চেষ্টা থামিয়ে দিলে সেখানে পৌঁছানো যায় না।
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
মেঘনায় গোসলে নেমে নিখোঁজ ৩ স্কুলছাত্রের লাশ উদ্ধার
২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
ন্যাম ভবন থেকে জামাত এমপি গাজী নজরুলের কথিত স্ত্রীর মরদেহ উদ্ধার!
২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
বিধবা স্ত্রী বা বিপত্নীক স্বামী আবার বিয়ে না করার শর্তে আজীবন পেনশন পাবেন
২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
ফাতেহা-ই-ইয়াজদহম ছুটির তালিকা সংশোধন
২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
ইলিয়াস মোল্লাসহ ৫০ জনের বিরুদ্ধে মামলা
২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
পেনশনভোগীদের সার্ভার অদৃশ্য মাফিয়ার নিয়ন্ত্রণে
২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
মাদকের টাকার জন্য শিশুকে বিক্রির চেষ্টা -৯৯৯-এ ফোন পেয়ে উদ্ধার
২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
অপ্রাপ্তবয়স্কদের হ্যান্ডসেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নীতিমালা জরুরি
২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
অর্থনৈতিক প্রশাসনে বহাল পুরনো বলয়
২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
বেতন বাড়ল সরকারি চাকরিজীবীদের, বেসরকারি খাতে চ্যালেঞ্জ!
২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
প্রধানমন্ত্রী যুক্তরাষ্ট্র যাচ্ছেন আজ -জাতিসংঘে ভাষণ ২৪ সেপ্টেম্বর
২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্রদের বড় ধরনের নতুন হামলার প্রস্তুতি, কঠোর হুঁশিয়ারি ইরানের
২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার)












