হাক্বীক্বী মৃত্যুকে স্মরণ করার মধ্যেই শহীদী দরজা মিলে
, ১২ ডিসেম্বর, ২০২৫ ১২:০০:০০ এএম ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) পবিত্র দ্বীন শিক্ষা
এক বুযূর্গ ব্যক্তি, মহান আল্লাহ পাক উনার বিশিষ্ট ওলী, বুযূর্গ ছিলেন। সেই দেশের যে বাদশাহ ছিলো, সে উক্ত বুযূর্গ বা মহান আল্লাহ পাক উনার ওলীর মুরীদ ছিলো। তিনি নছীহত করতেন, তা’লীম দিতেন। বাদশাহও প্রায় সময় তার পীর সাহেব অর্থাৎ সেই ওলীআল্লাহ বা বুযূর্গ ব্যক্তির খানকা শরীফে আসতো। এসে নছীহত হাছিল করে তা’লীম নিয়ে যেতো। একদিন সেই মহান আল্লাহ পাক উনার ওলী, বুযূর্গ ব্যক্তি তিনি নছীহত করলেন যে, মানুষের অন্তরের মধ্যে দুনিয়ার মুহব্বত বেশী হয়ে গিয়েছে। মানুষ দুনিয়াতে গরক (মশগুল) থাকার কারণে মহান আল্লাহ পাক উনার থেকে গাফিল হয়ে গিয়েছে। তবে কোন ব্যক্তি যদি মৃত্যুকে বেশি বেশি স্মরণ করতে পারে, তাহলে তার অন্তর থেকে দুনিয়ার মুহব্বত দূর হয়ে যাবে।
পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে রয়েছে- মহান আল্লাহ পাক উনার রসূল, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি বলেছেন, “কোন ব্যক্তি যদি প্রতিদিন ২০ বার মৃত্যুর কথা স্মরণ করে, তাহলে তাকে শহীদী দরজা দেয়া হবে। তাহলে তার অন্তর থেকে দুনিয়ার মুহব্বতও দূর হয়ে যাবে। ” সেই বুযূর্গ মহান আল্লাহ পাক উনার ওলী তিনি নছীহত করলেন। বাদশাহ সেটা শুনলো, শুনে মনে মনে চিন্তা করলো- যেহেতু বাদশাহ সবসময় বাদশাহী কাজে মশগুল থাকে, তার অন্তরে দুনিয়ার মুহব্বত বেশী হওয়াটা স্বাভাবিক। বাদশাহ তার বাড়ীতে চলে গেলো, প্রাসাদে চলে গেলো। কিছুদিন পর আবার আসলো সেই বুযূর্গ ব্যক্তির সাক্ষাতে। এসে জানালো যে, হুযূর! আমি একটা তসবীহ তৈরী করেছি। তার দানা হচ্ছে এক হাজারটা। অর্থাৎ এক হাজার দানার আমি একটা তসবীহ তৈরী করেছি। আপনি যেহেতু বলেছেন, প্রতিদিন ২০ বার মৃত্যুর কথা স্মরণ করলে শহীদী দরজা পাওয়া যায় এবং অন্তর থেকে মৃত্যুকে স্মরণ করলে অন্তর থেকে দুনিয়ার মুহব্বত দূর হয়ে যায়।
যেটা মূলতঃ পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার অন্তর্ভূক্ত। আমি সেটা শুনে এক হাজার দানার একটা তসবীহ তৈরী করেছি। প্রতিদিন আমি এক হাজারবার মৃত্যুর কথা স্মরণ করে থাকি। যখন বাদশাহ এই কথা বললো, সেই বুযূর্গ ব্যক্তি কিছু বললেন না। বললেন খুব ভাল হয়েছে। বলে তিনি উনার নছীহত করলেন। বাদশাহও এতমিনানের মধ্যে রয়েছে। সে মৃত্যুকে স্মরণ করতেছে। হয়ত তার অন্তর থেকে দুনিয়ার মুহব্বত দূর হয়ে যাবে ইত্যাদি ইত্যাদি। বাদশাহ চলে গেলো। হঠাৎ একদিন সেই বুযূর্গ ব্যক্তি বাদশাহর দরবারে গিয়ে উপস্থিত হলেন। যেহেতু তিনি পূর্বে কোনদিন যাননি সেখানে। অর্থাৎ বিনা দাওয়াতে তিনি কোথাও যান না। দাওয়াত ছাড়া বিনা কথা বিনা বলায় তিনি সেখানে উপস্থিত হয়ে গেলেন। বাদশাহ দেখেতো আশ্চর্য্য হয়ে গেলো। যেহেতু বাদশাহর পাশে কোন আসন ছিলো না বসার মত। বাদশাহ একাই আসনে বসা ছিলো, আর সকলেই নীচে বসা ছিলো।
এখন বাদশাহ কি করবে? অস্থির হয়ে তাড়াতাড়ি বাদশাহ সেই বুযূর্গ ব্যক্তি উনাকে তার আসনে বসিয়ে দিলো এবং সে নিজে নীচে বসলো। যখন সে নীচে বসলো, তখন সেই বুযূর্গ ব্যক্তি বললেন, হে বাদশাহ! তোমার দেশে তো নিয়ম রয়েছে, তোমার এদেশে নিয়ম রয়েছে, যে গদীতে বসবে তার কথামত দেশ চলবে। বাদশাহ বললো, হ্যাঁ; তখন সেই বুযূর্গ ব্যক্তি বললেন, আমি যেহেতু এখন আসনে বসেছি, গদীতে বসেছি, এখন কি আমার কথামত চলবে? বাদশাহ বললো, জি হুযূর। অবশ্যই আপনি যা আদেশ করবেন সেটাই পালন করা হবে। তখন সেই বুযূর্গ ব্যক্তি বললেন, এক কাজ করো, জল্লাদকে ডেকে নিয়ে আসো। জল্লাদকে ডাকা হলো। জল্লাদ আসলো। তখনো কেউ ব্যাপারটা কিছু বুঝতে পারলো না।
যখন জল্লাদকে আনা হলো, তখন সেই মহান আল্লাহ পাক উনার ওলী তিনি বললেন যে- এখন আমি যা আদেশ করবো, সেটা কি পালন করা হবে? জি হ্যাঁ, আপনি যা বলবেন, সেটাই পালন করা হবে। তিনি বললেন, তাহলে এক কাজ করো হে জল্লাদ, তুমি বাদশাহকে বাঁধো, শক্ত করে বাঁধো, বাদশাহকে মৃত্যুদ- দেয়া হবে। যখন একথা বলা হলো, জল্লাদ বাদশাহকে বাঁধলো। সমস্ত উজীর-নাজীর যারা ছিলো, তারাতো চিন্তা-পেরেশানীর মধ্যে পড়ে গেলো। কি ব্যাপার? তিনি বুযূর্গ মহান আল্লাহ পাক উনার ওলী জানি, তিনি এখানে আসলেন, বাদশাহকে বাঁধালেন, কি ব্যাপার? এবং বাদশাহকে মৃত্যুদ- দিয়ে তিনি কি রাজত্ব দখল করবেন? এই কি উনার খেয়াল অন্তরে? নানান চু-চেরা, কিল ও কাল তাদের মনে চলতে থাকলো। বাদশাহর মনেও নানান চিন্তা-ফিকির। তিনি মহান আল্লাহ পাক উনার ওলী, বুযুর্গ। তিনি কেন আমাকে বাঁধলেন আর কেনই বা আমাকে মৃত্যুদ- দিবেন। কিন্তু সেই বুযূর্গ ব্যক্তি তিনি ঘোষণা করলেন, জল্লাদ তুমি তরবারী নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকো। আর বাদশাহও মাথা বাঁকা করে দাঁড়িয়ে রইলো। তার মাথার উপরে তরবারী নিয়ে সে জল্লাদ দাঁড়িয়ে রইলো। তো মহান আল্লাহ পাক উনার ওলী বললেন যে, আমি এক থেকে বিশ পর্যন্ত গোনবো, এক থেকে বিশ পর্যন্ত। যখন আমার গোনা শেষ হয়ে যাবে, তখন তুমি বাদশাহর গর্দানে তরবারী চালিয়ে দিবে এবং তার পূর্বে কখনো করবে না। বিশ না গোনা পর্যন্ত তরবারী তুমি চালাবে না।
জল্লাদ বললো, ঠিক আছে। সেই মহান আল্লাহ পাক উনার ওলী তিনি গোনতেছেন আস্তে আস্তে করে। এক, দুই এরকম করে তিনি আস্তে আস্তে গোনতে লাগলেন। ১২-১৪ হয়ে গেলো, মানুষতো অস্থির হয়ে গেলো। বাদশাহর যেহেতু স্বাস্থ্য ভাল। বাদশাহর শরীর ঘেমে সমস্ত দরবার ভিজে গেলো। সেখানে যা ছিলো- বিছানাপত্র, কার্পেট সব ভিজে গেলো। বাদশাহ অস্থির হয়ে গেলো। যখন পনের-ষোলতে গোনা হলো, তখন বাদশাহ যেহেতু অস্থির সে বেহুশ হয়ে যাওয়ার মত অবস্থা হলো। তখন সেই মহান আল্লাহ পাক উনার ওলী তিনি বললেন জল্লাদকে যে, তোমার তরবারী নিয়ে তুমি চলে যাও। সকলে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো। কি ব্যাপার এখন। তখন বাদশাহর যারা খাছ খাদেম ছিলো, তাদেরকে ডাকা হলো। ডেকে বলা হলো তোমরা এদিকে আসো। বাদশাহকে নিয়ে যাও। দৈনিক তোমরা বাদশাহকে যেভাবে তা’যীম-তাকরীমের সাথে গোসল করায়ে থাকো শাহী কায়দায়, ঠিক আজকে সেই শাহী কায়দায় তোমরা গোসল করায়ে নিয়ে আসো। যখন বলে দেয়া হলো, তখন সেই খাদেমরা নিয়ে গেলো বাদশাহকে। শাহী কায়দায় গোসল করায়ে, আতর-গোলাপ মেখে, নতুন কাপড় পরায়ে, আর দরবারে যা ভিজে গিয়েছিলো সেগুলি মুছে পরিস্কার করে নতুন বিছানা দিয়ে আবার বাদশাহকে এনে বসানো হলো। মানুষ তো সব চিন্তার মধ্যে রয়ে গেলো, কি ব্যাপার হচ্ছে। এরমধ্যে যখন এসে পৌঁছলো, তখন সেই বুযূর্গ ব্যক্তি তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, “বাদশাহ! তুমি কি এখন বলতে পারবে, তোমার কেমন মনে হয়েছিলো?” বাদশাহ বললো যে, হুযূর আর কি বলবো- এটা বলার মত নয় যে কি অবস্থায় গিয়ে পৌঁছেছিলাম, এটা বলার ভাষা আমার নেই। তখন সেই মহান আল্লাহ পাক উনার ওলী বললেন যে, “তোমার রাজত্ব আমি দখল করতে আসিনি। আমার এই রাজত্ব দরকার নেই। এর চাইতে অনেক বড় রাজত্ব মহান আল্লাহ পাক তিনি আমাকে দান করেছেন। আমি শুধু এসেছিলাম, তুমি আমাকে বলেছিলে- তুমি এক হাজার দানার একটা তসবীহ তৈরী করেছো, প্রতিদিন তো মৃত্যুকে এক হাজারবার স্মরণ করে থাকো, তোমার এটা যেহেতু শুদ্ধ নয়, তোমাকে বাস্তবভাবে যদি আমি না বুঝিয়ে দেই, তুমি সেটা বুঝতে পারবে না। সেটা বুঝাবার জন্য আমি এসেছিলাম। আজকে তুমি যেভাবে মৃত্যুকে স্মরণ করলে, ঠিক এ রকমভাবে যদি কেউ ২০ বার মৃত্যুকে স্মরণ করতে পারে, তাহলে যেমন শহীদী দরজা সে পাবে, তদ্রুপ তার অন্তর থেকে দুনিয়ার মুহব্বত দূর হয়ে যাবে। ” সুবহানাল্লাহ!
এখন চিন্তা এবং ফিকিরের বিষয় যে, দুনিয়ার মুহব্বত যেহেতু গাঢ়, সেটা দূর করতে হলে সে রকম শক্ত করে দূর করতে হবে। যদি খালেছভাবে মৃত্যুকে স্মরণ করতে পারে, তাহলেই তার অন্তর থেকে দুনিয়ার মুহব্বত দূর করা সম্ভব, অন্যথায় কখনোই সম্ভব নয়। অর্থাৎ দুনিয়া সম্পূর্ণ ছেড়ে দিতে হবে। দুনিয়া এজন্যই করতে হবে, যতটুকু মহান আল্লাহ পাক তিনি নির্দেশ দিয়েছেন, মহান আল্লাহ পাক উনার রসূল ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি নির্দেশ দিয়েছেন, ঠিক ততটুকুই, তার চাইতে বেশী নয়।
-

এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
সম্মানিত ইসলামী শরীয়ত উনার দৃষ্টিতে- ফুটবল-ক্রিকেটসহ সর্বপ্রকার খেলাধুলা করা, সমর্থন করা হারাম ও নাজায়িয (৫)
২০ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
পর্দা করা ফরজ, বেপর্দা হওয়া হারাম
২০ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
সাইয়্যিদুনা হযরত সুলত্বানুন নাছীর আলাইহিস সালাম উনার পবিত্র ওয়াজ শরীফ
২০ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু (৬)
২০ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
কদমবুছী করা খাছ সুন্নত মুবারক
২০ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
সম্মানিত হযরত ইমাম পরিবার আলাইহিমুস সালাম উনাদেরকে অবরোধ ও ফোরাত নদীর পানি পান করতে বাধা প্রদান
২০ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
পবিত্রতা সম্পর্কিত মাসয়ালা-মাসায়িল (১০)
১৯ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
প্রাণীর ছবি তোলা হারাম ও নাফরমানীমূলক কাজ
১৯ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
সাইয়্যিদুনা হযরত সুলত্বানুন নাছীর আলাইহিস সালাম উনার পবিত্র ওয়াজ শরীফ
১৯ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
কারবালার ঘটনার জন্য মালউন ইয়াযিদ লানতুল্লাহি আলাইহি দায়ী এবং সে কাফির (২)
১৯ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে সম্বোধন মুবারক করার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ আদব-শরাফত বজায় রাখতে হবে
১৯ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
মহান আল্লাহ পাক তিনি পবিত্র কুরআন শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক করেন-
১৯ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার)












