উত্তর প্রদেশে মুসলিম নেতার প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয় ভেঙে ফেলার উদ্যোগ
, ১৩ ছফর শরীফ, ১৪৪৮ হিজরী সন, ২৯ ছানী, ১৩৯৪ শামসী সন , ২৮ জুলাই, ২০২৬ খ্রি:, ১৩ শ্রাবণ, ১৪৩৩ ফসলী সন, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) তাজা খবর
রামপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (আরডিএ) গত ১৫ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে জানায়, মাত্র দুটি ভবনের নির্মাণ অনুমোদন বৈধ। বাকি ৩৮টি ভবন নাকি নির্মাণবিধি লঙ্ঘন করে গড়ে তোলা হয়েছে। কর্তৃপক্ষ ৫ আগস্টের মধ্যে এসব ভবন নিজ উদ্যোগে অপসারণের নির্দেশ দেয়। অন্যথায় প্রশাসন নিজেই বুলডোজার চালিয়ে ভবন ভেঙে খরচ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে আদায় করবে বলে জানায়।
পরে রাজ্য প্রশাসন সাময়িক স্থগিতাদেশ দিলেও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বলছে, এটি চূড়ান্তভাবে ভাঙার সিদ্ধান্ত বাতিল নয়, কেবল নির্ধারিত সময়সীমা স্থগিত করা হয়েছে। ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করা একজন স্বাধীনতা সংগ্রামীর নামে নামকরণ করা এই বিশ্ববিদ্যালয়টি উত্তর প্রদেশ রাজ্যের রামপুর জেলায় বিশিষ্ট মুসলিম রাজনীতিবিদ আজম খান প্রতিষ্ঠা করেন। খান ২০০৩ সালে মোহাম্মদ আলি জওহর ট্রাস্ট প্রতিষ্ঠা করেন, যা তিন বছর পর বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠা তত্ত্বাবধান করে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য জহিরউদ্দিন বলেন, তারা আদালতের মাধ্যমে পুরো ভাঙার নির্দেশ বাতিলের চেষ্টা করছেন। তার দাবি, বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের সময় ওই এলাকা আরডিএর আওতায় ছিল না। ফলে তখন নির্মাণ অনুমোদনের প্রয়োজন ছিল না। এখন নতুন করে সেই বিধি প্রয়োগ করে ভবন অবৈধ ঘোষণা করা আইনসঙ্গত নয়।
‘আমাদের ভবিষ্যৎ ধ্বংস করা হচ্ছে’
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, একটি পূর্ণাঙ্গ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ধ্বংস করে হাজারো শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী উসামা তাইয়্যাব বলেন, ‘দিল্লিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ সম্ভব হলে আমাদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় রক্ষা করা যাবে না কেন?’
বিশ্ববিদ্যালয়ের পঞ্চম বর্ষের আইন বিভাগের শিক্ষার্থী ইকরা বলেন, পরিবারের নিরাপত্তার বিবেচনায় তাকে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করানো হয়েছিল। তিনি বলেন, ‘এই বিশ্ববিদ্যালয় ভেঙে গেলে আমাদের মতো অনেক মুসলিম মেয়ের আর উচ্চশিক্ষার সুযোগ থাকবে না। অন্য কোথাও পড়তে যাওয়ার অনুমতি পরিবার দেবে না।’
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, এখানে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের প্রায় অর্ধেকই নারী। পাশাপাশি এক-তৃতীয়াংশের বেশি শিক্ষার্থী হিন্দু সম্প্রদায়ের। প্রথম বর্ষের প্যারামেডিকেল বিভাগের শিক্ষার্থী চাঁদনি দিবাকর বলেন, ‘এটি সংখ্যালঘু বিশ্ববিদ্যালয় হলেও এখানে কখনো নিজেকে ভিন্ন মনে হয়নি। ধর্ম নয়, শিক্ষা এখানে সবচেয়ে বড় পরিচয়।’
প্রায় ২৪ কোটি মানুষের বাসস্থান উত্তর প্রদেশ ২০১৭ সাল থেকে ডানপন্থি ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) দ্বারা শাসিত হয়ে আসছে। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ একজন গেরুয়াবস্ত্রধারী কট্টরপন্থি হিন্দু নেতা, যিনি তার মুসলিম-বিরোধী বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্য ও নীতির জন্য পরিচিত।
প্রতিষ্ঠাতা আজম খানকে ঘিরে প্রতিশোধের রাজনীতি
আজীবন আচার্য আজম খান উত্তর প্রদেশে বিজেপির অন্যতম কঠোর সমালোচক ছিলেন। তিনি সমাজবাদী পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। এই রাজনৈতিক দলটি রাজ্যের ৩.৮ কোটি মুসলমান এবং অধিকাংশ সুবিধাবঞ্চিত বর্ণ-হিন্দু ভোটারদের কাছে জনপ্রিয়।
খান ১৯৭০-এর দশকে রামপুর থেকে প্রায় ১৬০ কিলোমিটার (১০০ মাইল) দূরে অবস্থিত ভারতের বৃহত্তম সংখ্যালঘু প্রতিষ্ঠান আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন নিয়ে পড়াশোনা করেন। আলিগড়ে তিনি একজন তেজস্বী ছাত্রনেতা হিসেবে এবং পরে একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। তিনি একটি প্রাক্তন রাজপরিবারের বিরুদ্ধে লড়েন, যারা কয়েক দশক ধরে রামপুরের রাজনীতিতে আধিপত্য বিস্তার করেছিল। ২০১১ সালের সর্বশেষ আদমশুমারি অনুযায়ী, রামপুর জেলার প্রায় ৫০ শতাংশ মানুষ মুসলমান।
তিনি ১৯৮০ সালে রাজনীতিতে যোগ দেন এবং উত্তর প্রদেশ বিধানসভায় রামপুরের প্রতিনিধিত্ব করেন। এছাড়া তিনি বিভিন্ন রাজ্য সরকারে মন্ত্রী এবং বিরোধী দলের নেতা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি রামপুর থেকে ভারতীয় সংসদের নিম্নকক্ষেও নির্বাচিত হন এবং পরে তার দল তাকে উচ্চকক্ষে পাঠায়। বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করে তিনি উত্তর ভারতের অন্যতম বিশিষ্ট মুসলিম নেতা হিসেবে তার অবস্থানকে সুদৃঢ় করে। আর এর ফলেই তিনি রোষানলে পড়েন বিজেপির।
২০১৭ সালে ক্ষমতায় আসার পরপরই আদিত্যনাথের সরকার খানের বিরুদ্ধে জমি দখল, জালিয়াতি এবং বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের অভিযোগে প্রায় ১০০টি মামলা দায়ের করে। তার বিরুদ্ধে দায়ের করা সেই মামলাগুলোর মধ্যে কয়েক ডজন জওহর বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কিত।
সমাজবাদী পার্টির সাংসদ জাভেদ আলী খান বলেন, ‘এটি কেবল অবৈধ স্থাপনা অপসারণের বিষয় নয়, একটি সংখ্যালঘু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে লক্ষ্যবস্তু বানানো হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘এই বিশ্ববিদ্যালয়টিকে লক্ষ্যবস্তু করার অনেক কারণ রয়েছে। প্রথমত, এটি আজম খান প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। দ্বিতীয়ত, এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন সমাজবাদী পার্টির প্রধান মুলায়ম সিং। তৃতীয়ত, এটি উদ্বোধন করেছিলেন রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী অখিলেশ যাদব। এবং চতুর্থত, এটি একটি সংখ্যালঘু বিশ্ববিদ্যালয়।’
সমাজবাদী পার্টির প্রধান প্রতিষ্ঠাতা মুলায়ম সিং যাদব ২০২২ সালে মারা যান। তাঁর ছেলে অখিলেশ এখন দলটির প্রধান এবং তিনি বিজেপি-বিরোধী জোটের সদস্য, যে জোটে ভারতের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসও রয়েছে।
শিক্ষার্থীদের দমাতে চলছে চাপ সৃষ্টি
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যে ভাঙার নির্দেশের বিরুদ্ধে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছে। এদিকে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, পুলিশ তাদের বাড়িতে গিয়ে আন্দোলন বন্ধ করতে চাপ দিচ্ছে। যদিও প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ অভিযোগের কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া দেয়া হয়নি।
শিক্ষার্থীদের আশঙ্কা, ভাঙার নির্দেশ কার্যকর হলে শুধু ভবনই ধ্বংস হবে না, বরং হাজারো শিক্ষার্থীর শিক্ষা, স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎও বড় ধরনের সংকটে পড়বে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী উসমান আলি বলেন, ‘আমরা শান্তিপূর্ণভাবে আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রক্ষার আন্দোলন করছি। প্রয়োজনে ত্যাগ স্বীকার করব, কিন্তু এই অন্যায় মেনে নেব না।’
এমন পরিস্থিতিতে রামপুরের একমাত্র পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়টি ভাঙার দাঁড়প্রান্তে থাকায় ক্ষোভ বাড়ছে। ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, সাক্ষরতার হারের দিক থেকে উত্তর প্রদেশের ৭৫টি জেলার মধ্যে এই জেলাটি মাত্র চারটি জেলার চেয়ে এগিয়ে আছে। বিশ্ববিদ্যালয়টির রামপুরের একমাত্র পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়টি আসন্ন ভাঙার ঘটনায় ক্ষোভ বাড়ছে। ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, সাক্ষরতার হারের দিক থেকে উত্তর প্রদেশের ৭৫টি জেলার মধ্যে এই জেলাটি মাত্র চারটি জেলার চেয়ে এগিয়ে আছে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে গেলে সবচেয়ে বেশি শিক্ষা সংকটে পড়বে অঞ্চলটির নারী শিক্ষার্থীরা।
সংখ্যালঘুদের টার্গেট নতুন নয়
২০১৪ সালে বিজেপির নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে ভারতে বাড়ি, মসজিদ, দোকান এবং অন্যান্য সম্পত্তি ভাঙার ঘটনা ব্যাপকভাবে বেড়েছে, বিশেষ করে উত্তর প্রদেশে ঘটনাগুলো বেশি লক্ষ্য করা যায়। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, এ কাজগুলো মুসলিমদের ওপর অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে প্রভাব ফেলে। সংস্থাগুলো বলছে, অবৈধ দখলদারিত্বকে লক্ষ্যবস্তু করছে বিজেপি সরকার।
দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের হিন্দি সাহিত্যের শিক্ষক অপূর্বানন্দ বলেন, ‘এসবের পেছনে একাধিক দিক রয়েছে। প্রথমত, এসবের উদ্দেশ্য হিন্দু ভোটারদের সামনে শক্তিশালী মুসলিমদের মুখোমুখি করে একটি নাটকীয় পরিস্থিতি তৈরি করা। দ্বিতীয়ত, এই সরকারের পুরো মেয়াদ জুড়ে সংখ্যালঘু প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে একটি ধারাবাহিক প্রচারণা চালানো হয়েছে। আর তৃতীয়ত, এ ধরনের ঘটনা তারা ঘটাচ্ছে, কারণ তারা হিন্দু ও মুসলিমদের মধ্যে মেলামেশা চায় না। আর এই মেলামেশা বা সম্পর্ক তৈরির শক্তিশালী ঘাঁটি হলো বিশ্ববিদ্যালয়গুলো।
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
সিটি করপোরেশন হচ্ছে কক্সবাজার: প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা
২৯ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
জুলাইয়ের ২৭ দিনে প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছেন ২৫২ কোটি ডলার
২৯ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
গরু বিক্রি করতে বাংলাদেশে আসা তিন ভারতীয়কে ফেরত দিল বিজিবি
২৯ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
বুধবার ১২ ঘণ্টা গ্যাস থাকবে না দেশের যেসব এলাকায়
২৯ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
তদবির ছাড়া ১২৫ টাকায় সরকারি চাকরি বিগত ২০ বছরে নজিরবিহীন: ভূমি প্রতিমন্ত্রী
২৯ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
গ্যাসের চাপ কম, একে একে বন্ধ হচ্ছে রাজধানীর সিএনজি স্টেশন
২৯ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
পুলিশসহ সরকারি কর্মকর্তাদের নামে প্রতারণা, সতর্ক থাকার অনুরোধ পুলিশ সদর দফতরের
২৯ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
দেশের রিজার্ভ ৩৬.৪৫ বিলিয়ন ডলার
২৯ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের এলেঙ্গায় গ্যাস পাইপে ফাটল
২৯ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
নূরানীবাদে গৃহকর্তা নিহতের ঘটনায় গ্রেপ্তার ৭
২৯ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
মাদারীপুরে নির্মাণাধীন ঘরে হাতবোমার বিস্ফোরণ, উড়ে গেল টিনের চালা
২৯ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
খাগড়াছড়িতে ইউপিডিএফ-জেএসএসের ব্যাপক গোলাগুলি, গুলিবিদ্ধ ২
২৮ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার)












