পবিত্র মি’রাজ শরীফ উনার তারিখ নিয়ে বিভ্রান্তি নিরসন (১) (একটি দলীলভিত্তিক পর্যালোচনা)
, ২৬ রজবুল হারাম শরীফ, ১৪৪৭ হিজরী সন, ১৮ ছামিন, ১৩৯৩ শামসী সন , ১৬ জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রি:, ০২ মাঘ, ১৪৩২ ফসলী সন, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) পবিত্র দ্বীন শিক্ষা
নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার অসংখ্য-অগণিত বুলন্দী শান মুবারক উনার মধ্যে অন্যতম একখানা বুলন্দী শান মুবারক হচ্ছেন পবিত্র মি’রাজ শরীফ। সুবহানাল্লাহ!
মশহূর ও বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী পবিত্র মাহে রজবুল হারাম শরীফ উনার ২৬ তারিখ দিবাগত রাত অর্থাৎ ২৭ তারিখ ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম শরীফ (সোমবার) রাতে পবিত্র মি’রাজ শরীফ সংঘটিত হয়েছেন। তখন নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার দুনিয়াবী বয়স মুবারক ছিলেন ৫১ বছর, আনুষ্ঠানিকভাবে নুবুওওয়াত মুবারক প্রকাশের একাদশ বছর, সম্মানিত হিজরত মুবারক উনার পূর্বে। সুবহানাল্লাহ!
পরিতাপের বিষয় হলো, পবিত্র রজবুল হারাম শরীফ মাস আসলেই কিছু কুচক্রী মহল একটি বিভ্রান্তি ছড়ায়, পবিত্র মি’রাজ শরীফের তারিখ নির্দিষ্ট নয়, এটা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। কাজেই ২৭ রজবুল হারাম শরীফে এটা পালন করার কোনো প্রয়োজন নেই। নাঊযুবিল্লাহ! এরা আগে দিবস পালন করার বিরুদ্ধে ফতওয়া দিতো। সেখানে যখন ব্যর্থ হয়েছে তখন পবিত্র মি’রাজ শরীফের তারিখ নিয়ে মানুষের মাঝে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে মানুষকে এই মহান দিবস মুবারক থেকে দূরে রাখার কোশেশ করে যাচ্ছে। যাতে করে মানুষ এই দিনের রহমত, বরকত, ছাকীনাহ থেকে মাহরুম হয়ে যায়। নাউযুবিল্লাহ! অথচ মুসলিম উম্মাহর মাঝে প্রসিদ্ধ রয়েছে যে, পবিত্র মি’রাজ শরীফ রজবুল হারাম শরীফ মাসের ২৭ তারিখেই অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং যুগ যুগ ধরে মুসলমানগণ এই তারিখের উপরই আমল করে আসছেন। এই প্রবন্ধে অনুসরণীয় কতিপয় হযরত ইমাম-মুজতাহিদ রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনাদের অভিমত তুলে ধরা হবে। ইনশাআল্লাহ!
১. পাক ভারত উপমহাদেশে পবিত্র হাদীছ শরীফের প্রচার-প্রসারকারী হযরত শায়েখ আব্দুল হক্ব মুহাদ্দিছ দেহলভী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি উনার বিশ্বখ্যাত কিতাব ‘মা ছাবাতা বিস সুন্নাহ’ উনার মধ্যে লিখেছেন-
اِعْلَمْ أَنَّه قَدْ اِشْتَهَرَ فِيْمَا بَيْنَ النَّاسِ بِدِيَارِ الْعَرَبِ أَنَّ مِعْرَاجَه صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ لِسَبْعٍ وَّعِشْرِيْنَ مِنْ رَّجَبَ
অর্থ: জেনে রাখুন! নিশ্চয়ই আরব জাহানের দেশসমূহের লোকদের মধ্যে মাশহূর বা প্রসিদ্ধ রয়েছে যে, নিশ্চয়ই নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার সম্মানিত মি’রাজ শরীফ সংঘটিত হয়েছিলেন পবিত্র রজবুল হারাম মাসের ২৭ তারিখ রাতে। সুবহানাল্লাহ! (মা ছাবাতা বিস সুন্নাহ ৭৩ পৃষ্ঠা)
২. হযরত ইমাম ইসমাঈল হাক্কী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন-
وهى ليلة سبع وعشرين من رجب ليلة الاثنين وعليه عمل الناس
অর্থ: আর তা ছিলো পবিত্র রজবুল হারাম মাসের সাতাশ তারিখ, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম শরীফ অর্থাৎ সোমবার রাত; এ মতের উপরই মানুষের আমল প্রচলিত রয়েছে। (তাফসীরে রূহুল বায়ান ৫/১০৩, তাফসীরে হাক্বী ৭/১৩৭, আল হাওঊ ফী তাফসীরিল কুরআনিল কারীম ৪৪৯/৮৭)
৩. হযরত ইমাম মুহিউদ্দীন নববী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন-
ثم نسخه بإيجاب الصلوات الخمس ليلة الإسراء بمكة بعد النبوة بعشر سنين وثلاثة أشهر ليلة سبع وعشرين من رجب
অর্থ: অতঃপর পবিত্র ইসরা বা মি’রাজ শরীফ রাতে পাঁচ ওয়াক্ত নামায ফরজ করার মাধ্যমে সেটিও (পূর্বের হুকুম) রহিত করা হয়। যা সংঘটিত হয়েছিলো সম্মানিত নুবুওয়াত মুবারক প্রকাশের দশ বছর তিন মাস পর, পবিত্র মক্কা শরীফে, সম্মানিত রজবুল হারাম শরীফ মাসের সাতাশতম রাত্রিতে। সুবহানাল্লাহ! (রওদ্বাতুত ত্বালিবীন ১০/২০৬)
৪. হযরত ইবনে কাছীর রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন-
أَنَّ الْإِسْرَاءَ كَانَ لَيْلَةَ السَّابِعِ وَالْعِشْرِينَ مِنْ رَجَب
অর্থ: নিশ্চয়ই পবিত্র ইসরা অর্থাৎ মি’রাজ শরীফ সম্মানিত রজবুল হারাম শরীফ মাসের ২৭ তারিখে সংঘটিত হয়েছেন। (আল বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ ৪/২৭০)
৫. আল্লামা হযরত বদরুদ্দীন আইনী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন-
كَانَ الْإِسْرَاء لَيْلَة السَّابِع وَالْعِشْرين من رَجَب، وَقد اخْتَارَهُ الْحَافِظ عبد الْغَنِيّ الْمَقْدِسِي رحمة الله عليه فِي سيرته
অর্থ: পবিত্র ইসরা বা মি’রাজ শরীফ সম্মানিত রজবুল হারাম শরীফ মাসের ২৭ তারিখ রাতে সংঘটিত হয়েছে। হাফিযুল হাদীছ হযরত আব্দুল গণী মাক্বদেসী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি উনার সীরাতগ্রন্থে এ মতটিকেই অধিক গ্রহণযোগ্য হিসেবে উল্লেখ করেছেন। (উমদাতুল ক্বারী ৪/৩৯ পৃষ্ঠা, নুখাবুল আফকার ৩/৯)
৬. হযরত ইমাম যারক্বানী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন-
"وقيل: كان ليلة السابع والعشرين من رجب" وعليه عمل الناس، قال بعضهم: وهو الأقوى، فإن المسألة إذا كان فيها خلاف للسلف ولم يقم دليل على الترجيح واقترن العمل بأحد القولين أو الاقوال، وتلقى بالقبول فإن ذلك مما يغلب على الظن كونه راجحا
অর্থ: আরও বলা হয়েছে, পবিত্র মি’রাজ শরীফ সম্মানিত রজবুল হারাম মাসের ২৭ তারিখ রাতে সংঘটিত হয়েছে। আর এই মতের উপরই মানুষের আমল চলে আসছে। কতিপয় আলিম বলেছেন, এই মতটিই সবচেয়ে শক্তিশালী। কেননা (নিয়ম হচ্ছে,) কোনো বিষয়ে যদি সালফে ছালেহীন অর্থাৎ পূর্ববর্তীতের মধ্যে মতভেদ থাকে এবং কোনো মতকে প্রাধান্য দেয়ার জন্য স্পষ্ট দলিল না পাওয়া যায়, এমতাবস্থায় যদি ঐ মতগুলোর কোনো একটির উপর মানুষের আমল চলতে থাকে এবং তা সাধারণভাবে গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে, তাহলে এতে প্রবল ধারণা সৃষ্টি হয় যে সেটিই অধিক প্রাধান্যপ্রাপ্ত (শক্তিশালী) মত। (শরহুয যারক্বানী আলাল মাওয়াহিব ২/৭১)
৭. হযরত মুহম্মদ ইবনে ইসমাইল তাহতাভী হানাফী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি উনার ‘হাশিয়াতুত তাহতাবী আলা মারাক্বিইল ফালাহ’ উনার মধ্যে উল্লেখ করেছেন-
"وفرضت ليلة المعراج" وهي ليلة الإسراء على ما عليه جمهور المحدثين والمفسرين والفقهاء والمتكلمين وهو الحق كما قاله القاضي عياض رحمة الله عليه وكانت بعد البعثة على الصواب قبل الهجرة .............وقيل ليلة سبع وعشرين من رجب وعليه العمل في جميع الأمصار وجزم به النووي رحمة الله عليه في الروضة تبعا للرافعي رحمة الله عليه
অর্থ: পবিত্র ছলাত বা নামায ফরয করা হয়েছিলো পবিত্র মি’রাজ শরীফ উনার রাতে, আর এটাই পবিত্র ইসরা উনার রাত। এটাই জুমহূর মুহাদ্দিছ, মুফাসসির, ফক্বীহ এবং কালামশাস্ত্রবিদ উনাদের অভিমত। এটাই প্রকৃত সত্য কথা, যেমনটা হযরত কাজী ইয়ায রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেছেন। সঠিক মত অনুযায়ী পবিত্র মি’রাজ শরীফ সংঘটিত হয়েছিলেন, সম্মানিত নুবুওওয়াত মুবারক প্রকাশের পর এবং সম্মানিত হিজরত মুবারক উনার পূর্বে। ............ আরো বলা হয়েছে, পবিত্র মি’রাজ শরীফ সম্মানিত রজবুল হারাম শরীফ মাসের সাতাশ তারিখ রাতে সংঘটিত হয়েছিলেন। আর এই মত অনুযায়ী-ই সকল নগর, বন্দর, অঞ্চল ও ভূখ-ে আমল চলে আসছে। হযরত ইমাম নববী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি উনার ‘রওদ্বাতুত ত্বালিবীন’ কিতাবে হযরত ইমাম রাফেয়ী রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার অনুসরণে এ মতটিকেই নিশ্চিতভাবে গ্রহণ করেছেন। (হাশিয়াতুত তাহতাবী আলা মারাক্বিইল ফালাহ ১৭২ পৃষ্ঠা) (অসমাপ্ত)
-হাফিয মুহম্মদ ইমামুল হুদা।
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
গাযওয়াতুল হুদায়বিয়াহ বা হুদায়বিয়ার জিহাদ (১৩)
০৪ মে, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
পবিত্র নামাযের মাসয়ালা-মাসায়িল
০৪ মে, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
প্রাণীর ছবি তোলা শক্ত হারাম, রয়েছে কঠিন শাস্তি
০৪ মে, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
ছহিবু সাইয়্যিদি সাইয়্যিদিল আ’ইয়াদ শরীফ, আস সাফফাহ, আল জাব্বারিউল আউওয়াল, আল ক্বউইউল আউওয়াল, হাবীবুল্লাহ, আহলু বাইতি রসূলিল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, মাওলানা মামদূহ মুর্শিদ ক্বিবলা সাইয়্যিদুনা হযরত সুলত্বানুন নাছীর আলাইহিস সালাম উনার পবিত্র ওয়াজ শরীফ হযরত উম্মাহাতুল মু’মিনীন আলাইহিন্নাস সালাম উনারা বেমেছাল মর্যাদার অধিকারী (১৫৫)
০৪ মে, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
মহাসম্মানিত সুন্নত মুবারকসমূহ যারা পালন করেন উনাদেরকে অনেক ফযীলত দেয়ার সাথে সাথে তিনটি বিশেষ ফযীলত হাদিয়া করা হয়-
০৪ মে, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
পর্দা করা ফরজ, বেপর্দা হওয়া হারাম
৩০ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
সাইয়্যিদুনা হযরত সুলত্বানুন নাছীর আলাইহিস সালাম উনার পবিত্র ওয়াজ শরীফ
৩০ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-
৩০ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
ওলীআল্লাহ উনাদের সম্পর্কে বদ আক্বীদা পোষণ এবং উনাদের বিরুদ্ধাচরণের কারণে কঠিন পরিণতি
৩০ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু (৫)
৩০ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
সম্মানিত মসজিদের মধ্যে উচ্চস্বরে কথা বলা সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ
২৯ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
অসংখ্য হাদীছ শরীফ দ্বারা প্রমাণিত- প্রাণীর ছবি হারাম
২৯ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার)












