জীবনী মুবারক
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু (৬)
বিলাদত শরীফ: ৬০৮ খৃ: বিছাল শরীফ: ৭৪ হিজরী (৬৯৪ খৃ:) বয়স মুবারক: ৮৭ বছর।
, ০৪ মুহররম শরীফ, ১৪৪৮ হিজরী সন, ২১ আউওয়াল, ১৩৯৪ শামসী সন , ২০ জুন, ২০২৬ খ্রি:, ০৬ আষাঢ়, ১৪৩৩ ফসলী সন, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) পবিত্র দ্বীন শিক্ষা
ফযীলত ও মর্যাদা:
মহান আল্লাহ পাক তিনি পবিত্র কুরআন শরীফে হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনাদের প্রশংসায় ইরশাদ মুবারক করেছেন-
إذَا ذُكِرَ اللهُ وَجِلَتْ قُلُوْبُهُمْ
(অর্থ: উনাদের কাছে যখন মহান আল্লাহ পাক উনার কথা বলা হয়, উনাদের অন্তর ভয়ে কেঁপে উঠে)। হযরত ইবনে উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার মধ্যে এ অবস্থার পূর্ণ বিকাশ ঘটেছিল। একবার উনার সম্মুখে এই আয়াত শরীফখানা পাঠ করা হলো-
فَكَيْفَ إذَا حِئْنَا مِنْ كُلِّ أمَّةٍ شَهِيْدًا
(অর্থ: তখন কেমন হবে যখন আমরা প্রত্যেক জাতির মধ্য থেকে সাক্ষী উপস্থিত করবো)। হযরত ইবনে উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি এই আয়াত শরীফখানা শুনে এত কাঁদলেন যে, চোখের পানিতে উনার দাড়ি মুবারক ভিজে গেল এবং উনার আশেপাশের লোকেরাও তাতে প্রভাবিত হলো।
হযরত নাফে’ রহমতুল্লাহি আলাইহি বর্ণনা করেন, হযরত ইবনে উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি একবার যখন নিম্নোক্ত আয়াত শরীফখানা তিলাওয়াত করলেন-
ألَمْ يَأنِ لِلَّذِيْنَ آمَنُوْا أنْ تَخْشَعَ قُلُوْبُهُمْ لِذِكْرِاللهِ
তখন তিনি ক্রন্দন করে উঠলেন এবং অতঃপর অঝোরে কাঁদতে লাগলেন। (ইছাবা)
যার অর্থ হচ্ছে- ঈমানদারদের জন্য কি এখনও সময় আসেনি যে, তাদের অন্তরসমূহ মহান আল্লাহ পাক উনার যিকিরের জন্য বিনিত হবে? (পবিত্র সূরা হাদীদ শরীফ: পবিত্র আয়াত শরীফ ১৬)
হযরত ইবনে উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু ছিলেন একজন বড় ধরণের আবেদ এবং রাত্রি-জাগরণকারী ব্যক্তি। রাত্রির বেশীর ভাগ সময় ইবাদতে অতিবাহিত করতেন। উনার খাদেম হযরত নাফে’ রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন, তিনি সারা রাত নামায আদায় করতেন। ছুবহে ছাদিকের সময় আমাকে জিজ্ঞাসা করতেন, সকাল হয়েছে কি? আমি যদি হ্যাঁ বলতাম, তাহলে আর একটু ফর্সা হওয়া পর্যন্ত ইস্তিগ্ফারে কাটাতেন। আর “না” বললে আবার নামাযে দাঁড়িয়ে যেতেন।
এক হাদীছ শরীফে হযরত ইবনে উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বর্ণনা করেন, নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার দুনিয়াবী জিন্দেগীতে কেউ যদি স্বপ্ন দেখত, তা উনার নিকট বর্ণনা করত। আমিও আকাঙ্খা করতাম যেন আমি কোন একটি স্বপ্ন দেখি। তখন আমি ছিলাম অল্প বয়সের অবিবাহিত বালক, মসজিদেই শুয়ে থাকতাম। একবার আমি স্বপ্নে দেখলাম, দুইজন ফেরেশতা আমার নিকট আসলেন, অতঃপর আমাকে নিয়ে চললেন।... (অতঃপর পরিশেষ বলা হয়েছে) “অতঃপর আমি ইহা (আমার বোন) হযরত উম্মুল মু’মিনীন আর রবি’য়াহ আলাইহাস সালাম (হাফছাহ আলাইহাস সালাম) উনার নিকট বর্ণনা করি। তিনি ইহা নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার নিকট বর্ণনা করলেন। অতঃপর নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি ইরশাদ মুবারক করলেন-
نِعْمَ الرَّجُلُ عَبْدُ اللهِ لَوْ كَانَ يُصَلِّى مِنَ اللَّيْلِ
অর্থ: আবদুল্লাহ কত উত্তম লোক! তিনি যদি রাত্রে নামায (তাহাজ্জুদ) পড়তেন! হযরত ইবনে উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেন যে, এরপর থেকে তিনি প্রায় সারা রাত্রই জাগ্রত থাকতেন এবং অতি অল্পই নিদ্রা যেতেন। (ইছাবা)
পবিত্র কুরআন শরীফ তিলাওয়াতে তিনি এক অপার্থিব স্বাদ অনুভব করতেন। এক রাত্রিতেই সম্পূর্ণ পবিত্র কুরআন শরীফ খতম করতেন। প্রতি বছর হজ্জ আদায় করতেন। ছোট ছোট ইবাদতও তিনি ছাড়তেন না। প্রত্যেক নামাযের জন্য তিনি নতুনভাবে ওযু করতেন। মসজিদে যাওয়ার সময় ধীরে ধীরে পা ফেলতেন যাতে কদম সংখ্যা বেড়ে যায় এবং নেকীও বেশী অর্জিত হয়।
হযরত ইবনে উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু ছিলেন যুহদ ও তাক্বওয়ার বাস্তব নমুনা। তিনি ছিলেন উনার যুগের অতুলনীয় যাহিদ ও মুত্তাক্বী।
বাল্যকাল থেকেই হযরত ইবনে উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার মধ্যে তাক্বওয়ার ভাবটি গালিব তথা প্রবল ছিল। নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি উনার এই তাক্বওয়ার স্বভাব দেখে বলেছিলেন اَلرَّجُلُ الصَّالِحُ (নেককার বান্দা)।
হযরত হামযাহ বিন আবদুল্লাহ বিন উমর রহমতুল্লাহি আলাইহি বলেন, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনার নিকট যদিও প্রচুর খাদ্য সামগ্রী মজুদ থাকত, তিনি কখনও পেট ভরে খাদ্য গ্রহণ করতেন না। একবার উনার অসুস্থ অবস্থায় ইবনে মুতী উনাকে দেখতে আসলেন। তিনি দেখলেন যে, উনার শরীর ক্ষীণ হয়ে গেছে। তখন ইবনে মুতী হযরত ছফিয়্যা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা উনাকে উদ্দেশ্য করে বললেন; আপনি কি উনার প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন করেন না? যাতে উনার শরীর স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে, আপনি কি উনার জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী খাদ্য প্রস্তুত করতে পারেন না? হযরত ছফিয়্যা রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা তিনি উত্তর দিলেন, আমরা সেরূপ করে থাকি। কিন্তু তিনি উনার পরিবারের কারো অথবা উপস্থিত অন্য কোন লোকের কথায় কর্ণপাত করেন না। ইচ্ছা করলে এ বিষয়ে আপনি উনার সঙ্গে কথা বলতে পারেন। অতঃপর ইবনে মুতী হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু উনাকে বললেন, হে আবু আবদুর রহমান! আপনি যদি প্রয়োজনীয় খাদ্য গ্রহণ করতেন, আপনার শরীর স্বাভাবিক অবস্থায় আসত।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু তিনি বললেন, আমার বয়স এখন ৮০ বছর হয়েছে, এ দীর্ঘ সময়ের মধ্যে আমি কখনও পেট ভরে আহার করিনি। অথবা তিনি বলেছিলেন, শুধু একবার ব্যতীত এ সময়ের মধ্যে কখনও পেট ভরে আহার করিনি। এখন আপনি কি চান, আমার জীবনের একেবারে শেষ মুহূর্তে আমি পেট ভরে আহার করি? (হায়াতুছ ছাহাবা) (অসমাপ্ত)
-আল্লামা সাঈদ আহমদ গজনবী।
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
সম্মানিত ইসলামী শরীয়ত উনার দৃষ্টিতে- ফুটবল-ক্রিকেটসহ সর্বপ্রকার খেলাধুলা করা, সমর্থন করা হারাম ও নাজায়িয (৫)
২০ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
পর্দা করা ফরজ, বেপর্দা হওয়া হারাম
২০ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
সাইয়্যিদুনা হযরত সুলত্বানুন নাছীর আলাইহিস সালাম উনার পবিত্র ওয়াজ শরীফ
২০ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
কদমবুছী করা খাছ সুন্নত মুবারক
২০ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
সম্মানিত হযরত ইমাম পরিবার আলাইহিমুস সালাম উনাদেরকে অবরোধ ও ফোরাত নদীর পানি পান করতে বাধা প্রদান
২০ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
পবিত্রতা সম্পর্কিত মাসয়ালা-মাসায়িল (১০)
১৯ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
প্রাণীর ছবি তোলা হারাম ও নাফরমানীমূলক কাজ
১৯ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
সাইয়্যিদুনা হযরত সুলত্বানুন নাছীর আলাইহিস সালাম উনার পবিত্র ওয়াজ শরীফ
১৯ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
কারবালার ঘটনার জন্য মালউন ইয়াযিদ লানতুল্লাহি আলাইহি দায়ী এবং সে কাফির (২)
১৯ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
নূরে মুজাসসাম হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে সম্বোধন মুবারক করার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ আদব-শরাফত বজায় রাখতে হবে
১৯ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
মহান আল্লাহ পাক তিনি পবিত্র কুরআন শরীফ উনার মধ্যে ইরশাদ মুবারক করেন-
১৯ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
হযরত মাওলানা শাহ ছুফী আবুল খায়ের মুহম্মদ ওয়াজীহুল্লাহ নানুপূরী যাত্রাবাড়ীর হযরত মুর্শিদ কিবলা আলাইহিস সালাম উনার সংক্ষিপ্ত সাওয়ানেহ উমরী মুবারক (৭ম পর্ব)
১৯ জুন, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার)












