আধুনিক ভবন ও শিক্ষক সবই আছে, নেই শিক্ষার্থী
, ১৩ জুমাদাল ঊলা শরীফ, ১৪৪৮ হিজরী সন, ২৬ খ্বমিছ, ১৩৯৪ শামসী সন , ২৫ অক্টোবর, ২০২৬ খ্রি:, ০৯ কার্তিক, ১৪৩৩ ফসলী সন, ইয়াওমুল আহাদ (রোববার) তাজা খবর
বরগুনার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে চলছে শিক্ষার্থী সংকট। আধুনিক ভবন, একাধিক শিক্ষক—সবই আছে। কিন্তু শিক্ষকদের যাদের পড়ানোর কথা, সেই শিক্ষার্থীই নেই পর্যাপ্ত। তাই শিক্ষকদের সবাই বিদ্যালয়েও আসেন না। যারা আসেন, তাদের অনেকে অলস সময় কাটান। কেউ কেউ আবার দুপুরের ভাতঘুমটাও দেন বিদ্যালয়ে। জেলার প্রাথমিক শিক্ষার এমন চিত্র কেন? আর এর দায় কার? এ নিয়ে রয়েছে নানা মতামত।
অভিভাবক ও সচেতন মহলের দাবি, কর্মরত শিক্ষকদের আন্তরিকতার অভাব এবং নিয়মিত বিদ্যালয়ে গিয়ে পাঠদান না করানোর কারণেই শিক্ষাক্ষেত্রে এমন নৈরাজ্য তৈরি হয়েছে। তবে শিক্ষকদের দাবি, অভিভাবকদের অসচেতনতা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেশি হওয়ায় শিক্ষার্থী পাওয়া যাচ্ছে না। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর এমন দুর্দশার কথা স্বীকার করে শিক্ষা বিভাগ ও জেলা প্রশাসন বলছে, বিদ্যালয়ে শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে নানা প্রচেষ্টা চলছে।
বরগুনা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের তথ্য অনুযায়ী, এক হাজার ৮২৩ দশমিক ৮৭ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এ জেলায় লোকসংখ্যা ১০ লাখ ১০ হাজার ৫৩১ জন। জেলায় সরকারি-বেসরকারি প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এক হাজার ৪৫টি। এর মধ্যে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ৭৯৯টি। এসব বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৮১ হাজার ৯০০। শিক্ষার্থী উপস্থিতির হার ৮৭ দশমিক ৬৫ শতাংশ। মঞ্জুরিকৃত শিক্ষকের পদ ৫ হাজার ৪৭টি। এর মধ্যে শূন্য পদ রয়েছে ৪৯৮টি। কর্মরত শিক্ষকদের অনুপাতে একজন শিক্ষকের বিপরীতে শিক্ষার্থী থাকার কথা ১৮ দশমিক ২২ জন এবং একটি বিদ্যালয়ে গড়ে শিক্ষার্থী থাকার কথা অন্তত ১০৪ দশমিক ৬০ জন। তবে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, একজন শিক্ষকের বিপরীতে অন্তত ৩০ জন শিক্ষার্থী থাকার প্রয়োজন।
তবে বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। সম্প্রতি বরগুনা সদর উপজেলার মধ্য পাঠাকাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, আধুনিক ভবনের বিদ্যালয়টির বারান্দায় ঘোরাঘুরি করছে মাত্র দুজন শিক্ষার্থী। লাইব্রেরিতে বসে আছেন কর্মরত পাঁচ শিক্ষকের মধ্যে তিনজন। উপস্থিত নেই প্রধান শিক্ষক কিংবা ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক। শ্রেণিকক্ষের চেয়ার-টেবিল পড়ে আছে ফাঁকা।
এমন পরিস্থিতির ব্যাখ্যা দেন বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক কামরুন নাহার। তিনি বলেন, বিদ্যালয়ের ক্যাচমেন্ট এরিয়ায় (শিক্ষাসেবা এলাকা) শিক্ষার্থী কম। অনেকে শহরে গিয়ে লেখাপড়া করে। তা ছাড়া যোগাযোগব্যবস্থা খারাপ থাকার কারণেও শিশুরা বিদ্যালয়ে কম আসে। প্রধান শিক্ষক ও ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের অনুপস্থিতির বিষয়ে তিনি বলেন, প্রধান শিক্ষক অসুস্থ এবং ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ছুটিতে আছেন।
এ বিদ্যালয় থেকে প্রায় ১৮ কিলোমিটার দূরে উপজেলার চরপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। সেখানেও দেখা যায় একই চিত্র। বারান্দায় ঘোরাঘুরি করছে পাঁচ শিক্ষার্থী। বিদ্যালয়ে উপস্থিত ছিলেন দুজন শিক্ষিকা। উপস্থিত ছিলেন না প্রধান শিক্ষক।
বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা মোসা. পারভীন আক্তার বলেন, শিক্ষার্থী কম থাকা তাদের জন্যও বিব্রতকর। তার দাবি, কাছাকাছি মাদরাসা ও কিন্ডারগার্টেন থাকায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী কমে যাচ্ছে। শিক্ষার্থী কম থাকায় মানসম্মত পাঠদানের প্রতিও তাদের অনীহা তৈরি হচ্ছে। তবে এ বিদ্যালয়ের একাধিক অভিভাবকের দাবি, প্রধান শিক্ষকসহ অন্য শিক্ষকেরা নিয়মিত বিদ্যালয়ে না আসা এবং আন্তরিকতার সঙ্গে পাঠদান না করানোর কারণেই শিক্ষার্থীরা অন্য প্রতিষ্ঠানে চলে যাচ্ছে।
চরপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. বশির উদ্দীন জানান, অসুস্থ থাকায় তিনি বেশ কিছুদিন ধরে ছুটিতে আছেন। তবে বিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকায় শিক্ষার্থী কমে যাচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।
আরও বিস্তারিত জানতে এ প্রতিবেদক সরেজমিনে জেলার বেতাগী উপজেলার পূর্ব হোসনাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যান। সেখানে দেখা যায়, ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা একটি ফাঁকা শ্রেণিকক্ষে বেঞ্চের ওপর ঘুমিয়ে আছেন। অন্য এক শিক্ষিকার মাধ্যমে সাংবাদিকদের উপস্থিতির কথা শুনে তড়িঘড়ি করে উঠে বসেন তিনি।
এ বিদ্যালয়ে চারজন শিক্ষকের মধ্যে উপস্থিত পাওয়া যায় দুজনকে। তবে শিক্ষক হাজিরা খাতায় চারজনেরই স্বাক্ষর ছিল। অন্যদিকে, তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির পাঁচ শিক্ষার্থীকে নিয়ে একটি কক্ষে বসেছিলেন এক শিক্ষিকা। তার সঙ্গে ছিল তার শিশুসন্তানও।
এ সময় বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা নাজমা আক্তারের সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, বিদ্যালয়ের আওতাধীন এলাকায় মোট শিক্ষার্থী রয়েছে ২০ জন। তারা সবাই এ বিদ্যালয়ে ভর্তি হলেও নিয়মিত আসে না। শিক্ষার্থীদের পাঠদান না করিয়ে ঘুমানোর বিষয়ে তিনি বলেন, শারীরিক অসুস্থতার কারণে কিছু সময়ের জন্য ঘুমিয়ে ছিলেন। অন্য দুই শিক্ষকের অনুপস্থিতির বিষয়ে তিনি জানান, তাদের এক আত্মীয় মারা যাওয়ায় তারা সেখানে গেছেন।
একই অবস্থা বেতাগী উপজেলার উত্তর দেশান্তরকাঠী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। সেখানে গিয়ে কোনো শিক্ষার্থী পাওয়া যায়নি। একজন শিক্ষককে বসে থাকতে দেখা যায়। পাশের সর্দারপাড়া হাবিবুর রহমান চানমিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও কোনও শিক্ষার্থী পাওয়া যায়নি। তবে এমন পরিস্থিতি মাত্র দুই-চারটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নয়; গ্রামপর্যায়ের অধিকাংশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চিত্র প্রায় একই।
এ দিকে ৫০ জনের কম শিক্ষার্থী থাকা জেলার ২৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় একীভূত করার প্রস্তাব ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠিয়েছেন জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা। এসব বিদ্যালয়ের মধ্যে পাথরঘাটা উপজেলার ১০টি, বেতাগী উপজেলার ১৩টি এবং বরগুনা সদর, আমতলী, তালতলী ও বামনা উপজেলার একটি করে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে।
বরগুনা সদর উপজেলার কালিরতবক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি মো. জাফর হোসেন বলেন, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পাঠদানে আন্তরিকতার অভাব, নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিত না হওয়া এবং বিদ্যালয়ে গেলেও নির্ধারিত সময়ের আগেই ছুটি দিয়ে চলে যাওয়ার কারণে অভিভাবকেরা সন্তানদের কিন্ডারগার্টেনে ভর্তি করছেন। তা ছাড়া অনেক শিক্ষক শিক্ষকতা না করে ঠিকাদারিসহ নানা পেশায় যুক্ত রয়েছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি। এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা অফিস বা প্রশাসনের যথাযথ পদক্ষেপ না থাকায় এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে তার দাবি।
সদর উপজেলার পূর্ব চরকগাছিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. সিদ্দিকুর রহমান বলেন, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অতিরিক্ত অভিজ্ঞতাসম্পন্ন শিক্ষক নিয়োগ দেয়ায় তারা প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে চাকরি করে মানসিক শান্তি পান না। তা ছাড়া বর্তমানে শিক্ষকদের পাঠদানে আন্তরিকতার ঘাটতি, শিক্ষা অফিসের যথাযথ নজরদারি না থাকা এবং অভিভাবকদের মাদরাসামুখী হওয়াসহ নানা কারণে সরকারি প্রাথমিক শিক্ষায় ধস নেমেছে।
তবে বিদ্যালয়ে সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত পাঠদানের সময় শিশুদের জন্য কষ্টকর বলেও মন্তব্য করেন এ শিক্ষক। তার দাবি, পাঠদানের সময়সীমা আরও কিছুটা কমিয়ে আনা প্রয়োজন।
এ বিষয়ে বরগুনা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবু জাফর মো. ছালেহ্ বলেন, ‘জেলায় শিক্ষার্থীর অনুপাতে বিদ্যালয়ের সংখ্যা বেশি হওয়ায় অনেক বিদ্যালয়ে আশানুরূপ শিক্ষার্থী পাওয়া যাচ্ছে না। তারপরও বিদ্যালয়ের ক্যাচমেন্ট এরিয়ার শিক্ষার্থীরা যাতে ওই বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়, সে জন্য শিক্ষকদের মাধ্যমে অভিভাবক সমাবেশ, বাড়ি বাড়ি গিয়ে অভিভাবকদের বোঝানোসহ নানা কার্যক্রম চলছে।’
শিক্ষকদের নিয়মিত বিদ্যালয়ে না যাওয়া এবং নির্ধারিত সময়ের আগে বিদ্যালয় ছুটি দেয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
বরগুনার জেলা প্রশাসক মিজ তাছলিমা আক্তার বলেন, বিভিন্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিদর্শন করে শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার বিষয়টি লক্ষ্য করা গেছে। শিক্ষার গুণগত মানও নিশ্চিত হচ্ছে না এবং শিক্ষকদের অনাগ্রহ দেখা যাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে সামগ্রিকভাবে কীভাবে কাজ করা যায়, সে বিষয়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের নিয়ে মতবিনিময় সভা করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, প্রাথমিক শিক্ষাকে মানসম্মত করার লক্ষ্যে নানা প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে।
এ সম্পর্কিত আরো সংবাদ
-
বিরোধীদল নোট অব ডিসেন্টে শিথিলতা চাইলে বৈঠকে এসে বলতে হবে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
২৪ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
কৃষকদের ধাওয়ায় পিছু হটল বিএসএফ, পরে গুলি ছোড়ার অভিযোগ
২৪ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
শাহজালাল রহমতুল্লাহি আলাইহি মাজারের দানবাক্সে মিলল ৮৮ লাখ টাকা ও ১৮ দেশের মুদ্রা
২৪ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
কক্সবাজারে অপ্রাপ্তবয়স্কদের হোটেলে রুম ভাড়া দিলে আইনি ব্যবস্থা
২৪ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
মার্কিন শীর্ষ কর্মকর্তাদের হত্যার পরিকল্পনা ইরানের, গোয়েন্দা প্রতিবেদনে চাঞ্চল্যকর তথ্য
২৪ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
ভারত থেকে আসা ১৩৫ টন চালে বিষাক্ত ও ক্ষতিকর উপাদান
২৪ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
পদ্মার ভাঙন তীব্র, দুই মাসে বিলীন ৫০০ বিঘা জমি
২৪ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
ভোক্তার ব্যয় বাড়ার পেছনে দায় কার?
২৪ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’ এখন মুদিপণ্য
২৪ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
১ টাকায় বিক্রি হচ্ছে ৪ পিস কদু!
২৪ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
থার্ড টার্মিনাল পরিচালনা: ৪ শর্তে আটকে গেছে চুক্তি
২৪ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার) -
সৌদি কারাগারে সাড়ে ৭ হাজার বাংলাদেশি, ২ মৃত্যুদ-ের তথ্য চাইলো ঢাকা
২৪ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:০০ এএম, ইয়াওমুছ সাবত (শনিবার)












