পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের দায়িত্ব-কর্তব্য
(রাজারবাগ শরীফ উনার সম্মানিত মুর্শিদ ক্বিবলা সাইয়্যিদুনা হযরত সুলত্বানুন নাছীর আলাইহিস সালাম উনার ওয়াজ শরীফ থেকে সংকলিত)
, ০৬ রবীউছ ছানী শরীফ, ১৪৪৮ হিজরী সন, ২০ রবি, ১৩৯৪ শামসী সন , ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রি:, ০৩ আশ্বিন, ১৪৩৩ ফসলী সন, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) মহিলাদের পাতা
(ধারাবাহিক)
এ প্রসঙ্গে হাদীস শরীফে উল্লেখ করা হয়েছে-
قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: مَنْ زَارَ قَبْرَ وَالِدَيْهِ أَوْ أَبَوَيْهِ أَوْ أَحَدَهُمَا فِي كُلِّ جُمُعَةٍ، غُفِرَ لَهُ، وَكُتِبَ لَهُ بَرَاءَةٌ
কোন ব্যক্তি যদি তার পিতা-মাতা উভয়ের অথবা পিতা কিংবা মাতা যে কোন একজনের কবর, প্রতি জুমুয়াতে জিয়ারত করে, মহান আল্লাহ পাক তিনি তাকে ক্ষমা করবেন এবং তাকে জাহান্নাম থেকে নাযাত দান করবেন।
এ হাদীস শরীফ থেকে কিছু মাসয়ালা বের হয়, তার মধ্যে একটা বিশেষ মাসয়ালা; সেটা হচ্ছে- যারা বলে থাকে, নিয়ত করে মাজার শরীফ জিয়ারত করা জায়েয নেই তাদের প্রসঙ্গে এ হাদীস শরীফ উল্লেখ করা যেতে পারে যে, সরাসরি নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি নির্দেশ দিয়েছেন-
“যদি কেউ নেক সন্তান হতে চায়, অতীতের গুণাহ্ ক্ষমা করাতে চায় তাহলে তার দায়িত্ব এবং কর্তব্য হচ্ছে, সে যেন তার পিতা-মাতা উভয় অথবা যে কোন একজনের কবর প্রতি সপ্তাহে বা প্রতি জুমুয়াতে জিয়ারত করে এবং অবশ্যই তাকে নিয়ত করে জিয়ারত করতে হবে, তাহলে মহান আল্লাহ পাক তিনি তার গুণাহ্-খতাগুলো ক্ষমা করে তাকে নেক সন্তান হিসেবে কবুল করে নিবেন এবং তাকে জাহান্নাম থেকে পানাহ্ দান করবেন।” (সুবহানাল্লাহ্)
এ প্রসঙ্গে কিতাবে উল্লেখ করা হয়, এক লোক ছিল, যে তার প্রথম জীবনে পিতা-মাতার সাথে সদাচরণ করেনি, তাদের হক্ব আদায় করেনি, খাওয়া, পরার খোঁজ-খবর সে নেয়নি। কিন্তু তার পিতা এবং মাতা ইন্তেকাল করার পর তার সেই বুঝ আসলো, দ্বীনি সমঝ তার মধ্যে পয়দা হলো। হওয়ার পর সে মনে মনে ফিকির করলো, কি করা যেতে পারে পিতা-মাতার জন্য? যেহেতু তাদের সাথে সদাচরণ করা হয়নি, তাঁদের হক্ব আদায় করা হয়নি, তাদের খেদমত করা হয়নি। এখন কি করা যেতে পারে?
সে এ বিষয় চিন্তা করে যারা আউলিয়া-ই-কিরাম, বুযুর্গানে দ্বীন তাঁদের সোহ্বত এখতিয়ার করলো, উনার আদেশ করলেন, “তুমি এক কাজ করো, তোমার পিতা-মাতার কবর প্রতি জুমুয়াতে জিয়ারত কর।” কারণ হাদীস শরীফে রয়েছে-
قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: مَنْ زَارَ قَبْرَ وَالِدَيْهِ أَوْ أَبَوَيْهِ أَوْ أَحَدَهُمَا فِي كُلِّ جُمُعَةٍ، غُفِرَ لَهُ، وَكُتِبَ لَهُ بَرَاءَةٌ
“কোন ব্যক্তি যদি তার পিতা-মাতা উভয়ের অথবা পিতা কিংবা মাতা যে কোন একজনের কবর প্রতি জুমুয়াতে জিয়ারত করে, মহান আল্লাহ পাক তিনি তাকে ক্ষমা করবেন এবং তাকে জাহান্নাম থেকে নাযাত দান করবেন।”
সে বললো, হুজুর! আমার পিতা এবং মাতার যে কবর রয়েছে তা অনেক দূরে। আমি দেশ থেকে অনেক দূরে আছি। আমার পক্ষে প্রতি সপ্তাহে, প্রতি জুমুয়াতে জিয়ারত করা সম্ভব নয়। আমি বাড়িতে দু-চার মাস পর বা বছরে একবার গিয়ে থাকি। কারণ বাড়িতে আমার কেউ নেই। যেখানে আমি বসবাস করি সেখানেই সকলে রয়েছে। তাই আমার পক্ষে প্রতি সপ্তাহে জিয়ারত করা সম্ভব নয়। তাহলে কি করা যেতে পারে?
তখন তাকে পরামর্শ দেয়া হলো, যদি জিয়ারত করতে না পারো, তাহলে প্রতি জুমুয়াতে সওয়াব রেসানী করবে এবং তোমার পিতা-মাতার জন্য কিছু দান-খয়রাত করবে। সে লোকটা ছিল গরীব, অভাবী, দিন এনে দিন খেতো। প্রকৃতপক্ষে, সে দিনমজুর ছিল। যখন সে নিয়ত করলো, প্রতি সপ্তাহে অর্থাৎ প্রতি জুমুয়াতে সে যে কাজ পাবে, সে কাজের বদলা যা মজুরী পাবে, সেটা তার পিতা-মাতার জন্য দান করে দিবে। এবং ঠিক তার সে নিয়ত অনুযায়ী প্রতি জুমুয়াতে সেটা করতে লাগলো। বেশ অনেক দিন সে করলো।
হঠাৎ এক জুমুয়াতে দেখা গেল, সে কোন কাজ পেলো না। অর্থাৎ সে এক জুমুয়াতে কোন কাজ পেলো না। কাজ না পাওয়াতে সে অস্থির হয়ে গেল, অস্থির হয়ে অনেক ঘুরাঘুরি করলো কাজের জন্য; কিন্তু কোন কাজই সে পেলো না। শেষ পর্যন্ত সে তার নিকটবর্তী এলাকার একজন আল্লাহ পাক উনার ওলীর শরণাপন্ন হলো।
তখন তাকে আল্লাহ পাক উনার ওলী বললেন, তুমি টাকা-পয়সার ব্যবস্থা যখন করতে পারোনি তাহলে এক কাজ কর, তুমি বাজারে চলে যাও, সেখানে গিয়ে দেখবে কদু বিক্রি হয়ে থাকে। অনেকে সে কদু ছিলে তার ছিলকা ফেলে কদুটা নিয়ে যায়। তুমি সেই ছিলকাগুলো সংগ্রহ করে, কুচি কুচি করে কেটে, তোমার প্রতিবেশীর মধ্যে যার গরু রয়েছে তার গরুকে যখন পানি খাওয়ায়, তখন সে গামলাতে বা খাদাতে পানির সাথে সেটা মিশিয়ে দিও। মিশিয়ে দিয়ে সেই গরুকে সেটা খাওয়ায়ে দাও এবং খাওয়ানোর পর তুমি নিয়ত কর, “আয় মহান আল্লাহ পাক তিনি! আমি তো নিয়ত করেছিলাম, প্রতি জুমুয়াতে আমি যা উপার্জন করবো সেটা আমার পিতা-মাতার জন্য খয়রাত করে দিব। আজকে কোন কাজ আমি পাইনি যার জন্য আমি কোন উপার্জন করতে পারিনি। সে কারণে এই কদুর ছিলকাগুলো আমি সংগ্রহ করে এনে গরুকে খাওয়ায়ে দিলাম। এর পরিবর্তে আমার যে নেকী অর্জন হয়েছে, আমি সেটা আমার পিতা-মাতার নামে দান করে দিলাম।”
মহান আল্লাহ পাক উনার ওলীর পরামর্শ মোতাবেক, সে লোক তাই করলো। এরপরও তার মন এতমিনান প্রশান্ত হচ্ছিলো না, যেহেতু সে কিছু দান-খয়রাত করতে পারেনি। বাদ এশা সে চিন্তা-ফিকির করতে করতে ঘুমিয়ে গেল। যেহেতু অতীতে সে তার পিতা-মাতার হক্ব আদায় করেনি। এখন করার জন্য সে কোশেশ করেছিল; কিন্তু তাও সে আজকে কোন কাজ পেলো না।
সে যখন ঘুমিয়ে গেল হঠাৎ সে স্বপ্নে দেখলো, তার পিতা এবং মাতা উভয়কে। কিন্তু এ পর্যন্ত তার পিতা-মাতাকে সে কখনও স্বপ্নে দেখেনি। আজকে হঠাৎ করে সে দেখলো। তার পিতা-মাতা যারা অসন্তুষ্ট ছিল, আজকে তাঁরা খুব খুশী। তাঁরা খুশীর সাথে বলতেছিল, সেই সন্তানকে, “হে আমাদের সন্তান! তুমি আজকে খুব উত্তম কাজ করেছ, উত্তম কাজ তুমি করেছ। আমাদের মনের একটা বাসনা ছিল অনেকদিন ধরে যে, কদু খাওয়ার। কিন্তু যেহেতু তুমি কদু দান করো না সেহেতু মহান আল্লাহ পাক তিনিও আমাদেরকে কদু খাওয়াননি। আজকে যেহেতু তুমি গরুকে কদুর ছিলকা খাইয়েছো। সেজন্য মহান আল্লাহ পাক তিনি খুশী হয়ে আমাদেরকে তৃপ্তি সহকারে কদু খাইয়েছেন। (সুবহানাল্লাহ্) সে পিতা-মাতা খুশী প্রকাশ করলো। সেও খুশী হয়ে এ অবস্থায় তার ঘুম ভেঙ্গে গেল। সে এতমিনান হলো যে, তার দান যা সে করেছে পিতা-মাতার নামে, সেটা মহান আল্লাহ পাক তিনি কবুল করেছেন।” সুবহানাল্লাহ!
কাজেই পিতা-মাতার সাথে যারা সদাচরণ করতে পারেনি, পিতা-মাতা ইন্তেকাল করে গেছেন। তারা যদি প্রতি সপ্তাহে অর্থাৎ প্রতি জুমুয়াতে জিয়ারত করে মহান আল্লাহ পাক তিনি সেটা কবুল করবেন। অথবা যাদের পক্ষে সম্ভব নয়, দূর দেশে যারা রয়েছে, তারা যেন প্রতি সপ্তাহে অর্থাৎ জুমুয়াতে কিছু কম বেশী দান-খয়রাত করে দেয়। তাহলে মহান আল্লাহ পাক তিনি সেটা কবুল করে তাকে নেক সন্তান হিসেবে গ্রহণ করবেন। সুবহানাল্লাহ!
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
মহিলাদের প্রতি মহান আল্লাহ পাক উনার বিশেষ নির্দেশনা মুবারক- পর্দা পালন করা
২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
সাইয়্যিদাতুনা হযরত উম্মুল উমাম আলাইহাস সালাম উনার নছীহত মুবারক: মহান আল্লাহ পাক উনার যিকির সমস্ত কামিয়াবীর সোপান (১ম পর্ব)
২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
ক্বলবী যিকির জারী না থাকলে শয়তানের ওয়াসওয়াসা থেকে বেঁচে থাকা সম্ভব নয়
২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
মহিলাদের জামায়াতের জন্য মসজিদে ও ঈদগাহে যাওয়া হারাম ও কুফরী (৪)
১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
ইখলাছ অর্জন করা ফরজ; ইখলাছ ছাড়া ইবাদত-বন্দেগী কবুল হয় না
১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু আনহুম উনাদের সম্পর্কে কটূক্তি করা কাট্টা কুফরী
১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
মহিলাদের জন্য হাত, পা ও চেহারা আবৃত করে ঘর থেকে বের হওয়া ফরজ। খোলা রেখে বের হওয়া হারাম, জায়েয বলা কুফরী (৩)
১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার প্রতি পশু-পাখিদের মহব্বত ও সম্মান প্রদর্শনের কিছু নমুনা (১)
১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
যে ৪ শ্রেণীর লোকদের জন্য ক্বিয়ামতের দিন সুপারিশ ওয়াজিব হবে
১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
মহাসম্মানিত মহাপবিত্র হযরত আহলু বাইত শরীফ আলাইহিমুস সালাম উনারা বেমেছাল ফযীলত মুবারকের অধিকারী
১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
সর্বক্ষেত্রে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে প্রাধান্য দিতে হবে
১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
সাইয়্যিদাতুনা হযরত উম্মুল উমাম আলাইহাস সালাম উনার নছীহত মুবারক: দুনিয়ার মুহব্বত সমস্ত পাপের মূল (২য় পর্ব)
১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার)












