হযরত আউলিয়ায়ে কিরাম রহমতুল্লাহি আলাইহিম উনাদের কিছু সংক্ষিপ্ত ঘটনা ও ইবরত নছীহত (৭)
, ২৫ মে, ২০২৫ ১২:০০:০০ এএম ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) পবিত্র দ্বীন শিক্ষা
(১৫) হযরত আবু আব্দুল্লাহ মুহম্মদ ইবনুল হুসাইন তারুগান্দী রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি একদিন পবিত্র মক্কা শরীফ উনার এক বাজারে গিয়েছিলেন। তিনি গিয়ে দেখলেন, এক বৃদ্ধ এক ক্রীতদাসীকে বিক্রি করার জন্য দাঁড়িয়ে আছে। ক্রীতদাসীর শরীরের রং ফ্যাকাসে হয়ে গেছে, শরীর ভীষণ রোগা ও দূর্বল, কিন্তু চেহারা বেশ নূরানী।
বৃদ্ধ লোকটি বলছে, সে ২০ দীনারের অধিক মূল্যে এই বাঁদীকে বিক্রি করবে এবং তার দোষ-ত্রুটির জন্য তাকে ফেরত দেয়া যাবে না। তখন হযরত আবু আব্দুল্লাহ মুহম্মদ ইবনুল হুসাইন রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বৃদ্ধের কাছে গিয়ে বাঁদীর দোষ-ত্রুটি সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করলেন। বৃদ্ধ বললো, “এ বাঁদী পাগলিনী, সব সময় চিন্তায় নিশ্চুপ হয়ে থাকে। সারা রাত্রি ইবাদত করে, দিনে রোযা রাখে, সর্বদা একা একা থাকতে পছন্দ করে। ”
একথা শুনে আগ্রহ সহকারে তিনি বৃদ্ধের দাবিকৃত মূল্যে বাঁদীকে ক্রয় করে নিজের বাড়ীতে নিয়ে গেলেন। বাঁদী তখন বললো, “হে আমার ছোট প্রভু! মহান আল্লাহ পাক তিনি আপনার প্রতি রহম করুন। আপনি কোথাকার বাসিন্দা?” তিনি বললেন, “আমি ইরাকের বাসিন্দা”, সে জিজ্ঞেস করলো, “কোন ইরাক? বসরার ইরাক না কুফার ইরাক?” তিনি বললেন, “বসরার ইরাক। ” সে তখন বললো, “আপনি সম্ভবত বাগদাদের মদীনাতুস সালামে থাকেন?” তিনি স্বীকৃতিসূচক হ্যাঁ বললেন। বাঁদী তখন আনন্দিত হয়ে বললো, “বাহ! এ শহরটি তো জাহেদ এবং আবেদগণের শহর। ”
একথা শুনে হযরত ইবনুল হুসাইন রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি আশ্চর্য হয়ে গেলেন এবং মনে মনে ভাবলেন বাঁদী তো অন্দর মহলের বাসিন্দা, সে কি করে জাহেদ এবং আবেদগণের খবর রাখে। অতঃপর তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি বুযূর্গানে দ্বীনের মধ্যে কাকে কাকে চেনো?” সে তখন হযরত মালিক ইবনে দীনার রহমতুল্লাহি আলাইহি, হযরত বিশর হাফী রহমতুল্লাহি আলাইহি, হযরত মারূফ কারখী রহমতুল্লাহি আলাইহি, হযরত মুহম্মদ ইবনুল হুসাইন রহমতুল্লাহি আলাইহি এবং আরও কয়েকজনের নাম মুবারক বললো।
আরও কিছু আলাপের পর হযরত মুহম্মদ ইবনুল হুসাইন রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বললেন, “হে বাঁদী! আমিই মুহম্মদ ইবনুল হুসাইন। ” বাঁদী তখন বললো, “আমি মহান আল্লাহ পাক উনার নিকট আরজু করেছিলাম, যেন মহান আল্লাহ পাক তিনি আপনার সাথে আমার সাক্ষাৎ করিয়ে দেন। আপনার যেই মধুর আওয়াজ দ্বারা মুরীদগণের দিল জিন্দা করতেন এবং শ্রোতাদের চোখে পানি ঝরাতেন, সেই মধুর আওয়াজ কই? আপনার রবের কসম! আপনি আমাকে পবিত্র কুরআন শরীফ তিলাওয়াত করে শুনান। ”
তিনি তখন শুধুমাত্র “বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম” পড়লেন। এতেই বাঁদী চিৎকার করে বেহুঁশ হয়ে পড়লো। চোখে মুখে পানি ছিটা দেওয়ার পর কিছুক্ষণের মধ্যে হুঁশ ফিরে এলে বাঁদী বললো, “হে আবু আব্দুল্লাহ! এ তো উনার নাম মাত্র। এ শুনেই আমি অজ্ঞান হলাম। আর যখন উনাকে আমি চিনতে পারবো এবং বেহেশতে দেখতে পাবো তখন আমার কি অবস্থা হবে?” এ বলে সে আরও কিছু তিলাওয়াতের জন্য অনুরোধ করলো।
অতঃপর হযরত মুহম্মদ ইবনুল হুসাইন রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি একখানা আয়াত শরীফ পাঠ করলেন, যার অর্থ: “যারা গুণাহ করছে, তারা কি মনে করে যে, আমি তাদেরকে ঈমানদার ও নেককারদের সমান করবো? তাদের জীবন ও মৃত্যু একইরূপ? (কখনোই না)। কাফিররা যা বলে, তা খুবই মন্দ। ” বাঁদী বললো, “হে আবু আব্দুল্লাহ! আমি কোন মূর্তিকে পূজা করিনি। অন্য কোন মাবুদকেও কবুল করিনি। মহান আল্লাহ পাক আপনার প্রতি রহমত বর্ষণ করুন। ”
হযরত মুহম্মদ ইবনুল হুসাইন রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি আরও তিলাওয়াত করলেন, যার অর্থ: “আমি যালিমদের জন্য দোযখের আগুন প্রস্তুত করে রেখেছি, তাদের চতুষ্পার্শ্বে আগুনের তাবু থাকবে। তারা পানি প্রার্থনা করলে, তাদেরকে তাম্রগলিত উত্তপ্ত পানির ন্যায় পানি দেয়া হবে; যা তাদের চেহারার চামড়া খসিয়ে ফেলবে। তাদের এ পান করাও মন্দ, তাদের বাসস্থানও নিকৃষ্ট। ”
উনার তিলাওয়াত শেষ হলে বাঁদী বললো, “হে আবু আব্দুল্লাহ! আপনি নিজের নফসকে নৈরাজ্যের মধ্যে রেখেছেন। অন্তঃকরণকে ভয় এবং আশার মধ্যস্থলে রেখে একটু আরাম দিন। ” তারপর সে আরও কিছু পাঠ করার জন্য বললো।
হযরত আবু আব্দুল্লাহ মুহম্মদ ইবনুল হুসাইন রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি আরো পড়লেন, যার অর্থ: “কতক চেহারা কিয়ামতের দিন আনন্দিত, হাসিমাখা এবং প্রফুল্ল হবে। ” তিনি আরও পড়লেন, যার অর্থ: “কতক চেহারা সে দিন সতেজ, প্রফুল্ল স্বীয় পরওয়ারদেগারকে দর্শনকারী হবে। ”
বাঁদী বললো, “আহা! উনার (মহান আল্লাহ পাক) সাথে মিলিত হবার জন্য আমার মনে কত আগ্রহ, যেদিন তিনি স্বীয় বান্দীকে দর্শন দেবার জন্য আত্মপ্রকাশ করবেন। আপনি আরও কিছু পড়ুন। ”
বাঁদীর অনুরোধে তিনি আরো পড়লেন, যার অর্থ: “বেহেশতবাসীগণ, যারা অনন্তকাল স্থায়ী হবে, তাদেরকে প্রদক্ষিণ করবে বালকগণ, হাতে শরাবে মায়ীনের পেয়ালা, জগ এবং পানপাত্র নিয়ে। সে শরাব পানকারীদের মাথাও ঘুরবে না, তারা মাতালও হবে না। ”
অতঃপর বাঁদী বললো, “হে আবু আব্দুল্লাহ! আমার মনে হয়, আপনি বেহেশতের হুরদিগকে মিলনের পয়গাম পাঠিয়েছেন। তবে তাদের মোহর আদায় করেছেন কি?”
হযরত ইবনুল হুসাইন রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বললেন, “হে বাঁদী! তা কি জিনিস?” সে বললো, “রাত জেগে ইবাদত করা নিজের জন্য ওয়াজিব করে নিন, সর্বদা রোযা রাখুন, ফকীর মিসকীনদের মুহব্বত করুন। ” অতঃপর বাঁদী বেহুঁশ হয়ে গেলো। চোখে মুখে পানি ছিটা দেবার পর হুঁশ ফিরে এলে সে মুনাজাত করতে শুরু করলো। মুনাজাত করতে করতে সে আবার অজ্ঞান হয়ে গেলো। এবার আর জ্ঞান ফিরে এলো না, অর্থাৎ সে ইন্তেকাল করলো।
-০-
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনারা সত্যের মাপকাঠি
১৩ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু (৩)
১৩ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
সম্মানিত ইসলামী শরীয়ত উনার দৃষ্টিতে- ফুটবল-ক্রিকেটসহ সর্বপ্রকার খেলাধুলা করা, সমর্থন করা হারাম ও নাজায়িয (৪)
১৩ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
প্রাণীর ছবি তোলা কবীরা গুনাহ ও অসন্তুষ্টির কারণ
১৩ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
সাইয়্যিদুনা হযরত সুলত্বানুন নাছীর আলাইহিস সালাম উনার পবিত্র ওয়াজ শরীফ
১৩ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
আল্লাহওয়ালা হতে হলে প্রতিটি ক্ষেত্রে আদব রক্ষা করা আবশ্যক
১৩ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
একমাত্র খালিছভাবে মহান আল্লাহ পাক উনার জন্যই ইবাদত করতে হবে
১৩ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
হযরত মাওলানা শাহ ছুফী আবুল খায়ের মুহম্মদ ওয়াজীহুল্লাহ নানুপূরী যাত্রাবাড়ীর হযরত মুর্শিদ কিবলা আলাইহিস সালাম উনার সংক্ষিপ্ত সাওয়ানেহ উমরী মুবারক (৬ষ্ঠ পর্ব)
১২ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
পবিত্রতা সম্পর্কিত মাসয়ালা-মাসায়িল (৯)
১২ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
বেপর্দা হওয়া শয়তানের ওয়াসওয়াসাকে সহজ করার মাধ্যম
১২ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
সাইয়্যিদুনা হযরত সুলত্বানুন নাছীর আলাইহিস সালাম উনার পবিত্র ওয়াজ শরীফ
১২ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
মহাসম্মানিত সুন্নত তরীক্বায় দোয়ার খাযীনাহ (৮)
১১ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার)












