ইতিহাস
স্রেব্রেনিৎসা গণহত্যা: অসংখ্য মুসলমানদের রক্তে যখন ভিজেছিলো বসনিয়ার মাটি
, ২৮ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০:০০ এএম ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) ইতিহাস
(১ম পর্ব)
অতিসম্প্রতি বসনিয়া যুদ্ধের সময় গণহত্যা ও যুদ্ধাপরাধী যাবজ্জীবন কারাদ-প্রাপ্ত বসনিয়ান সার্ব বিশ্বসন্ত্রাসী রাটকো মøাদিচ মারা গেছে। সে কিন্তু ‘বসনিয়ার কসাই’ নামেও পরিচিত ছিলো।
১৯৯২ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত চলা বসনিয়া যুদ্ধে মুসলিম গণহত্যা ও অন্যান্য নৃশংস অপরাধ ঘটিয়ে এই যবন নিজের ঘৃণ্য পাশবিকতার জানান দিয়েছিলো বিশ্ববাসীর কাছে।
বসনিয়ায় জাতিসংঘের নির্ধারণ করা ‘সেফ এরিয়া’-তে ৮ হাজার মুসলমান হত্যাকা-ের মূল পরিকল্পনাকারী ও নেতৃত্ব দেয় সে। ইউরোপের মাটিতে যা ছিলো সবচেয়ে বড় নৃশংস হত্যার ঘটনা। তার নির্দেশে মুসলিম পুরুষ ও শিশু-কিশোরদের নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করা হয়।
এতকিছুর পরও তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দিয়েছে সার্বিয়া। যদিও তাকে যাবজ্জীবন কারাদ- দেওয়া হয়েছিলো। চলতি ২০২৬ সালের ২৭ অগাস্ট তার মৃত্যুর পর ৩ সেপ্টেম্বর নেদারল্যান্ডসের হেগ থেকে তার মরদেহ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সার্বিয়াতে আনা হয়। এ সময় তার কফিনটি সার্বিয়ার পতাকায় মোড়ানো ছিলো। তার নাপাক দেহটি বহন করে ছয়জন সেনা। দ-প্রাপ্ত এ যুদ্ধাপরাধীকে রাষ্ট্রীয় সম্মানে বিদায় জানানোর কথা জানিয়েছিলো তৎকালীন সার্বিয়ার প্রেসিডেন্ট আলেক্সান্ডারও।
এবার আসুন কেন তার মত কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধকে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা দেয়া হলো-
পূর্ব বসনিয়ার পোতোচারি; যা সেব্রেনিৎসা শহরের ঠিক পাশেই অবস্থিত। স্থানটিতে সারিবদ্ধ কবর। কবরস্থানটি ১০ হেক্টরেরও বেশি জায়গা জুড়ে বিস্তৃত।
সর্বশেষ তথ্যমতে, ৮,৩৭২ জন বসনীয় মুসলিম শায়িত আছেন এখানে। প্রতিটি কবরের ওপর দাঁড়িয়ে আছে মিনারের মতো সাদা ফলক।
কবরস্থানটির পেছনে লুকিয়ে আছে নির্মম ইতিহাস। এখানে যারা শায়িত, তাদের একেকজনকে শহীদ করা হয়েছে নৃশংস কায়দায়।
বছরের পর বছর ধরে পরিচয়হীনভাবে মাটির নিচে চাপা পড়ে ছিলো তাদের নিথর দেহ। গণহত্যার পর সার্ব বাহিনী প্রমাণ লোপাটের জন্য মৃতদেহগুলো বিভিন্ন গণকবরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দিয়েছিলো। দীর্ঘ সময় পর সেই দেহাবশেষগুলো সংগ্রহ করে এখানে সমাহিত করা হয়েছে। যা বিশ ও একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম গণহত্যার নীরব সাক্ষী। এটিই ইতিহাসের কুখ্যাত স্রেব্রেনিৎসা গণহত্যা।
তিন দশকেরও বেশি সময় পার হয়ে গেলেও সেই ভয়াবহতার দাগ মোছেনি। এমনও পরিবার রয়েছে যে, এক পরিবারের ৭৬ জন সদস্যের কবর রয়েছে এই কবরস্তানে। বসনিয়ান সার্ব সন্ত্রাসী বাহিনীর (ম্লাদিচের বাহিনী) হাতে নির্মমভাবে শহীদ হওয়া ৮ হাজারের বেশি নিরস্ত্র বসনীয় মুসলিমের কয়েকজন তারা। অথচ এই খুনিরা কিছুদিন আগেও ছিলো তাদের প্রতিবেশী, সহপাঠী। এই পাশবিকতার মাঝে রেহাই পায়নি মহিলা-শিশুও, প্রায় ২০ হাজারেরও বেশি বসনীয় নারী সেই সময় সম্ভ্রমহরণের শিকার হয়। নাউযুবিল্লাহ!
এই ট্র্যাজেডির ঘটনা বেঁচে যাওয়া মানুষদের চেয়ে আর কেউ এত নিখুঁতভাবে বলতে পারবে না। তিন দশক পেরিয়ে গেলেও তাদের চেহারায় সেই দুঃসহ স্মৃতির প্রতিটি ক্ষত স্পষ্ট। কেউ কেউ নিজ স্বজনের হাড় কিংবা সামান্য দেহাবশেষ দাফন করার জন্য অপেক্ষা করেছেন এক দশকেরও বেশি সময় ধরে।
খাঁচা থেকে বের হওয়া সার্ব দানব:
১৯৯১ সালের আগস্টে বসনিয়ার প্রেসিডেন্ট আলি ইজ্জত বেগোভীচ সতর্ক করে বলেছিলেন, কট্টর মুসলিমবিদ্বেষী সার্বিয়া পুরো বসনিয়া গ্রাস করতে চায়। কিন্তু বসনিয়ার পক্ষ থেকে ছিলো না তেমন আত্মরক্ষামূলক প্রস্তুতি।
ইউরোপের অনুরোধে ১৯৯২ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি বসনিয়ায় স্বাধীনতার ওপর গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। বসনিয়ার মুসলিম ও ক্রোয়াটরা, যারা জনসংখ্যার ৬০ শতাংশেরও বেশি ছিলো, স্বাধীনতার পক্ষে ভোট দেয়। অন্যদিকে বসনিয়ার সার্ব নেতৃত্ব এই গণভোট বয়কটের ডাক দেয় এবং ভোটকেন্দ্র স্থাপনে বাধা সৃষ্টি করে। ফলে যুদ্ধের দামামা বাজতে শুরু করে।
১৯৯২ সালের মার্চ মাসে, গণভোটের মাত্র কয়েকদিন পর, বসনিয়ান সার্ব মিলিশিয়ারা বিশ্ব কসাই ম্লাদিচের নেতৃত্বে রাস্তাঘাটে ব্যারিকেড দেওয়া শুরু করে, যা তারা ক্রোয়েশিয়া যুদ্ধের সময়ও করেছিলো। মার্চের শেষ নাগাদ তারা বসনিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকা দখল করে নেয়। ওই বছরের ৬ এপ্রিল শুরু হয় সারায়েভো অবরোধ।
তারা বসনিয়ার রাজধানী সারায়েভো দীর্ঘদিন অবরোধ করে রাখে। শহরটিতে ব্যাপক গোলাবর্ষণ ও আগ্রাসনে বিপুলসংখ্যক মুসলিম শহীদ হন। একপর্যায়ে সারায়েভো মুসলমানদের হস্তচ্যূত হয়। এভাবে একের পর এক মুসলিম জনপদ তাদের দখলে যেতে থাকে এবং শুরু হয় বসনীয় মুসলিমদের ওপর সার্ব সন্ত্রাসীদের বর্বর গণহত্যা। আর এসব গণহত্যায় সন্ত্রাসী ম্লাদিচের কালো হাত হাজারো মুসলমানের রক্তে সিক্ত হয়েছিলো।
-আহমদ হুসাইন মুফহিম।
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
ইসলামী শক্তির বিপরীতে কুফরী শক্তি! ঈমানী শক্তির বিপরীতে শয়তানী শক্তি! কখনো কি এক হতে পারে?
২৭ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
আধুনিক যুদ্ধ জাহাজ নির্মাণ শিল্পের গোড়াপত্তন করেছিলেন আরব মুসলমানগণই
২৬ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
দেশে দেশে জাতিসংঘ ওরফে ইহুদীসংঘের কথিত মানবাধিকার অফিসমূহের পবিত্র দ্বীন ইসলাম ও মুসলমান বিরোধী কার্যক্রমের ইতিহাস (২০তম পর্ব)
২৫ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসী ইহুদী-খ্রিস্টানদের নজরদারী, তথ্যচুরি, ফিৎনা সৃষ্টিকারী, সন্ত্রাস সৃষ্টিকারী এবং বিমান হামলার কাজে ব্যবহৃত সন্ত্রাসী আমেরিকা ভিত্তিক মুসলিম বিদ্বেষী এক তথ্যজালিকা (৫)
২৫ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
হাজিব আল মানসুর: যে সেনাপতি পরাজিত হননি কোনো যুদ্ধে
২৩ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
পবিত্র আযানের জন্য ২২ জন মুসলমানের শহীদ হওয়ার ঈমানদীপ্ত ঘটনা
১৯ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
বাহাদুর শাহ জাফর: ব্রিটিশবিরোধী শেষ মোঘল শাসক
১৪ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
পিরি রইস: বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ মানচিত্র অঙ্কনকারী উসমানীয় এডমিরাল
০৩ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
বঙ্গ, বাংলা, বাঙ্গালী শব্দের উৎপত্তি মুসলমানদের মাধ্যম দিয়েই (৬)
০১ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
তাতার বিরোধী যুদ্ধে হযরত আমীর খসরু দেহলভী চিশতী রহমতুল্লাহি আলাইহি
২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
মুসা বিন আবী গাসসান: হার না মানা এক অকুতোভয় মুসলিম সিপাহী
২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
ফিঙ্গারপ্রিন্ট বা আঙ্গুলের ছাপ শরীয়তসম্মত, নিখুঁত, ব্যবহারে সহজ এবং রহমত, বরকত, সাকীনা লাভের কারণ (৭)
২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার)












