পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের দায়িত্ব-কর্তব্য
(রাজারবাগ শরীফ উনার সম্মানিত মুর্শিদ ক্বিবলা সাইয়্যিদুনা হযরত সুলত্বানুন নাছীর আলাইহিস সালাম উনার ওয়াজ শরীফ থেকে সংকলিত)
, ০৯ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০:০০ এএম ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) মহিলাদের পাতা
(ধারাবাহিক)
এ প্রসঙ্গে বলা হয়, সূরা বাক্বারা যা মহান আল্লাহ পাক তিনি নাযিল করেছেন কুরআন শরীফে। তার মধ্যে যে ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে, তা মহান আল্লাহ পাক উনার রাসূল হযরত মূসা কালিমুল্লাহ্ আলাইহিস সালাম উনার জামানার একটা ঘটনা, যা ঘটে গেছে।
ঘটনাটি হলো, এক পিতা তার একটি মাত্র সন্তান। তার স্ত্রী ছিল এবং একটা বাছুর ছিল। একদিন সেই পিতা তার সে সন্তানসহ বাছুরটা নিয়ে এক জঙ্গলে গেল। জঙ্গলে গিয়ে সে পিতা মহান আল্লাহ পাক উনার কাছে দোয়া করলো। পিতা এবং মাতার দোয়া যে কত নির্ঘাত কবুলযোগ্য এবং সন্তানের জন্য যে কত ফায়দাজনক সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। এই ওয়াকেয়ার মধ্যে সেটা ফুটে উঠেছে।
পিতা সন্তানকে ও তার একটা গরুর বাছুর ছিল সেটাসহ জঙ্গলে নিয়ে গিয়ে দোয়া করলো, “ মহান আল্লাহ পাক তিনি! আমার শরীর অসুস্থ, হায়াত হয়তো বেশি দিন নেই। কিন্তু আমার একটা সন্তান রয়েছে। আমি গরুর বাছুরটা আপনার জিম্মাদারীতে দিয়ে দিলাম” এ দোয়া করে সে জঙ্গলে ছেড়ে দিল অর্থাৎ জঙ্গলে ছেড়ে দিয়ে বললো, “আয়, মহান আল্লাহ পাক! এই বাছুরটা আমি ছেড়ে দিলাম। আমার বাচ্চা ছেলে, শিশু সন্তান রয়েছে, এই ছেলেটা যখন বড় হবে তখন এই বাছুরের মাধ্যমে তার রিযিকের ফায়সালা করে দিবেন।”
সেই পিতা মহান আল্লাহ পাক উনার কাছে আরো দোয়া করলো “আয় মহান আল্লাহ পাক তিনি! আমার কোন আসবাব-সম্পত্তি, জায়গা-জমীন কিছুই নেই। আপনি দয়া করে আমার এই সন্তানের রিযিকের ফায়সালা করবেন এই গরু দিয়ে।”
পিতা দোয়া করলো সন্তানের জন্য। দোয়া করে বাছুরটা ছেড়ে বাড়ীতে চলে গেল। বাড়ীতে চলে গিয়ে তার মাকে জানালো অর্থাৎ তার স্ত্রীকে বললো, “আমি গরুটা ছেড়ে দিয়ে এসেছি, আমি মহান আল্লাহ পাক উনার কাছে দোয়া করেছি যে, মহান আল্লাহ পাক তিনি! আমার সন্তান বড় হলে এই গরুর দ্বারা যেন আমার সন্তানের আজীবনের রিযিকের ফায়সালা হয়ে যায়। আশা করি মহান আল্লাহ পাক তিনি কবুল করেছেন।”
কিছুদিন পর সেই পিতা ইন্তেকাল করলো। এদিকে সে বাচ্চাকে তার মা অনেক কষ্টে লালন-পালন করলো। ছেলেটা বড় হলো। বড় হয়ে সে তেমন কিছু শিক্ষা গ্রহণ করতে পারেনি। তবে অবশ্যই নামাজ-কালাম, যিকির-আযকার, পিতা-মাতার হক্ব ইত্যাদি সম্পর্কে সে মোটামুটি জ্ঞান অর্জন করেছে। দুনিয়াবী তেমন কিছু শিক্ষা সে গ্রহণ করতে পারেনি। যার জন্য সে জঙ্গলে গিয়ে কাঠ কেটে এনে বাজারে বিক্রি করে সংসার চালাতো। সে কাঠ কেটে বিক্রি করে যা পেত তার একভাগ মহান আল্লাহ পাক উনার রাস্তায় দান করে দিত। একভাগ তার মায়ের খেদমতের জন্য ব্যয় করতো। আর একভাগ নিজের জন্য সে ব্যয় করতো।
ঠিক তদ্রুপ সে তার সময়টাকে তিন ভাগ করে নিয়েছিল। তিনভাগ করে সে অবসর সময়টা রাত্রির মধ্যে রেখেছিল। সারাদিন সে কাজে ব্যয় করতো। আর রাত্রিকে সে তিনভাগ করলো। একভাগ সে ইবাদত-বন্দেগীর জন্য রেখে দিয়েছিল। একভাগ তার মায়ের খিদমতের জন্য। আর একভাগ তার বিশ্রামের জন্য। এভাবে সে চলতে লাগলো।
বেশ কিছু দিন অতিবাহিত হয়ে গেল। একদিন তার মায়ের সেই কথাটা স্মরণ হলো, তখন সে বললো, “হে আমার সন্তান! তুমি যখন ছোট ছিলে, তোমার পিতা তোমার জন্য একটা নিয়ামত রেখে গেছেন। যেন তার দ্বারা মহান আল্লাহ পাক তিনি তোমাকে স্বচ্ছল করে দেন, যাতে এতমিনানের সাথে তুমি জীবন-যাপন করতে পার।”
সেটা কি? মুলতঃ সেই বাছুরটা যেটা বড় হয়ে বড় একটা গরু হয়েছিল, যেটা খুব সুন্দর নিঁখুত। মানুষ সেটাকে দেখতো, কিন্তু কেউ সেটাকে ধরতে পারতো না। সেটা গভীর জঙ্গলে অবস্থান করতো। যখন বের হয়ে আসতো, তখন যদি কেউ ধরতে চাইতো, সেটা এত দ্রুত গতিতে পালিয়ে যেত, কারো পক্ষে ধরা সম্ভব হতো না।
তখন সেই ছেলের মা তাকে বললো যে, “দেখ তোমার আব্বা তোমার জন্য একটা নিয়ামত রেখে গেছেন, যেটা দ্বারা তোমার রিযিকের ফায়সালা হবে।” তখন তার মা তাকে বললো, “তুমি এক কাজ করো, তুমি জঙ্গলে যাও, জঙ্গলে গিয়ে একটা খুব সুন্দর গরু দেখবে সেটা ধরে নিয়ে আসবে।”
ছেলে বললো, গরু আমি কি করে ধরবো। তখন তার মা বলে দিল, “তুমি এক কাজ কর, গরু তো তুমি ধরতে পারবে না। সে গরুটা যখন তুমি দেখবে তখন বলবে সে গরুকে, ‘হে গরু! তোমার প্রতি মহান আল্লাহ পাক উনার খলীল হযরত ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম, হযরত ইসমাঈল আলাইহিস সালাম এবং হযরত ইসহাক আলাইহিস সালাম উনাদের যিনি মহান আল্লাহ পাক উনার কসম! তুমি আমার কাছে চলে আসো। তুমি কসম দিয়ে তাকে ডাকবে। গরুটা তোমার কাছে চলে আসবে।”
সত্যিই সে জঙ্গলে গেল তার মায়ের নির্দেশ মোতাবেক। যখন জঙ্গলে গেল তখন সেখানে সেই গরুটাকে দেখল কিন্তু গরুটা তাকে দেখে খুব দ্রুতগতিতে পালাতে লাগলো। সে তখন সেই গরুটাকে সম্বোধন করে বললো যে, “হে গরু! তোমার প্রতি কসম! সেই মহান আল্লাহ পাক উনার খলীল হযরত ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম, হযরত ইসমাঈল আলাইহিস সালাম এবং হযরত ইসহাক আলাইহিস সালাম উনাদের যিনি রব উনার কসম! তুমি আমার কাছে চলে আসো।
বলার সাথে সাথে গরুটা থেমে গেলো। সত্যিই থেমে গেলো। আস্তে আস্তে হেঁটে হেঁটে সেই সন্তানের কাছে আসলো। সন্তান সেটার শিং-এর মধ্যে ধরলো। ধরে বললো, আমার সাথে বাড়িতে চলো। যখন সে নিয়ে রওয়ানা হলো বাড়ির দিকে তখন মহান আল্লাহ পাক উনার কুদরত, গরুর জবান খুলে গেল। গরু বললো যে, হে নেক সন্তান! তুমি এক কাজ কর, তুমি আমার পিঠে চড়ে বস। রাস্তা অনেক বড় লম্বা তোমার কষ্ট হবে।
কিন্তু সে সন্তান বললো দেখ, হে গরু! আমার মাতা আমাকে বলেছেন, তোমাকে শিং এ ধরে নিয়ে যেতে, তোমার পিঠে চড়তে আমাকে বলেননি। কাজেই আমার পক্ষে তোমার পিঠে চড়া সম্ভব নয়। আমার মায়ের নির্দেশ অমান্য করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।
যখন সেই সন্তান একথা বললো তখন গরু বললো, তুমি তো উপযুক্ত সন্তান তোমার মায়ের। তোমার মায়ের খুব বাধ্য সন্তান তুমি। অবশ্যই মহান আল্লাহ পাক তিনি তোমার দোয়ার বদৌলতে অনেক কিছু করে দিতে পারেন।
মহান আল্লাহ পাক তিনি সেই গরুর জবান খুলে দিলেন। গরু তখন বললো, যে সন্তান মায়ের বাধ্যগত হয়। মহান আল্লাহ পাক তিনি তার দোয়া অবশ্যই কবুল করেন। গরু কিছু কথা বললো, সন্তান আর কথা বললো না। সে তাকে শিং ধরে বাড়িতে নিয়ে গেল। বাড়িতে গিয়ে যখন পৌঁছল। পৌঁছার পর তার মা দেখলো। দেখে বললো এক কাজ কর। এটা বাজারে নিয়ে যাও। বাজারে নিয়ে বলবে এটার মূল্য হচ্ছে তিন দিনার। তবে শর্ত হচ্ছে, আমার মায়ের পুনঃ অনুমতি নিতে হবে। অর্থাৎ পুনরায় অনুমতি নিতে হবে। অন্যথায় বিক্রি হবে না। তিন দিনার এটার মূল্য নির্ধারণ করা হবে। যদি কেউ নিতে চায় তাহলে আমার মায়ের পুনরায় অনুমতি নিয়ে বিক্রি করতে হবে। অন্যথায় বিক্রি করা যাবে না। সে সন্তান মায়ের কথায় বাজারে নিয়ে গেল গরুটা। যখন গরুটা তুললো- এদিকে মহান আল্লাহ পাক তিনি ফেরেশ্তাদেরকে জানিয়ে দিলেন যে দেখ, আমার বান্দা সে তার মায়ের কত অনুগত। সে তার মায়ের কথা ছাড়া এক কদমও ফেলে না।
তখন ফেরেশ্তারা বললো বেশ, আমরা তাহলে সে যখন বাজারে বিক্রি করতে যাবে, আমরা সেখানে কিনতে যাব এবং তাকে কিছু পরীক্ষা করবো, সে কতটুকু তার মায়ের অনুগত।
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
মহিলাদের সুন্নতী লিবাস, অলংকার ও সাজ-সজ্জা (২৪)
১৪ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
হাশরের ময়দানে যে ৫টি প্রশ্নের উত্তর প্রত্যেককেই দিতে হবে
১৪ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
মহাসম্মানিত মহাপবিত্র হযরত আহলু বাইত শরীফ আলাইহিমুস সালাম উনারা বেমেছাল ফযীলত মুবারকের অধিকারী
১৪ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
সর্বক্ষেত্রে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে প্রাধান্য দিতে হবে
১৩ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি সৃষ্টির শুরুতেই মহান আল্লাহ পাক উনার কুদরত মুবারক উনার মধ্যে ছিলেন, আছেন এবং অনন্তকাল থাকবেন
১৩ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু আনহুম উনাদের সম্পর্কে কটূক্তি করা কাট্টা কুফরী
১১ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
তওবা
০৯ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
সাইয়্যিদু সাইয়্যিদিল আ’ইয়াদ শরীফ মেহমানদারী করার মাধ্যমে উদযাপনে শাফায়াত মুবারক লাভ
০৯ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
৩টি বিশেষ নেক কাজ, যা ইন্তেকালের পরও জারি থাকে
০৮ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
যে ৪ শ্রেণীর লোকদের জন্য ক্বিয়ামতের দিন সুপারিশ ওয়াজিব হবে
০৮ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
মহিলাদের সুন্নতী লিবাস, অলংকার ও সাজ-সজ্জা (২৩)
০৭ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
হাশরের ময়দানে যে ৫টি প্রশ্নের উত্তর প্রত্যেককেই দিতে হবে
০৭ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার)












