তিস্তা মহাপরিকল্পনা: একটি নদী, কোটি মানুষের স্বপ্ন
বর্ষার উত্তাল স্রোতে ঘরবাড়ি গিলে খায় নদী। কয়েক মাস পর সেই নদীর বুকই পরিণত হয় ধুলোমাখা বিস্তীর্ণ চরে। একই নদী কখনও কেড়ে নেয় মানুষের বসতভিটা, আবার কখনও কৃষকের জমিতে সেচের পানিটুকুও দিতে পারে না। এ যেন দুই বিপরীত চরিত্রের এক নদী তিস্তা।
, ১৫ মুহররম শরীফ, ১৪৪৮ হিজরী সন, ০২ ছানী, ১৩৯৪ শামসী সন , ০১ জুলাই, ২০২৬ খ্রি:, ১৭ আষাঢ়, ১৪৩৩ ফসলী সন, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) তাজা খবর
উত্তরাঞ্চলের মানুষের কাছে তিস্তা শুধু একটি নদী নয়; এটি জীবন, জীবিকা, কৃষি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি এবং টিকে থাকার প্রতীক। অথচ বছরের পর বছর নদীভাঙন, আকস্মিক বন্যা, শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট এবং অপরিকল্পিত নদী ব্যবস্থাপনার কারণে এই জনপদ ক্রমেই পিছিয়ে পড়েছে। সেই বাস্তবতায় বহু বছর ধরে আলোচিত তিস্তা মহাপরিকল্পনা এখন শুধু একটি অবকাঠামো প্রকল্প নয়; এটি উত্তরাঞ্চলের অর্থনৈতিক পুনর্জাগরণের স্বপ্ন হয়ে উঠেছে।
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরকে ঘিরে আবারও আলোচনায় এসেছে প্রকল্পটি। তিস্তা অববাহিকার মানুষের প্রত্যাশা, দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে এবার হয়তো বাস্তবায়নের পথে এগোবে এই মহাপরিকল্পনা।
নদীর সঙ্গে সহাবস্থানের কঠিন বাস্তবতা
লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুর, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধার বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে তিস্তার প্রভাব। বর্ষা এলেই নদীর ভয়াল রূপ দেখা দেয়। নদীভাঙনে বিলীন হয় বসতভিটা, আবাদি জমি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বাজার, সড়ক ও জনপদ। আবার শুষ্ক মৌসুমে নদীর বিশাল অংশ জেগে ওঠে বালুচরে। পানির অভাবে কৃষকরা চাষাবাদে পড়েন চরম সংকটে।
এই দুই চরম বাস্তবতার মাঝখানে আটকে আছে তিস্তা পাড়ের লাখো মানুষের জীবন। তিস্তার গতিপথের পরিবর্তন, পলি জমে নাব্যতা কমে যাওয়া, অপরিকল্পিত নদী ব্যবস্থাপনা এবং উজানের পানিপ্রবাহের পরিবর্তন-সব মিলিয়েই জটিল হয়েছে পরিস্থিতি। ফলে প্রতিবছর নদীকে কেন্দ্র করে নতুন করে তৈরি হয় মানবিক ও অর্থনৈতিক সংকট। সমীক্ষা অনুযায়ী, তিস্তা মহাপরিকল্পনা কেবল নদী খননের প্রকল্প নয়, এটি নদী ব্যবস্থাপনা, ভূমি উন্নয়ন, যোগাযোগ, কৃষি, শিল্প, পরিবেশ এবং পুনর্বাসনকে একসঙ্গে বিবেচনায় নেওয়া একটি সমন্বিত পরিকল্পনা।
প্রস্তাবিত প্রকল্পে রয়েছে ১১০ কিলোমিটার নদীতীর সংরক্ষণ, সমান দৈর্ঘ্যের নদী ড্রেজিং, ২২৪ দশমিক ৩০ কিলোমিটার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার, বাঁধের ওপর সড়ক নির্মাণ এবং ৬৭টি গ্রোয়েন ও স্পার নির্মাণ বা পুনর্নির্মাণ। পাশাপাশি প্রায় ১৭০ দশমিক ৮৭ বর্গকিলোমিটার নতুন ভূমি পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ১৩ হাজার ৩৪০ কোটি ৬০ লাখ টাকা।
নদী থেকে উঠে আসবে নতুন ভূমি
মহাপরিকল্পনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো পুনরুদ্ধার হওয়া ভূমির পরিকল্পিত ব্যবহার।
সমীক্ষা অনুযায়ী উদ্ধার হওয়া জমির মধ্যে প্রায় ৭৩ বর্গকিলোমিটার শিল্পায়ন ও সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য, ৫৪ দশমিক ৬৭ বর্গকিলোমিটার আধুনিক কৃষি উন্নয়নের জন্য, ৬ দশমিক ৮২ বর্গকিলোমিটার আধুনিক নগরায়নের জন্য এবং প্রায় ৩৬ দশমিক ৪৫ বর্গকিলোমিটার নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসনের জন্য ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে উত্তরাঞ্চলে নতুন শিল্পাঞ্চল, পরিকল্পিত আবাসন এবং কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির আধুনিক রূপ গড়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশ নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর লক্ষ্যে কাজ করছে বর্তমান সরকার। কিন্তু বড় চ্যালেঞ্জ পর্যাপ্ত জমির অভাব। এখানেই নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে তিস্তা মহাপরিকল্পনা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উদ্ধার হওয়া জমিতে বৃহৎ আকারের সৌরবিদ্যুৎ পার্ক স্থাপন করা সম্ভব হলে এক হাজার মেগাওয়াটেরও বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যেতে পারে। এতে আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর চাপ কমবে, পাশাপাশি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাও আরও শক্তিশালী হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে এটি শুধু একটি বিদ্যুৎ প্রকল্প নয়; বরং পরিবেশবান্ধব উন্নয়নের একটি কৌশলগত উদ্যোগ হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে। তিস্তা মহাপরিকল্পনার প্রভাব শুধু নদীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না।
নদীভাঙন কমলে কৃষিজমি রক্ষা পাবে। বন্যা নিয়ন্ত্রণ সহজ হবে। আধুনিক সেচব্যবস্থা গড়ে উঠবে। নদীকেন্দ্রিক যোগাযোগ উন্নত হবে। শিল্পায়নের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে। বাড়বে কর্মসংস্থান। নদীভাঙনে বাস্তুচ্যুত মানুষের পুনর্বাসনের সুযোগও তৈরি হবে। সব মিলিয়ে দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়ন বঞ্চিত উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতিতে নতুন গতি আসতে পারে।
শুরু থেকেই তিস্তা মহাপরিকল্পনায় বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করেছে চীন। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের পর আবারও প্রকল্পটি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী স্পট করে বলেছেন, তিস্তা ব্যারাজ মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে তার সরকার বদ্ধপরিকর। অন্যদিকে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ও প্রকল্প বাস্তবায়নের বিষয়ে ইতিবাচক অবস্থানের কথা জানিয়েছে।
তবে অর্থায়ন নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি প্রকল্প বাস্তবায়নে পরিবেশগত ভারসাম্য, স্থানীয় জনগণের মতামত, আন্তর্জাতিক নদী ব্যবস্থাপনা এবং দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ পরিকল্পনাও সমান গুরুত্ব পেতে হবে।
তিস্তা পাড়ের মানুষের কাছে উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি নতুন নয়। বহু বছর ধরে বিভিন্ন সময়ে নানা ঘোষণা এসেছে। কিন্তু বাস্তবে নদীভাঙন থামেনি, পানির সংকটও কাটেনি। তাই এবার তাদের প্রত্যাশা শুধু নতুন ঘোষণা নয়, দৃশ্যমান কাজের সূচনা। কারণ তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে সেটি শুধু একটি নদী সংস্কার প্রকল্প হবে না। এটি হতে পারে উত্তরাঞ্চলের অর্থনৈতিক পুনর্জাগরণ, জলবায়ু সহনশীল উন্নয়ন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণ এবং নদীকেন্দ্রিক টেকসই উন্নয়নের নতুন অধ্যায়।
আজও তিস্তার তীরে দাঁড়িয়ে হাজারো মানুষ অপেক্ষা করেন কবে এই নদী আর দুর্ভোগের প্রতীক না হয়ে উন্নয়ন, নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধির প্রতীক হয়ে উঠবে।
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
রাজধানীর সড়কে যানজট শুল্কের প্রস্তাব, আদায় যেভাবে
০১ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
রাশিয়া-কানাডা থেকে আসছে ৩৫১ কোটি টাকার সার
০১ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
জানা গেল প্রাথমিক বৃত্তির ফল প্রকাশের সম্ভাব্য সময়
০১ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
‘মালয় প্রার্থীকে ভোট দেয়ার’ আহ্বান মাহাথিরের: মাদানি সমর্থকদের তীব্র প্রতিক্রিয়া
০১ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
হিমাগারের অতিরিক্ত ভাড়া: কাফনের কাপড় পরে কৃষকের গণ-অনশন
০১ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
ব্যাংকের টাকা লেনদেনের ফি নিয়ে নতুন নির্দেশনা
০১ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
বাংলা কিউআর কোডে লেনদেনে নতুন নির্দেশনা
০১ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
নামাজ পড়াতে মসজিদে যাচ্ছিলেন খতিব, ট্রাকচাপায় গেল প্রাণ
০১ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে ডিএসসিসির সড়ক ব্যবস্থাপনা বিষয়ক সভা
০১ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
চীনের ‘টু প্লাস টু’ ও করিডর প্রস্তাব বিবেচনা করবে সরকার: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী
০১ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
সুপ্রিম কোর্টের একটি তালার পেটে কয়েকশ’ চাবি
০১ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
মনিবের অবাধ্য হলে শিক্ষা দেবে ইরান: ইসরায়েলকে আরাগচির হুঁশিয়ারি
০১ জুলাই, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার)












