বাংলার মুসলিম কৃষকদের উপর হিন্দু জমি দখলদারদের জুলুমের ইতিহাস (পর্ব ০১)
, ১৭ শাওওয়াল শরীফ, ১৪৪৬ হিজরী সন, ১৭ হাদি আশির, ১৩৯২ শামসী সন , ১৬ এপ্রিল, ২০২৫ খ্রি:, ৩ বৈশাখ, ১৪৩২ ফসলী সন, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) ইতিহাস
১৭৯৩ সালে ভূমি-ব্যবস্থার সংস্কারের নামে বাংলার মুসলিম কৃষকদেরকে শোষণের হাতিয়ার হিসেবে ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’কে ব্যবহার করে কোলকাতা কেন্দ্রীক উচ্চ বর্ণের নব্য হিন্দু জমি দখলদাররা। ব্রিটিশরা আসার আগে জমিদার দাবিকারীরা জমির মালিক ছিলো না, শুধু খাজনা তুলে সরকারী কোষাগারে জমা দিতো।
তারপর ১৭৯৩ সালে ব্রিটিশ বেনিয়াগুলি চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত চালু করলো, জমিদার দাবিকারীদের জমির মালিকানা দেয়া হলো, তারা জমির মালিক হলো ব্রিটিশ বেনিয়াদের সরাসরি সহযোগিতায়, তাদেরকে বলা হলো, তারা সরকারের জন্য নির্দিষ্ট পরিমান খাজনা আদায় ছাড়াও আরো যতভাবে খুশি টাকা আদায় করতে পারবে। তবে কোনো কৃষক ও সাধারণ নাগরিক যেন ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন-সংগ্রাম করতে না পারে। অর্থাৎ জমি দখলদাররা হয়ে গেলো ব্রিটিশ সরকারের লাঠিয়াল বাহিনী ও কৃষক নির্যাতন অত্যাচারকারী বর্ণ হিন্দু নব্য জমি দখলদাররা গড়ে তুললো সম্পদের পাহাড়।
চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে উচ্চ বর্ণ হিন্দু জমি দখলদার ও ইংরেজদের লুণ্ঠন সম্পর্কে বিনয় ঘোষ লিখেছে- “নবাবের সিংহাসন নিয়ে চক্রান্ত করে, জমিদারী বন্দোবস্ত ও রাজস্ব আদায়ের নতুন ব্যবস্থা প্রবর্তন করে, ব্যক্তিগত ও অবৈধ বাণিজ্য থেকে প্রচুর মুনাফা লুণ্ঠন করে এবং আরও নানা উপায়ে উৎকোচ-উপঢৌকন নিয়ে চার্ণক-হেজেস-ক্লাইভ-হেষ্টিংস-কর্নওয়ালিসের আমলের কোম্পানির কর্মচারীরা যে কি পরিমাণ বিত্ত সঞ্চার করেছিলো তা কল্পনা করা যায় না। দেখতে দেখতে প্রচুর অর্থ ও নতুন রাজনৈতিক ক্ষমতার জোরে কোম্পানি সাহেবরা সত্যি সত্যি নবাব বনে গেলো। তাদের মেজাজ ও চালচলন সবই দিন দিন নবাবের মতো হয়ে উঠতে লাগলো”। (বিনয় ঘোষ কলকাতা শহরের ইতিবৃত্ত, ৪৪৫ পৃষ্ঠা)
আর ইংরেজদের কাছ থেকে উচ্চ বর্ণ হিন্দুদের হঠাৎ করে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলের জমিদারির মালিক হওয়ার প্রসঙ্গে ডক্টর আহমদ শরীফ বলেছে, ‘স্বল্প বেতনভূক’ বণিক নাবিক আর ‘লোফার’ ইংরেজ ‘কর্মচারীরা’ ‘বেঙ্গল নেবুব’-এ পরিণত হলো। আর তাদের এ দেশীয় লুণ্ঠন-সহচর দেওয়ান-বেনিয়ান-মুৎসুদ্দীরা দালালীর মাহত্ম্যে রাতারাতি পরিণত হলো রাজা-মহারাজারয়।
এই সম্মিলিত লুটেরা চক্রটি সম্পর্কেই ডক্টর আহমদ শরীফ লিখেছে- “প্রথমে কলকাতায় ইংরেজ কোম্পানির আশ্রয়ে ও প্রশ্রয়ে কতগুলো ভাগ্যবিতাড়িত, চরিত্রভ্রষ্ট, ধুর্ত, পলাতক, অল্প শিক্ষিত লোক বেনিয়া-মুৎসুদ্দী-গোমস্তা-কেরানী-ফড়িয়া দালালরূপে অবাধে অঢেল অজস্র কাঁচা টাকা অর্জন ও সঞ্চয়ের দেদার সুযোগ পেয়ে ইংরেজদের এ দেশে উপস্থিতিকে ভগবানের আশীর্বাদরূপে জানলো ও মানলো”। (ডক্টর আহমদ শরীফথবঙ্কিম বীক্ষা-অন্য নিরিখে, ভাষা-সাহিত্যপত্র, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় বার্ষিকী সংখ্যা, ১৩৮২)
আর এইসব উচ্চ বর্ণ হিন্দু দালাল, মুৎসুদ্দী, বেনিয়ান ও দেওয়ান সম্পর্কে কলকাতা মার্কসবাদী গবেষক বিনয় ঘোষ দেখিয়েছে, কলকাতা শহর গড়ে উঠেছিলো ‘নাবিক, সৈনিক ও লোফার’- এই তিন শ্রেণীর ইংরেজের হাতে। তাদের দেওয়ান, বেনিয়ান ও দালালরূপে এদেশীয় একটি নতুন শ্রেণী রাতারাতি কাড়ি কাড়ি টাকার মালিক হয়ে ইংরেজদের জুনিয়র পার্টনাররূপে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো।
এখানে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পিছনে ইতিহাস সম্পর্কে একটু বলা যাক-
এই বাঙালি বেনিয়ানরা প্রথম যুগের ইংরেজ ব্যবসায়ীদের দোভাষী, বাণিজ্য প্রতিনিধি আর মহাজন শুধু ছিলো না, তারা ছিলো তাদের রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রেরও সহচর। ১৬৯০ সালে জোব চার্ণক হুগলী নদীর উজান বেয়ে যখন কলকাতায় এসে বাসা বেঁধেছিলো, তখন থেকেই এই শ্রেণীর সাথে তাদের বাণিজ্যিক যোগাযোগের সুবাদে গড়ে উঠেছিলো এক ধরনের রাজনৈতিক গাঁটছাড়া।
আঠারো শতকের শুরু থেকে সে সম্পর্ক আরো জোরদার হয়। এ জন্যই দেখা যায় ১৭৩৬ থেকে ১৭৪৯ সালের মধ্যে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কলকাতায় যে ৫২ জন স্থানীয় ব্যবসায়ীকে নিয়োগ করে, তারা সকলেই ছিলো একটি বিশেষ ধর্ম-সম্প্রদায়ের লোক। ১৭৩৯ সালে কোম্পানি কাসিমবাজারে যে ২৫ জন ব্যবসায়ী নিয়োগ করে তাদেরও অভিন্ন পরিচয়। এভাবেই গড়ে ওঠে ইঙ্গ-হিন্দু ষড়যন্ত্রমূলক মৈত্রী। মুসলিম শাসনের অবসানই ছিলো এই মৈত্রীজোটের উদ্দেশ্য। (এস. সি. হিল তার গ্রন্থ ‘বেঙ্গল ইন ১৭৫৬-১৭৫৭’-এর ২৩, ১০২, ১১৬ ও ১৫৯ পৃষ্ঠায় প্রমাণপঞ্জীসহ এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছে। )
এই শ্রেণীর লোকেরাই বাংলার স্বাধীনতা ইংরেজ অর্থাৎ ব্রিটিশ বেনিয়াদের হাতে তুলে দেওয়ার সকল আয়োজন সম্পন্ন করেছিলো। ব্যক্তিস্বার্থ ও সংকীর্ণ মোহাচ্ছন্ন সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষবশত এই শ্রেণীর লোকেরাই স্বাধীনতার পরিবর্তে পরাধীনতাকে স্বাগত জানিয়েছিলো। আর যার ফলাফল চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের।
বিষয়টি খোলামেলা তুলে ধরে এম. এন. রায় লিখেছে- "It is historical fact that a large section of Hindu community welcomed the advent of the English power." (India In Transition)"
আর রমেশচন্দ্র মজুমদার লিখেছে- British could winover political authority without any opposition from the Hindus." (British Paramountcy and Indian Renaissance. Part-II, P-4)
ইংরেজরা বাংলার সাবেক শাসক জাতির ব্যাপারে একদিনের জন্যও নিশ্চিন্ত থাকতে পারেনি। ক্লাইভ কোর্ট অব ডিরেক্টরকে এক চিঠিতে লিখেছিলো- “মুসলমানরা সব সময়ই বিদ্রোহের জন্য প্রস্তুত। সাফল্যের বিন্দুমাত্র সম্ভাবনা আছে জানলেই তারা সাথে সাথে তা সংঘটিত করবে”। (Selections from Unpublished Records of Govt1784-67; James Long, 1973, P-202)
বিদ্রোহের এ আশঙ্কার কারণেই যে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ব্যবস্থা করা হয়, তা কর্ণওয়ালিসের যবানি থেকেই খোলাসাভাবে জানা যায়। তার ভাষায়-
“আমাদের নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্যই ভূ-স্বামীদেরকে আমাদের সহযোগী করে নিতে হবে। যে ভূ-স্বামী একটি লাভজনক ভূ-সম্পত্তি নিশ্চিন্তে ও সুখে-শান্তিতে ভোগ করতে পারে তার মনে তার কোনরূপ পরিবর্তনের ইচ্ছা জাগতেই পারে না”। (বদরুদ্দীন উমর: চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ও বাংলাদেশের কৃষক, ২২ পৃষ্ঠা)
-মুহম্মদ মুশফিকুর রহমান।
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
মুসলিম নির্যাতনের প্রতিশোধ হিসেবে বাংলার সুলতান যেভাবে নেপাল বিজয় করেছিলেন
০৫ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল খমীছ (বৃহস্পতিবার) -
আধুনিক কাগজ শিল্পের প্রতিষ্ঠাতা মুসলমানগণই
০৪ মার্চ, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
মাদরাসা প্রতিষ্ঠা নিয়ে ইতিহাসের আলোকে কিছু সংক্ষিপ্ত তথ্য
২৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
তাতারস্তানে সম্মানিত দ্বীন ইসলাম এবং মুসলমানদের স্বর্ণালী ইতিহাস
১৮ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
বিধর্মীরা যতটুকু সভ্যতা পেয়েছে তা মুসলিম শাসনামলেই আর বর্বরোচিত প্রথাসমূহ বন্ধ করেছিলেন মুসলিম শাসকরাই
১১ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
সম্মানিত দ্বীন ইসলাম উনার স্বর্ণালী যুগের নিরাপত্তা বিভাগের ইতিহাস (৪)
১১ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
বিখ্যাত মুসলিম পর্যটক ইবনে বতুতার বর্ণনায় বাংলাদেশ
০৬ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল জুমুয়াহ (শুক্রবার) -
উপমহাদেশে ব্রিটিশবিরোধী সুফি, ফকীর-দরবেশ বিদ্রোহের ইতিকথা
০১ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) -
বন্দর দখলদার, নব্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী, বিশ্ব সন্ত্রাসী ইহুদী দস্যুদের দোসর ডিপি ওয়ার্ল্ড এর পরিচিতি এবং উদ্দেশ্য (২)
৩১ জানুয়ারি, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
বর্তমানে দেশকে উন্নত করতে হলে দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ উত্তোলনের বিকল্প নেই (২)
২৮ জানুয়ারি, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
সম্মানিত দ্বীন ইসলাম উনার স্বর্ণালী যুগের নিরাপত্তা বিভাগের ইতিহাস (৩)
২৮ জানুয়ারি, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুল আরবিয়া (বুধবার) -
বর্তমানে দেশকে উন্নত করতে হলে দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ উত্তোলনের বিকল্প নেই (১)
২৭ জানুয়ারি, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ ছুলাছা (মঙ্গলবার)












