পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র সুন্নাহ শরীফ উনাদের দৃষ্টিতে রোযা অবস্থায়- ইনজেকশন, ইনহেলার, স্যালাইন ও টিকা নেয়া অবশ্যই রোযার ভঙ্গের কারণ (২)
, ৩রা রমাদ্বান শরীফ, ১৪৪৭ হিজরী সন, ২৩ তাসি, ১৩৯৩ শামসী সন , ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রি:, ০৮ ফাল্গুন, ১৪৩২ ফসলী সন, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) পবিত্র দ্বীন শিক্ষা
আমাদের বর্তমান সমাজের প্রেক্ষাপটে “রোযা অবস্থায় ইনজেকশন, ইনহেলার, স্যালাইন নিলে অবশ্যই রোযা ভঙ্গ হয়ে যাবে” এই বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব ও তাৎপর্য বহন করে, যা অস্বীকার করার উপায় নেই।
কেননা বর্তমানে চিকিৎসা বিজ্ঞানে চিকিৎসার মাধ্যম হিসাবে ইনজেকশনের ভূমিকা অপরিসীম, বিশেষ করে কিছু কিছু রোগের ক্ষেত্রে নিয়মিত ইনজেকশন নেওয়ার প্রয়োজন পড়ে। সুতরাং রোযা অবস্থায় ইনজেকশন নেওয়া, না নেওয়ার ব্যাপারে অনেকেই সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগেন, যেহেতু কিছু সংখ্যক মুফতি ইনজেকশনের কার্যকারিতা সম্পর্কে না জানার কারণে ভুল ফতওয়া দিয়েছে যে, “রোযা রাখা অবস্থায় ইনজেকশন নিলে রোযা ভঙ্গ হয় না” নাঊযুবিল্লাহ! অথচ সম্মানিত ইসলামী শরীয়ত উনার উছূল মোতাবেক যা সম্পূর্ণ ভুল। অর্থাৎ রোযা অবস্থায় ইনজেকশন নিলে অবশ্যই রোযা ভঙ্গ হয়ে যাবে।
কেননা পবিত্র হাদীছ শরীফ মুতাবিক সম্মানিত ইসলামী শরীয়ত উনার সাধারণ উছূল হলো-
عَنْ حَضْرَتْ عَبْدِ اللهِ بْنِ مَسْعُوْدٍ رَضِىَ اللهُ تَعَالٰـى عَنْهُ مِنْ قَوْلِهٖ اِنَّـمَا الْوُضُوْءُ مِـمَّا خَرَجَ وَلَيْسَ مِـمَّا دَخَلَ وَالْفَطْرُ فِى الصَّوْمِ مِـمَّا دَخَلَ وَلَيْسَ مِـمَّا خَرَجَ.
অর্থ: “হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার থেকে বর্ণিত আছে- ওযূর ব্যাপারে নিয়ম হলো- শরীর হতে কিছু বের হলে ওযূ ভঙ্গ হবে, প্রবেশ করলে ভঙ্গ হবে না। আর রোযার ব্যাপারে নিয়ম হলো- শরীরের ভিতর কিছু প্রবেশ করলে রোযা ভঙ্গ হবে, বের হলে নয়।” (বায়হাক্বী শরীফ, ত্ববারানী শরীফ, মুয়াত্তা মালিক শরীফ)
অবশ্য কিছু কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে এই উছূলের ব্যতিক্রম লক্ষণীয়। কিন্তু খাছভাবে রোযার ব্যাপারে ইমামে আ’যম, হযরত আবু হানীফা রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার যে উছূল, অর্থাৎ “বাহির থেকে রোযা অবস্থায় যে কোন প্রকারে বা পদ্ধতিতে শরীরের ভিতর কিছু প্রবেশ করলে, যদি তা পাকস্থলী অথবা মগজে প্রবেশ করে, তবে অবশ্যই রোযা ভঙ্গ হয়ে যাবে,” এই উছূলের উপরেই ফতওয়া এবং অন্যান্য ইমাম মুজতাহিদগণও এ ব্যাপারে একমত যে, যদি নিশ্চিতভাবে জানা যায় যে, ওষুধ মগজ অথবা পাকস্থলীতে পৌঁছেছে, তবে অবশ্যই রোযা ভঙ্গ হয়ে যাবে।
উপরোক্ত উছূলের ভিত্তিতে যে কোন প্রকারে বা যে কোন পদ্ধতিতে ইনজেকশন নিলে রোযা ভঙ্গ হয়ে যাবে।
যেহেতু যে কোন প্রকারের বা পদ্ধতিতেই ইনজেকশন নেওয়া হোক না কেন, ইনজেকশনের ওষুধ কিছু সময়ের মধ্যে রক্তস্রোতে মিশে যায়, রক্ত এমন একটি মাধ্যম, যার সাথে সরাসরি শরীরের প্রত্যেকটি কোষ (ঈবষষ) ও কলা (ঞরংংঁব)-এর সংযোগ রয়েছে। ফলে তা সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে এবং রক্তের মাধ্যমে তা কয়েক মিনিটের মধ্যে মগজে পৌঁছে যায়। অর্থাৎ রোযাদার রোযা অবস্থায় ইনজেকশন নিলে অবশ্যই রোযা ভঙ্গ হয়ে যাবে।
আবার মুসলমানদের রোযা নষ্ট করার জন্য বেদ্বীন-বিজাতীয়দের কিছু দালাল ফিকাহর কিতাবের বরাত দিয়ে বলছে, اِحْتَقَنَ (ইহ্তাক্বানা) শব্দ দ্বারা যে ইনজেকশন নিলে রোযা ভঙ্গের কথা বলা হয়েছে সেই ‘ইহতাক্বানা’ শব্দের সঠিক অর্থ ইনজেকশন নয়। বরং তার অর্থ হলো ডুশ নেয়া, যা বড় ইস্তিঞ্জার রাস্তা দিয়ে প্রবেশ করানো হয়। আর রোযাদারের পাকস্থলী, নাড়ি অথবা গলার মধ্যে স্বভাবজাত পথ তথা মুখ, নাক বা বড় ইস্তিঞ্জার রাস্তার মাধ্যমে কোন কিছু প্রবেশ করানো হলে রোযা ভঙ্গ হবে। অন্যথায় নয়। নাঊযুবিল্লাহ!
অথচ প্রায় সমস্ত আরবী লুগাত বা অভিধানগ্রন্থে- حُقْنَةٌ - اَلْـحُقْنَةُ - مِـحْقَنَةٌ- اِحْتِقَانٌ ইত্যাদি শব্দের উল্লেখ রয়েছে। যার সরাসরি অর্থ ইনজেকশন, সিরিঞ্জ ইত্যাদি। আর সেই حُقْنَةٌ (হুক্বনাতুন) থেকে اِحْتَقَنَ (ইহ্তাক্বানা) শব্দের উৎপত্তি হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ ‘আল ক্বামূসুল জাদীদ’ (আরবী-উর্দূ) লুগাত বা অভিধানগ্রন্থের বর্ণনা উল্লেখ করা হলো-
حُقْنَةٌ -‘হুক্বনাতুন’ অর্থ- ইনজেকশন, সিরিঞ্জ।
اِحْتِقَانٌ বাবে اِفْتِعَالٌ এর মাছদার বা ক্রিয়ামূল। অর্থ ইনজেকশন নেয়া। আর উক্ত বাব থেকে اِحْتَقَنَ শব্দটি এসেছে। এর অর্থ হলো, সে ইনজেকশন নিলো।
আধুনিক আরবী-বাংলা অভিধানগ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে, اِحْتِقَانٌ অর্থ- ইনজেকশন। এবং সরাসরি اِحْتَقَنَ (ইহ্তাক্বানা) “ইনজেকশন নেয়া” শব্দটিরও উল্লেখ রয়েছে। এমনিভাবে প্রায় সমস্ত লুগাত বা অভিধানগ্রন্থে “ইনজেকশন” শব্দের উল্লেখ রয়েছে।
আর ফিক্বাহর বিশ্বখ্যাত ও সুপ্রসিদ্ধ কিতাব ‘মাবসূত’ কিতাবে হযরত ইমামে আ’যম আবূ হানীফা রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার মত উল্লেখ রয়েছে যে-
وَاَبُوْ حَنِيْفَةَ رَحِمَهُ اللهُ تَعَالٰى يَقُوْلُ اَلْـمُفْسِدُ لِلصَّوْمِ وُصُوْلُ الْـمُفْطِرِ اِلٰى بَاطِنِهٖ فَالْعِبْرَةُ لِلْوَاصِلِ لَا لِلْمَسْلَكِ.
অর্থ: “হযরত ইমাম আবূ হানীফা রহমতুল্লাহি আলাইহি তিনি বলেন, রোযা ভঙ্গের কারণ হলো, রোযা ভঙ্গকারী কোন কিছু ভিতরে প্রবেশ করা। সুতরাং পৌঁছাটাই গ্রহণযোগ্য। মূল রাস্তা নয়।”
একইভাবে ফিক্বাহর বিশ্বখ্যাত ও সুপ্রসিদ্ধ কিতাব ‘ফতহুল ক্বাদীর’ কিতাবে উল্লেখ রয়েছে-
وَاَبُوْ حَنِيْفَةَ رَحْـمَةُ اللهِ عَلَيْهِ يُعْتَبَرُ الْوُصُوْلُ
অর্থ: “হযরত ইমাম আবূ হানীফা রহমতুল্লাহি আলাইহি উনার নিকট পৌঁছাটাই গ্রহণযোগ্য।”
আর চিকিৎসা বিজ্ঞানের মতে, ইনজেকশন দ্বারা প্রয়োগকৃত ঔষধ পাকস্থলী ও মগজে অবশ্যই পৌঁছে থাকে। এর স্বপক্ষে ফিক্বাহ্ ও ফতওয়ার নির্ভরযোগ্য কিতাবসমূহের অসংখ্য দলীল বিদ্যমান রয়েছে। (আমীন)
-০-
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
সম্মানিত ইসলামী শরীয়ত উনার দৃষ্টিতে- ফুটবল-ক্রিকেটসহ সর্বপ্রকার খেলাধুলা করা, সমর্থন করা হারাম ও নাজায়িয (১০)
২১ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
প্রাণীর ছবি তোলা হারাম ও নাজায়িজ
২১ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
সাইয়্যিদুনা হযরত সুলত্বানুন নাছীর আলাইহিস সালাম উনার পবিত্র ওয়াজ শরীফ
২১ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
তিন প্রকার খাবার দিয়ে ইফতার করা সুন্নত-
২১ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-
২১ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
বন্দর দখলদার, নব্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী, বিশ্ব সন্ত্রাসী ইহুদী দস্যুদের দোসর ডিপি ওয়ার্ল্ড এর পরিচিতি এবং উদ্দেশ্য (৪)
২১ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
পবিত্র রোযা সম্পর্কিত মাসয়ালা-মাসায়িল
২০ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
বেপর্দা হওয়া লা’নত ও হালাকীর কারণ
২০ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
সাইয়্যিদুনা হযরত সুলত্বানুন নাছীর আলাইহিস সালাম উনার পবিত্র ওয়াজ শরীফ
২০ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
রোযাদারকে ইফতার করালে তিনটি ফযীলত
২০ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র সুন্নাহ শরীফ উনাদের দৃষ্টিতে রোযা অবস্থায়- ইনজেকশন, ইনহেলার, স্যালাইন ও টিকা নেয়া অবশ্যই রোযার ভঙ্গের কারণ (১)
২০ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে-
২০ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার)












