হিন্দুত্ববাদী মোদি সরকার যেভাবে ভারতের মুসলমানদের বিরুদ্ধে ‘ইসরায়েলি মডেল’ গ্রহণ করেছে
, ০৮ রমাদ্বান শরীফ, ১৪৪৭ হিজরী সন, ২৮ তাসি, ১৩৯৩ শামসী সন , ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রি:, ১৩ ফাল্গুন, ১৪৩২ ফসলী সন, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) বিদেশের খবর
যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে নিযুক্ত ভারতের তৎকালীন কনসাল জেনারেল সন্দীপ ২০১৯ সালের নভেম্বরে একটি ব্যক্তিগত অনুষ্ঠানে ভারতনিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে নয়াদিল্লিকে ‘ইসরায়েলি মডেল’ গ্রহণ করার আহ্বান জানিয়েছিলো।
সন্দীপের বক্তব্যের কয়েক মাস আগেই বিজেপিদলীয় মোদি সরকার কাশ্মীর অঞ্চলের আধা স্বায়ত্তশাসিত মর্যাদা কেড়ে নিয়েছিলো। মোদি সরকার হাজার হাজার মানুষকে কারাগারে ভরেছিলো, যাদের মধ্যে ওই অঞ্চলের রাজনৈতিক নেতারাও ছিলো। এমনকি ভারতপন্থী হিসেবে পরিচিত কাশ্মীরি নেতাদেরও তখন আটক করা হয়েছিলো।
নিউইয়র্কে নিযুক্ত ভারতের এই কূটনীতিক অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখ-ে দখলদার ইসরায়েলের কট্টরপন্থী অবৈধ বসতি স্থাপনের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করছিলো। সে এই আলোচনা তুলেছিলো- ১৯৮৯ সালে কাশ্মীরি হিন্দুদের দেশত্যাগের প্রেক্ষাপটে। হিমালয় অঞ্চলে ভারতীয় শাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু হওয়ার পর হাজার হাজার কাশ্মীরি হিন্দু তাদের জন্মভূমি ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিলো।
সন্দীপ ওই অনুষ্ঠানে বলেছিলো, ‘এটি মধ্যপ্রাচ্যে ঘটেছে। ইসরায়েলিরা যদি এটি করতে পারে, আমরাও পারি’। সে যোগ করে, মোদি সরকার এটি করতে ‘দৃঢ়প্রতিজ্ঞ’।
ছয় বছর পর সন্দীপের কথাগুলো এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি বাস্তবায়িত হচ্ছে। গতকাল ২৫ ফেব্রুয়ারি থেকে হিন্দুত্ববাদী মোদি যখন তার দ্বিতীয় ইসরায়েল সফরের প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন দেখা যাচ্ছে এই দুই দেশ কেবল বন্ধুত্ব, বাণিজ্য এবং সামরিক অংশীদারত্বের মধ্যেই আবদ্ধ নয়। বিশ্লেষকদের মতে, তারা শাসনের নির্দিষ্ট কিছু মডেলেও একে অপরের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে গেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, মোদির সরকার ক্ষমতায় আসার পর ফিলিস্তিনিদের প্রতি দীর্ঘদিনের সমর্থন বিসর্জন দিয়ে খোলাখুলিভাবে সন্ত্রাসী ইসরায়েলকে গ্রহণ করেছে ভারত। তাদের মতে, নয়াদিল্লি ফিলিস্তিনিদের ওপর সন্ত্রাসী ইসরায়েলের নিরাপত্তা, নিপীড়ন এবং প্রশাসনিক পদ্ধতির একাধিক উপাদান আমদানি করেছে। ২০১৪ সালে মোদি ক্ষমতায় আসার পর থেকে সেগুলো অভ্যন্তরীণ নীতিতে প্রয়োগ করছে।
দখলদারত্বের অধীন থাকা শত্রু প্রজা:
বিশ্লেষকদের মতে, এই গভীর সম্পর্কের মূলে রয়েছে একটি অভিন্ন আদর্শিক দৃষ্টিভঙ্গি।
মোদির ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) মূল ভিত্তি হলো ‘হিন্দুত্ব’ নামক এক দর্শন, যা ভারতকে একটি হিন্দু রাষ্ট্রে পরিণত করতে চায় এবং বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের হিন্দুদের জন্য একে একটি স্বাভাবিক মাতৃভূমি হিসেবে বিবেচনা করে। ঠিক একইভাবে দখলদার ইসরায়েল নিজেকে ইহুদীদের মাতৃভূমি হিসেবে দেখে।
২০২৩ সালে প্রকাশিত ‘হোস্টাইল হোমল্যান্ডস: দ্য নিউ অ্যালায়েন্স বিটুইন ইন্ডিয়া অ্যান্ড ইসরায়েল’ বইয়ের লেখক আজাদ এসা বলেন, ‘মোদির অধীনে ভারত-ইসরায়েল সম্পর্ক হলো এমন দুটি আদর্শের বন্ধন, যারা নিজেদের সভ্যতাগত প্রকল্প হিসেবে দেখে এবং মুসলমানদের জনসংখ্যাগত ও নিরাপত্তার জন্য হুমকি মনে করে।’
এসা আল-জাজিরাকে বলেন, তাদের লক্ষ্যগুলো একই রকম বলে এই বন্ধুত্ব কাজ করছে। মোদির অধীন ভারত ও সন্ত্রাসী ইসরায়েল কৌশলগত অংশীদার হয়ে উঠেছে। এ অবস্থায় দিল্লি তেলআবিবকে একটি আদর্শ মডেল হিসেবে দেখতে শুরু করেছে।
সন্ত্রাসী ইসরায়েল থেকে ভারতের শিক্ষা নেওয়ার সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ হলো- মোদির দলের তথাকথিত ‘বুলডোজার জাস্টিস’ বা বুলডোজারের মাধ্যমে বিচার।
গত এক দশকে হিন্দুত্ববাদী বিজেপিশাসিত বেশ কয়েকটি রাজ্যের সরকার শত শত মুসলমানের ঘরবাড়ি ও দোকানপাট গুঁড়িয়ে দিয়েছে। অসংখ্য মসজিদ গুঁড়িয়ে দিয়েছে। মাদরাসা সিলগালা করে দিয়েছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই কোনো আইনি নোটিশ ছাড়াই এই উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছে।
ভারতের উত্তর প্রদেশের উগ্র হিন্দুত্ববাদী মুর্খমন্ত্রী এবং বিজেপির অন্যতম শীর্ষ নেতা আদিত্যনাথ এখন তার সমর্থকদের কাছে ‘বুলডোজার বাবা’ নামে পরিচিত।
হিন্দুত্ববাদী নেতাদের এসব কর্মকা- সরাসরি দখলদার ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে যায়। দখলদার ইসরায়েল অধিকৃত পশ্চিম তীর এবং পূর্ব জেরুজালেমে হাজার হাজার ফিলিস্তিনি ঘরবাড়ি ধ্বংস করেছে এবং বাসিন্দাদের বাস্তুচ্যুত করে অবৈধ ইসরায়েলি বসতি স্থাপনের পথ তৈরি করেছে।
গাজায় সন্ত্রাসী ইসরায়েলের নির্বিচার হামলার সময় প্রায় সব ফিলিস্তিনি ঘরবাড়ি, কৃষিজমি, খামার, অফিস, হাসপাতাল, স্কুল ও মসজিদ-দরসগাহ ধ্বংস বা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বলেন, ‘হিন্দু জাতীয়তাবাদী বিশ্বাস ব্যবস্থা জায়নবাদ এবং সন্ত্রাসী ইসরায়েলের প্রতি গভীর অনুরাগে সিক্ত। মোদিসহ আরএসএসের প্রজন্মের পর প্রজন্ম এই আদর্শে দীক্ষিত হয়েছে এবং সন্ত্রাসী ইসরায়েলকে মনে-প্রাণে ধারণ করেছে।’
নিরাপত্তা তত্ত্বের ব্যাপক ছায়া:
ভারত-ইসরায়েল দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সামনের সারিতে রয়েছে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক এবং একই ধরনের নিরাপত্তা তত্ত্ব। ভারত ইসরায়েলি অস্ত্রের বৃহত্তম ক্রেতা, যা কিনতে তারা শত শত কোটি ডলার ব্যয় করছে।
গাজায় নির্বিচার হামলা ও হত্যাযজ্ঞের মধ্যেও ভারত সন্ত্রাসী ইসরায়েলকে অস্ত্র সরবরাহ করছে। সন্ত্রাসী ইসরায়েল ভারতীয় সেনাদের প্রশিক্ষণের পাশাপাশি ড্রোন, বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এবং উন্নত রাডার ও নজরদারি প্রযুক্তি সরবরাহ করছে।
তবে ভারতের কট্টর নিরাপত্তা সমর্থকদের কাছে সন্ত্রাসী ইসরায়েলের আবেদন কেবল উন্নত অস্ত্রের সরবরাহের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।
২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল কাশ্মীরের পেহেলগামে সশস্ত্রগোষ্ঠীর গুলিতে ২৬ জন বেসামরিক ব্যক্তি নিহত হওয়ার পর ভারত সরকার পাকিস্তান ও পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের একাধিক স্থানে বোমা হামলা চালায়। ভারতের হামলার জবাবে পাকিস্তানও পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। ফলে দুই দেশের মধ্যে চার দিনের তীব্র বিমানযুদ্ধ হয়। সেই সময়ে ভারতীয় সম্প্রচারমাধ্যমগুলোর আলোচনায় বারবার সন্ত্রাসী ইসরায়েলের প্রসঙ্গ টেনে আনা হয়।
সে সময় উগ্র হিন্দুত্ববাদী সন্ত্রাসীরা ইহুদীবাদী নীতি অনুসরণ করে। যুদ্ধ চলাকালীন সময় বিভিন্ন আক্রমণাত্মক, হুশিয়ারী উচ্চারণ করে অনেক হিন্দু দাবি করে, “আমাদের দাবি হচ্ছে, পাকিস্তানকে গাজায় পরিণত করা হোক।”
অনেকের অভিযোগ- “২২ এপ্রিল ভারতের জন্য তাই, যা ৭ অক্টোবর ইসরায়েলিদের জন্য ছিলো।”
কাশ্মীরে কর্মরত একজন অবসরপ্রাপ্ত উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তা হিন্দি ভাষার একটি সংবাদপত্রকে বলে, “আমাদের অবশ্যই (সন্ত্রাসী) ইসরায়েলের মতো জবাব দিতে হবে।”
জনগণকে বহিঃশত্রুর মতো দেখা:
আজাদ এসা আল-জাজিরাকে বলেন, সন্ত্রাসী ইসরায়েল ভারতকে আরও বেশি নিপীড়ক, স্বৈরাচারী এবং সামরিকায়িত হতে প্রযুক্তি ও দক্ষতা দিয়ে সাহায্য করেছে। এসব পদ্ধতি এমন যে, তারা নিজেদের জনগণকে বহিঃশত্রু হিসেবে গণ্য করে।
কাশ্মীরের চেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ আর কোথাও নেই। বিশ্বের অন্যতম সামরিকায়িত অঞ্চল কাশ্মীর থেকে ২০১৯ সালের আগস্টে শুধু আধা স্বায়ত্তশাসিত মর্যাদাই নয়, বরং গণতান্ত্রিক ক্ষমতাও কেড়ে নেওয়া হয়েছে। কাশ্মীরের বিষয়ে রাজনৈতিক সংলাপ বা কূটনৈতিক আলোচনা বন্ধ করার মোদির পদক্ষেপ ইসরায়েলি কৌশলেরই প্রতিফলন।
এসা আরও বলেন, কাশ্মীরের সঙ্গে ফিলিস্তিনের অতীত ও বর্তমান আলাদা হলেও বর্তমানে কাশ্মীরে ভারতের দৃষ্টিভঙ্গি পশ্চিম তীরে সন্ত্রাসী ইসরায়েলের আচরণের সঙ্গে অনেক বেশি মিলে যায়।
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
সাধারণ মানের অস্ত্র দিয়েই দখলদারদের কুপোকাত করেছেন যোদ্ধারা।
০২ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
ইসরাইলি সন্ত্রাসী সেনাদের পদত্যাগের হিড়িক
০২ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
ভারতে স্বাধীনতাকামীদের হামলায় হতাহত ৫ সেনা
০১ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
ঘুমন্ত ফিলিস্তিনিদের ঘরের ভেতর রেখে আগুন দিলো ইসরায়েলি সেটেলাররা
০১ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
দুই দশক পর ইরাক ছাড়ছে মার্কিন বাহিনী, উচ্ছ্বসিত ইরান
০১ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
তিন বছরে ধ্বংসস্তূপে পরিণত পুরো গাজা : স্যাটেলাইট চিত্রে ভয়াবহ দৃশ্য
০১ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
ক্যাটাগরি-৩ শক্তি নিয়ে মেক্সিকোতে আছড়ে পড়লো হারিকেন পোলো
০১ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
হামাসের বীরত্ব:
০১ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
সাংবাদিকদের উপর দমন-পীড়ন দখলদারদের আসল চেহারা উন্মোচিত করেছে
০১ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
হামাসের বীরত্ব:
৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
আল-আকসা মসজিদে ইসরায়েলি দখলদারদের ব্যাপক হামলা
২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার) -
হামাসের বীরত্ব:
২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার)












