সুওয়াল-জাওয়াব:
হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু আনহুম সম্পর্কে বিশুদ্ধ আক্বিদা
, ২০ মুহররম শরীফ, ১৪৪৮ হিজরী সন, ০৭ ছানী, ১৩৯৪ শামসী সন , ০৬ জুলাই, ২০২৬ খ্রি:, ২২ আষাঢ়, ১৪৩৩ ফসলী সন, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) শিক্ষামূলক জিজ্ঞাসা
সুওয়াল:
জুমাদাল উখরা ১৪৪৬ হিজরী সনে প্রকাশিত এক অখ্যাত মাসিক পত্রিকায় পাকিস্তানের মুফতী তকী উসমানী সে আশরাফ আলী থানবীর বরাত দিয়ে লিখেছে- মক্কায় থাকা অবস্থায় মুসলমানদের সকলের মাঝে উন্নত চরিত্র, ইখলাছ, সবর ও তাক্বওয়া গুণ দৃঢ়তা লাভ করেনি। এ অবস্থায় সশস্ত্র জিহাদের অনুমতি দিলে সকল মোকাবিলা হতো কেবল উদ্দীপনা, জোশ, ক্রোধ ও প্রতিশোধের লক্ষ্যে। কেবল আখলাক্ব ও আল্লাহ পাক উনার কালিমা বুলন্দ করার উদ্দেশ্যে হতো না। এ অবস্থায় উনারা ফেরেশতাদের পবিত্র কাফেলার সহযোগিতা লাভের উপযুক্ত হতেন না। এবং মহান আল্লাহ পাক উনার পক্ষ থেকে নিরাপত্তা লাভেরও যোগ্য বিবেচিত হতেন না। নাউযুবিল্লাহ! একথা কতটুকু শরীয়তসম্মত?
জাওয়াব (১ম অংশ):
আশরাফ আলী থানবীর বরাত দিয়ে পাকিস্তানের কথিত মুফতী তকী উসমানী সে হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনাদের সম্পর্কে যেসব বক্তব্য উল্লেখ করেছে তা সম্পূর্ণরূপে মনগড়া, দলীলবিহীন এবং উনাদের সুমহান শান বা মর্যাদা মুবারকের খিলাফ হওয়ার কারণে কুফরী হয়েছে।
মুরতাদ তকী উসমানী তার মুরুব্বীর বক্তব্যের বরাত দিয়েছে। অথচ মহান আল্লাহ পাক তিনি মুরুব্বীর বরাত দিতে নিষেধ করেছেন। পবিত্র কুরআন শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে-
وَإِذَا قِيْلَ لَـهُمُ اتَّبِعُوْا مَا أَنْـزَلَ اللهُ قَالُوْا بَلْ نَـتَّبِعُ مَا أَلْفَيْـنَا عَلَيْهِ اٰبَاءَنَا ۗ أَوَلَوْ كَانَ اٰبَاؤُهُمْ لَا يَـعْقِلُوْنَ شَيْـئًا وَّلَا يَـهْتَدُوْنَ
অর্থ: যখন তাদেরকে বলা হয়, মহান আল্লাহ পাক তিনি যা নাযিল করেছেন সেগুলোর অনুসরণ করো। তখন তারা বলে, আমরা আমাদের পূর্ব পুরুষদেরকে যার উপর পেয়েছি তার অনুসরণ করবো। যদিও তাদের পূর্বপুরুষরা জ্ঞানীও ছিলনা এবং হিদায়েতপ্রাপ্তও ছিল না। (পবিত্র সূরা বাক্বারা : আয়াত শরীফ ১৭০)
কাজেই, মুরতাদ তকী উসমানীকে মুরুব্বীর বরাত বাদ দিয়ে পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র সুন্নাহ শরীফ থেকে দলীল দিতে হবে। কেননা মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-
هَاتُـوْا بُـرْهَانَكُمْ اِنْ كُنْـتُمْ صَادِقِيْنَ
অর্থ: তোমরা সত্যবাদী হলে দলীল পেশ করো। (পবিত্র সূরা বাক্বারা : আয়াত শরীফ ১১১, পবিত্র সূরা নমল : আয়াত শরীফ ৬৪)
পবিত্র কুরআন শরীফ ও পবিত্র সুন্নাহ শরীফ উনাদের দলীল ব্যতীত তার উক্ত বক্তব্য মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়।
মহান আল্লাহ পাক তিনি মুহাজির ও আনছার সকল হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনাদের শান মুবারকে ইরশাদ মুবারক করেন-
وَالسَّابِقُوْنَ الْأَوَّلُوْنَ مِنَ الْمُهَاجِرِيْنَ وَالْأَنصَارِ وَالَّذِيْنَ اتَّـبَـعُوْهُمْ بِإِحْسَانٍ رَّضِيَ اللهُ عَنْـهُمْ وَرَضُوْا عَنْهُ وَأَعَدَّ لَهُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِيْ تَحْتَـهَا الْأَنْـهَارُ خَالِدِيْنَ فِيْـهَا أَبَدًا ۚ ذٰلِكَ الْفَوْزُ الْعَظِيْمُ
অর্থ: মুহাজির ও আনছার সকল হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম যারা (ঈমান আনয়নে) অগ্রগামী, প্রথম উনারা এবং উনাদেরকে যারা উত্তমভাবে অনুসরণ করবেন উনাদের সকলের প্রতি মহান আল্লাহ পাক তিনি সন্তুষ্টি ঘোষণা করেছেন এবং উনারাও মহান আল্লাহ পাক উনার প্রতি সন্তুষ্ট রয়েছেন। উনাদের জন্য তিনি এমন জান্নাত প্রস্তুত করে রেখেছেন যার নি¤œদেশ দিয়ে নহরসমূহ প্রবাহিত থাকবে। উনারা সেখানে চিরস্থায়ীভাবে অবস্থান করবেন। ইহা উনাদের জন্য বিরাট কামিয়াবী । (পবিত্র সূরা তওবাহ : আয়াত শরীফ ১০০)
পবিত্র আয়াত শরীফ উনার ব্যাখ্যায় পবিত্র হাদীছ শরীফে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-
لَا تَمَسُّ النَّارُ مُسْلِمًا رَاٰنِىْ أَوْ رَأَى مَنْ رَاٰنِىْ
অর্থ: ঐ সকল মুসলমান উনাদেরকে জাহান্নামের আগুন স্পর্শ করবে না, যারা আমাকে দেখেছেন অর্থাৎ হযরত ছাহাবায়ে কিরাম এবং উনাদেরকে যারা দেখেছেন (হযরত তাবিয়ীনে কিরাম) উনাদেরকেও জাহান্নামের আগুন স্পর্শ করবে না। (তিরমিযী শরীফ, মা’রিফাতুছ ছাহাবা ইত্যাদি)
উক্ত পবিত্র আয়াত শরীফ ও পবিত্র হাদীছ শরীফ উনাদের আলোকে প্রতিভাত যে, সকল হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনারা সার্বিকভাবে সবদিক থেকে চূড়ান্তভাবে পূর্ণতাপ্রাপ্ত ছিলেন এবং মহান আল্লাহ পাক উনার নিকট এমন মকবূল হয়েছেন যার কারণে তিনি উনাদের প্রতি যমীনে থাকতেই সন্তষ্টি ও জান্নাত মুবারকের সুসংবাদ দিয়েছেন। এমনকি উনাদেরকে যারা দেখবেন এবং উত্তমভাবে অনুসরণ করবেন উনাদের জন্যও সন্তুষ্টি ও জান্নাত মুবারকের সুসংবাদ দিয়েছেন। সুবহানাল্লাহ!
হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনাদের বৈশিষ্ট্য মুবারক সম্পর্কে মহান আল্লাহ পাক তিনি অনেক আয়াত শরীফ নাযিল করেছেন। মহান আল্লাহ পাক তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-
وَلٰكِنَّ اللهَ حَبَّبَ إِلَيْكُمُ الْإِيمَانَ وَزَيَّـنَهٗ فِي قُـلُوْبِكُمْ وَكَرَّهَ إِلَيْكُمُ الْكُفْرَ وَالْفُسُوْقَ وَالْعِصْيَانَ ۚ أُولٰئِكَ هُمُ الرَّاشِدُوْنَ
অর্থ: নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ পাক তিনি আপনাদের নিকট সম্মানিত ঈমানকে প্রিয় বা পছন্দনীয় করে দিয়েছেন এবং আপনাদের অন্তরে তা সুশোভিত করে দিয়েছেন। আর আপনাদের নিকট কুফরী, ফাসিকী ও নাফরমানীকে অপছন্দনীয় করে দিয়েছেন। উনারাই হচ্ছেন হাক্বীক্বী হিদায়েতপ্রাপ্ত। (পবিত্র সূরা হুজুরাত : আয়াত শরীফ ০৭)
কাজেই, কোন উম্মতের জন্য এমন কথা বলা বা বক্তব্য দেয়া যাবে না যা হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনাদের বিন্দুতম শান মুবারকের খিলাফ হয়। খিলাফ হলে সেটা কুফরী হবে এবং জাহান্নামী হওয়ার কারণ হবে।
এ প্রসঙ্গে পবিত্র হাদীছ শরীফ উনার মধ্যে নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করেন-
اَللهَ اَللهَ فِى أَصْحَابِىْ اَللهَ اَللهَ فِى أَصْحَابِىْ لاَ تَـتَّخِذُوْهُمْ غَرَضًا بَعْدِىْ فَمَنْ أَحَبَّـهُمْ فَبِحُبِّىْ أَحَبَّـهُمْ وَمَنْ أَبْـغَضَهُمْ فَبِبُـغْضِىْ أَبْـغَضَهُمْ وَمَنْ اٰذَاهُمْ فَـقَدْ اٰذَانِىْ وَمَنْ اٰذَانِىْ فَـقَدْ اٰذَى اللهَ وَمَنْ اٰذَى اللهَ فَـيُـوْشِكُ أَنْ يَّأْخُذَهٗ
অর্থ: “আমার ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনাদের সম্পর্কে মহান আল্লাহ পাক উনাকে ভয় করো, আমার ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনাদের সম্পর্কে মহান আল্লাহ পাক উনাকে ভয় করো। আমার বিছাল শরীফের পরে উনাদেরকে তোমরা তিরস্কারের লক্ষ্যস্থল করোনা। যে ব্যক্তি উনাদেরকে মুহব্বত করলো, সে আমাকে মুহব্বত করার কারণেই মুহব্বত করলো, আর যে ব্যক্তি উনাদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করলো, সে আমার প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করার কারণেই তা করলো। যে ব্যক্তি উনাদেরকে কষ্ট দিল, সে মুলতঃ আমাকেই কষ্ট দিল, আর যে আমাকে কষ্ট দিল, সে মূলত মহান আল্লাহ পাক উনাকেই কষ্ট দিল, আর যে মহান আল্লাহ পাক উনাকে কষ্ট দিল, মহান আল্লাহ পাক তিনি শীঘ্রই তাকে পাকড়াও করবেন।” (তিরমিযী শরীফ)
অনুরূপ পবিত্র কালামুল্লাহ শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক হয়েছে-
إِنَّ الَّذِيْنَ يُـؤْذُوْنَ اللهَ وَرَسُوْلَهٗ لَعَنَـهُمُ اللهُ فِي الدُّنْـيَا وَالْاٰخِرَةِ وَأَعَدَّ لَهُمْ عَذَابًا مُّهِيْـنًا
অর্থ: “নিশ্চয় যারা মহান আল্লাহ পাক উনাকে ও উনার রসূল নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে কষ্ট দেয়, দুনিয়া ও আখিরাতে তাদের প্রতি মহান আল্লাহ পাক উনার অভিসম্পাত এবং তাদের জন্য নির্ধারিত রয়েছে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি।” (পবিত্র সূরা আহযাব : আয়াত শরীফ ৫৭)
(মাসিক আল বাইয়্যিনাত শরীফ ৩০০তম সংখ্যা থেকে সংকলিত)
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
প্রসঙ্গ: নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি মাটির সৃষ্টি নন, তিনি মহাসম্মানিত নূর মুবারক
১৯ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
প্রসঙ্গ: মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া করার শরয়ী হুকুম
১১ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
প্রসঙ্গ: মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া করার শরয়ী হুকুম
০৪ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
প্রসঙ্গ মূর্তি-ভাস্কর্য দ্বীন ইসলামে নিষিদ্ধ (১১)
৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
প্রসঙ্গ: মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া করার শরয়ী হুকুম
২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
প্রসঙ্গ মূর্তি-ভাস্কর্য দ্বীন ইসলামে নিষিদ্ধ (১০)
২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
প্রসঙ্গ দ্বীন ইসলামে দিবস পালন করা শরীয়তসম্মত (৩)
২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
প্রসঙ্গ মূর্তি-ভাস্কর্য দ্বীন ইসলামে নিষিদ্ধ (৯)
১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
প্রসঙ্গ দ্বীন ইসলামে দিবস পালন করা শরীয়তসম্মত (২)
১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
প্রসঙ্গ মূর্তি-ভাস্কর্য দ্বীন ইসলামে নিষিদ্ধ (৮)
০৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
প্রসঙ্গ দ্বীন ইসলামে দিবস পালন করা শরীয়তসম্মত (১)
০৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল ইছনাইনিল আযীম (সোমবার) -
প্রসঙ্গ মূর্তি-ভাস্কর্য দ্বীন ইসলামে নিষিদ্ধ (৭)
০২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার)












